আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

আমিই মিসির আলি

মিসির আলি ঠিক করে রাখলেনবাড়ির লাইব্রেরি থেকে বেশ কিছু বই এনে টেবিল ভর্তি করে রাখবেন। চোখের সামনে প্রচুর বই থাকলে ভালাে লাগেআবারাে সিঁড়িতে থপথপ শব্দ হচ্ছেবরকত কি আবারাে ভারী কিছু নিয়ে উঠছে? ব্যাপারটা কী? এবার সে কী আনছে ? মিসির আলি দ্রুত বারান্দায় চলে এলেন

বরকত ভারী কিছু তুলছে নাতার হাতে ছােট্ট তেলের শিশির মতাে শিশিঅথচ এমনভাবে সে উঠছে যেন তার উঠতে কষ্ট হচ্ছেমাঝে মাঝে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সে বিশ্রামও করে নিচ্ছে বলে মনে হয়। এমন স্বাস্থ্যবান একজন মানুষের সিঁড়ি ভাঙতে কোনাে কষ্ট হবার কথা নাঅথচ তার যে কষ্ট হচ্ছে এটা পরিষ্কারহার্টের কোনাে অসুখ কি আছে? কিংবা আর্থরাইটিস ? ওঠার সময় হাঁটুতে ব্যথা করে

বরকত মিসির আলির সামনে এসে বলল, অষুধ নিয়া আসছিমিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, কীসের অষুধ ? সাপের অষুধ। আপনের ঘরের চারিদিকে দিয়া দিব। 

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৯)

ঘরের চারদিকে সাপের অষুধ দেবে মানেকী ? দোতলায় সাপ আসবে কীভাবে

বরকত প্রশ্নের জবাব দিল নাঘরে ঢুকে গেলমিসির আলি বারান্দায় দাঁড়িয়েই তীব্র কার্বলিক এসিডের গন্ধ পেলেনতার গন্ধবিষয়ক সমস্যা আছেকিছু কিছু গন্ধ মনে হয় তার স্নায়ুতে সরাসরি আক্রমণ করেচট করে মাথা ধরে যায়কার্বলিক এসিডেও তাই হয়েছে

মিসির আলি ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন, শুধু সাপ না, আমি নিজেও আর এই ঘরে ঢুকতে পারব নাএই গন্ধ নিয়ে বাস করার চাইতে ঘরে দুতিনটী সাপ নিয়ে বাস করা অনেক সহজমশারি ভালোমতাে গুঁজে দিয়ে রাখলে সাপ ঢুকতে পারবে নাসাপকে খাটে উঠতে হলে খাটের পা বেয়ে উঠতে হবেসাপের জন্যে এই প্রক্রিয়া খুবই কষ্টকর হবার কথাসপি শুধু শুধু এত কষ্ট করবে না। 

বরকত নেমে যাচ্ছে। শিশিটা নিশ্চয়ই ঘরে কোথাও রেখে এসেছেবােতল থেকে গন্ধ বের হচ্ছেআচ্ছা বােতলটা সে কোথায় রেখেছে ? খাটের নিচে রেখেছে নিশ্চয়ইমশার কয়েল জ্বালিয়ে আমরা বেশির ভাগ সময় জ্বলন্ত কয়েলটা খাটের নিচে রেখে দেই। 

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৯)

সিঁড়ি দিয়ে নামতে বরকতের তেমন কষ্ট হচ্ছে বলে মনে হলাে নাবেশ দ্রুতই নামছেবরকতের আর্থরাইটিস নেই, এটা নিশ্চিত। 

সিঁড়ির শেষ মাথায় ছােট একটা শব্দ হলাে। জায়গাটা গাঢ় অন্ধকারতারপরেও মিসির আলির মনে হলাে কে যেন সেখানে বসে আছেতীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাঁকে দেখছেমিসির আলির মনে হলাে তার হাতে একটা টর্চ থাকলে ভালাে হতােটর্চের আলাে ফেলে দেখা যেত কে ঘাপটি মেরে বসে আছে ? তিনি সিড়ি বেয়ে দুধাপ নামলেন। উঁচু গলায় বললেন, কে ? কে ওখানে

কেউ জবাব দিল নামিসির আলি আরাে কয়েকটা সিঁড়ি টপকালেন আর তখনি শান্ত গম্ভীর পুরুষ গলায় কেউ একজন বলল, স্যার রেলিং ধরে ধরে নামুনখুব খেয়াল রাখবেন যত বার ওঠানামা করবেনরেলিং ধরে ধরে করবেনআমার নাম সুলতানওয়েল কাম টু মাই ধ্বংসস্তুপধ্বংসস্তুপের ইংরেজিটা মনে পড়ছে না বলে বাংলা বললামস্যার কেমন আছেন?

হুইল চেয়ারে বসে যে মানুষটি হাত বাড়িয়েছে মিসির আলি কয়েক মুহূর্তের জন্যে তার উপর থেকে চোখ ফেরাতে পারলেন নাকাছাকাছি আসায় মানুষটাকে এখন দেখা যাচ্ছেকেউ একজন একতলার দরজাও মনে হয় খুলেছেআলাে এসে পড়েছে মানুষটার মুখেঅত্যন্ত সুপুরুষ একজন মানুষঅতিথিকে স্বাগতম বলার জন্যে যিনি বিশেষভাবে পােশাক পরেছেনইস্ত্রিরি করা ধবধবে সাদা প্যান্টের সঙ্গে, হালকা নীল ফুল হাফ শার্টপােশাকটায় স্কুলড্রেস স্কুলড্রেস ভাব আছে

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৯)

কিন্তু এই মানুষটাকে খুব মানিয়েছেভদ্রলােক চশমা পরেন, নাকের কাছে চশমার দাগ আছে, কিন্তু এখন চোখে চশমা নেইতার বড় বড় ভাসা ভাসা চোখ, বুদ্ধিতে ঝিকমিক করছেবয়স পঞ্চাশের বেশিমাথা ভর্তি কাঁচাপাকা চুলকাঁচাপাকা চুলের যে আশ্চর্য সৌন্দর্য আছে, তা এই মানুষটার চুলের দিকে তাকালে পরিষ্কার বােঝা যায়। 

স্যার আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দেন নিআপনি কেমন আছেন? আমি ভালাে আছিঘরটা পছন্দ হয়েছে

কার্বলিক এসিড দেয়ার আগ পর্যন্ত পছন্দ ছিলআমার কিছু গন্ধবিষয়ক সমস্যা আছে। 

আপনি এসেছেন আমি অসম্ভব খুশি হয়েছিখুশির প্রকাশটা অবশ্যি করতে পারছি নাআপনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষ, আপনি নিশ্চয়ই আমার খুশি ধরতে পারছেন। 

মিসির আলি কিছু বললেন নামানুষটা যে খুশি হয়েছে, তা বােঝা যাচ্ছেঅনিন্দিত মানুষের ভেতর অস্থিরতা থাকেব্যথিত মানুষ চুপচাপ হয়ে যায়। এই মানুষটা অস্থিরহুইল চেয়ার নিয়ে এদিকওদিক করছে। 

আমি আপনাকে খাবার ঘরে নিয়ে যাবার জন্যে অনেকক্ষণ থেকে সিঁড়ির গোড়ায় বসে আছিআপনি বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলেন, আমি নিচ থেকে আপনাকে লক্ষ করছিলামআমার মনে হচ্ছিল কোনাে একটা বিষয় নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তা করছিলেনদুশ্চিন্তার বিষয়টা ধরার চেষ্টা করছিলাম। 

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৯)

দুশ্চিন্তা করছিলাম নাআপনার স্ত্রী লিলি কোথায় ?

রান্না শেষ করে ঘুমুতে চলে গেছেভুল বললাম, সে চলে যায় নিআমি তাকে জোর করে পাঠিয়েছিওর কিছু মানসিক সমস্যা আছেসমস্যাগুলি হঠাৎ হঠাৎ দেখা দেয়আপনাকে নানান কৌশল করে এখানে আনার অনেকগুলি কারণের মধ্যে একটা কারণ হলাে লিলির ব্যাপারটি নিয়ে আপনার সঙ্গে আলাপ 

আচ্ছাস্যার আসুনখেতে আসুনখাবার ঘরটা একতলায়একতলায় থাকায় {আমি যেতে পারছিদোতলায় হলে যেতে পারতাম না। 

মিসির আলি ভেবেছিলেন বিশাল একটা খাবার ঘর দেখবেনতা দেখলেন নাছােট ঘরখাবার টেবিলটাও ছোেটটেবিলের পাশে একটামাত্র চেয়ারমনে হচ্ছে একজনের জন্যেই খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছেএই ঘরের প্রধান আকর্ষণ মােমদানিরূপাতৈরি মােমদানিতে এক সঙ্গে একুশটা মােমদানি 

জ্বলছেঘর আলাে হয়ে আছেমােমদানিটা খাবার টেবিলে রাখা। 

মিসির আলি চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, আপনি খাবেন না

 

Read more

আমিই মিসির আলি-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *