কোয়ার্টার পর্যন্ত এখানে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। করেছে খানিকটা দুরে। ওরা এখন পালিয়ে সেই কোয়ার্টারে ঢুকবে। পরের ট্রেন আসার সময় হলে স্টেশনে আসবে। ফের পালাবে।
অবিশ্বাসী ভবভূতি বললেন–তাহলে এই স্টেশনঘরটা তৈরি হল কীভাবে শুনি?
সে অনেক হাঙ্গামা করে হয়েছিল। সায়েব ইঞ্জিনিয়াররা এসে বানিয়েছিল। ওরা খুব ডানপিটে ছিল বলেই পেরেছে। গজপতি পা বাড়িয়ে ফের বললেন—অর ট্রেনটা কেমন ঝটপট একটু দাড়িয়েই তক্ষুণি লেজ তুলে কেটে পড়ল, দেখলে না? তুমি ঠাহর করলে দেখতে, ড্রাইভার–ফায়ারম্যান–গার্ড সায়েব—এমন কি যাত্রীরাও এ স্টেশনে এসে চোখ বুজে থাকে! ওই সিগনাল পেরুলে তখন চোখ খােলে।
-আমরা কিন্তু চোখ বুজে নেই। ভবভূতি বাঁকা হাসিটা আরও একটু লম্বা করে দিলেন।
- গজপতি বললেন—আমাদের ক্ষতি হবার কারণ নেই বলেই চোখ খুলে রেখেছি। তুমি নিশ্চিন্তে থেকে, আমাদের গায়ে আঁচড় লাগা দূরে থাক, আমাদের উকিঝুকি নোরে ওরা দেখতে সাহসও পাবে না। কারণ এত বড় প্রজেক্টের চার্জে আছে আমার ভাগ্নে ভূতনাথ। ভূতনাথকে ওরা কী ভয় যে পায় !
নিঝুম রাতের আতঙ্ক খন্ড-১
প্রজেক্ট। অর্থাৎ বাংলায় যাকে বলে প্রকল্প। এই প্রকল্পের কথা শুনে ভবভূতি কলকাতায় গজপতির ড্রয়িংরুমে যতটা জোরে হেসেছিলেন, এখানে পৌঁছে ততটা পারলেন না। খুকখুক শব্দ হল মাত্র। গজপতির পিছনে–পিছনে রেললাইন বরাবর এগােতে থাকলেন। সূর্য গাছপালার আড়ালে অস্ত যাচ্ছে।
আশ্বিন মাস। ঘন সবুজ চেকনাই দেওয়া। সেইসব গাছপালার গায়ে নীলচে কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। পাখপাখালি তুমুল হল্লা করছে। ভবভূতি টের পেলেন, কেমন যেন অস্বস্তি তাকে পেয়ে বসছে ক্রমশ। হলেও–হতে–পারে কিংবা থাকলেও থাকতে পারে গোছের ভাবনা মগজে সুড়সুড় করে বেড়াচ্ছে। বারবার এদিক–ওদিক দেখতে দেখতে যাচ্ছেন। এই থায়।
এই প্রকল্পের কথাটা উঠেছিল সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের কথায়। গতকাল সন্ধ্যায় জোর বৃষ্টি নেমেছিল। রাস্তায় একহাঁটু জল জমে গিয়েছিল। তার সঙ্গে লােডশেডিং। গজপতির ড্রয়িংরুমে মােম বাতির আলােয় বাঘ নিয়ে কথা হচ্ছিল। ভবভূতি যৌবনে দুর্দান্ত শিকারী ছিলেন। তাই ওঁর সব কথায় বাঘ আসবেই। ওঁর আফসােস, বাঘ মেরে বড় ভুল করেছেন এতকাল।
এখন বাঘবংশ দেশ থেকে লােপ পেতে বসেছে। তাই সুন্দরবনে বাঘ প্রকল্প করে সরকার একটা কাজের মতাে কাজ করেছেন। বেচারিরা শান্তিতে ওখানে খেয়েপরে বাঁচুক আর বংশবৃদ্ধি করুক। সেই কথার জের টেনে গজপতি বলেছিলেন—আর ভূতবংশের কথাটা ভাবাে ভায়া! আজকাল আর তত ভূত কেউ দেখতে পায় ? ভূতেরাও তত লােপ পেতে বসেছে। আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি•••বাধা দিয়ে ভবভূতি বলেছিলেন—ভূত। তুমি ভূত বিশ্বাস কর ?
নিঝুম রাতের আতঙ্ক খন্ড-১
–আলবৎ করি। গজপতি দৃঢ়ভাবে জবাব দিয়েছিলেন। সেই * তাে বলতে যাচ্ছি !
হাত তুলে ভবভূতি বলেছিলেন—উহু, শুনব না! সব গুল। ভূত নেই।
—নেই ! গজপতি ফুসে উঠেছিলেন। আলবৎ আছে। চলো,
- এক্ষুণি চলল—আছে না নেই টের পাইয়ে দিচ্ছি।
—কোথায় যাব শুনি? ভবভূতি হাসতে হাসতে বলেছিলেন।
- কোনও পােড়ো বাড়িতে, নয়তাে শ্মশানে—এই তাে? আমি ওসব জায়গা চষে ফেলেছি একসময়। ভূতের টিকিও দেখিনি।
গজপতি রেগে গিয়েছিলেন।—ঠিক জায়গায় গেলে তাে দেখবে। * তাছাড়া বললুম তো, আজকাল আর তত ভূত নেই। আগে যেমন
পাড়াগায়ে যখন-তখন বাঘ দেখা যেতু, এখন কি যায়? যায় না।’ আর তুমিই তাে বললে, বাঘবংশ লােপ পাচ্ছে বলে সুন্দরবনে বাঘ। প্রকল্প করা হয়েছে।
হয়েছে। প্রকল্প না বলে বলল, বাঘেদের অভয়ারণ্য।
নিঝুম রাতের আতঙ্ক খন্ড-১
-হু, ঠিক তাই বলতে যাচ্ছিলুম তােমায়। শুনবে, না খালি গো ধরবে। রামচন্দ্রপুর নামে স্টেশন আছে শুনেছ কখনও? শােননি। ভবভূতি বাঁকা হেসে বলেছিলেন—না শুনিনি। তা হয়েছে কী?
রামচন্দ্রপুরে ঠিক তােমার সুন্দরবনের বাঘেদের অভয়ারণ্যের মতাে ভূতেদেরও বংশরক্ষার জন্য অভয়ারণ্য করা হয়েছে জানাে? আর ; তার প্রজেক্ট অফিসার কে জানে?
-জানি না। কারণ এমন প্রজেক্টের কথা কস্মিনকালে শুনিনি। গজপতি গর্জে বলেছিলেন—তুমি যা জানাে না বা শােননি, তা : নিয়ে তক্কো করতে এসাে না। রামচন্দ্রপুর ভূত প্রকল্পের চার্জে যে অফিসার আছে, তার নাম ভূতনাথ ; আমার আপন ভাগ্নে । সে রীতিমতাে মেক্সিকোতে ট্রেনিং নিয়ে এসেছে ভূতের ব্যাপারে।
Read More
