রোশন কাকু (আমীর) বললেন, আমি শের খাঁ’র পত্রে সন্তোষ বোধ করছি ।
বৈরাম খাঁ বললেন, দুষ্টলোকের ছলনায় ভোলার কোনো কারণ দেখি না ।
কাকু বললেন, শের খাঁ তার নামে খুৎবা পাঠ করে না, এটা তো সত্য । তার নামে মুদ্রা বের হয় নি, এটাও সত্য ।
বৈরাম খাঁ বললেন, খুৎবা পাঠ করছে না । শক্তি সঞ্চয় করছে । চুনার দুর্গ যদি শের খাঁ’র দিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকে তাহলে সম্রাটের যে-কোনো প্রতিনিধির কাছে দুর্গ দেবে । স্বয়ং সম্রাটকে কেন উপস্থিত হতে হবে ।
উজির তর্দি বেগ খান বললেন, আপনি কি মনে করেন সম্রাটের যুদ্ধযাত্রা করা উচিত ?
বৈরাম খাঁ বললেন, অবশ্যই উচিত । এবং এখনই যুদ্ধযাত্রা করা প্রয়োজন ।
তর্দি বেগ বললেন, এখনই কেন ?
বৈরাম খাঁ বললেন, সম্রাটের অনুমতি পেলে আমি ব্যাখ্যা করব
কেন কালবিলম্ব না করে যুদ্ধযাত্রা করা উচিত ।
সম্রাট বললেন, অনুমতি দেওয়া হলো ।
বৈরাম খাঁ বললেন, শের খাঁ হলো ধূর্ত শেয়াল । সুন্দর একটি চিঠি
পাঠিয়ে সে সম্রাটকে শান্ত করেছে । সে কল্পনাও করছে না সম্রাট এরকম একটি চিঠি পাওয়ার পরও যুদ্ধযাত্রা করবেন । কাজেই সে নিশ্চিন্ত আছে । রাজকীয় বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো প্রস্তুতি তার নেই । এই সুযোগে মোঘল সৈন্য অতর্কিতে শের খাঁ’র ঘাড়ের উপর পড়লে চিরদিনের মতো আফগান শক্তির পতন হব।
সম্রাট বললেন, আলোচনা বন্ধ । সবাইকে আমি হামামখানায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছি ।
উপস্থিত শের খাঁ’র পাঠানো ফল এবং বিষ্ণুমূর্তি গোসলখানায় আনার নির্দেশ দিলেন। বিষ্ণুমূর্তি দেখে সম্রাট বিস্মিত হলেন । এত সুন্দর কাজ! সম্রাট বললেন, যে কারিগর এই মূর্তি তৈরি করেছে তার উদ্দেশে মারহাবা ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৭
সবাই বললেন, মারহাবা!
প্রধান উজির বললেন, রাজকোষে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি থাকা বাঞ্ছনীয় না । মূর্তি গলিয়ে সোনা করে রাজকোষে জমা হোক ।
হুমায়ূন বললেন, না । এই মূর্তি যেমন আছে তেমন থাকবে । আমি আজ তার সঙ্গে স্নান করব ।
বিষ্ণুমূর্তি হাম্মামে নামিয়ে দেওয়া হলো । বঙ্গদেশের ফলগুলির মধ্যে একটি সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। অত্যন্ত রসালো ফল । মুখে দিলেই জিভের রঙ বদলে কালো হয়ে যাচ্ছে । এই ফলের কী নাম কেউ বলতে পারল না । (ফলটি কালো জাম, কিংবা তুঁত।)
হুমায়ূন গোসলখানায় ঘোষণা দিলেন শের খাঁ’র বিষয়ে তাঁর কোনো উদ্বেগ নেই । তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার কিছু নেই । বাহাদুর শাহ পরাজিত হয়েছে । পর্তুগীজদের হাতে সে নিহত । সে অপুত্রক বিধায় তাকে এবং তার বংশধর নিয়ে আর চিন্তার কিছু নেই । সেই উপলক্ষে তেমন কোনো আনন্দ-অনুষ্ঠান হয় নি । দুই মাসব্যাপি আনন্দ উৎসবে হবে । এই দুই মাসে প্রতিদিন দশজন করে সাধারণ প্রজা আমার সঙ্গে রাজকীয় খানায় অংশগ্রহণ করবে ।
মাগরেবের নামাজের পর হুমায়ূনকে জানানো হলো, গাধার চামড়া পরিয়ে যে তিন অপরাধীকে সারা দিন ঘুরানো হয়েছে তাদের দু’জন মারা গেছে । একজন এখনো জীবিত। হুমায়ূনের নির্দেশে চামড়া থেকে মুক্ত করে তাকে সম্রাটের সামনে আনা হলো । তার দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই । তার সমস্ত শরীর ফুলে গেছে । চোখ নষ্ট হয়ে গেছে । সম্রাট বললেন, তোমার নাম কী য়
সে অতি কষ্টে বলল, সম্রাট, আমি একজন মৃত মানুষ । মৃত মানুষের নাম থাকে না ।
তুমি কী অপরাধ করেছিলে?
আপনার এক আমীর আমার অতি আদরের কন্যাকে তার হেরেমে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন । আমি সেই নির্দেশ পালন করি নাই । এটাই আমার অপরাধ । আমাকে মিথ্যা হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছিল । মহান কাজি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৭
আমার সেই আমীরের নাম কী ?
সে নাম বলতে পারল না । ততক্ষণে তার হেঁচকি উঠেছে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে । সে ঠোঁট নাড়ছে কিন্তু মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না । কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হলো।*
সম্রাট হুমায়ূন এর পরপর একটি রাজকীয় ফরমান জারি করলেন । যে-কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সম্রাটের অনুমতি নিতে হবে ।
এ ছাড়াও তিনি যুদ্ধে ব্যবহার হয় এমন একটি দামামার ব্যবস্থা করলেন । কোনো প্রজা যদি মনে করে তার উপর বিরাট অবিচার করা হচ্ছে, তাহলে সে দামামায় বাড়ি দিয়ে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে ।
এই কাজটা করতে হবে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে । এই সময় সম্রাটের শোবার ঘরের জানালা খুলে যায়। তিনি জানালায় মুখ বের করে প্রজাদের দর্শন দেন । এই দর্শনের নাম ‘ঝড়োয়া কি দর্শন’ । প্রজারা সম্রাটকে দেখে আশ্বস্ত হয় যে, সম্রাট বেঁচে আছেন । রাজত্ব ঠিকমতো চলছে ।
বাঁশিতে ভৈরবীর সুর বাজছে । সূর্য উঠছে । সম্রাট হুমায়ূন ‘ঝড়োয়া কি দর্শন’ দেবেন । প্রজার দল উপস্থিত ।
জানালা খুলে গেল । সম্রাটের প্রিয় নফর জওহর আবতাবচি রেশমি পর্দা সরাল । সম্রাটের হাসিহসি মুখে দেখা গেল । সম্রাটের হাতে একটি ফুটন্ত গোলাপ । তিনি গোলাপের ঘ্রাণ নিয়ে জানালার নিচে সমবেত প্রজাদের দিকে ছুঁড়ে দিলেন । সম্রাটের ফুল হাতে পাওয়ার জন্য প্রজারা হুমড়ি খেয়ে পড়ল । আর ঠিক তখনই দামামার শব্দ হলো । সম্রাট ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকালেন ।
*আমীরের নাম তর্দি বেগ খান । সম্রাট আকবরের সময় বৈরাম খাঁ তাঁকে হত্যা করেন ।
বিচার পেতে ব্যর্থ প্রজারাই শুধু এই দামামায় ঘা দিতে পারে । কে ঘা দিল ?
দামামার পাশে সারা শরীর কালো বোরকায় ঢাকা এক জেনানা দেখা যাচ্ছে । সে দামামায় বাড়ি দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সম্রাট নির্দেশে দিলেন আজ সন্ধায় ‘দরবারে-আম’ বসবে । সেখানে এই জেনানার বক্তব্য প্রথম শোনা হবে । দরবারে আমে প্রবেশের জন্য এই মহিলাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে বলা হলো।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৭
‘ঝড়োয়া কি দর্শন’ শেষ হয়েছে । সম্রাট নিজের ঘরে ফিরে গেছেন । তিনি কিছুক্ষণ কোরান পাঠ করবেন । কোরান পাঠের পর একটি বই পড়বেন । মূল বই হিন্দুস্তানি ভাষায় লেখা (মনে হয় সংস্কৃত কিংবা আদি বাংলা,-লেখক)। সম্রাটের নির্দেশে বইটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে । বইয়ের শিরোনাম-
অদৃশ্য হইবার মন্ত্র
বইতে হিন্দু যোগীরা কীভাবে অদৃশ্য হন তার বিষদ বর্ণনা এবং মন্ত্র দেওয়া আছে । যেসব উপকরণের উল্লেখ আছে তা হলো, শ্মশানে ভাঙা কলসির মাথা (কালো রঙ), বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির পাঁজরের হাড়, যে দড়িতে ফাঁসি হয়েছে সেই দড়ি । প্রথম রজস্বলা কিশোরীর দূষিত রক্ত । ত্রিমুখী রুদ্রাক্ষ । বেশ্যা রমণীর যৌনকেশ…ইত্যাদি ।
দরবারে আমে বিচারপ্রার্থী তরুণী উপস্থিত । সম্রাটের নির্দেশে সে মুখের নেকাব খুলেছে । তার মুখ দেখা যাচ্ছে । মেয়েটির রুপ দেখে সম্রাট হতভম্ব । কী সুন্দর বড় বড় চোখ । চোখের দীর্ঘ পল্লব । সম্রাট বললেন, নাম?
তরুণী আভূমি নত হয়ে বলল, বাঁদির নাম আসহারি ।
পরিচয়?
সম্রাটকে দেওয়ার মতো কোনো পরিচয় এই বাঁদির নেই । আমি আপনার হেরেমে বাস করি । আপনার মহান পিতা বাদশাহ বাবরকে একবার গান গেয়ে শোনাবার সৌভাগ্য হয়েছিল ।
হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৭
তোমার অভিযোগ কী ?
মহান সম্রাট বাদশাহ বাবর আমার গান শুনে খুশি হয়ে আমায় সমওজনের স্বর্ণমুদ্রা দিতে হুকুম করেছিলেন । আমি তা পাই নাই । অবশ্য খাজাঞ্জিখানা থেকে আমাকে সমওজনের তাম্রমুদ্রা দেওয়া হয় । সেটাও কাগজে-কলমে ।
তোমার অভিযোগের পক্ষে কোনো সাক্ষী আছে?
আমার হৃদয় একমাত্র সাক্ষী । আর কোনো সাক্ষী নাই ।
সম্রাট দাওয়াতদারকে (লিখনসামগ্রীর ব্যবস্থাপক।প্রতিদিনের হিসাবরক্ষক।)বললেন, ঐদিনের ঘটনা কী তা যেন রেকর্ড ঘেঁটে জানানো হয় । প্রতিদিনের ঘোষণার কপি কিতাবদারের (গ্রন্থাগারিক) কাছেও থাকে । তাকেও রেকর্ডপত্র বের করতে বলা হলো ।আসহারি বলল, সম্রাট আমার আর্জি শুনেছেন, এতেই আমার জীবন ধন্য । পুরাতন রেকর্ড খোঁজার প্রয়োজন নেই ।
সম্রাট বললেন, কী প্রয়োজন আর কী প্রয়োজন না, তা তোমার কাছ থেকে জানতে আমি আগ্রহী না । আমি আগ্রহী সেই গানটি শুনতে যা আমার মহান পিতা শুনেছিলেন । তুমি কি গান শোনাতে প্রস্তুত হয়ে এসেছ ?
জি জাহাঁপনা ।
সঙ্গীতের আসর বসল । বাদ্যকররা আসহারির সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে আসহারির গলার সমন্বয় করল ।
আসহারি গান করল । গান শেষ হওয়ামাত্র সম্রাট হুমায়ূন ঘোষণা করলেন, পুরাতন নথিপত্র পরে ঘাঁটা হবে । এই মুহূর্তে গায়িকার ওজনের সমপরিমাণ স্বর্নমুদ্রা তাকে দেওয়া হোক । আমি এই গায়িকাকে ‘আগ্রার বুলবুল’ সম্মানিত করলাম । আজ থেকে তার নামের আগে ‘আগ্রার বুলবুল’ ব্যবহৃত হবে ।
Read more
হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৮
