রূপার পালঙ্ক-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-২)

বিজ্ঞানের উপরকিছু প্রশ্ন থাকবেযুগটাই বিজ্ঞানেরসেই বিজ্ঞানের উপর প্রশ্ন না থাকলে হবে কীভাবে

রূপার পালঙ্কপেনিসিলিন কে আবিষ্কার করেন ? ফাউন্টেন পেন এবং বল পয়েন্টের মধ্যে তফাৎ কী ? লুই পাস্তুর কোন দেশের নাগরিক? কিছু থাকবে পলিটিক্যাল প্রশ্নকোন্ড ওয়ার কী ? তৃতীয় বিশ্ব মানে কী ? ইটালীর প্রেসিডেন্টের নাম কী ? বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘােষণা কে দিয়েছিলেন

এটা একটা ট্রিকি প্রশ্নবাের্ডের চেয়ারম্যান আওয়ামীপন্থী না বিএনপি পন্থী তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছেআওয়ামীপন্থী হলে সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বলতে হবেজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিববিএপি-পন্থী হলে বলতে হবে মেজর জিয়া| বাের্ডে একজন ডাক্তারও নিশ্চয়ই থাকবেনডাক্তার পেট টিপেটুপে দেখবেন মালঠিক আছে কিনাপেট কেটে দেখতে চাইলেও অনেকে হয়ত আপত্তি করবে নাকাস্টমার জিনিস কিনবে না দেখে কেন কিনবে? দেখে শুনে কিনবেসাইজ পছন্দ করবে, রঙ পছন্দ করবে। 

করে দেবার জন্যে মনু মিয়ার ঠাণ্ডা পানি বিষয়ক অপরাধ প্রায় ক্ষমা করে দিল। 

অতি বিস্ময়কর ব্যাপার হল মােবারক দেখল ইন্টারেস্টেড পার্টিতে ঘর ভর্তি নাসে একাযে ঘরে তাকে বসানাে হয়েছে সেই ঘরও হলঘর নাছােট ঘরতবে বসার ঘরসােফা আছে, মেঝেতে কার্পেট আছে, দেয়ালে পেইনটিং আছেবড়লােকদের বসার ঘর একটা থাকে নাকয়েকটা থাকেতাদের কাছে নানান ধরনের লােক আসেসবাইকে এক জায়গায় বসানাে হয় 

অবস্থা বুঝে বসার ব্যবস্থা হয়। 

রূপার পালঙ্ক-পর্ব-২

ম্যানেজার সাহেবের সঙ্গে মােবারকের কথা হয়েছেটেলিফোনে তাকে যেমন গম্ভীর এবং রাগী মনে হয়েছিল বাস্তবে তাকে মিনমিনেটাইপ মনে হলচেহারা, চলাফেরা এবং কথাবার্তায় লজ্জিত ভঙ্গিএকটু তােতলামী আছেমনে হয় টেলিফোন হাতে পেলে উনি বদলে যানবন্দুক হাতে পেলে মানুষ যেমন বদলে যায়, উনিও বােধহয় টেলিফোন হাতে পেলে বদলানম্যানেজার সাহেবের নাম জগলু। নাম বগলু হলে ভাল হতলম্বা বলে তার মধ্যে বগা বগা ভাব আছে। জগলু সাহেবের সঙ্গে মােবারকের কিছু কথা হল। 

আপনি মােবারক সাহেব জ্বি স্যারআপনি কী করেন কিছু করি না। 

একেবারেই কিছু করেন না তা কী করে হয় ? আগে কী করতেন? শিক্ষকতা করতাম। 

কথাটা পুরােপুরি ভুল না। এনজিও-ওয়ালাদের এক স্কুলে মােবারক সর্বমােট এগারাে দিন পড়িয়েছেবয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রগােটা বিশেক থুড়থুড়াে বুড়োবুড়ি বইখাতা নিয়ে বসাতাদেরকে কিছুক্ষণ স্বরে , স্বরে আ 

নােবুড়ােবুড়িরা যে শিক্ষার মহান আলােয় আলােকিত হতে এসেছে তা ওনাচুলে ভর্তি হওয়ার সুবাদে তাদের নাম রেজিস্ট্রি হয়েছেসবাই একটা করে হাতা পেয়েছেছাতায় এনজিও’নামছাতা ছাড়া মাঝে মধ্যে টুকটাক উপহারের ব্যবস্থা আছেঅক্ষরজ্ঞান শেষ হলে সবাই শাড়ি লুঙ্গি পাবে এরকম গুজব শােনা যাচ্ছেএগারাে দিন পড়ানাের পর মােবারক ঈপর্যন্ত আগালে। কিন্তু দেখা গেল ছাত্রছাত্রীরা শুরুর স্বরে ভুলে গেছেমােবারক এগারাে দিনের দিন এনজিওওয়ালাদের তিনটা ছাতা নিয়ে সড়ে পড়লাে। 

রূপার পালঙ্ক-পর্ব-২

মেস থেকে বেরুবার মুখে মনু মিয়ার সঙ্গে দেখাকোকের বােতল ভর্তি গরম চা নিয়ে কোনাে বাের্ডারের ঘরে যাচ্ছেহারামজাদার সাহস কত বড় তার দিকে তাকিয়ে দাত বের করে আছেমনে হয় হাসছে। হারামজাদাটাকে লাথি দিয়ে কোকের বােতলসহ মেঝেতে ফেলে দেয়া উচিতমােবারক তা করল নাশুভ কাজে যাচ্ছে, এ সময় মারামারি করা ঠিক নাগলা নামিয়ে বলল, সামনের দরজা দিয়া যাইয়েন নাবাবু আছে

বাবু মানে পরিমল সাহা। মেসের মালিকের শালাএবং মেসের ম্যানেজারমােবারকের ছয়মাসের মেস ভাড়া বাকিপরিমল বাবু তাকে দেখলে বাঘের মত ঝাপ দিয়ে পড়বেন। এই সুযােগ তাকে দেয়া ঠিক হবে মােবারক পেছন দরজা দিয়ে বের হল এবং তাকে যথা সময়ে সাবধান। 

কাজেই সে শিক্ষকতা করেছে এটা বলা ভুল হয় নি। যে একদিন পড়িয়েছে সে শিক্ষকসারা জীবনই শিক্ষক। আবার যে একদিন চুরি করেছে সে কিন্তু সারাজীবনই চোর না। তাহলে পৃথিবীর সব মানুষই চোর হত । 

আপনি তাহলে শিক্ষকতা করতেন? জি স্যার। এখন কিছু করেন না ? করলে কি কিডনী বিক্রি করতে আসতাম? 

তা ঠিক। আপনি বসুন। চা-টা খান। স্যার আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। সামান্য দেরি হবে। 

কিডনী কার জন্যে দরকার ? 

স্যারের জন্যেউনার দুটা কিডনী নন ফাংশানাল হয়ে গেছেডায়ালাইসিস করে করে এতদিন চলেছে, এখন ডাক্তাররা কিডনী ট্রান্সপ্লান্টের কথা বলছেন। আত্মীয়-স্বজনরা অনেকেই ডােনেট করতে রাজি। কিন্তু স্যার তা চান না। 

মােবারক হাসি মুখে বলল, আমরা থাকতে আত্মীয়-স্বজনরা কেন কষ্ট করবে। আমরা আছি কী জন্যে ? 

রূপার পালঙ্ক-পর্ব-২

ম্যানেজার সাহেব কিছুক্ষণ সরু চোখে তাকিয়ে থেকে আগের মত মিনমিনে গলায় বললেন, আপনি অপেক্ষা করুনআমি যথাসময়ে ডেকে নিয়ে যাব। 

মােবারক বিনীত গলায় বলল, জ্বি আচ্ছা স্যার। একটা কথা শুধু জিজ্ঞেস করি, এই ঘরে কি সিগারেট খাওয়া যায় ? 

হা খাওয়া যায়। ঐ যে এসট্রে। স্যার অনেক ধন্যবাদ।

মােবারক সিগারেট ধরালাে। বড় সাহেবের কাছে যাবার আগে হাত-মুখ ধুতে হবেমুখ কুলকুচা করতে হবে। অসুস্থ মানুষরা দূর থেকে সিগারেটের গন্ধ পায়। তাদের মেজাজ খারাপ হয়। বড় সাহেবের মেজাজ খারাপ করা একেবারেই ঠিক হবে না। 

মােবারক যে চেয়ারে বসেছে তার দু‘টা চেয়ারের পরের চেয়ারেই সুন্দর একটা উলের চাদর পড়ে আছে। চাদরের ওপর মারলবােররা সিগারেটের একটা প্যাকেট। মনে হছে তার মত কেউ একজন এখানে বসেছিল। সে-ও 

কিডনী বেচতে এসেছে। বড় সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছে। তবে যে এমন দামি চাদর গায়ে দেয় এবং মারলবােররা সিগারেট খায় সে কিডনী বেচবে কেন ? তার উচিত দু’একটা কিডনী কিনে ফ্রীজে রেখে দেয়াপ্রয়ােজনে ব্যবহার করবে। প্রয়ােজন না হলে কালােবাজারে বেচে দেবে। 

ব্যস্ত ভঙ্গিতে এক দ্রলােক ঢুকলেন। রাজপুত্র রাজপুত্র চেহারা। হাতে তলােয়ারের বদলে লম্বা স্কেল। কমপ্লিট স্যুট পরা। গলায় লাল টাই! জুতাজোড়াও সম্ভবত নতুন– হাঁটলেই মুড়ি খাওয়ার মত মচমচ শব্দ হচ্ছে । ভদ্রলােক ঘরে ঢুকেই মােবারককে বললেন, আচ্ছা আনিস সাহেব কি চলে গেছেন। 

রূপার পালঙ্ক-পর্ব-২

মােবারক বিনীত ভঙ্গিতে বলল, জ্বি স্যার চলে গেলেন। 

যদিও আনিস সাহেব কে মােবারক কিছুই জানে না। এ বাড়ির একজনকেই সে চেনে। ম্যানেজার জগলু। 

কখন গেছেন বলতে পারেন । 

এগজাক্ট টাইম বলতে পারব না। দশ এগারাে মিনিট হবে। কমও হতে পারে। 

আনিস সাহেবের সঙ্গে কি কোনাে ফাইলপত্র ছিল ? স্যার আমি লক্ষ করিনি। আপনার অবশ্য লক্ষ করার কথাও না। থ্যাংকস এনিওয়ে। 

ভদ্রলােক যেমন ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঢুকেছিলেন তারচেয়েও ব্যস্ততার সঙ্গে চলে গেলেনমিথ্যা কথাগুলি বলার জন্যে মােবারক তেমন দুশ্চিন্তা করছে না। এই নিয়ে পরে যদি প্রশ্ন করা হয় সে বলবে, সে আসলে বুঝতে পারে নি। সে ভেবেছে ভদ্রলােক ম্যানেজার সাহেবের কথা জানতে চেয়েছেনম্যানেজার জগলু সাহেব এই ঘরে কিছুক্ষণ ছিলেন, তারপর চলে গেছেন। এই অংশতাে মিথ্যা না। পুরােপুরি সত্যি কথা বলা ঠিক না। সােনার মধ্যে যেমন খাদ মিশাতে হয়। সত্যি কথার মধ্যেও সামান্য মিথ্যা মিশাতে হয়। 

মােবারক চেয়ার বদলে পাশের চেয়ারে গেল। এই চেয়ার থেকে হাত বাড়িয়ে মারলবােরাের প্যাকেটটা নেয়া যায়প্যাকেট খুলে দেখা যেতে পারে মােট কটা সিগারেট আছেপ্যাকেট ভর্তি থাকলে কিছু করার নেই। আধাআধি থাকলে একটা সিগারেট খাওয়া যেতে পারে। সিগারেটের মালিক যদি চলেও আসে তাকে বলা যাবে, ভাই একটা সিগারেট নিয়েছিকিছু মনে করবেন না। 

রূপার পালঙ্ক-পর্ব-২

তেরটা সিগারেট আছেমােবারক একটা সিগারেট ধরালােম্যানেজার চায়ের কথা বলে গিয়েছিলেনসেই চা এখনাে আসে নি। বিদেশী সিগারেট চায়ের সঙ্গে খেতে পারলে আরাম হতউপায় কী? মােবারক হাত বাড়িয়ে উলের শালটা পরীক্ষা করলহাত দিলেই বােঝা যায় দামি জিনিসএক চাদরে মাঘ মাসের শীত পার করে দেয়া যাবে। শালের নিচে গেঞ্জি বা শার্ট কিছু না থাকলেও সমস্যা হবে নাশালের মালিককে পেলে জিজ্ঞেস করা যেত শালটার দাম কত। 

মােবারক সাহেব। 

ম্যানেজার জগলু এসে দাঁড়িয়েছে পেছনেএই মিনমিনে লােক হাঁটেও বিড়ালের মত। টেলিফোনে হাঁটার ব্যবস্থা থাকলে বুট পরে ধপ ধপ শব্দ করে হাঁটতাে। 

আসুন স্যারের সঙ্গে কথা বলবেন। 

মােবারক ভেবেছিল স্যার এক বিরাট পালংকে শুয়ে আছেন। তাকে ঘিরে সেবা করার লােকজনপাশের টেবিল ভর্তি ফলমুলদুজন নার্স এবং একজন ডাক্তার একটু দূরে শুকনাে মুখে হাঁটাহাঁটি করছেস্যার ঠিকমত নিঃশ্বাসও নিতে পারছেন নাকাতলা মাছ পুকুর থেকে তােলার পর যেভাবে থেমে থেমে দম নেয় সেভাবে দম নিচ্ছেনএই সময়ে তাঁর প্রিয়তমা পত্নী কপালে ভেজা রুমাল ঘসে দিচ্ছেন। 

দেখা গেল সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি। অফিস ঘরের মত ঘরস্যার বসে আছেন চেয়ারেতার সামনে প্রচুর ফাইলপত্রতিনি ফাইলপত্রে সিগনেচার করছেনতার ঠোটে জ্বলন্ত সিগারেটতিনি সিগারেট হাতে নিয়ে টানছেন নাঠোটে রেখেই টানছেনঠোটে রেখেই অদ্ভুত কায়দায়, একটু মাথা ঝুঁকিয়ে ছাই ফেলছেনকায়দাটা ইন্টারেস্টিং। শিখে রাখতে হবেতাহলে সিগারেট খাবার সময় দুটা হাত খালি রাখা যায়স্যারের গায়ে সিল্কের শার্টসুন্দর মেরুন রঙতবে তিনি লুঙ্গি পরে আছেনপ্রিয়তমা পত্নীর মুখ বিষাদময়। 

 

Read more

রূপার পালঙ্ক-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *