পুলিশের চাকরির কারণে বাবা রেশন পেতেন। ভাত–ডালের ব্যবস্থা হতাে। বাকি খরচ কোথেকে আসবে! পুলিশের রেশনে কাপড় দেয় না। মা’কে তাকিয়ে থাকতে হতাে তার বাবার দিকে । উনি প্রায়ই কন্যার শাড়ি কিনে পাঠাতেন।
স্বামী–স্ত্রীর নিখাদ ভালােবাসায় সংসার অতি সুখের হয় এই ধারণা ভুল। সংসার সুখের হতে হলে কিছু অর্থের অবশ্যই প্রয়ােজন হয়।
আমার মায়ের নিশ্চয়ই ইচ্ছা করত ভালাে কোনাে খাবার তার স্বামী–পুত্র কন্যাদের পাতে তুলে দিতে। তিনি কখনােই তা পারেন নি। মা’র কাছ থেকে শােনা আমাদের বাসার মেনু ছিল—
নাশতা : রুটি, পেঁপে ভাজি (আটা পুলিশের রেশনের)। লাঞ্চ : ভাত, ডাল, ডালের বড়া (ডালের বড়া বানানাের তেল
পুলিশের রেশনের)। ডিনার : ভাত, ডাল, নিমপাতা ভাজি (বাসার পেছনে বড় নিম গাছ
ছিল। আমরা সেই নিম গাছের সব পাতা ভেজে খেয়ে ফেলেছি।)।
সমস্যার এখানেই শেষ না, বাবার নিয়ম ছিল কোনাে ভিখিরি এসে যদি ভাত চায় তাকে ভাত খেতে দিতে হবে । ভিখিরিরাও এই খবর পেয়ে গিয়েছিল। প্রতি দুপুরেই তারা নিয়ম করে এসে কুয়াতলায় বসে পরম তৃপ্তিতে ভাত খেত। ভিখিরিদের খাওয়া দেখাটা আমার জন্যে খুব আনন্দের ছিল। কী তৃপ্তি করেই না তারা প্লেট চেটেপুটে খেত! দেখে মনে হতে অমৃতসম কোনাে খাদ্য খাচ্ছে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
একদিন আমি মাকে বললাম, আমিও ভিখিরিদের মতাে কুয়ার পাড়ে বসে টিনের থালায় ভাত খাব।
মা চড় দিয়ে বললেন, কী জন্যে ? কুয়ার পাড়ে বসে ভাত খেতে খুবই মজা।
মা তার ছেলের অধঃপতন দেখে রাগে–দুঃখে কেঁদেকেটে অস্থির হলেন। সব ঘটনা শােনার পর বাবা নির্দেশ দিলেন— ছেলেকে দুপুরে কুয়ার পাড়েই ভাত দেয়া হবে।
আমি তিন–চারবেলা খেয়েছি। আমি এবং আমার ছােটবােন শেফু। দাদাভাই যা করে শেফুর তাই করা চাই। কুয়ার পাড়ে স্বাদের কোনাে উনিশ বিশ না দেখে পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া হয়।
মা’র প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সংসারের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ একজন তরুণী। ছেলেমেয়েগুলি প্রচণ্ড দুষ্ট। কেউ ঘরে থাকে না। ঘরে অভাব। তরুণীর দিশাহারা হবারই কথা। সেই বয়সের একটি মেয়ের কোনাে শখই পূর্ণ হবার না। হঠাৎ হঠাৎ ছবিঘরে ছবি দেখতে যাওয়া। এ–পাড়া ও–পাড়ায় বেড়ানাে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
তিনি কখনাে তাঁর মেয়েকে নিয়ে কখনােবা আমাকে নিয়ে নিজের আনন্দে ঘুরে বেড়াতেন। মাঝে মাঝে নিতান্তই অপরিচিত বাড়িতেও ঢুকে যেতেন।
একবার বাবা খুব রাগ করলেন, কারণ মা ডিসট্রিক্ট জজ সাহেবের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। গল্পগুজব করে এসেছেন। বাবা বললেন, আয়েশা শােন, আমি নিতান্তই সাধারণ এক পুলিশের দারােগা। জজ সাহেব কত উপরের একজন মানুষ। তুমি কী মনে করে তাঁর বাড়িতে গেলে ?
মা বললেন, অসুবিধা কী? আমার স্বামী সাধারণ একজন দারােগা, কিন্তু আমার ছেলেমেয়েরা একদিন অবশ্যই জজ–ব্যারিস্টার হবে। আমি জর্জ ব্যারিস্টারের মা হিসেবে ঐ বাড়িতে গিয়েছি।
বাবা হেসে দিয়ে বললেন, তােমার যুক্তি মানলাম। তুমি যেখানে ইচ্ছা যাবে। অভাব–অনটন একেকজনের উপর একেকভাবে ক্রিয়া করে । অভাব–অনটন মা’কে যুক্তিবাদী করল। মার কাছ থেকে আমি শিখেছি লজিক। আমি বাজি রেখে বলতে পারি, লজিকে কেউ তাঁকে হারাতে পারবে না। তবে আমি কয়েকবার হারিয়েছি। মা নিশ্চয়ই পুত্রের কাছে লজিকে পরাজিত হয়ে খুশি হয়েছেন। কারণ ছাত্র এবং পুত্র এই দুইয়ের কাছে পরাজয়ে আনন্দ আছে। এই দুইয়ের বাইরে কারাে কাছে পরাজিত হওয়া দুঃখের এবং কষ্টের ব্যাপার।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
মা’কে লজিকে হারানাের গল্পটা বলি। আমি দীর্ঘদিনের সংসার ভেঙে অভিনেত্রী শাওনকে বিয়ে করলাম। মা চিন্তাই করতে পারেন নি তাঁর কোনাে ছেলে এমন কাণ্ড করবে। তিনি তাঁর ছেলেকে ত্যাগ করলেন। আমার সব ভাইবােনরাও একই কাজ করল। তাদের যুক্তি— আমি পরিবারকে ছােট করেছি, তাদেরকেও ছােট করেছি। আমার কর্মকাণ্ডে আমার ভাইবােনরা কেন ছােট হবে আমি বুঝতে পারি না। সবাই তার নিজের কর্মের জন্যে দায়ী। একজনের কর্মের দায়িত্ব অন্যজনের না।
ভাইবােনদের সঙ্গে আমি কোনাে যুক্তিতে গেলাম না। অতি যুক্তিবাদী মহিলা মার কাছে গেলাম। তিনি কঠিন গলায় বললেন, আমি কখনাে কোনােদিনও তাের বাসায় যাব না।
আমি বললাম, যুক্তিতে আসুন। কোন যুক্তিতে আমার বাসায় আসবেন না সেটা বলুন আমি শুনি। মা যুক্তি দিলেন। আমি পাল্টা যুক্তি দিলাম । মা‘কে বলতে হলাে তাের যুক্তি মানলাম। কিন্তু আমি যাব না।
মা অবশ্যি তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারেন নি। শাওনের চরম দুঃসময়ে তিনি হাসপাতালে ছুটে এলেন। শাওনের তখন খুবই খারাপ অবস্থা। তার পেটের সন্তান সাত মাসে মারা গিয়েছে। সে কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলছে, আমার লীলাবতী। লীলাবতী! সন্তানটির নাম রাখা হয়েছিল ‘লীলাবতী‘। লীলাবতীর জন্যে সে কত কিছুই না কিনেছিল!
কিছু শৈশব-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি অল্পতেই ভেঙে পড়ি। মা পাশে এসে দাঁড়াতেই অনেক সাহস পেলাম। হঠাৎ মনে হলাে, আমি তাে একা না। আমার মা আমার পাশে আছেন। এবং অবশ্যই আমার মৃত বাবাও হাসপাতালের এই ঘরেই আছেন। গভীর বেদনায় বলছেন, ‘বাছুনি বড় বেটা হুমায়ূনের পাশে কেউ নেই কেন ? কেন আমার ছেলে একা একা কাঁদবে ? আমি কি এই শিক্ষাই আমার ছেলেমেয়েদের দিয়েছি!
বাবা তাঁর সব ছেলেমেয়েকে নাম ধরে ডাকতেন— শেফু, ইকবাল, শাহীন, শুধু তাঁর বড়ছেলের জন্যে আলাদা নাম এবং বিরাট নাম— বাঙ্গুনি বড় ব্যাটা হুমায়ূন।
Read more