হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৯

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৯

সেই ভয়াবহ ঘটনা তিনি স্বীকার করেছেন । আমরা সবাই তো আমাদের ভয়ঙ্কর পাপের কথা স্বীকার করি না । আমার মতে, মহাপুরুষ হচ্ছে এমন একজন যাকে পৃথিবীর কোনো মালিন্য স্পর্শ করেনি । এমন কেউ কি সত্যি সত্যি জন্মেছে এই পৃথিবীতে ? ঘুমুতে চেষ্টা করছি । ঘুমুতে পারছি না । শীত শীত লাগছে । খালিগায়ে থাকার জন্যে লাগছে । খালিগায়ে থাকার কারন আমার পাঞ্জাবী এখন বাদলের গায়ে । শুয়ে শুয়ে ছলেবেলার কথা ভাবতে চেষ্টা করছি । বিশেষ কোনো কারণে নয় । ঘুমুবার আগে কিছু-েএকটা নিয়ে ভাবতে হয় বলেই ভাবা । 

আমার শৈশব যাদের সঙ্গে কেটেছে – তারা কেমন ! 

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৯                                                               

জন্মের সময় আমার মা মারা যান । মার কথা কিছুই জানি না । তিনি দেখতে কেমন তাও জানি না । অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে তার কোনো ছবি নেই । বাবা মারা যান আমার ন-বছর বয়সে । তার কথা তেমন মনেও নেই । তার কথা মনে পড়লেই একটা উদ্বিগ্ন মুখ মনে আসে । সেই মুখে বড় বড় দুটি চোখ । ভারি চশমায় ঢাকা বলে সেই চোখর ভাবও ঠিক বোঝা যায় না । মনে হয় পানির ভেতর থেকে কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে । বাবার উদ্বিগ্ন গলা, কী রে তোর ব্যাপারটা কী বলত ? যত্ন হচ্ছে না ? আমি তো প্রাণপণ করছি । অবশ্যি ছেলে মানুষ করার কায়দা-কানুনও আমি জানি না । কী যে ঝামেলায় পড়লাম ! তোমার অসুবিধাটা কী বল তো ? পেট ব্যথা করছে ?     

বাবার বোধহয় ধারণা ছিল শিশুদের একটি সমস্যা-পেটে ব্যথা । তারা যখন মন খারাপ করে বসে থাকে তখন বুঝতে হবে তার পেট ব্যথা করছে । গভীর রাতে ঘুম ভেঙে কোনো শিশু যদি জেগে উঠে কাঁদতে থাকে তখন বুঝতে হবে তার পেটে ব্যথা । বাবার কাছ থেকে কত অসংখ্যবার যে শুনেছি- কী রে হিমু, তোর কি পেটব্যথা নাকি ? মুখটা এমন কালো কেন ? কোন জায়গাটায় ব্যথা দেখি । বাবা যে একজন পাগল ধরনে মানুষ এটা বুঝতে আমার তেমন দেরি হয়নি । শিশুদের বোধশক্তি ভালো । পাগল না হলে নিজের ছেলের নাম কেউ হিমালয় রাখে ?    স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে গেলেন- হেডস্যার গম্ভীর গলায় বললেন, হিমালয় !                                                                                                 

জি ।                                                                                                          

আহম্মদ বা মোহম্মদ এইসব কিছু আছে ?                                                                  

জি না, শুধুই হিমালয় ।                                                                             

হেডস্যার অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন, ও আচ্ছা ।    

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড-৯                           

বাবা উৎসাহের সঙ্গে বললেন, নদীর নামে মানুষের নাম হয়, ফুলের নামে হয়, গাছের নামে হয়, হিমালয়ের নামে নাম হতে দোষ কী ? হিমালয় নাম রাখার বিশেষ কোনো তাৎপর্য কি আছে ? অবশ্যই আছে-যাতে এই ছেলের হৃদয় হিমালয়ের মতোবড় হয় সেইজন্যেই এই নাম ।                                                                                                                                                  

তাহলে আকাশ নাম রাখলেন না কেন ? আকাশ তো আরো বড় । বড় হলেও তা ধরা-ছোয়ার বাইরে । হিমালয়কে স্পর্শ করা যায় । কিছু মনে করবেন না, এই নামে স্কুলে ছেলে ভর্তি করা যাবে না । এমন কোনো আইন আছে যে হিমালয় নাম রাখলে সেই ছেলে স্কুলে ভর্তি হতে পারবে না ?                      

আইন-টাইন আমি জানি না । এই ছেলেকে আমি স্কুলে নেব না ।                        

কেন ?                                                                                           

আগে তো বললেন সিট আছে ।                                                                                   

এখন নেই ।                                                                                               

শিক্ষক হয়ে মিথ্যা কথা বলছেন- তাহলে তো এখানে কিছুতেই ছাত্র ভর্তি করা উচিত না । মিথ্যা কথা বলা শিখবে ।                                                  

Read more

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১০

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *