মিসির আলি ঠিক করে রাখলেন— এ বাড়ির লাইব্রেরি থেকে বেশ কিছু বই এনে টেবিল ভর্তি করে রাখবেন। চোখের সামনে প্রচুর বই থাকলে ভালাে লাগে। আবারাে সিঁড়িতে থপথপ শব্দ হচ্ছে। বরকত কি আবারাে ভারী কিছু নিয়ে উঠছে? ব্যাপারটা কী? এবার সে কী আনছে ? মিসির আলি দ্রুত বারান্দায় চলে এলেন।
বরকত ভারী কিছু তুলছে না। তার হাতে ছােট্ট তেলের শিশির মতাে শিশি। অথচ এমনভাবে সে উঠছে যেন তার উঠতে কষ্ট হচ্ছে। মাঝে মাঝে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সে বিশ্রামও করে নিচ্ছে বলে মনে হয়। এমন স্বাস্থ্যবান একজন মানুষের সিঁড়ি ভাঙতে কোনাে কষ্ট হবার কথা না। অথচ তার যে কষ্ট হচ্ছে এটা পরিষ্কার। হার্টের কোনাে অসুখ কি আছে? কিংবা আর্থরাইটিস ? ওঠার সময় হাঁটুতে ব্যথা করে?
বরকত মিসির আলির সামনে এসে বলল, অষুধ নিয়া আসছি। মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, কীসের অষুধ ? সাপের অষুধ। আপনের ঘরের চারিদিকে দিয়া দিব।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৯)
ঘরের চারদিকে সাপের অষুধ দেবে মানে–কী ? দোতলায় সাপ আসবে কীভাবে ?
বরকত প্রশ্নের জবাব দিল না। ঘরে ঢুকে গেল। মিসির আলি বারান্দায় দাঁড়িয়েই তীব্র কার্বলিক এসিডের গন্ধ পেলেন। তার গন্ধবিষয়ক সমস্যা আছে। কিছু কিছু গন্ধ মনে হয় তার স্নায়ুতে সরাসরি আক্রমণ করে। চট করে মাথা ধরে যায়। কার্বলিক এসিডেও তাই হয়েছে।
মিসির আলি ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন, শুধু সাপ না, আমি নিজেও আর এই ঘরে ঢুকতে পারব না। এই গন্ধ নিয়ে বাস করার চাইতে ঘরে দুতিনটী সাপ নিয়ে বাস করা অনেক সহজ। মশারি ভালোমতাে গুঁজে দিয়ে রাখলে সাপ ঢুকতে পারবে না। সাপকে খাটে উঠতে হলে খাটের পা বেয়ে উঠতে হবে। সাপের জন্যে এই প্রক্রিয়া খুবই কষ্টকর হবার কথা। সপি শুধু শুধু এত কষ্ট করবে না।
বরকত নেমে যাচ্ছে। শিশিটা নিশ্চয়ই ঘরে কোথাও রেখে এসেছে। বােতল থেকে গন্ধ বের হচ্ছে। আচ্ছা বােতলটা সে কোথায় রেখেছে ? খাটের নিচে রেখেছে নিশ্চয়ই। মশার কয়েল জ্বালিয়ে আমরা বেশির ভাগ সময় জ্বলন্ত কয়েলটা খাটের নিচে রেখে দেই।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৯)
সিঁড়ি দিয়ে নামতে বরকতের তেমন কষ্ট হচ্ছে বলে মনে হলাে না। বেশ দ্রুতই নামছে। বরকতের আর্থরাইটিস নেই, এটা নিশ্চিত।
সিঁড়ির শেষ মাথায় ছােট একটা শব্দ হলাে। জায়গাটা গাঢ় অন্ধকার। তারপরেও মিসির আলির মনে হলাে কে যেন সেখানে বসে আছে। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাঁকে দেখছে। মিসির আলির মনে হলাে তার হাতে একটা টর্চ থাকলে ভালাে হতাে। টর্চের আলাে ফেলে দেখা যেত কে ঘাপটি মেরে বসে আছে ? তিনি সিড়ি বেয়ে দু‘ধাপ নামলেন। উঁচু গলায় বললেন, কে ? কে ওখানে?
কেউ জবাব দিল না। মিসির আলি আরাে কয়েকটা সিঁড়ি টপকালেন আর তখনি শান্ত গম্ভীর পুরুষ গলায় কেউ একজন বলল, স্যার রেলিং ধরে ধরে নামুন। খুব খেয়াল রাখবেন যত বার ওঠানামা করবেন। রেলিং ধরে ধরে করবেন। আমার নাম সুলতান। ওয়েল কাম টু মাই ধ্বংসস্তুপ‘। ধ্বংসস্তুপের ইংরেজিটা মনে পড়ছে না বলে বাংলা বললাম। স্যার কেমন আছেন?
হুইল চেয়ারে বসে যে মানুষটি হাত বাড়িয়েছে মিসির আলি কয়েক মুহূর্তের জন্যে তার উপর থেকে চোখ ফেরাতে পারলেন না। কাছাকাছি আসায় মানুষটাকে এখন দেখা যাচ্ছে। কেউ একজন একতলার দরজাও মনে হয় খুলেছে। আলাে এসে পড়েছে মানুষটার মুখে। অত্যন্ত সুপুরুষ একজন মানুষ। অতিথিকে স্বাগতম বলার জন্যে যিনি বিশেষভাবে পােশাক পরেছেন। ইস্ত্রিরি করা ধবধবে সাদা প্যান্টের সঙ্গে, হালকা নীল ফুল হাফ শার্ট। পােশাকটায় স্কুল–ড্রেস স্কুল–ড্রেস ভাব আছে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৯)
কিন্তু এই মানুষটাকে খুব মানিয়েছে। ভদ্রলােক চশমা পরেন, নাকের কাছে চশমার দাগ আছে, কিন্তু এখন চোখে চশমা নেই। তার বড় বড় ভাসা ভাসা চোখ, বুদ্ধিতে ঝিকমিক করছে। বয়স পঞ্চাশের বেশি। মাথা ভর্তি কাঁচা–পাকা চুল। কাঁচা–পাকা চুলের যে আশ্চর্য সৌন্দর্য আছে, তা এই মানুষটার চুলের দিকে তাকালে পরিষ্কার বােঝা যায়।
স্যার আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দেন নি। আপনি কেমন আছেন? আমি ভালাে আছি। ঘরটা পছন্দ হয়েছে ?
কার্বলিক এসিড দেয়ার আগ পর্যন্ত পছন্দ ছিল। আমার কিছু গন্ধবিষয়ক সমস্যা আছে।
আপনি এসেছেন আমি অসম্ভব খুশি হয়েছি। খুশির প্রকাশটা অবশ্যি করতে পারছি না। আপনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষ, আপনি নিশ্চয়ই আমার খুশি ধরতে পারছেন।
মিসির আলি কিছু বললেন না। মানুষটা যে খুশি হয়েছে, তা বােঝা যাচ্ছে। অনিন্দিত মানুষের ভেতর অস্থিরতা থাকে। ব্যথিত মানুষ চুপচাপ হয়ে যায়। এই মানুষটা অস্থির। হুইল চেয়ার নিয়ে এদিক–ওদিক করছে।
আমি আপনাকে খাবার ঘরে নিয়ে যাবার জন্যে অনেকক্ষণ থেকে সিঁড়ির গোড়ায় বসে আছি। আপনি বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলেন, আমি নিচ থেকে আপনাকে লক্ষ করছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল কোনাে একটা বিষয় নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তা করছিলেন। দুশ্চিন্তার বিষয়টা ধরার চেষ্টা করছিলাম।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৯)
দুশ্চিন্তা করছিলাম না। আপনার স্ত্রী লিলি কোথায় ?
ও রান্না শেষ করে ঘুমুতে চলে গেছে। ভুল বললাম, সে চলে যায় নি। আমি তাকে জোর করে পাঠিয়েছি। ওর কিছু মানসিক সমস্যা আছে। সমস্যাগুলি হঠাৎ হঠাৎ দেখা দেয়। আপনাকে নানান কৌশল করে এখানে আনার অনেকগুলি কারণের মধ্যে একটা কারণ হলাে লিলির ব্যাপারটি নিয়ে আপনার সঙ্গে আলাপ
ও আচ্ছা। স্যার আসুন। খেতে আসুন। খাবার ঘরটা একতলায়। একতলায় থাকায় {। আমি যেতে পারছি। দোতলায় হলে যেতে পারতাম না।
মিসির আলি ভেবেছিলেন বিশাল একটা খাবার ঘর দেখবেন। তা দেখলেন না। ছােট ঘর। খাবার টেবিলটাও ছোেট। টেবিলের পাশে একটামাত্র চেয়ার। মনে হচ্ছে একজনের জন্যেই খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ঘরের প্রধান আকর্ষণ মােমদানি। রূপার তৈরি মােমদানিতে এক সঙ্গে একুশটা মােমদানি
জ্বলছে। ঘর আলাে হয়ে আছে। মােমদানিটা খাবার টেবিলে রাখা।
মিসির আলি চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, আপনি খাবেন না ?
Read more
