করার তাে কথা। এরকম বন্ধু তােমার ক’জন আছে ? ভাইয়া আবারও হাসল। যেন আবারও আমি মজার কোনাে কথা বলেছি। ওদের সঙ্গে সঙ্গে থেকে তােমার গুদের মতাে হতে ইচ্ছে করে না ? না। ওরা আমার মতাে হয় না। আমিও ওদের মতাে হই না। যা, ঘুমুতে যা।
কেউ কি আসবে তােমার কাছে ? …………ভাইয়া চুপ করে রইল। আমি বললাম, তুমি কিন্তু এখনাে ঐ ছেলের নাম বলে নি। ভাইয়া আবারও বলল, যা ঘুমুতে যা। আমি ঘুমুতে গেলাম এবং আশ্চর্যের কথা খুবই সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলাম— কাওসার স্যার মােটর সাইকেল চালাচ্ছেন।
আমি মােটর সাইকেলের পেছনে বসে আছি। হাওয়ায় আমার মাথার চুল উড়ছে, শাড়ির আঁচল উড়ছে। মােটর সাইকেল প্রায় উড়ে যাচ্ছে। আমার মােটেই ভয় লাগছে না। …….তার পরেও কপট ভয়ের অভিনয় করে বলছি– এই তুমি কি একটু আস্তে চালাতে পারাে না? স্যার বললেন, না, পারি না।
আমি বললাম, ছিটকে পড়ে যাব তাে। …….স্যার বললেন, পড়বে না। আমার কোমর জড়িয়ে ধরে শক্ত হয়ে বসে থাক। আমি কিন্তু স্পিড আরাে বাড়াচ্ছি। রেডি। গেট সেট গাে। এমন স্পিড দেব যে মােটর সাইকেল নিয়ে আকাশে উড়ে যাব।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৫)
স্যারের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে মােটর সাইকেল সত্যি সত্যি আকাশে উঠে গেল। ওপর থেকে নিচের ঢাকা শহর দেখা যাচ্ছে। আমার সামান্য ভয় ভয় লাগছে। তবে ভয়ের চেয়ে আনন্দ হচ্ছে অনেক বেশি।
ভয়ঙ্কর ভয়ের স্বপ্নে মানুষের ঘুম ভাঙে, আবার অস্বাভাবিক আনন্দের স্বপ্নেও মানুষের ঘুম ভাঙে। আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি বিছানায় উঠে বসতে বসতে ভাবলাম– কেন এরকম স্বপ্ন দেখলাম ? আমি কি একপলকের দেখাতেই একটা মানুষের প্রেমে পড়ে গেছি ? প্রেম এত সস্তা ?
রাত দেড়টা বাজে। …….বেশির ভাগ মানুষের জন্যেই গভীর রাত— আমার জন্যে রজনীর শুরু। ভিজাইনের মূল কাজগুলাে আমি এই সময় শুরু করি। আগামীকাল ডুপলেক্স বিল্ডিং–এর ফটোগ্রাফ দিয়ে করা একটা কোলাজ জমা দিতে হবে। বিল্ডিং–এর ফটোগ্রাফ সাজানাে হয়েছে।
এদের মাঝখানে ফাক ভরার জন্যে রং দিতে হবে। রং তৈরির কাজটা রাত যত গভীর হয় তত ভালাে হয়। দিন হলাে কাজের সময়, প্রয়ােজনের কাজ যেমন— ব্যবসা বাণিজ্য, অফিস আদালত। রাত হলাে। অপ্রয়ােজনের কাজের সময়। কবিতা লেখা হবে, ছবি আঁকা হবে। ঔপন্যাসিক চোখ বন্ধ করে তার চরিত্রদের নিয়ে খেলা করবেন। সাধু সন্তরা বসবেন ধ্যানে।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৫)
জীবনানন্দ দাশ নিশ্চয়ই চৈত্র মাসের দুপুরে গরমে ঘামতে ঘামতে লিখেন
নি— ……..এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি ………..সারারাত দখিনা বাতাসে। ……..আকাশের চাঁদের আলােয় এক ঘাই হরিণীর ডাক শুনি, ……….কাহারে সে ডাকে! আমার ধারণা এই লাইনগুলাে তিনি লিখেছেন মধ্যরাত পার করে। তখন চারদিকে সুনসান নীরবতা। বরিশালে তার বাড়ির পাশের বাঁশঝাড়ের বাশ পাতা বাতাসে কাঁপছে। এবং তিনি কল্পনায় বনের ভেতর ঘাই হরিণীর ডাক স্পষ্ট
শুনতে পাচ্ছেন। ………..আচ্ছা, ঘাই হরিণী ব্যাপারটা কী ? চিত্রা হরিণ, শাম্বা হরিণ আছে। ঘাই হরিণ কোথেকে এসেছে। ঘাই কি নাম, নাকি বিশেষণ ? ………..কাওসার স্যার ক্লাসের ব্ল্যাকবাের্ডে বড় বড় করে তাঁর টেলিফোন নাম্বার লিখে বলেছিলেন, ডিজাইন সংক্রান্ত কোনাে জটিলতায় তােমরা যদি পড় তাহলে এই নাম্বারে যে–কোনাে সময় আমাকে টেলিফোন করতে পারাে। রাত দু’টা, তিনটা, চারটা কোনাে সমস্যা নেই।
আমি এখন ডিজাইন সংক্রান্ত জটিলতাতেই পড়েছি। মাথার ভেতর থেকে ঘাই শব্দ দূর না করা পর্যন্ত কাজে মন দিতে পারছি না। কাজেই স্যারকে টেলিফোন করার অধিকার আমার আছে। ……….আমি ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেললাম। অধিকার কাজে লাগানাে ঠিক হবে না। সব অধিকার কাজে লাগাতে নেই। তারচে‘ মন অন্যদিকে নেবার ব্যবস্থা করা যাক।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৫)
আমি হাতে রিমােট কনট্রোল নিয়ে সিডি প্লেয়ার চালু করলাম। ঝড় বৃষ্টির একটা সিড়ি চালু হয়ে গেল। এই সিডিটা জন্মদিনে ফরিদা আমাকে দিয়েছে। গান বাজনা কিছু নেই শুধুই সাউন্ড এফেক্ট। বাতাসের শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, মাঝে মাঝে বজ্রপাতও হচ্ছে। স্টুডিওতে তৈরি শব্দ না। মন্টানার এক বনের ভেতরে রেকর্ড করা ঝড়ের শব্দ। সিডির গায়ে সেরকমই লেখা। শুনতে ভালাে লাগে।
টেলিফোন বাজছে। আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। একটা চল্লিশ। এত রাতে টেলিফোন করার মতাে আমার কেউ নেই। ট্র্যাংক কল হবার সম্ভাবনা। রিসিভার তুলতেই মা’র আবদারি গলা শুনা গেল– মৃ আজ আমি তাের সঙ্গে ঘুমাব ।
আমি বললাম, আচ্ছা। টেলিফোনের রিং পেয়ে কী ভেবেছিলি ? কিছু ভাবি নি মা। পাশের কামরা থেকে আমি টেলিফোন করেছি এটা নিশ্চয়ই ভাবিস নি। ……….তা ভাবি নি। আমার ঘরে ঘুমুলে চাইলে চলে এসাে। তবে আমাকে বিরক্ত করতে পারবে না। তুমি ঘুমাবে তােমার মতাে, আমি বাতি জ্বালিয়ে কাজ করব।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৫)
মৃ ভাের ঘর থেকে ঝড়ের শব্দ আসছে কেন? ঝড়ের সিডি বাজছে এই জন্যে ঝড়ের শব্দ। ঝড়ের সিডি আবার কী? এসে শুনে যাও কী। এক্সপ্লেইন করতে পারব না। ………তুই এত বিরক্ত হচ্ছিস কেন? সবাই দেখি আমার কথা শুনলে বিরক্ত হয়। আমার বাবা–মা’র ফ্যামিলির সবাই হয়। তার বাবা হয়। তুই হােস। ব্যাপার
কী ? ……….টেলিফোনে এত কথা শুনতে ভালাে লাগছে না মা। তুমি আসতে চাইলে চলে এসাে। ………..আমার তাে টেলিফোনে কথাবার্তা চালাতে খুবই ভালাে লাগছে। খুব যারা ঘনিষ্ঠ তাদের মাঝে মাঝে উচিত টেলিফোনে কথা বলা। টেলিফোনে গলার শব্দ বদলে যায় তাে পরিচিত জনকে তখন মনে হয় অপরিচিত।
খুব পরিচিত জনের সঙ্গে যত কথা বলা যায় মােটামুটি পরিচিত জনের সঙ্গে তারচে‘ বেশি কথা বলা যায়। হ্যালাে তুই কি টেলিফোন রেখে দিয়েছিস? …………….না।
Read more
