আয়নাঘর-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর-হুমায়ূন আহমেদ

এ বিষয়ে তাহেরের মতামত কি জিজ্ঞেস করতে হবে। একটা গাছের নিচটা বাধানাে। এখানে বসে সকালের ব্রেকফাস্ট খেলে কেমন হয়? তাহেরকে বললে সে হয়ত আবার মুখ বাকিয়ে বলবে – তুমি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছ।

আয়নাঘর

লিলিয়ানের ধারণা, সে মােটেই বাড়াবাড়ি করছে না। এই যে বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে এটা কি বাড়াবাড়ি? নিশ্চয়ই বাড়াবাড়ি না। সে দেখছে মােট কত ধরনের গাছ এখানে আছে। ইস্কান্দর আলির সঙ্গে বাগানেই লিলিয়নের দেখা হল। তিনি সকালের নাশতা নিয়ে এদিকে আসছেন। এক হাতে টিফিন ক্যারিয়ার, অন্য হাতে ফ্লাস্ক | লিলিয়ানকে দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। লিলিয়ান বলল, গুড মর্নিং ! 

তিনি হাসিমুখে মাথা নাড়লেন। লিলিয়ান বাংলায় থেমে থেমে বলল, আপনি কেমন আছেন? 

ইস্কান্দর আলি থতমত খেয়ে বললেন, হৃে ভাল। এইখানে কি করেন? ‘আমি বাগান দেখছি।‘ 

‘বাগানে দেখার কিছু নাই। সাপের আড্ডা। প্রতি বছর একটা–দুইটা গরু মরে। সাপ চিনেন তো?” 

‘জ্বি, আমি সাপ চিনি। 

‘বড়ই ভয়ংকর জিনিস। চলেন উপরে যাই। নাশতা নিয়া আসছি। খিচুড়ি আর ডিমের তরকারি। গৈ–গেরাম জায়গা। কিছু পাওয়া যায় না। সব জিনিস শহর থাইক্যা আনা লাগে। অনেক খরচ পড়ে। 

লিলিয়ান সব কথা বুঝতে না পারলেও আন্দাজ করছে – এই মানুষটি বলছে ও শহর থেকে জিনিস আনতে হয় বলে টাকা বেশি লাগে। লিলিয়ান বলল, আপনি তাহেরকে বলবেন, ও টাকা দেবে।

আয়নাঘর-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

বলতেও শরম লাগে। কত টেকা সে আনছে কিছুই তাে জানি না! ‘ও যথেষ্ট টাকা–পয়সা এনেছে। আমরা বাড়িঘর ঠিক করব, টাকা লাগবে। ‘বাড়িঘর ঠিক কইরা ফয়দা কি ? কে থাকব?” ‘আমরা থাকব। আচ্ছা, আপনি বলুন তো এই গাছটার কি নাম?” ‘জলফই গাছ। 

‘আমি ঠিক করেছি আমি এবং তাহের এই গাছের নিচে বসে সকালের ব্রেকফাস্ট করব। কাউকে দিয়ে কি পরিষ্কার করিয়ে দিতে পারবেন? 

‘পারব। কিছু খরচ–বরচ লাগবে। টেকা ছাড়া কাউরে দিয়া কিছু করন যায় না। যে যুগের যে ভাও। দুনিয়া গেছে উল্টাইয়া।‘ লিলিয়ান ইস্কান্দর আলিকে নিয়ে বাগানে ঘুরছে। গাছের নাম জিজ্ঞেস করছে। অনেকগুলি নাম লিলিয়ান শিখে ফেলল – আমগাছ, তেঁতুলগাছ, বেলগাছ, কাঠালগাছ, জলফইগাছ, গাবগাছ ...। 

লিলিয়ানের খুব ভাল লাগছে। তাহেরের ঘুম না ভাঙা পর্যন্ত সে বাগানে বাগানে ঘুরল। | তাহের নাশতা খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। দুপুরের খাবার খেয়েও ঘুমুতে গেল। তার ঘুম ভাঙল বিকেলে। সে হাসিমুখে বলল, ইচ্ছা করে ঘুম স্টক করে নিয়েছি। আজ রাত জাগব। তোমাকে নিয়ে ছাদে বসে থাকব। কাল ছাদে যাওয়া হয় নি। আজ হবে। ছাদটা সুন্দর। ছাদ থেকে ব্রহ্মপুত্র পরিষ্কার দেখা যায়। ব্রহ্মপুত্র নদীতে নৌকাভ্রমণ করতে চাও? 

আয়নাঘর-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

‘চাই! ‘দেখি খােজ করে। 

তাহের হাই তুলতে তুলতে বলল, বেশি ঘুমানাের প্রবলেম কি জান? নেশা লেগে যায়। তখন শুধু ঘুমুতে ইচ্ছা করে। 

“তুমি কি আবার ঘুমুবে? 

‘বাগানে যাবে? চল বাগানে যাই। বিকেলের চা বাগানে বসে খাই। 

‘ওরে সর্বনাশ! বিকেলে বাগানে যাওয়াই যাবে না। বিকেলে সাপর খুব উত্তেজিত থাকে। বিকেলে দোতলা থেকে নিচে নামাটা হবে চরম বােকামি। বরং চল ছাদে বসে চা খাই। 

বেশ চল। 

তােমাকে আরেকটা কথা বলা দরকার। আজ রাতই কিন্তু এ বাড়িতে আমাদের শেষ রজনী। কাল ভােরে আমরা চলে যাব। তোমার যা দেখার দেখে নাও। ছবি তুলতে চাইলে ছবি তােল | ক্যামেরাটা বের কর তাে ? 

লিলিয়ানের মন খারাপ হয়ে গেল। আজই শেষ রজনী ? লিলিয়ান কিছু বলল না। ছবি তােলার ব্যাপারে তার কোন আগ্রহ দেখা গেল না। বিকেলে ছাদে চা খাওয়া হল না। কারণ ছাদের দরজার চাবি নেই। ছালাম চাবি নিয়ে এল অনেক রাতে। সেই চাবিতে তালা না খােলায় তালা ভাঙতে হল। ছাদে পাটি পেতে বিছানা করতে করতে রাত দশটার মত বেজে গেল। লিলিয়ানের খুব শখ ছিল শাড়ি পরবে।

আয়নাঘর-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

শাড়ি জোগাড় হয় নি। সে তার সবচে’ সুন্দর ড্রেসটি পরে ছাদে বসে আছে। তাহের ছালামকে বিদেয় করে ছাদে আসবে। সে আসতে খুব দেরি করছে। একা একা ছাদে বসে থাকতে লিলিয়ানের খুব খারাপ লাগছে না। বরং ভালই লাগছে। তবে আজ গত রাতের মত জোছনা হয় নি। আকাশে মেঘ। মরা জোছনা। 

তাহের ছাদে এল এগারটার দিকে। বিরক্তমুখে বলল, লিলিয়ান, ছাদের প্রগ্রামটা আধঘণ্টা পিছিয়ে দিতে হবে। আমার চাচা খবর পাঠিয়েছেন। অত্যন্ত জরুরী কি কথা না–কি এই মুহূর্তে আমাকে বলা দরকার। তার হাঁপানীর টান উঠেছে। তিনি আসতে পারছেন না। তুমি শােবার ঘরে গিয়ে বস। আমি ফিরে এসে তােমাকে নিয়ে ছাদে যাব। তারা ছাদ থেকে নেমে এল। লিলিয়ান বুঝতে পারছে তাকে একা ফেলে। তাহেরের যেতে ইচ্ছা করছে না। লিলিয়ান বলল, আমিও যাই তােমার সঙ্গে?

‘তিনি বলে দিয়েছেন আমি যেন একা যাই। তোমার ভয়ের কিছু নেই। তার বড় ছেলেটা এখানে থাকবে। 

‘আমি মােটেও ভয় পাচ্ছি না। তবে উনার ছেলে এখানে না থাকলে ভাল হয়। ছেলেটাকে আমার পছন্দ না। সারাক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকানাের ধরনটা ভাল না। 

আয়নাঘর-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

তাকানাের ধরন ঠিকই আছে। ওরা কখনো বিদেশী মেয়ে দেখে নি। তােমাকে অবাক হয়ে দেখছে। এতে যে তুমি অস্বস্তিবােধ করতে পার সেই জ্ঞান ওদের নেই। 

তাছাড়া সে থাকবে একতলায় – তুমি দু‘তলায়, অসুবিধা কি। পারবে না আধঘন্টা থাকতে?‘ 

‘পারব। ‘সিঁড়ির দরজাটা বন্ধ করে দিও। ‘আচ্ছ।” 

“আমি মােটেও দেরি করব না। কথাটা শুনব আর চলে আসব। তাদের যদি ভাল কোন শাড়ি থাকে তােমার জন্যে নিয়ে আসব। 

“থ্যাংকস। 

লিলিয়ান বিড়ি দরজা বন্ধ করে শােবার ঘরে চলে এল। তার হাতে হারিকেন। তাকে একা একা আধঘন্টা সময় কাটাতে হবে। আধঘন্টা সময় কিছুই না। দেখতে দেখতে কেটে যাবে। হিথ্রো এয়ারপোর্ট থেকে তাহের ডার্টি জোকস–এর একটা বই কিনেছে। নােংরা রসিকতা পড়তে ভাল লাগে না। তবু সময় কাটানাের জন্যে নিশ্চয়ই পড়া যায়। 

লিলিয়ান শ্বেত পাথরের টেবিলে হারিকেন নামিয়ে রাখল। হারিকেনের সম্ভবত কোন সমস্যা হয়েছে।

 

Read more

আয়নাঘর-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *