মতিয়ুর রহমান অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই মেয়ে মুখের উপর এমন ভঙ্গিতে কথা বলতে পারে তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। ঘটনা কী? ………..আনিকা দাড়িয়ে আছে। হয়তাে সে বাবার সঙ্গে আরাে কিছুক্ষণ তর্ক করতে চায়। মতিয়ুর রহমান মিইয়ে গেছেন।
মেয়েকে কী বলবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। টিভিতে নতুন একটা রান্নার কথা বলছে রাশিয়ান সালাদ । সেদিকেও মন দিতে পারছেন না। …………মতিয়ুর রহমান ছােট করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে বেশি ঘােরাঘুরি করা ঠিক না। দু‘দিন পর পর জ্বরজ্বারি হয়— এই লক্ষণও ভালাে না । লিভারের কিছু হয়েছে কি–না কে জানে! ভালাে একজন ডাক্তার দেখা। সবচে’
ভালাে হলাে রেস্টে থাকা। ………আনিকা আর কিছু বলল না। বাবার সামনে থেকে বের হলাে। তার কোথাও যাবার পরিকল্পনা নেই। এখন মনে হয় মিতুর শ্বশুরবাড়িতে যেতে পারলে মন্দ হতাে না। বাচ্চা একটা মেয়ে বউ সেজে কী করছে দেখে আসা যায়। সমস্যা একটাই—মিতুর শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা তার জানা নেই। রাইফেলস স্কয়ারে নাকি সুন্দর দোকানপাট হয়েছে। এখনাে সে যায় নি। সেখানে যাওয়া যেতে পারে। কফির দোকান থাকলে এক কাপ কফি কিনে খাওয়া। সবচে‘ ভালাে হয় শওকতের বাসায় চলে যাওয়া। ছেলে তার সঙ্গে থাকতে আসছে, সে কী ব্যবস্থা করেছে দেখে আসা।
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
সে রিকশা নিল । রিকশায় উঠার পর মনে হলাে, কোথাও না গিয়ে কোনাে একটা সিনেমাহলে গিয়ে একা একা ছবি দেখলে কেমন হয়! ঠাণ্ডা সিনেমাহলে অনেক লােকের সঙ্গে বসে থাকা । ছবির আজগুবি কাহিনী দেখার মধ্যেও মজা আছে। নায়ক কোনাে কারণ ছাড়া গান শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে এক গাদা মেয়ে উপস্থিত হলাে। তারাও নাচ শুরু করবে। মন্দ কী ? এই সময়ে সিনেমার কোনাে শাে আছে কি–না তাও আনিকার জানা নেই। রিকশাওয়ালা বলল, আপা, কোথায় যাবেন ?
আনিকা বলল, এখনাে বুঝতে পারছি না কোথায় যাব। আপনি এগুতে থাকুন। আমি ভেবে–চিন্তে বলব ।।
রিকশা এগুচ্ছে। মাথার উপর কড়া রােদ। অথচ আনিকার শীত লাগছে । বেশ ভালাে শীত লাগছে। সে বুঝতে পারছে তার জ্বর আসছে। শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসছে। তার উচিত বাসায় ফিরে যাওয়া কিন্তু তার বাসায় ফিরতে ইচ্ছা করছে না। রিকশা চলতে থাকুক। অনন্তকাল ধরে চলতে থাকুক। সে রিকশায় বসেই তার জীবন পার করে দেবে।
ইমন ভেবেছিল প্রথম যখন সে তার বাবাকে দেখবে, চিনতে পারবে না। বাবার চেহারা তার মনে ছিল না । নিউ জার্সির বাড়িতে বাবার ছবি থাকলে সে ছবি দেখে চেহারা মনে করত। কিন্তু সেই বাড়িতে তার কোনাে ছবি নেই। মার পুরনাে অ্যালবামে হয়তাে আছে, কিন্তু মা অ্যালবাম তালাবন্ধ করে রাখে। ফ্যামিলি রুমে ফায়ারপ্লেসের পাশে কিছু অ্যালবাম রাখা আছে। সেখানে সবই নতুন ছবি। পুরনাে ছবি একটাও নেই।
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
বাবার কথা মনে হলেই ইমনের চোখে ভাসে তার মুখের কাছে একটা মুখ। মুখটা হাসি হাসি। আর দুটা চকচকে চোখ । চকচকে চোখের ব্যাপারটা নিয়ে ইমন চিন্তা করেছে। মানুষের চোখ কি আসলেই চকচক করে ? রাতেরবেলা হরিণের চোখে আলাে পড়লে চোখ নীল রঙের হয়ে যায় এবং ঝিকমিক করতে থাকে। তাদের নিউ জার্সির বাড়ির পেছনের পাের্চে শীতের সময় জঙ্গল থেকে হরিণ আসে। যখন পাের্চের আলাে তাদের চোখে পড়ে, তখন তাদের চোখ তারার মতাে ঝিকমিক করতে থাকে। মানুষের বেলাতেও কি এরকম হয় ? একবার সে মা’কে জিজ্ঞেস করল। রেবেকা বললেন, তােমার সব উদ্ভট প্রশ্ন। মানুষের চোখ চকচক করবে কেন ?
ইমন বলল, চোখ যখন খুব কাছাকাছি আসে, তখন কি চকচক করে ? ……..রেবেকা বললেন, যে চোখ দূরে চকচক করে না, সেই চোখ কাছে এলেও চকচক করে না। কেন এমন আজগুবি প্রশ্ন করেছ ? ……….এমনি।………….. এমনি না। তুমি বিনা কারণে প্রশ্ন করার ছেলে না। নিশ্চয়ই কোনাে কারণ আছে। কারণটা বলাে।
ইমন কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। রেবেকা বললেন, আমি বরং এক কাজ করি। আমার মুখ তােমার মুখের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসি। তুমি দেখ চোখ চকচক করে কি–না। …….ইমন বলল, আচ্ছা।
রেবেকা ইমনের খুব কাছাকাছি চলে এলেন। এত কাছে যে তার নাকের গরম নিঃশ্বাস ইমনের গালে লাগতে লাগল। রেবেকা রাগ–রাগ ভঙ্গি সরিয়ে দিয়ে প্রায় আদুরে গলায় বললেন, আমার চোখ কি চকচক করছে ? …….তুমি কি তােমার প্রশ্নের জবাব পেয়েছ ?
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
ইমন যদিও বলেছে সে তার প্রশ্নের জবাব পেয়েছে— আসলে কিন্তু পায়। নি। তখনাে সে ভেবেছে কারাে কারাে চোখ নিশ্চয় চকচক করে। চকচকে চোখের ইংরেজি হলাে— Glittering eyes. Watery eyes না।
ইমন রিকশায় করে তার বাবার সঙ্গে যাচ্ছে। এই প্রথম যে সে রিকশায় চড়ল তা–না। আগেও চড়েছে। দু’বার চড়েছে। সেই দু‘বার তার খুবই ভয় লাগছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি ছিটকে পড়ে যাবে। এখন কোনাে ভয় লাগছে না। এখন তার মনে হচ্ছে ছিটকে পড়ে যাবার মতাে কিছু হলে তার বাবা তাকে খপ করে ধরে ফেলবেন।
বাবাকে প্রথম দেখে সে ছােটখাটো একটা চমক খেয়েছে। নিজের উপর খানিকটা তার রাগও লেগেছে। কেন তার এতদিন ধরে মনে হয়েছে সে বাবার চেহারা ভুলে গেছে ? মােটেও ভােলে নি। তা না হলে দেখামাত্র সে কীভাবে চিনল ? তাকে সামনে এসেও দেখতে হয় নি।
পেছন থেকে দেখেই সে চিনে ফেলেছে । ইমন সামান্য লজ্জা পাচ্ছিল— বাবা তাকে দেখে কী করেন এই ভেবে লজ্জা। ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু–টুমু খেলে খুবই লজ্জার ব্যাপার হবে। ইমন বড় ধরনের স্বস্তিবােধ করল, যখন সে দেখল তার বাবা সেরকম কিছুই করলেন না। তার দিকে তাকিয়ে বললেন, যাবার জন্যে রেডি ? …………ইমন বলল, হু। তােমার মা কই ?