আসুন আমরা বাদশাহ নামদারের জগতে ঢুকে যাই । মোঘল কায়দার কুর্নিশ করে ঢুকতে হবে কিন্তু ।
নকিব বাদশাহর নাম ঘোষণা করছে –
আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল আল মুকাররাম, জামিই সুলতানাত-ই-হাকিকি ওয়া মাজাজি, সৈয়দ আল সালাতিন, আবুল মোজাফফর নাসির উদ্দিন মোহাম্মদ হুমায়ূন বাদশাহ, গাজি জিল্লুল্লাহ ।
ইংরেজি ৬ মার্চ ১৫০৮ খ্রিষ্টাব্দ
এগারো সংখ্যাটি সম্রাট বাবরের প্রিয় । তিনি যখন শরাব পানের আসরে বসেন, তখন তাঁর সঙ্গী থাকে দশজন । খাবার খেতে যখন বসেন তখনো দশজনকে নিয়েই বসেন । তাঁকে নিয়ে সবসময় সংখ্যা হয় এগারো । বেজোড় সংখ্যা । আল্লাহপাক বেজোড় সংখ্যা পছন্দ করেন ।
প্রভাতী মদ্যপানের আসর বসেছে । এই আসরের নাম সাবহী (প্রভাতী মদ্য) যথারীতি দশজন আমীর আছেন । তাদের সামনে রুপার পানপাত্র । সম্রাট সামনে স্বর্ণের পানপাত্র । তারা ‘দমীহ্’ নামের শরাব খাচ্ছেন । ‘দমীহ্’ এসেছে পারস্য থেকে । এক বিশেষ ধরনের গাছের শিকড় এবং মধু থেকে দমীহ তৈরি হয়। দমীহ্ কিছুক্ষণের মধ্যে নেশার আবেশ তৈরি করে, তবে সহজে মত্ততা আনে না ।
পান শুরু হওয়ামাত্র প্রধান উজির মীর খলিফা ঢুকলেন । সম্রাটের ভুরু কুঞ্চিত হলো । মীর খলিফা ধর্মীয় অনুশাসন কঠিনভাবে মানেন । শরাব খান না । পানের আসরে এ ধরনের মানুষের উপস্থিতি সম্রাটের পছন্দ না ।
মীর খলিফা বললেন, আমি সম্রাটের সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলতে আগ্রহী ।
সম্রাট বললেন, উজির, আপনার সময় নির্বাচন ভুল হয়েছে ।
উজির বললেন, সময়ের ভুল শুদ্ধ নেই । মানুষ ভুল শুদ্ধের অধীনে বাস করে ।সময় করে না ।
এই মুহূর্তে একান্তে কথা বলা জরুরি ?
বাদশাহ নামদার পর্ব –৩
জরুরি ।
যাঁরা আমার সঙ্গে আছেন তাঁরা আমার আপনজন । আমাকে যা বল যাবে, তাঁদেরকেও বলা যাবে ।
উজির বললেন, আমার যা বলার তা আমি আপনাকেই বলব ।
আপনার ইচ্ছা হলে পরে আপনি আপনার প্রিয়জনদের সঙ্গে আলাপ করতে পারেন । এখন না ।
সম্রাট হাত ইশারা করতেই আমীররা উঠে গেলেন । তাদেরকে বিচলিত মনে হলো ।
উজির বললেন, কিছুক্ষণ আগে খবর পেয়েছি হুমায়ূন মীর্জা তাঁর সমস্ত সেনাদল নিয়ে আগ্রার দিকে ছুটে আসছেন ।
হুঁ।
বাদাখশান্ অরক্ষিত । হুমায়ূন মীর্জা বাদাখশান্ সুরক্ষার জন্যে কোনো ব্যবস্থাই করেন নি ।
হুঁ ।
কামরান মীর্জার সঙ্গে হুমায়ূনের কাবুলে দেখা হয়েছে । কামরান তাঁর বড়ভাইয়ের হঠাৎ করে আগ্রা রওনা হওয়ার কারণ জানতে চেয়েছিলেন । হুমায়ূন কোনো জবাব দেন নি ।
হুঁ ।
বাদাখশান। অরক্ষিত রেখে হুমায়ূন হিন্দুস্থান যাত্রা করেছেন দেখে কামরান যাচ্ছেন বাদাখশানে । তিনি বাদাখমানের দুর্গ রক্ষা করবেন ।
হুঁ ।
এদিকে অরক্ষিত বাদাখশানের দখল নেওয়ার জন্যে আপনার চিরশত্রু সুলতান সঈদ খান রওনা হয়ে গেছেন । আমার যা বলার ছিল বলেছি । আপনার প্রভাতী পানাহারের বিঘ্ন করেছি বলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি ।
বাবর দমীহতে চুমুক দিলেন । তাঁকে তেমন বিচলিত মনে হলো না ।তিনি হালকা গলায় বললেন, হুমায়ূন হঠাৎ কেন এদিকে আসছে বলে আপনার ধারণা ? সে কি সিংহাসন চায় ?
মীর খলিফা বললেন, সিংহাসন চাওয়াটাই স্বাভাবিক । ধরে নিলাম সিংহাসন তার চিন্তায় নেই, তারপরেও আপনাকে কিছু না জানিয়ে বাদাখশান্ অরক্ষিত রেখে তার যাত্রা গর্হিত হয়েছে ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৩
সম্রাট বললেন, এমনও তো হতে পারে হঠাৎ এদিকে আসার তার বিশেষ কোনো কারণ ঘটেছে ।
উজির শীতল গলায় বললেন, সম্রাটকে মনে করিয়ে দিতে চাই, আপনার এই পুত্র দিল্লীর রাজকোষ লুন্ঠন করে পালিয়ে গিয়েছিল ।
হুঁ ।
আপনি তিল তিল করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছেন । যোগ্য হাতে এই সামাজ্য রক্ষার ভার দিয়ে যাওয়া আপনার কর্তব্য ।
আপনার কাছে যোগ্য কে বলে মনে হয় ?
অবশ্যই কামরান মীর্জা অলস এবং আরামপ্রিয় ।
হুঁ ।
সম্রাটকে জানাতে চাই, প্রধান উজির হিসেবে সম্রাটের সেবা এবং সাম্রাজ্যের সেবা ছাড়া আমার কোনো উদ্দেশ্য নাই । অতীতেও ছিল না । ভবিষ্যতে ও থাকবে না ।
উজির ভক্তিভরে সম্রাটের হাতে চুম্নন করলেন । সম্রাট বললেন, আপনি কখনোই আমাকে কোনো ভুল পরামর্শ দেন নাই । আপনার কর্মে আমি উপকৃত, আমার সাম্রাজ্য উপকৃত ।
মীর খলিফা বললেন, আপনাকে এই মুহূর্তে আমি একটি পরামর্শ দিতে চাচ্ছি । আপনি বিচক্ষণ সম্রাট, আমার এই উপদেশ গ্রহণ করলে উপকৃত হবেন ।
কী পরামর্শ ?
রাজকীয় ঘোড়সওয়ার বাহিনী হুমায়ূন মীর্জার গতিরোধ করবে এবং তাঁকে গ্রেফতার করে সম্রাটের সামনে উপস্তিত করবে । আপনি তাঁকে প্রশ্ন করবেন এই সময়ে বাদাখশান্ শত্রুর হাতে ফেলে তিনি কেন চলে এসেছেন ?
আপনার ধানণা এটি সঠিক সিদ্ধান্ত ?
অবশ্যই এটি সঠিক সিদ্ধান্ত ।
সম্রাট বাবর বললেন, সঠিক সিদ্ধান্তের ক্ষমতা আছে শুধুই আল্লাহ্পাকের । মানুষকে মাঝে মাঝে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে সে মানুষ । হুমায়ূন মীর্জা যেন নির্বিঘ্নে দিল্লী আসতে পারে এই ব্যবস্থা করার দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হলো ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৩
উজির কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে হতাশ গলায় বললেন, সম্রাটের আদেশ এই দাসানুদাসের শিরোধার্য ।
মীর খলিফা উঠে যাওয়ার পর ভগ্ন পান-উৎসব আবার শুরু হলো । উজবেকিস্থানের এক গায়িকা আসহারির জাদুকরী কন্ঠের কথা সম্রাট শুনেছেন । তার গান শোনা হয় নি । প্রভাতী পান-উৎসবে গায়ক-গায়িকাদের কখনো আনা হয় না । সম্রাটের ইচ্ছায় আজ আসহারিকে আনা হলো । সে কিন্নর কন্ঠে তুর্কী ভাষায় গান ধরল-
‘‘গোলাপকুঁড়ির মতো আমার হৃদয়
তার দলের উপর রক্তের ছাপ,
লক্ষ বসন্তও আমার সে হৃদয়ের ফুল কুঁড়ি ফোটাতে পারে না ।’’
গান শুনে সম্রাট অভিভূত হলেন । প্রথমত, গায়িকার অলৌকিক কণ্ঠ । দ্বিতীয়ত, এই গানের চরণগুলি তাঁর লেখা ্ তাঁর চরণেই সুর বসানো হয়েছে ।
সম্রাট বললেন, তোমার নাম?
বাঁদির নাম আসহারি ।
গানের চরণগুলি কার রচনা তুমি জানো ?
জানি জাহাঁপনা ।
সুর কে করেছে ?
আপনার সামনে উপস্থিত এই বাঁদি করেছে ।
আমার কাছ থেকে উপহার হিসাবে কী চাও ?
মাঝে মাঝে আপনাকে গান শোনানোর সুযোগ চাই ।
সম্রাটের চোখে পানি এসে গেল । তিনি ঘোষণা করলেন এই গায়িকাকে ওজন করে সমওজনের স্বর্ণমুদ্রা যেন তৎক্ষণাৎ দেওয়া হয় ।
হুমায়ূন মীর্জা বাবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন । দীর্ঘ পথশ্রমে হুমায়ূন ক্লান্ত, কিন্তু তার চোখে চকচক করছে । মুখমণ্ডল উজ্জ্বল । বাবর বললেন, তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছ ? সম্রাটের সামনে, না একজন পিতার সামনে ?
বাদশাহ নামদার পর্ব –৩
আমি আমার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে আছি ।
তাহলে তুমি তোমার বাবাকে জড়িয়ে ধরছ না কেন ?
হুমায়ূন সম্রাট বাবকে জড়িয়ে ধরলেন । পুত্রের সঙ্গে পিতার সাক্ষাৎকারের বর্ণনা সম্রাট বাবর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বাবরনামা-য় এইভাবে
গায়িকাকে ওজন করে সমওজনের স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হয় নি । দেওয়া হয়েছিল তাম্রমুদ্রা আমীররা সবাই ভাজাঞ্জিকে বলেছেন, সম্রাট তাম্রমুদ্রা বলতে গিয়ে নেশার ঝোঁকে স্বর্ণমুদ্রা বলে ফেলেছেন ।
দিয়েছেন-‘‘হুমায়ূনের উপস্থিতিতে ফুলের মুকুলের মতো আমার হৃদয় ফুটে উঠল । আমাদের চোখ আনন্দে মশালের মতো জ্বলে উঠল । আমি রোজ দশজনকে নিয়ে খানা খেতাম , এদিন হুমায়ূনের সম্মানে আমি একটা ভোজের আয়োজন করলাম । আমরা পরম ঘনিষ্ঠভাবে কিছুকাল একসঙ্গে রইলাম । সত্যি বলতে কী, তার আলাপ আলোচনা ও কথাবার্তার একটা আশ্চর্য মনোজ্ঞ আকর্ষণ ছিল একজন পূর্ণ মানুষ বলতে যা বোঝায় সে তখন তা-ই ছিল ।’’ (Pavet de Courteille-র অনুবাদ । বাবরনামা-র বিক্ষিপ্ত অংশ। )
নৈশভোজনের পর পিতার সঙ্গে পুত্রের কিছু কথাবার্তা হলো । সম্রাটের খাসকামরায় গোপন বৈঠক । খাসকামরার দরজা-জানালা বন্ধ । ভারী পর্দা নামানো । খাসকামরার বাইরে ছ’জন খোজা প্রহরী । তারা সবাই বধির । যেন গোপন আলোচনার বিষয় তারা শুনতে না পারে । জন্ম থেকে মূক ও বধিরদের প্রহরী পদ দেওয়া হয় না । সুস্থ-সবল খোজা প্রহরীদের কান নষ্ট করে এই পদ দেওয়া হয় ।
সম্রাট পু্ত্রকে কিছু শক্ত কথা বললেন ।
বাবর: তুমি বাদাখশান্ অরক্ষিত রেখে চলে এলে কেন ?
হুমায়ূন: এক রাতে হঠাৎ আপনাকে দেখার প্রবল ইচ্ছা হলো । পরদিনই আমি যাত্রা করলাম ।
বাবর: তোমার কি ধারণা কাজটা ঠিক হয়েছে ?
হুমায়ূন: হ্যাঁ । পুত্রের কাছে পিতা বড় । সাম্রাজ্য বড় না ।
বাবর: মনেপ্রাণে এই কথা বিশ্বাস করো ?
হুমায়ূন: করি ।
বাবর: পিতাকে দেখতে চেয়েছিলে দেখা হয়েছে । এখন বাদাখশানে ফিরে যাও । দুর্গ রক্ষা করো ।
হুমায়ূন: না ।
বাবর: তুমি কি না বলেছ ?
বাদশাহ নামদার পর্ব –৩
হুমায়ূন : বেয়াদবির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছি । সম্রাট আদেশ করলে আমি এই মুহূর্তেই রওনা হব । কিন্তু আমি আমার পিতার আশপাশে থাকতে চাই । আপনার যদি মনে হয় আমার কর্মকাণ্ডের পেছনে আছে সিংহাসনের বসার লোভ তাহলে ভুল হবে । সিংহাসন আমি চাই না ।
বাবর : কেন চাও না ?
হুমায়ূন : যুদ্ধ, হত্যা, রাজ্যদখল এইসবে আমার আসক্তি নাই । আমি একা থাকতে পছন্দ করি,আমি পড়াশোনা করতে পছন্দ করি।
বাবর : খবর পেয়েছি তুমি আফিমের নেশা করছ ?
হুমায়ূন : হ্যাঁ ।
বাবর : এই ভয়ঙ্কর নেশায় আসক্ত হয়েছ কেন ?
হুমায়ূন : আফিম খেলে আমি আশপাশের সবকিছু ভুলে থাকতে পারি ।
বাবর : আফিম ছেড়ে দাও । এটা সম্রাটের আদেশ না, পিতার আদেশ । আর যেহেতু তুমি আমার আশপাশে থাকতে চাচ্ছ, আমি তোমাকে সম্বর যেতে বলছি । এখান থেকে কাছে । ইচ্ছা করলেই আমার কাছে চলে আসতে পারবে ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৩
হুমায়ূন : আপনার অনুমতি যেদিন পাব সেদিনই রওনা হব । আপনার কাছে আমার একটা আর্জি আছে ।
বাবর : বলো ।
হুমায়ূন : কোহিনূর হীরা আমি আপনাকে দিতে চাই । আপনি গ্রহণ করলে আমার হৃদয় আনন্দে পূর্ণ হবে । হীরাটা আমার সঙ্গেই আছে ।
বাবর : তোমার উপহার আমি গ্রহণ করলাম ।
হুমায়ূন : আপনাকে নিয়ে এই অক্ষম অভাজন একটি কবিতা লিখেছে ।
বাবর : পড়ে শোনাও ।
হুমায়ূন: আপনার সামনে লজ্জাবোধ করছি ।
বাবর : প্রথম চরণটি বলো ।
হুমায়ূন : ‘প্রদীপ্ত সূর্য ছিল আমার পিতার কাছে ম্লান।’
হুমায়ূন সম্বর ফিরে গেলেন এবং তাঁর স্বভাবমতো ডুব মারলেন । যে বাবাকে দেখার জন্যে এত দূরে ছুটে আসা, সেই বাবার সঙ্গে কোনো যোগাগোগ নেই ।