মা শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগলেন। আমি বললাম, হাসির কিছু হয় নি মা। সে সত্যি কথা বলেছে। লুকায় নি। কেউ সত্যি কথা বললে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করা যায় না । মা চোখ বড় বড় করে বললেন, তুই রেগে যাচ্ছিস কেন ? এখনাে তাে ছেলেটার তাের সঙ্গে বিয়ের দলিল রেজেস্ট্রি হয় নি। আগে হােক, তারপর রাগ করিস।
আমি বললাম, এইসব কী বলছ তুমি ? ………..মা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, তাের সঙ্গে ঠাট্টা করলাম। ঠাট্টাও করতে পারব না ? …………এই ঠাট্টাটা আমার ভালাে লাগছে না। ……..ঠাট্টা তাে করাই হয় ভালাে না লাগার জন্যে। ঠাট্টা শুনে তুই যদি মজা পাস তাহলে তাে আর এটা ঠাট্টা থাকে না। সেটা হয়ে যায় রসিকতা।
ঠিক আছে মা ঠাট্টা করাে। ……..মা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, তুই কিন্তু LSD ট্যাবলেট আমাকেও দিবি। আমি খেয়ে দেখব রঙের ব্যাপারটা কী। আয় আমরা মা মেয়ে দু’জন এক সঙ্গে খাই। …আমি মার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। মা বললেন, টেলিফোনের প্যারালাল কানেকশন তাে। তুই যখন কারাে সঙ্গে কথা বলিস তখন মাঝে মাঝে আমি শুনি।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ
যেন টেলিফোনে লুকিয়ে কথা শােনা কোনাে ব্যাপার না। এমন ভঙ্গিতে মা ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ঢুকে বললেন, তােকে তাে আসল কথাই বলা হয় নি। নকল কথা নিয়ে ছােটাছুটি করছি। তাের আজহার চাচা তার ছেলের বিয়ের তারিখ ঠিক করতে এসেছেন। তাের বাবাকে বললেন। খুব খুশি। তার হাসি শুনতে পাচ্ছিলি না ? তাের জন্যে বিশাল এক গিফট প্যাকেট এনেছেন। এখন খুলবি না পরে খুলবি ?
আমি মার দিকে তাকিয়ে আছি। মা গ্রিন টির মগে চুমুক দিচ্ছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে চা–টা খেয়ে তিনি খুব তৃপ্তি পাচ্ছেন। ……গাড়ি বারান্দার সিঁড়িতে, যেখানে দারােয়ান এবং মালীরা সাধারণত বসে থাকে ভাইয়া সেখানে বসে আছে। তার মুখ বিষন্ন। দেখেই মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে। শরীর কি খারাপ করেছে? ভাইয়া এমন মানুষ যে শরীর ভয়ঙ্কর খারাপ করলেও কাউকে কিছু জানাবে না। হয়তাে তার কাছে শারীরিক কষ্ট অরুচিকর ব্যাপার। যা অন্যদের কাছ থেকে গােপন রাখতে হয়।
ভাইয়া এ বাড়িতে থাকতে আসার দিন পনের পরের কথা— বাবা এক সকালবেলা গাড়ি বের করে আমাকে বললেন টগরকে ডেকে নিয়ে আয়তে। ওকে কিছু জামা–কাপড় কিনে দেব। ওতাে ফকির মিসকিনের কাপড় চোপড় নিয়ে এসেছে। মৃন্ময়ী, তুইও চল আমাদের সঙ্গে। আমি ভাইয়াকে নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। ড্রাইভার ঘটাং করে গাড়ির দরজা বন্ধ করল। ভাইয়া গাড়ির দরজায় হাত রেখেছিল, তার হাতের তিনটা আঙ্গুল থেতলে গেল। সে অস্পষ্ট গলায় শুধু বলল–– উফ!
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ
বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, কী হয়েছে ? ভাইয়া বলল, কিছু হয় নাই। …………বাবা বললেন, দরজায় হাত রেখে বসেছিলে কেন ? গাড়িতে চড়ারও কিছু নিয়ম কানুন আছে। লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেই হয় না। ব্যথা পেয়েছ ?
ভাইয়া চাপা গলায় বলল, না। বাবা বললেন, ড্রাইভার চালাও, বনানী মার্কেটের দিকে যাও। …….আমি বললাম, না। আগে কোনাে ডাক্তারের কাছে চলে । ভাইয়া খুবই ব্যথা পেয়েছে, রক্ত পড়ছে। রক্তে তার সার্ট মাখামাখি হয়ে গেছে।
আমরা একটা ক্লিনিকে গেলাম। ক্লিনিকের ডাক্তার সাহেব বললেন, কী সর্বনাশ! এই ছেলের তাে একটা আঙ্গুল ভেঙে গেছে। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান, কিংবা পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যান। …বাবা বিরক্ত মুখে বললেন, একটা আঙ্গুল ভেঙে গেছে তারপরেও কোনাে শব্দ করে নাই। এ তত ডেনজারাস ছেলে। একে তাে সর্বক্ষণ চোখে চোখে রাখা দরকার।
টগর নামের অতি শান্ত অতি নম্র কিশােরটি একটি ডেনজারাস ছেলে— এই। চিন্তাটা বাবা মাথা থেকে কখনাে দূর করতে পারেন নি। দূর কোনােদিন হবে বলেও আমার মনে হয় না। মানুষের প্রথম ধারণা সব সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়। ভাইয়াকে এ রকম অসহায় ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে আমার খুবই মায়া লাগল। এইখানে একটা ভুল কথা বললাম – ভাইয়াকে দেখলেই আমার মায়া লাগে। তাকে অসহায় ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখলেও মায়া লাগে, আবার সহায় ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখলেও মায়া লাগে। আমি বললাম, শরীর খারাপ না–কি?
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ
মৃ তাের সঙ্গে জরুরি কথা আছে। এইখানে বলবে না ঘরে যেতে হবে ? ঘরে আয়। ……..কথা যা বলার এক মিনিটের মধ্যে বলে শেষ করতে হবে। আমার আজও ক্লাসে দেরি হয়ে গেছে। ………তাহলে এখানেই বলি। বলাে।
ভাইয়া ইতস্তত করতে লাগল। আমি খুবই অবাক। এমন কী কথা যা আমাকে বলতে ভাইয়ার ইতস্তত করতে হচ্ছে। আমি ধমকের মতাে বললাম, বলাে তাে কী বলবে।
আমাকে কিছু টাকা দিতে পারবি ? ………..আমি হ্যান্ডব্যাগ খুলতে খুলতে বললাম, অবশ্যই পারব। বলাে কত লাগবে— পাঁচ শ টাকায় হবে ? …………পাঁচ শ‘ টাকায় হবে না। অনেক বেশি টাকা লাগবে। কারাে কাছ থেকে। জোগাড় করে দিতে পারবি ?
অবশ্যই পারব। বাবার কাছ থেকে এনে দেব। টাকাটা যে আমার দরকার এটা জানলে বাবা দেবেন না । বাবাকে বলব না। এখন দয়া করে বলল কত টাকা? ষাট হাজার টাকা। আমি অবাক হয়ে বললাম, ষাট হাজার টাকা! এত টাকা ।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ
ভাইয়া নিচু গলায় বলল, হা । বিকাল চারটার আগে টাকাটা লাগবে। মৃ পারবি ? ……..পারার তাে কোনাে কারণ দেখি না। …….বিকাল চারটার আগে টাকাটা দরকার। ……..আমার মনে আছে। আমি কি জানতে পারি বিকাল চারটার আগে এতগুলি টাকা কেন দরকার ?
ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল— পরে বলি ? এখন বলতে ইচ্ছা করছে না। …বলতে ইচ্ছা না করলে তােমাকে কখনাে বলতে হবে না। থ্যাংকু ।
Read more
