কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তােমার সমস্যার কথা বল। আমার বদঅভ্যাস। হচ্ছে, আমি চশমার ফাক দিয়ে তাকাই। আশা করি এতে কোন সমস্যা হবে না। কারণ আমার চোখ খুব সুন্দর। ঠিক বলি নি ?”
‘জি ঠিক বলেছেন।

লিলিয়ান খুব গুছিয়ে তার সমস্যার কথা বলল। ডঃ ভারমান কোন প্রশ্ন করলেন না। চুপচাপ শুনে গেলেন। এক ফঁাকে উঠে গিয়ে আবার কফির পেয়ালা ভর্তি করে আনলেন। লিলিয়ান কথা শেষ করবার পর ডঃ ভারমান মুখ খুললেন। তিনি নরম গলায় বললেন, তােমার পরিবারে লােক সংখ্যাকত?
‘অনেক। আমাদের যৌথ পরিবার। আমার দু‘চাচা এবং বাবা ... এরা তিন ভাই একসঙ্গে থাকেন।
‘একত্রে রান্না হয়?
‘হ্যা, এক সঙ্গে রান্না হয়। তবে আমাদের পজার চাচা কিছুদিন পরপর রাগ করে বলেন এখন থেকে তিনি আলাদা রান্নাবান্না করবেন। কারাে সঙ্গে তার কোন যােগাযােগ নেই। দু একদিন আলাদা রান্না হয় তারপর আবার আগের জায়গায় ফিরে আসেন।
আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
‘তােমাদের চাচাদের মধ্যে কি খুব মিল ?” ‘মােটেও মিল নেই। সারাক্ষণ তারা ঝগড়া করছেন, কিন্তু তারপরেও একজন অন্যজনদের ছাড়া থাকতে পারেন না। আমার মনে হয় ঝগড়া করার জন্যেই তাঁদের একসঙ্গে থাকা প্রয়ােজন। ব্যাপারটা বেশ মজার।
‘তুমিই প্রথম বাইরে পড়তে এসেছ ?”
‘তুমি যখন বিদেশে রওনা হলে তখন তােমার পরিবারের সদস্যরা কি করল।
সবাই খুব কাদল। আমার পজার চাচা পুরাে একদিন এক রাত না খেয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরে বসে ছিলেন। অনেক বুঝিয়ে–সুঝিয়ে তাকে খাওয়ান হয়।
ডাঃ ভারমান পাইপ ধরাতে ধরাতে বললেন, তােমার সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে তােমার পরিবার। তুমি এমন এক ক্লোজ পরিবার থেকে এসেছ যে পরিবারের সদস্যরা ভালবাসার কঠিন জালে তােমাকে আটকে রেখেছে। তুমি জাল ছিড়তে চাচ্ছ – পারছ না।”
‘আপনি ভুল বললেন – আমি জাল ছিড়তে চাচ্ছি না।‘ | ‘তুমি চাচ্ছি কিন্তু তােমার মন তাতে সায় দিচ্ছে না। তােমার মনে একই সঙ্গে দুটি বিপরীত ধারা কাজ করছে। একটি ধারা তােমাকে জাল কেটে বেরিয়ে আসতে বলছে, অন্যটি তা করতে দিচ্ছে না। এতে মনে প্রচণ্ড চাপ পড়ছে।
আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
এর সঙ্গে আমার দুঃস্বপ্নের সম্পর্ক কি? আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি অন্য একজনকে নিয়ে।।
‘সম্পর্ক আছে । ঐ ছেলেটিকে দেখেই তােমার জাল কেটে বেরিয়ে আসবার কথা মনে হল। তােমার মনের একটি অংশ তাতে সায় দিল না। সৃষ্টি হল প্রচণ্ড চাপের। দুঃস্বপ্নগুলি চাপের ফল, আর কিছুই না। ছেলেটিকে তােমার খুব ভাল লেগে গেছে তুমি তা স্বীকার করতে চাচ্ছি না।‘
‘ছেলেটিকে ভাল লাগার কিছু নেই।
‘আমার ধারণা আছে। তুমি তােমার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কাকে সবচে ভালবাস?
‘পজার চাচাকে।
‘চিন্তা করে দেখ তাে পজার চাচার স্বভাব–চরিত্রের সঙ্গে তােমার ঐ ছেলেটির স্বভাব চরিত্রের কোন কোন মিল আছে?
‘কোন মিল নেই। ‘ভাল করে চিন্তা কর। আমার ধারণা মিল আছে।
আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
‘পজার চাচা অকারণে হো হাে করে হাসেন। ঐ ছেলেটিও হাসে। ‘আর?” ‘এইসব নিয়ে ভাবতে আমার ভাল লাগছে না। ‘আমি যে তােমার সমস্যাটা ধরিয়ে দিয়েছি তা–কি বুঝতে পেরেছ?” | লিলিয়ান জবাব দিল না। ডাঃ ভারমন হাসলেন। লিলিয়ান বলল, আমাকে আপনি কি করতে বলেন?
‘উপদেশ চাচ্ছ?”
‘আমি তােমাকে কোন উপদেশ দেব না। তুমি কি করবে না করবে তা তোমার ব্যাপার। আমি সমস্যা ধরিয়ে দিয়েছি। সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব তােমার। কারণ সমস্যাটা তােমার, আমার নয়।
লিলিয়ান উঠে দাড়াল। ফিরে গেল অ্যাপার্টমেন্টে। প্রায় এক ঘন্টার মত চুপচাপ বিছানায় শুয়ে রইল। তারপর উঠে হাতে মুখে পানি ছিটাল। সে তার সবচে সুন্দর পােশাকটা পড়ল। অনেক সময় নিয়ে চুল আঁচড়াল। তার সম্বল অল্প কিছু ডলারের সব ক‘টা সঙ্গে নিয়ে বেরুল। সে তাহেরকে খুঁজে বের করবে। এই শহরের মেডিকেল স্কুলের একজন বিদেশী ছাত্রের ঠিকানা বের করা কঠিন হবার কথা না। তবে লিলিয়ান প্রথমে গেল ডাউন টাউনের এক ফুলের দোকানে। দশ ডলার দিয়ে সে পঁচিশটা চমৎকার গােলাপ কিনল। আধ ফোটা গোলাপ। আগুনের মত টকটকে রঙ। চিরকাল ছেলেরাই মেয়েদের জন্যে ফুল কিনেছে। মাঝে–মধ্যে নিয়মের হের ফের হলে কিছু যায় আসে না।
আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
কলিং বেল টেপার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে গেল। তাহের খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, এসাে লিলিয়ান। তার কথা বলার ভঙ্গি থেকে মনে হওয়া অস্বাভাবিক না যে সে লিলিয়ানের জন্যেই অপেক্ষা করছিল।
লিলিয়ান বলল, আমি যে এখানে আসব তা কি আপনি জানতেন? তাহের বলল, জানব কি করে – আগে তো বলনি। ‘আমাকে দেখে অবাক হন নি ?
‘আমি এত সহজে অবাক হই না। ছােটবেলায় বাবার সঙ্গে রিকশা করে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে রিকশা থেকে পড়ে গেলেন। নেমে গিয়ে দেখি মরে পড়ে আছেন। সেই থেকে অবাক হওয়া ছেড়ে দিয়েছি।‘
লিলিয়ানের চোখে–মুখে হকচকিত ভাব। তার ফর্সা কপাল ঘামছে। হাতের গােলাপগুলি নিয়েও সে বিব্রত। তাহের বলল, ফুলগুলি কি আমার জন্যে?
‘দাও আমার হাতে। তুমি বোস।
‘দাঁড়িয়ে থাকার জন্যে এসেছ?
লিলিয়ান কি বলবে বুঝতে পারছে না। সত্যি তাে সে কি জন্যে এসেছে ? কেনই বা এসেছে? সে তাকাল চারদিকে। অবিবাহিত পুরুষের ঘর। একপলকেই বোঝা যায়। টেবিলে বা দেয়ালে কোন তরুণীর ছবি নেই। এটা একটা বড় ব্যাপার। বিছানার কাছে পিন আপ পত্রিকা নেই। লিলিয়ান ক্ষীণ গলায় বলল, আমি এখন চলে যাব।
আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ
‘চলে যাবে ভাল কথা – চলে যাও। হঠাৎ করে একগাদা ফুল নিয়ে এসে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে চলে যাওয়া ভাল।
‘আপনাকে বিব্রত করার জন্যে আমি দুঃখিত।
‘আমি মােটেও বিব্রত হই নি। বিস্মিত হচ্ছি। অন্যদের বিস্ময় যেমন চোখে মুখে ফুটে উঠে আমার বেলায় তা হয় না বলেই তােমার কাছে মনে হচ্ছে আমি পুরাে ব্যাপারটা খুব সহজভাবে নিচ্ছি। আসলে তা না। আমার ঠিকানা কোথায় পেলে?
‘জোগাড় করেছি। “কেন?”
Read more
