লিলিয়ান অ্যাপার্টমেন্টে ফিরল সন্ধ্যা মিলাবার পর। ক্লান্তিতে তার শরীর ভেঙে পড়ছে। মনে হচ্ছে এক সেকেণ্ডও সে জেগে থাকতে পারবে না। হট শাওয়ার নেয়া, গরম দুধ খাওয়া, বিছানার চাদর বদলান কিছুই তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

সে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। গাঢ় গভীর ঘুম। যে ঘুমের সময় মানুষ মানুষ থাকে না, পাথরের মত হয়ে যায়। গভীর ঘুমের স্বপ্নগুলি অন্যরকম হয়। স্বপ্ন আর স্বপ্ন থাকে না। বাস্তবের কাছাকাছি চলে যায়। হলিকা
ঘুমের স্বপ্নগুলি হয় হালকা, অস্পষ্ট কিছু লজিক বিহীন এলােমেলাে ছবি। গাঢ় ঘুমের স্বপ্ন – স্পষ্ট, যুক্তিনির্ভর।
আজ লিলিয়ান দেখল গাঢ় ঘুমের স্বপ্ন। স্বপ্নে সে এবং তাহের দু’জন পাশাপাশি শুয়ে আছে। তাহের ঘুমুচ্ছে সে জেগে আছে। ঘুমের মধ্যে তাহের অস্ফুট শব্দ। করল। লিলিয়ান হাত রাখল তাহেরের গায়ে। হাত ভেজা ভেজা লাগছে। সে চোখের সামনে হাত মেলে ধরল। হাত রক্তে লাল। সে চেঁচিয়ে উঠল। লিলিয়ানের ঘুম ভাঙল নিজের চিৎকারে। বাকি রাত সে ঘুমুল না জেগে বসে রইল। ভােরবেলা টেলিফোন করল মাকে –
আয়নাঘর-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
“কেমন আছ মা?” ‘আমি ভাল আছি। তাের গলা এমন শােনাচ্ছে কেন? তাের কি হয়েছে?” “কদিন ধরে আমি খুব দুঃস্বপ্ন দেখছি। “কি দুঃস্বপ্ন ?” ‘ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন। একটা বিদেশী ছেলেকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন। ‘এ ছেলের সঙ্গে কি তাের পরিচয় আছে?” ‘না। দু‘দিন কথা হয়েছে। ‘কি রকম কথা ? ‘সাধারণ কথা মা। তেমন কিছু না। ‘ছেলেটার মধ্যে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা দেখে তুই ভয় পেয়েছিস। ‘তেমন কিছু নেই মা। ভাল ছেলে। ‘দু‘দিনের আলাপে কি করে বুঝলি ভাল ছেলে? | লিলিয়ান জবাব দিল না। তার মা কয়েকবার বললেন, হ্যালাে – হ্যালো লিলিয়ান শুনতে পাচ্ছিস? আমি তাে কিছুই শুনতে পাচ্ছি না – হ্যালাে হ্যালাে।
লিলিয়ানের সবচে ছােটবােন রওনি কঁদছে। রান্নাঘরে মা নিশ্চয়ই কল ছেড়ে রৈখেছে – পানি পড়ার শব্দ আসছে।
‘হ্যালাে, লিলিয়ান। হ্যালাে... টেলিফোনটায় কি হল কিছু শুনতে পারছি না।
লিলিয়ান বলল, মা রওনি কাদছে তুমি ওকে দেখ – আমি টেলিফোন রাখলাম. ..
না না। টেলিফোন রাখিস না। তুই আমার কথা শােন মা ... তুই একজন ভাল ডাক্তার দেখা। টাকা যা লাগে লাগুক ... আমি যে ভাবেই হােক ডলার পাঠাব। কিছু দিন পর পর তুই এমন দুঃস্বপ্ন দেখিস। এটা তাে ভাল কথা না।
‘টেলিফোন রাখলাম মা।
না না না...‘
লিলিয়ান টেলিফোন রাখল না। কানে লাগিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে রইল। এখনাে রওনির কান্না শােনা যাচ্ছে। বাথরুমের ট্যাপ দিয়ে পানি পড়ার শব্দ আসছে, কেউ। একজন বােধহয় এসেছে তাদের বাড়িতে। কলিং বেল টিপছে ... ক্রমাগত বেল বাজছে। লিলিয়ানের মা কাঁদো কাদো গলায় বলে যাচ্ছেন, হ্যালাে লিলিয়ান হ্যালাে। কি হল টেলিফোনটায় — কোন কথা শুনতে পাচ্ছি না। অপারেটর হ্যালাে অপারেটর ...
আয়নাঘর-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলিয়ান মা‘র কথা অগ্রাহ্য করল না। কোনদিন করেও না। সে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কথা বলতে গেল। ইউনিভার্সিটির সাইকিয়াট্রিস্ট। এরা বলে স্টুডেন্ট কাউন্সিলার। ছাত্র–ছাত্রীদের নানান ধরনের সমস্যা নিয়ে এঁরা কথা বলেন। এক সময় ছাত্র–ছাত্রীদের সমস্যা ছিল পড়াশােনা কেন্দ্রিক – কোর্স ভাল লাগছে না, গ্রেড খারাপ হচ্ছে এই জাতীয়। এখনকার সমস্যা বেশির ভাগই মানসিক। যে কারণে স্টুডেন্ট কাউন্সিলারদের মধ্যে অন্তত একজন থাকেন সাইকিয়াট্রিস্ট।
লিলিয়ান যার কাছে গেল তার নাম ভারমান। ডঃ এঙ্গেলস ভারমান। ভদ্রলােক ভারিক্কি ধরনের বেঁটেখাট মানুষ। তাঁর মুখ ভর্তি দাড়ি–গোফ। চুল–দাড়ি সবই পাকা। ফর্সা গায়ের রঙের সঙ্গে চুলের রঙ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। চোখে মােটা ফ্রেমের চশমাটা ঝুলে আছে নাকের উপর। ভদ্রলােক তকাল চশমার ফ্রেমের উপর দিয়ে। লিলিয়ানের মনে হল – ভদ্রলােকের চোখ সুন্দর। তিনি তাকাচ্ছেন মমতা নিয়ে। ডাক্তাররা যখন রােগীর দিকে তাকান তখন রােগটাকে দেখার চেষ্টা করেন, মানুষটাকে নয়। এই ডাক্তার মানুষটাকে দেখার চেষ্টা করছেন।
লিলিয়ান বলল, গুড মর্নিং ডঃ এঙ্গেলস ভারমান। “গুড মর্নিং লিটল মিস। ‘আমার নাম লিলিয়ান।
গুড মর্নিং লিটল মিস লিলিয়ান। ‘গুড মর্নিং স্যার। ‘বল তাে লিলিয়ান, তুমি কেমন আছ?” ‘আমি খুব ভাল নেই।
আয়নাঘর-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
‘শুনে খুশি হলাম। সারাক্ষণ ভাল থাকা কোন কাজের কথা না – তােমরা যদি সারাক্ষণ ভাল থাক তাহলে আমরা কি করব ? তােমার সমস্যা কি তা এখন বল। সহজভাবে বল। খােলাখুলি বল।
‘আমার ঘুম হচ্ছে না। ‘এটা কোন সমস্যাই না। ঘুম না হলে এক লক্ষ ধরনের ঘুমের অষুধ আছে –
আর কি সমস্যা?
‘ঘুমুলেই দুঃস্বপ্ন দেখি।
‘তুমি তাে ভাল আছ ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখ। আমি দেখি জেগে জেগে। চারদিকে যা দেখছি সবই দুঃস্বপ্ন। গতকাল কি হয়েছে শােন – সাবওয়ে দিয়ে আসছি, আমার চোখের সামনে একজন মহিলার ব্যাগ এক কালাে ছােকরা ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালাল। এতগুলি লােক আমরা কেউ কোন কথা বললাম না। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। এটা কি বড় ধরনের দুঃস্বপ্ন না।
‘আপনিও কিছু বলেন নি ?” ‘না। আমি হচ্ছি অবজারভার, আমি বসে বসে দেখেছি। লিলিয়ান বলল, অন্যরাও হয়ত আপনার মত কোন অজুহাত তৈরি করে বসে
ছিল।
আয়নাঘর-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
ডঃ এঙ্গেলস ভারমান হাসতে হাসতে বললেন, তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে। তােমার কোন সমস্যা থাকার কথা না। সমস্যা হয় কম বুদ্ধির মানুষদের। এরা কিছু বুঝতে চায় না। কিন্তু তুমি বুঝবে। যুক্তি দিয়ে বােঝালে বুঝবে। এখন সুন্দর করে তােমার সমস্যা বল। না–কি বলার আগে কফি খেয়ে নেবে?
‘কফি খাব।
‘ঐ টেবিলে কফি মেকার আছে। তােমার জন্যে আন এবং আমার জন্যে আন।
Read more
