মৃন্ময়ী-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

মেয়ে বলবে, বন্ধ করতে হবে না, আমার শুনতে খুবই ইন্টারেস্টিং লাগছে। আচ্ছা বাবা যে মেয়ে তােমার জন্যে খাবার নিয়ে এসেছিল তার নাম কী ?………….. নাম তাে মা জানি না। নাম জিজ্ঞেস করা হয় নি। মেয়েটা দেখতে কেমন? ………………………….সেটাও বলতে পারছি না। অন্ধকার ছিল তাে। ভালােমতাে দেখতে পাই নি। 

এই পর্যায়ে মেয়ের মা মহা বিরক্ত হয়ে বলবে— ঐ মেয়ে মা রূপবতী ছিল। রূপবতী না হলে এই এক গল্প তোর বাবা পাঁচ লক্ষবার করে ? 

ভাইয়ার ঘরে বসে যে নিচু গলায় গল্প করছিল সে রাতে অবশ্যই ভাইয়ার ঘরে ঘুমুবে না। সে ঘুমুবে ছাদে। ছাদে চিলেকোঠার মতাে আছে। চিলেকোঠাটা স্টোর রুম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তারই এক কোণায় চাদর পেতে শােবার ব্যবস্থা আছে। বিপদজনক পরিস্থিতিতে এক ছাদ থেকে লাফিয়ে অন্য ছাদে যাওয়া যায়। এবং অতি দ্রুত পালিয়ে যাওয়া যায়। ভাইয়ার বন্ধুদের অনেকেই এই কাজটা অতীতে করেছে। 

ট্রে হাতে আমি চিলেকোঠার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, খেতে আসুন। ছাদ এবং চিলেকোঠা অন্ধকার হলেও সিড়ি ঘরে বাতি জ্বলছে। তার আলােয় কাজ চলার মতাে দেখা যাচ্ছে। চিলেকোঠায় বাতি আছে। তার সুইচ বাইরে। ইচ্ছা করলেই আমি বাতি জ্বালাতে পারি। তা না করে আবারাে বললাম– ভাত নিয়ে এসেছি খেতে আসুন। তিন চার সেকেন্ড কোনাে রকম শব্দ হলাে না— তারপর হামাগুড়ি দিয়ে ভাইয়ার বয়েসী এক যুবক বের হয়ে এল। তার চোখ ভর্তি বিস্ময়।

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি বললাম, আপনি কি অন্ধকারে খেতে পারবেন, না বাতি জ্বালাতে সে কিছুই বলল না। আমি বললাম, ঘরে খাবার কিছু ছিল না। গরম ভাতের ওপর ঘি দিয়ে দিয়েছি। শুকনা মরিচ ভেজে দিয়েছি। বেগুন ভাজা আছে। আর আপনার একটা পছন্দের খাবারও আছে। পাট শাক ভাজি। আমাদের বুয়ার দেশ ময়মনসিংহের ফুলপুর। সে দেশ থেকে টিন ভর্তি করে পাট শাক শুকিয়ে নিয়ে আসে। 

টগরের সঙ্গে আমি যখন কথা বলছিলাম তখন আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন ? ………………………জ্বি শুনছিলাম। বাবার সিগারেটের প্যাকেট থেকে দু’টা সিগারেটও আপনার জন্যে নিয়ে এসেছি। 

থ্যাংক য়ু। আমি যদি আপনাকে একটা অনুরােধ করি আপনি রাখবেন ? অবশ্যই রাখব। ………ভাইয়ার কাছে কখনাে আসবেন না। ভাইয়া বােকা মানুষ। সে কোনাে কিছুতে না থেকেও মহা বিপদে পড়ে যাবে। 

তােমাকে কথা দিচ্ছি আমি আর এ বাড়িতে আসব না। ………আপনি খাওয়া শুরু করুন। আপনার খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি থাকব । কেউ খুব আগ্রহ করে ভাত খাচ্ছে এই দৃশ্য দেখতে আমার খুব ভালাে লাগে। হাত ধােয়ার পানি এনেছি। নিন হাত ধােন। 

ভাইয়ার এই বন্ধুর নাম আমি জানি না। আগে দেখেছি কি–না মনে করতে পারছি না। সে হাত ধুয়ে খেতে বসেছে। ভাতের দলা মাখিয়ে মুখে দিতে গিয়ে নামিয়ে রেখে তাকাল আমার দিকে। ……..আমি বললাম, আরাম করে খান তাে। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

সে খুবই তৃপ্তির সঙ্গে খাচ্ছে। একজন ক্ষুধার্ত মানুষ খুব তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে এই দৃশ্য জগতের মধুর দৃশ্যের একটি ‘ কার যেন কথা? বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানতে হবে। কথাটা বাবার কাছ থেকে শুনেছিলাম। 

প্রথম ক্লাস সকাল সাড়ে ন‘টায়। এই ক্লাসটায় আমি রােজ লেট করি। এবং রােজই ভাবি আজ থেকে ক্লাস শুরু হবার দশ মিনিট আগেই ইউনিভার্সিটিতে চলে যাব। ফজলু মিয়ার ক্যান্টিনে কফি খাব। ফজলু মিয়ার কফি এমন অসাধারণ কিছু না। তবে খুব তাড়াহুড়া করে খেলে অসাধারণ লাগে। ক্লাস শুরু হয়ে গেছে এক্ষণি ক্লাসে ঢুকতে হবে, অথচ হাতে মগভর্তি কফি তখন কফিটা লাগে অসাধারণ। 

আমি গাড়িতে উঠতে যাব— দোতলার বারান্দা থেকে মা হাত ইশারায় ডাকলেন। খুবই ব্যস্ত ভঙ্গি। মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর কোনাে দুর্ঘটনা বাসায় ঘটে গেছে। আমি গাড়ি থেকে নামলাম, আবার দোতলায় উঠলাম। মা বললেন, যাচ্ছিস কোথায় ? 

এ ধরনের প্রশ্নের কোনাে মানে হয় ? মা জানে না আমি কোথায় যাচ্ছি ? সকাল ন‘টায় তাড়াহুড়া করে ঘর থেকে বের হবার উদ্দেশ্য তাে একটাই। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

ইউনির্ভাসিটিতে যাচ্ছি মা। আজ না গেলে হয় না? ……….তেমন ভয়ঙ্কর কোনাে কিছু ঘটে গেলে না গেলে হয়। ভয়ঙ্কর কিছু কি ঘটেছে? ……………….আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবি ? ……………………সেই এক জায়গাটা কোথায় ? তাড়াতাড়ি করে বল তাে মা। দেরি হয়ে যাচ্ছে। 

মা ঝলমল করে উঠলেন। উত্তেজিত গলায় বললেন, মৌচাক মার্কেট। সিল্ক শাড়ির একটা এগজিবিশন হচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। ……………………………………….তুমি দাওয়াতের কার্ড পেয়েছ ? ………………………..আমি কার্ড পাব কেন ? আমি কি মহিলা এমপি ? জাস্ট দেখতে যাব। পছন্দের কোনাে শাড়ি পেলে ।

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *