কার্তিক মাসের শেষ। উত্তরের গারাে পাহাড় থেকে শীতের হিমেল হাওয়া উড়ে আসতে শুরু করেছে। এবারের লক্ষণ ভালাে না। মনে হয় ভালাে শীত পড়বে। দু’বছর পরপর হাড় কাঁপানাে শীত পড়ে। গত দু‘বছর তেমন শীত পড়ে নি। হরিচরণ চাদর গায়ে পুকুরপাড়ে এসে বসেছেন। তার মন বেশ খারাপ। তিনি খবর পেয়েছেন ধনু শেখের দোতলা লঞ্চে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে।
ভেদবমি করতে করতে একজন মারা গেছে। বান্ধবপুরে কলেরা এসে ঢুকেছে। গ্রামের পর গ্রাম শূন্য করে দেয়া এই ব্যাধির কাছে মানুষ অসহায়। তিনি মনে মনে বললেন, দয়া কর দয়াময়। যেন দেবী ওলাউঠা লঞ্চে করে বান্ধবপুর না। নামেন। তার প্রার্থনার সময় বিস্ময়কর এক ঘটনা ঘটল।
তার দিঘিতে একজোড়া শীতের হাঁস নামল। শীতের পাখি নামে হাওরে, মনে হচ্ছে এই প্রথম কোনাে দিঘিতে নামল। দিঘিও এমন কিছু বড় দিঘি না। এরা কি মনের ভুলে নেমে পড়েছে ? নাকি কোনাে কারণে দলছুট হয়েছে ? দলছুট হবার সম্ভাবনাই বেশি ।
দুটি হাঁসের একটি পানিতে স্থির হয়ে আছে। অন্যটি একটু পরপর ডুব দিচ্ছে। এদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সুযােগ থাকলে জিজ্ঞেস করা যেত, ঘটনা কী ?
হরিচরণ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলেন। দু’টা পাখিই ঘাটের কাছে । ভয় পেয়ে ওদের উড়ে যাওয়া উচিত, তা গেল না। সম্ভবত এরা মানুষ দেখে অভ্যস্ত ।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
মানুষ যে বিপদজনক প্রাণী এই তথ্য এখনাে জানে না। হরিচরণ বললেন, তােদের সমস্যা কী রে ? একটা হাস তার দিকে তাকাল। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এ ক্লান্ত । রােগা শরীর। দুই থেকে আড়াই মাস এরা থাকবে। মােটাতাজা হয়ে দেশে ফিরে যাবে। একটা পাখি তার একজীবনে কতবার আসা যাওয়া করে এই তথ্য কি কেউ জানে ? হরিচরণ ঠিক করে ফেললেন গদিতে পৌছেই পাখিবিষয়ক কোনাে বইপত্র পাওয়া যায় কি–না জানতে চেয়ে কোলকাতায় চিঠি
লিখবেন। মানব বুক হাইস‘ নামে একটা বইয়ের দোকানের সঙ্গে তার যােগাযােগ হয়েছে। তার প্রয়ােজনীয় বইপত্র এরাই পাঠায়। জুলেখা বাটিভর্তি খেজুরের রস নিয়ে এসেছে। নিজেদের গাছের রস। সে জ্বাল দিয়ে ঘন করেছে। অপূর্ব ঘ্রাণ ছেড়েছে। খেজুরের রস খেজুরপাতা দিয়ে জ্বাল না দিলে ভালাে ঘ্রাণ হয় না। জুলেখা খেজুরপাতা দিয়েই রস জ্বাল দিয়েছে।
জুলেখা লজ্জা লজ্জা গলায় বলল, আপনার জন্যে খেজুরের রস আনছি। …..ভালাে করেছ। রস ভালাে হয়েছে। সুঘ্রাণ ছেড়েছে। তাকিয়ে দেখ দিঘিতে দু’টা হাঁস নেমেছে। ………ও আল্লা। কী আচানক! আরাে কি নামবে ?
নামতে পারে। সব পশুপাখি নিজেদের ভেতর যােগাযােগ রাখে । এই দুটা পাখি হয়তাে অন্যদের খবর দিবে। আমি ঠিক করেছি আজ আর গদিতে যাব ।………..ঘাটে বসে থাকব । দেখি আরাে পাখি নামে কি–না। ….জুলেখা মুখে আঁচল চাপা দিতে দিতে বলল, বাবা, আপনি আজব মানুষ।
হরিচরণ বললেন, আমরা সবাই আজব মানুষ। তুমি আজব, তােমার ছেলে। আজব, তােমার স্বামী আজব। ঈশ্বর নিজে আজব, সেই কারণে তিনি আজব জিনিস তৈরি করতে পছন্দ করেন। রসের বাটিটা দাও, এক চুমুকে খেয়ে ফেলি।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
জুলেখা বিস্মিত হয়ে বলল, এতটা রস একসঙ্গে খাবেন ? কোনাে অসুবিধা নাই, দুপুরে ভাত খাব না। ..হরিচরণ তৃপ্তি করে বাটিভর্তি ঘন খেজুরের রস শেষ করলেন। পুকুরের পানিতে ঠোট ধুতে ধুতে বললেন, মা, তুমি নানান সময়ে নানান ভাবে আমার সেবা করছ। তােমাকে একটা উপহার দিতে চাই। কী পেলে তুমি খুশি হবে ?
জুলেখা জবাব দিল না। যদিও তার ইচ্ছা করছে বলে, আমাকে একটা কলের গান কিনে দেন। এই যন্ত্রটার জন্যে আমি আমার জীবন দিয়ে দিতে রাজি। কী অদ্ভুত জিনিস! পিতলের এক চোঙ। চোঙের ভেতর দিয়ে আসে কী সুন্দর গান। একটা গান ইচ্ছা করলে দশবার শােনা যাবে। সুরে ভুল হবে না। তালে ভুল হবে না। বাজনায় ভুল হবে না। কী আজব যন্ত্র ! ইশ সে যদি তার বাপজানকে যন্ত্রটা দেখাতে পারত!
হরিচরণ বললেন, তােমার মনের মধ্যে কিছু আছে, বলে ফেল। জুলেখা বলল, মনের মধ্যে কিছু নাই। …বলতে বলতে সে হরিচরণের পাশে বসল। হরিচরণ বললেন, এই হাঁসের একটা নাম আছে, সেটা জানাে ? ….জুলেখা বলল, না।
এর নাম দেশান্তরী পাখি‘। এক দেশ থেকে আরেক দেশে যায়, এই জন্যেই দেশান্তরী । | জুলেখার মনে হলাে— কী সুন্দর নাম! দেশান্তরী। পাখিদের মতাে দেশান্তরী মানুষও তাে আছে যাদের কাজ এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া। তার নিজের বাবাও তাে দেশান্তরী । জুলেখার ইচ্ছা করছে দেশান্তরী দিয়ে একটা গান লেখে ।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
প্রথম লাইন দেশান্তরী বান্ধই গাে, কোন দেশেতে যাও? পরের লাইনটা মাথায় আসছে না। সে যদি লেখাপড়া জানত এই লাইনটা লিখে রাখত । লেখাপড়া শেখা খুব কি জটিল ? সে কোরান মজিদ পাঠ করতে পারে। লিখতে পারে না। | হরিচরণ বললেন, জুলেখা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও ? বলতে চাইলে বলাে।
জুলেখা মাথা নিচু করে বলল, আমি বাংলা লেখা বাংলা পড়া শিখতে চাই । | হরিচরণ বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকা তরুণীর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আমি নিজে তােমাকে শেখাব । তুমি তােমার স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রাখবে। মুসলমানদের মধ্যে এই বিষয়টা দেখেছি। তারা স্ত্রীদের লেখাপড়া পছন্দ করে না।
জুলেখা বলল, স্ত্রী লেখাপড়া শিখলে স্বামীর হায়াত কমে, এইজন্যে পছন্দ করে না। এইসব তাে ভুল কথা। সবাই জানে ভুল কথা, তারপরও ভুল কথাই মানে। তুমি সুলেমানকে আমার কাছে পাঠাবা, আমি তারে বুঝায়া বলব।
সে দেশে নাই। মৈমনসিং গেছে কামে। ফিরতে একমাস লাগব। আমি কি এর মধ্যে শিখতে পারব না ? …………হরিচরণ কিছুক্ষণ জুলেখার দিকে তাকিয়ে বললেন, অবশ্যই পারবা । বল— অ। জুলেখা বলল, অ। এখন বলাে, আ। জুলেখা বলল, আ। …এক টুকরা কয়লা আন। আমি অক্ষর দুইটা লিখব। আজ সন্ধ্যায় তোমার জন্যে বাল্যশিক্ষা কিনে আনব।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
জুলেখা এক টুকরাে কয়লা এনেছে। শ্বেতপাথরে সেই কয়লার দাগ বসছে । হরিচরণ উঠে দাঁড়ালেন। ঘাটে বসে থাকার পরিকল্পনা তিনি বাদ দিয়েছেন। তিনি বাজারে যাবেন। মেয়েটার জন্যে স্লেট পেন্সিল কিনবেন। বাল্যশিক্ষা কিনবেন।
হরিচরণ ঘাট থেকে যাবার কিছুক্ষণ পরই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। দিঘিতে ঝাকে ঝাকে হাঁস নামতে শুরু করল। দেখতে দেখতে দিঘি হাঁসে পূর্ণ হলাে । অদ্ভুত দৃশ্য। যেন দিঘিতে হাঁসের সর পড়েছে। সেই সর উঠানামা করছে। হাঁসদের কারণে দিঘি থেকে হো হো হো জাতীয় গম্ভীর ধ্বনি উঠছে।
একই সময় বাবু মনিশংকরের বাড়ি থেকে অসময়ে শাঁখের শব্দ হতে লাগল। মনিশংকরের এক জেঠির ভেদ বমি শুরু হয়েছে । আশঙ্কা করা হচ্ছে দেবী ওলাউঠার দয়া । দেবীকে দূর করার জন্যেই শঙ্খধ্বনি। অদ্ভুত শব্দ আসছে শঙ্খ থেকেও। ভো ভো ভো। যেন দূর থেকে লঞ্চ ভো দিচ্ছে। শঙ্খের শব্দের সঙ্গে হাঁসের শব্দ মিলে একাকার হয়ে গেল।
