নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-৮)

রূপবতী মেয়েদের প্রায়ই বড় রকমের কোনাে ত্রুটি থাকে। পরীর একটিমাত্র ত্রুটিসে বােকাহােসেন সাহেব পরীকে বিয়ে করে বেশ হতাশ হয়েছেন। শুধুমাত্র রূপ একটি পুরুষকে দীর্ঘদিন মুগ্ধ করে রাখতে পারে না। পরীর মেয়ে দুটি মায়ের মতাে রূপবতী হয় নি দেখে হােসেন সাহেব খুশি হয়েছেন। মেয়ে দু’টি বাবার গায়ের শ্যামলা রঙ পেয়েছে। চোখ মুখ নাক ফোলা ফোলা।

নির্বাসনঅনেকখানি মিল আছে চাইনিজ বাচ্চাদের সঙ্গেএবারডীন হসপিটালের এক নার্স হােসেন সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিল, বাচ্চাদের মা কি চাইনিজ? পরী তার মেয়ে দু’টিকে নিয়ে মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তায় ভােগেবড়াে হলে বিয়ে দিতে ঝামেলা হবেএই সব ভাবনা তাকে মাঝেমধ্যেই পায়হােসেন সাহেবকে সেকথা বলতেই তিনি হাে হাে করে হাসতে থাকেন

পরী রাগী গলায় বলে, এর মধ্যে হাসির কী হল? কালাে মেয়েদের কি ভালাে বিয়ে হয়? আমি যদি কালাে হতাম তুমি আমাকে বিয়ে করতে?’ হােসেন সাহেব একটু অপ্রস্তুত হনমাঝেমধ্যে পরী বেশ গুছিয়ে কথা বলে। হােসেন সাহেব বলেন, ‘আমার সঙ্গে তােমার বিয়েটা তাহলে খুব ভালাে বিয়ে বলতে চাও? 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

পরী তার জবাব দেয় নাকারণ মাঝে মাঝে তার নিজেরই সন্দেহ হয়। যদিও হােসেন সাহেব একটি নিখুঁত ভদ্রলােক এবং তাঁকে বিয়ে করবার ফলেই সে পৃথিবীর অনেকগুলি বড়াে বড়াে দেশ ঘুরে বেড়িয়েছে, তবু কোথাও কিছু অমিল আছে। লণ্ডনে থাকাকালীন প্রথম এটি পরীর চোখে পড়ে। পরীকে সারা দিন একা একা থাকতে হ’ত ফাটে। রেকর্ড বাজিয়ে আর রান্না করে কতটুকু সময়ইবা কাটে!

গল্প করার লােক নেই। পরী ইংরেজি জানালেও বলতে পারে না। আবার বিদেশী উচ্চারণ বুঝতেও পারে না। তার সারাটা দিন কাটত কয়েদীর মতাে। হােসেন সাহেব ফিরতেন সন্ধ্যাবেলায়। চা খেয়েই তাঁর পড়াশােনা শুরু হচ্ছে। পরী 

হয়তাে একটা গল্প শুরু করেছে। হােসেন সাহেব হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। কিন্তু কিছু দূর বলার পরই পরী বুঝতে পারত, হােসেনের গল্প শােনার মুড নেই। সে তাকিয়ে আছে পরীর দিকে ঠিকই, কিন্তু ভাবছে অন্য কিছু। পরী আচমকা গল্প বন্ধ করত। হােসেন সাহেব বলতেন, তারপর কী হল?’ 

 ‘থাক। আর ভালাে লাগছে নাএই বলে গম্ভীর হয়ে উঠে যেত পরী। ভার 

গল্প বন্ধ হওয়ায় খুশিই হয়েছে। পরী বলল, ময়মনসিংহ আর কত দূর? হােসেন সাহেব বই থেকে চোখ তুলে বললেন, ‘দূর আছে।’ পরী বলল, বাই রােডে এলে কত ভালাে হত। 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

হােসেন সাহেব জবাব দিলেন না। পান্না বলল, “বাই রােডে এলে ভালাে হত কেন মা? 

আর একটা কথা বললে চড় খাবি পান্না। 

পরী ঝাঝিয়ে উঠল। পান্না উশখুশ করতে লাগল। আরেকটা কথা জানবার জন্যে তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে। সে কয়েক বার মার দিকে তাকাল। মা ভীষণ গম্ভীর। কাজেই সে ঝুকে এল বাবার কাছে। ফিসফিস করে কানে কানে বলল, ‘বাবা, একটা কম্বা শােন। 

‘ বল।’ 

ঐ যে কারেন্টের তারে পাখি বসে আছে দেখেছ? ‘হু দেখলাম, শালিক পাখি।’ ‘ঐ পাখিগুলি শক খায় না কেন?’ 

‘টেলিগ্রাফের তারে বসে আছে। টেলিগ্রাফের তারে কারেন্ট নেই, তাই শক খায় না। 

‘ম বুঝেছি।’ 

পরী দেখল, মেয়ে ও বাবা খুব আলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। সে আগেও দেখেছে, মেয়ের সঙ্গে আলাপে হােসেনের কোনাে ক্লান্তি নেই। তখন আর্জেন্ট কলের কথাও মনে থাকে না। জরুরী টেলিফোন করতে হবে বলে হঠাউঠে পড়ারও প্রয়ােজন হয় না। পরীর মনে হল সে দারুণ অসুখী ও দুঃখী। এ রকম মনােভাব তার প্রায়ই হয়। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

 বিলেতে থাকার সময়ও পরী লক্ষ করেছে তার ব্যাপারে হােসেনের কোনাে আগ্রহ নেই। প্রায়ই একগাদা চিঠি আসত পরীর। হােসেন সাহেব তুলেও জিজ্ঞেস করতেন না চিঠি কে লিখল। সেসব চিঠির জবাব লিখতে একেক সময় গভীর রাত হয়ে যেত। ঘড়ির কাঁটার নিয়মে ঘুমুতে যেতেন হােসেন সাহেব, ভুলেও জিজ্ঞেস করতেন না এত রাত জেগে কোথায় চিঠি লেখা হচ্ছে।

 

Read More

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *