মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

করার তাে কথাএরকম বন্ধু তােমার ’জন আছে ? ভাইয়া আবারও হাসল। যেন আবারও আমি মজার কোনাে কথা বলেছিওদের সঙ্গে সঙ্গে থেকে তােমার গুদের মতাে হতে ইচ্ছে করে না ? নাওরা আমার মতাে হয় নাআমিও ওদের মতাে হই নাযা, ঘুমুতে যা। 

কেউ কি আসবে তােমার কাছে ? …………ভাইয়া চুপ করে রইলআমি বললাম, তুমি কিন্তু এখনাে ছেলের নাম বলে নি। ভাইয়া আবারও বলল, যা ঘুমুতে যাআমি ঘুমুতে গেলাম এবং আশ্চর্যের কথা খুবই সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলামকাওসার স্যার মােটর সাইকেল চালাচ্ছেন

আমি মােটর সাইকেলের পেছনে বসে আছিহাওয়ায় আমার মাথার চুল উড়ছে, শাড়ির আঁচল উড়ছেমােটর সাইকেল প্রায় উড়ে যাচ্ছেআমার মােটেই ভয় লাগছে না। …….তার পরেও কপট ভয়ের অভিনয় করে বলছিএই তুমি কি একটু আস্তে চালাতে পারাে না? স্যার বললেন, না, পারি না। 

আমি বললাম, ছিটকে পড়ে যাব তাে। …….স্যার বললেন, পড়বে নাআমার কোমর জড়িয়ে ধরে শক্ত হয়ে বসে থাকআমি কিন্তু স্পিড আরাে বাড়াচ্ছিরেডিগেট সেট গােএমন স্পিড দেব যে মােটর সাইকেল নিয়ে আকাশে উড়ে যাব। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৫)

স্যারের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে মােটর সাইকেল সত্যি সত্যি আকাশে উঠে গেলওপর থেকে নিচের ঢাকা শহর দেখা যাচ্ছেআমার সামান্য ভয় ভয় লাগছেতবে ভয়ের চেয়ে আনন্দ হচ্ছে অনেক বেশি। 

ভয়ঙ্কর ভয়ের স্বপ্নে মানুষের ঘুম ভাঙে, আবার অস্বাভাবিক আনন্দের স্বপ্নেও মানুষের ঘুম ভাঙেআমার ঘুম ভেঙে গেলআমি বিছানায় উঠে বসতে বসতে ভাবলামকেন এরকম স্বপ্ন দেখলাম ? আমি কি একপলকের দেখাতেই একটা মানুষের প্রেমে পড়ে গেছি ? প্রেম এত সস্তা

রাত দেড়টা বাজে। …….বেশির ভাগ মানুষের জন্যেই গভীর রাতআমার জন্যে রজনীর শুরুভিজাইনের মূল কাজগুলাে আমি এই সময় শুরু করি। আগামীকাল ডুপলেক্স বিল্ডিংএর ফটোগ্রাফ দিয়ে করা একটা কোলাজ জমা দিতে হবেবিল্ডিংএর ফটোগ্রাফ সাজানাে হয়েছে

এদের মাঝখানে ফাক ভরার জন্যে রং দিতে হবেরং তৈরির কাজটা রাত যত গভীর হয় তত ভালাে হয়দিন হলাে কাজের সময়, প্রয়ােজনের কাজ যেমনব্যবসা বাণিজ্য, অফিস আদালতরাত হলােঅপ্রয়ােজনের কাজের সময়কবিতা লেখা হবে, ছবি আঁকা হবেঔপন্যাসিক চোখ বন্ধ করে তার চরিত্রদের নিয়ে খেলা করবেনসাধু সন্তরা বসবেন ধ্যানে। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৫)

জীবনানন্দ দাশ নিশ্চয়ই চৈত্র মাসের দুপুরে গরমে ঘামতে ঘামতে লিখেন 

নি— ……..এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি ………..সারারাত দখিনা বাতাসে। ……..আকাশের চাঁদের আলােয় এক ঘাই হরিণীর ডাক শুনি, ……….কাহারে সে ডাকে! আমার ধারণা এই লাইনগুলাে তিনি লিখেছেন মধ্যরাত পার করেতখন চারদিকে সুনসান নীরবতাবরিশালে তার বাড়ির পাশের বাঁশঝাড়ের বাশ পাতা বাতাসে কাঁপছেএবং তিনি কল্পনায় বনের ভেতর ঘাই হরিণীর ডাক স্পষ্ট 

শুনতে পাচ্ছেন। ………..আচ্ছা, ঘাই হরিণী ব্যাপারটা কী ? চিত্রা হরিণ, শাম্বা হরিণ আছেঘাই হরিণ কোথেকে এসেছেঘাই কি নাম, নাকি বিশেষণ ? ………..কাওসার স্যার ক্লাসের ব্ল্যাকবাের্ডে বড় বড় করে তাঁর টেলিফোন নাম্বার লিখে বলেছিলেন, ডিজাইন সংক্রান্ত কোনাে জটিলতায় তােমরা যদি পড় তাহলে এই নাম্বারে যেকোনাে সময় আমাকে টেলিফোন করতে পারােরাত দুটা, তিনটা, চারটা কোনাে সমস্যা নেই। 

আমি এখন ডিজাইন সংক্রান্ত জটিলতাতেই পড়েছিমাথার ভেতর থেকে ঘাই শব্দ দূর না করা পর্যন্ত কাজে মন দিতে পারছি নাকাজেই স্যারকে টেলিফোন করার অধিকার আমার আছে। ……….আমি ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেললামঅধিকার কাজে লাগানাে ঠিক হবে নাসব অধিকার কাজে লাগাতে নেইতারচেমন অন্যদিকে নেবার ব্যবস্থা করা যাক। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৫)

আমি হাতে রিমােট কনট্রোল নিয়ে সিডি প্লেয়ার চালু করলামঝড় বৃষ্টির একটা সিড়ি চালু হয়ে গেলএই সিডিটা জন্মদিনে ফরিদা আমাকে দিয়েছেগান বাজনা কিছু নেই শুধুই সাউন্ড এফেক্টবাতাসের শব্দ, বৃষ্টির শব্দ, মাঝে মাঝে বজ্রপাতও হচ্ছেস্টুডিওতে তৈরি শব্দ নামন্টানার এক বনের ভেতরে রেকর্ড করা ঝড়ের শব্দসিডির গায়ে সেরকমই লেখাশুনতে ভালাে লাগে। 

টেলিফোন বাজছেআমি ঘড়ির দিকে তাকালামএকটা চল্লিশএত রাতে টেলিফোন করার মতাে আমার কেউ নেইট্র্যাংক কল হবার সম্ভাবনারিসিভার তুলতেই মাআবদারি গলা শুনা গেলমৃ আজ আমি তাের সঙ্গে ঘুমাব । 

আমি বললাম, আচ্ছাটেলিফোনের রিং পেয়ে কী ভেবেছিলি ? কিছু ভাবি নি মাপাশের কামরা থেকে আমি টেলিফোন করেছি এটা নিশ্চয়ই ভাবিস নি। ……….তা ভাবি নিআমার ঘরে ঘুমুলে চাইলে চলে এসাে। তবে আমাকে বিরক্ত করতে পারবে নাতুমি ঘুমাবে তােমার মতাে, আমি বাতি জ্বালিয়ে কাজ করব। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৫)

মৃ ভাের ঘর থেকে ঝড়ের শব্দ আসছে কেন? ঝড়ের সিডি বাজছে এই জন্যে ঝড়ের শব্দঝড়ের সিডি আবার কী? এসে শুনে যাও কীএক্সপ্লেইন করতে পারব না। ………তুই এত বিরক্ত হচ্ছিস কেন? সবাই দেখি আমার কথা শুনলে বিরক্ত হয়আমার বাবামাফ্যামিলির সবাই হয়তার বাবা হয়তুই হােসব্যাপার 

কী ? ……….টেলিফোনে এত কথা শুনতে ভালাে লাগছে না মাতুমি আসতে চাইলে চলে এসাে। ………..আমার তাে টেলিফোনে কথাবার্তা চালাতে খুবই ভালাে লাগছেখুব যারা ঘনিষ্ঠ তাদের মাঝে মাঝে উচিত টেলিফোনে কথা বলাটেলিফোনে গলার শব্দ বদলে যায় তাে পরিচিত জনকে তখন মনে হয় অপরিচিত

খুব পরিচিত জনের সঙ্গে যত কথা বলা যায় মােটামুটি পরিচিত জনের সঙ্গে তারচেবেশি কথা বলা যায়হ্যালাে তুই কি টেলিফোন রেখে দিয়েছিস? …………….না। 

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *