মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

মা বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললেন, পুরুষ এবং মহিলার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছেএকজন পুরুষের রাগ করার যতটা অধিকার, একজন মেয়ের কিন্তু ততটা অধিকার নেইতার মানে

মনে কর তাের বাবার হঠাৎ শখ হলাে একটা চা বাগান কিনবেসে কিনে ফেললআমাকে কিছুই বলল নাআমি কিন্তু তাতে রাগ করতে পারব নাসে যদি সেই চা বাগানে তার অফিসের কোনাে মহিলা কর্মচারীকে নিয়ে যায়, সপ্তাহে দু একদিন কাটিয়ে আসে তাতেও কিন্তু আমি রাগ করতে পারব না

কারণ সে গিয়েছে অফিসের কাজেতাকে চিঠি লিখতে হবে। দেশের বাইরের যারা চা পাতা কিনবে তাদের সঙ্গে যােগাযােগ করতে হবেঅসংখ্য মানুষকে টেলিফোন করতে হবেটেলিফোন রিসিভ করতে হবে। …………………বাবা কি চা বাগান কিনেছে নাকি

উদাহরণ দিচ্ছিরে মাউদাহরণ দিয়ে বােঝানাের জন্যে চা বাগানের কথাটা বললামতােদের ইউনিভার্সিটির টিচাররা জটিল বিষয় উদাহরণ দিয়ে সহজ করে না ? আমিও করেছি

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ 

মা হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলে বললেনউদাহরণ দিয়ে বুঝানাে নিয়ে খুবই অশ্লীল একটা জোক আছেঅশ্লীল হলেও দারুণ হাসির তাের বিয়ে হােক তারপর বলব| বিয়ে হােক আর না হোক তোমার মুখ থেকে অশ্লীল রসিকতা শােনার আমার কোনাে ইচ্ছা নেই। 

মা আবার শুয়ে পড়লেনআমি মায়ের গায়ে হাত রেখে বললাম, ঘাই হরিণী কী তুমি জানাে ? | মা হাই তুলতে তুলতে বললেন, জানিকিন্তু তােকে বলা যাবে নাঘাই হরিণী ব্যাপারটাও অশ্লীলমা হয়ে আমি মেয়ের সঙ্গে অশ্লীল কথা বলব ? ভাবিস কি তুই আমাকে? আমি কি জীবনানন্দ দাশ

মা হঠাৎ বালিশে মুখ গুজে হাসতে শুরু করলেনআমি বললাম, হাসছ কেন ? ………হাসি আসছে এই জন্যে হাসছি। কেন হাসি আসছে জানতে পারি ? তুই নাকি একজনের প্রেমে পড়েছিস এই ভেবে হাসি আসছে। 

আমি বিরক্ত গলায় বললাম, আমি কারাে প্রেমে পড়ি নিআর যদি পড়েও থাকি এখানে হাসির কী হলো? …………..কোনাে ছেলের প্রেমে পড়িস নি ? আমাকে যে বলল তােদের একজন টিচারের সঙ্গে তাের প্রেম হয়েছে। সবাই তাকে গরু স্যারডাকেহি হি হি। ……………হাসি থামাও তাে মাএইসব কে বলেছে ? দিন ফরিদাদের বাসায় গিয়েছিলাম। সে বলল । 

আমি চুপ করে গেলামমার অনেক বিচিত্র স্বভাবের একটা হলাে আমার সব বান্ধবীর সঙ্গে তার খুব ভালাে যােগাযােগতিনি নিয়মিত তাদের বাসায় যাবেনসমবয়সীদের মতাে হৈচৈ করবেন এবং ব্যাপারটা আমার কাছ থেকে গােপন রাখবেন। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

মা হাসি থামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, মৃন্ময়ী তুই তাের গরু স্যারকে একদিন বাসায় নিয়ে আসিস তােআমি লন থেকে কাচা ঘাস কেটে রাখবহি হি হি। …………….মা পাগলের মতাে হাসছেনআমি তার দিকে তাকিয়ে আছিআমার কাছে কেন জানি মনে হচ্ছে মা মানসিকভাবে পুরােপুরি সুস্থ না। 

মৃন্ময়ী! বলাে। ……………আমার মনে হচ্ছে তাের বিয়ে হবে আজহার সাহেবের ছেলের সঙ্গেআমার সিক্সথ সেন্স তাই বলছেবিয়েটা যেহেতু ঠিক হয়েই আছে কাজেই গরু স্যারের সঙ্গে প্রেমটা না হলেই ভালাে হয়টিচার মানুষ হাফসােল খাবেকাজটা ঠিক হবে না। 

মা, চুপ করাে তাে! ……………..এই রসিকতা মা প্রায়ই করেআজহার চাচার ছেলেটাকে নিয়ে রসিকতাছেলেটা জড়ভরতের মতােমানসিকভাবে হয়তােবা সামান্য অসুস্থকোথাও বসে আছে তাে বসেই আছেকোনাে দিকে তাকিয়ে আছে তাে তাকিয়েই আছে। 

 ছােটবেলায় আমাদের বাসায় আসতঘরের কোনাে অন্ধকার কোণ খুঁজে বসে থাকতকোনাে প্রশ্ন করলে জবাব দিত নাশুধু যদি মা বলতেন, এই শােন মৃন্ময়ীকে বিয়ে করবি ? ……..সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে নরম গলায় বলত, করব। 

মা হেসে ভেঙে পড়তেনরাগে আমার গা জ্বলে যেতএখনাে রাগ লাগছেমানুষের অসুস্থতা নিয়ে রসিকতা করার কোনাে মানে হয় না। 

মা বললেন, তাের আজহার চাচার এই ছেলে তাে খারাপ না। স্বামী হিসেবে আদর্শ হবেযেখানে বসিয়ে রাখবি বসে থাকবেতাের দিকে প্রেমপূর্ণ নয়নে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবেখেতে দিলে খাবেখেতে না দিলে খাবে নাহি হি হি। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি কঠিন গলায় বললাম, মা প্লিজ হাসবে না। ………মা বললেন, আজহার সাহেবকে তাের বাবা চিনতে পারে নিআজহার সাহেব কচ্ছপ রাশিকচ্ছপ রাশির মানুষ একবার কোনাে কিছু কামড়ে ধরলে ধরেই থাকবেদেখিস সে ঠিকই তাের বাবার কাছে কবরের জায়গা বিক্রি করবেতাের সঙ্গেও তার ছেলের বিয়ে দিয়ে দিবে। 

আমার সঙ্গে কি তিনি তার ছেলের বিয়ে দিতে চাচ্ছেন? অবশ্যই চাচ্ছেমা আবারও হাসি শুরু করলেনতিনি কেন হাসছেন কে জানে

আমি যে পরিস্থিতিতে পড়েছিসংবাদপত্রের ভাষায় তাকে বলা হয় বিব্রতকর পরিস্থিতিযতটুক ব্রিত বােধ করা উচিত তারচেয়ে বেশি বােধ করছিচেষ্টা করছি আমাকে দেখে যেন আমার মানসিক অবস্থাটা বােঝা না যায়এই অভিনয়টা আমি ভালাে পারি। তবে সবদিন পারি নাআজ পারছি কিনা বুঝতে পারছি না। …..ঘটনাটা রকম ক্লাস শেষ হয়েছেআমি গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিপেছন থেকে কাওসার স্যার ডাকলেনহ্যালাে মিস। 

আমি পেছন ফিরলামস্যার বললেন, তুমি কোন দিকে যাচ্ছ ? আমি বললাম, দিক বলতে পারব নাবাসা যে দিকে সে দিকে যাচ্ছি। ……….পথে আমাকে নামিয়ে দিতে পারবে? আমার মােটর সাইকেলের চাকা পাংচার হয়েছেএকটা এক্সট্রা চাকা আছেচাকা কীভাবে বদলাতে হয় আমি জানি না। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি বললাম, আসুন। আপনি কোথায় যাবেন বলুন আপনাকে নামিয়ে দিচ্ছি। ……….আমি কোথাও যাব নাতােমার সঙ্গে গাড়িতে উঠবহঠাৎ কোথাও নেমে যেতে ইচ্ছা করলে নেমে যাবআর যদি নেমে যেতে ইচ্ছা না করে তােমার সঙ্গে তােমাদের বাসায় যাবএক কাপ চা খেয়ে আসব। 

স্যারের সঙ্গে কথাবার্তার এই পর্যায়ে হঠাৎ আমার অস্বস্তি লাগতে শুরু করলনিঃশ্বাস দ্রুত পড়তে থাকলযদিও তার কোনােই কারণ নেইকোনাে অপরিচিত ভদ্রলােক আমার কাছে লিফট চাইছে নাযিনি লিফট চাইছেন তিনি আমার খুবই পরিচিত

তিনি হয়তাে আজ আবার নতুন ধরনের কোনাে খেলা খেলার চিন্তা করছেনআবারাে হয়তাে সাইকোলজির কোনাে পরীক্ষা হবেপরীক্ষার এক পর্যায়ে আমি রেগে যাব এবং আমার নিজেকে ক্ষুদ্র তুচ্ছ মনে হবে

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *