নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-৬)

তারপর সেই লাল চুলের মেয়েটি ঝাঁপিয়ে পড়বে বিছানায়। তার হৈচৈএর কোনাে সীমা থাকবে না। একসময় বলবে, ‘আমি হাতিহাতি খেলব। তখন কালাে কম্বলটা তার গায়ে জড়িয়ে দিতে হবে। একটি কোলবালিশ ধরতে হবে তার নাকের সামনে এবং সে ঘনঘন হুঙ্কার দিতে থাকবে। আনিস বারবার বলবে, আমি ভয় পাচ্ছি, আমি ভয় পাচ্ছি।

নির্বাসনএক সময় ক্লান্ত হয়ে কম্বল ফেলে বেরিয়ে আসবে সে। হাসিমুখে বলবে, আনিস, এখন সিগারেট খাও’। টিংকু নতুন দেয়াশলাই জ্বালাতে শিখেছে, সে সিগারেট ধরিয়ে দেবে। কিন্তু আজ দিনটি শুরু হয়েছে অন্যরকম ভাবে। | আজ টিংকু আসে নি। আনিস আবার ঘড়ি দেখল।

সাড়ে সাতটা বাজে। অন্য দিন এ সময়ের মধ্যে তার দাড়ি কামান হয়ে যেত। বাসি জামাকাপড় বদলে ফেলত। ভােরের প্রথম কাপ চা খাওয়াও শেষ হ’ত। আজ হয় নি। রাত থাকতেই যে অসহ্য ব্যথা শুরু হয়েছে দিনের আলাের সঙ্গে সঙ্গে তা যেন ক্রমেই বাড়ছে। 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

পিপাসায় বুকমুখ শুকিয়ে কাঠ| খুট করে শব্দ হল দরজায়। আনিস চমকে উঠে বলল, কে, টিংকু নাকি? টিংকু? কিন্তু টিংকু আসে নি, একটি অপরিচিত ছেলে উঁকি দিচ্ছে। আনিস কড়া গলায় ধমক দিল, ‘গেট এওয়ে, গেট এওয়ে। | ভয়ে ছেলেটির চোখে জল এসে গেল। তার পরনে স্ট্রাইপদেওয়া লাল ব্লেজারের শার্ট ও মাপে বড়াে একটি সাদা প্যান্ট। প্যান্ট বারবার খুলে পড়ছে, আর সে টেনে টেনে তুলছে। 

আনিস ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘যাও এখানে থেকেযাও।’ 

ছেলেটি প্যান্ট ছেড়ে দিয়ে হাত দিয়ে চোখের জল মুছল। অনেক দূর নেমে গেল পান্ট। সে ভয় পাওয়া গলায় বলল, ‘আমি হারিয়ে গেছিআম্মাকে খুজে পাই 

‘কী নাম তােমার? ‘বাবু। 

আনিস খার্ণিকক্ষণ তাকিয়ে রইল বাবুর দিকে। হঠাৎ গলার স্বর পাল্টে কোমল সুরে বলল, ভেতরে এস বাবু। 

 বাবু সংকুচিত ভঙ্গিতে ভেতরে এসে ঢুকল। একটু ইতস্তত করে বলল, “তুমি কাঁদছ কেন? 

‘আমার অসুখ করেছে। 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

পেটে ব্যথা? ‘হু। বস তুমি চেয়ারে। তােমার আম্মাকে খুঁজে দেব। তুমি কোথায় থাক? ‘বাসায় থাকি। 

কী নাম তােমার? বলেছি তাে এক বার।, তােমার নাম বাবু। বস একটু। 

আনিস ভােয়ালে দিয়ে আবার কপালের ঘাম মুছল। নটা বেজে গেছে। রােদ এসেছে ঘরের ভেতরে। একটা ভ্যাপসা ধরনের গরম পড়েছে। বাসিবিছানা থেকেএক ধরনের ভেজা গন্ধ আসছে। বাবু বসে আছে চুপচাপ, সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আনিসের দিকে। 

‘আনিস ভাই, ভিতরে আসব? 

দরজার ওপাশে জরীর বন্ধুরা কৌতূহলী চোখে উকি দিচ্ছে। এদের মধ্যে এক রুনুকেই আনিস চিনতে পারল। 

আনিস বলল, ‘জরী আসে নি? 

না। সে একলায় আটকা পড়েছে।’ জরীর গায়েহলুদের আয়ােজন চলছে নিচে। পরীর জন্যে অপেক্ষা করতে করতেই গায়েহলুদের অনুষ্ঠান পিছিয়ে গেল। পরীর আসবার সময় হচ্ছে। আনতে স্টেশনে গাড়ি গিয়েছে। 

চিত্রিত পিড়িতে বসে আছে জরী। কলসীতে করে পানি এনে রাখা হয়েছেগুরীর সামনে ডালায় বিচিত্র সব জিনিসপত্র সাজান। সেখানে আবার দু’টি প্রদীপ জ্বলছে। রাজ্যের মেয়েরা ভিড় করেছে সেখানে।

বরের বাড়ি থেকে পাঠান গায়ে হলুদের শাড়ি নিয়ে বেশ হৈচৈ হচ্ছে। কাজের বেটিরাও নাকি এত কমদামী শাড়ি পরে না-এ ধরনের কথা শােনা যাচ্ছে। রুনু এই ফাঁকে তার বন্ধুদের দোতলায় নিয়ে এসেছে। কনক তখন থেকেই আনিসের সঙ্গে দেখা করার কথা বলছিল। 

আনিস বলল, ‘ভেতরে আস রুনু। কী ব্যাপার? 

‘আনিস ভাই, এরা সবাই জরী আপার বন্ধু, তােমার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছে। 

আনিস বিরক্তি চেপে কোনাে মতে বলল, তােমরা বস।’ 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

ঘরে বসবার কিছু নেই। একটিমাত্র চেয়ার, সেটিতে বাবু গম্ভীর হয়ে বসে আছে। আনিস কী বলবে ভেবে পেল না। বিব্রতভাবে বলল, ‘হঠাৎ আমার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে হল কেন? 

 কেউ সে কথার জবাব দিল না। রুন কৃশকাকে দেখিয়ে বলল, ‘এর নাম কনক খুব নামকরা মেয়ে আনিস ভাই। রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়। সেই আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে বেশি ব্যস্ত। 

 কনক চুপ করে রইল। আভা বলল, আপনি আমাদের যুদ্ধের গল্প বলুন, আনিস ভাই!’ 

Read More

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *