কিছু শৈশব-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ

আমার এবং শাওনের দুঃসময়ে দেশের এবং দেশের মানুষের যে সমবেদনা পেয়েছি তার কোনাে তুলনা নেই। আমি ধন্যশাওন ধন্যআমার ভাইবােনরা কেউ সামান্য একটা টেলিফোনও করল নাএই দুঃখবােধ আমৃত্যু আমার সঙ্গে থাকবে। 

কিছু শৈশবপরকালে আমার কন্যা লীলাবতী যখন তার চাচা এবং ফুপুদের জিজ্ঞেস করবে, আমার বাবা যখন ঘরের সব দরজাজানালা বন্ধ করে একা একা কাঁদছিল, তখন তােমরা তাকে একটা সান্ত্বনার কথা কেন বলাে নি

আমার ভাইবােনরা কি লীলাবতীর প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে

হয়তাে পারবেশিশুদের অতি সহজেই ভুলানাে যায়স্বর্গের শিশুদের ভুলানাে তাে আরাে সহজ। 

মাঘড়ি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছেমা উপহার হিসেবে বাবার কাছ থেকে একটা হাতঘড়ি পেয়েছেনআনন্দে মা আত্মহারাঘড়ি হাতে পরে তিনি লাজুক হাসি হাসছেনআমরা ছােটরা মুগ্ধআমাদের ধারণা পাশের বাড়ি নাদুদিলুতের মতাে আমরাও ধনি হয়ে গেছি। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ

মাএই বিশেষ উপহার প্রাপ্তির কারণ বাবা প্রমােশন পেয়ে পুলিশ ইন্সপেক্টর হয়েছেন। আমার ধারণা হলাে তিনি বিরাট কিছু হয়ে গেছেনআগে সাইকেলে করে অফিসে যাওয়াআসা করতেন, এখন নিশ্চয় পুলিশের জিপে যাওয়াআসা করবেনঈদ ছাড়াও আমাদের জন্যে নতুন জামা জুতা কেনা হবে 

এরকম ক্ষীণ আশাও হলাে। 

দুঃখের ব্যাপার হলাে মায়ের ঘড়ি ছাড়া আমাদের জীবনযাত্রার কোনােরকম পরিবর্তন হলাে নাসকালের নাশতা সেই আটার রুটি এবং পেঁপে ভাজিরুচি বদলের জন্যে মাঝে আটার রুটি এবং চিনি। 

কয়েকদিন আগে ব্যাংককে একটা ফাইভ স্টার হােটেলে রাত কাটিয়েছিসকালের ব্রেকফাস্ট ফ্রিবিশাল ডাইনিং হলব্রেকফাস্ট হিসেবে কত রকমের খাবারই না সেখানে থরে থরে সাজানােহঠাৎ করেই মীরাবাজারের রান্নাঘরে পিড়িতে বসে শৈশবের নাশতা খাবার দৃশ্য মনে পড়লচোখে পানি এসে যাচ্ছিলঅনেক কষ্টে চোখের পাকি সামলালাম

কিছু শৈশব-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ

ঘড়ি প্রসঙ্গে ফিরে যাইমা তার ঘড়ি অতি যত্নে গােপন এক জায়গায় লুকিয়ে রাখলেনতাঁর ভয় আমাকে নিয়েতাঁর বড়ছেলে অতি দুষ্টুসংসারের অনেক জিনিস সে নষ্ট করেছেমা ঘড়ি কোথায় রেখেছেন খুঁজে বের করতে আমার মােটেও দেরি হলাে 

এক দুপুরে মা যখন ঘুমে আমি ঘড়ি নিয়ে বের হয়ে গেলামনানান 

কায়দাকানুন করে ঘড়ির ডালা খােলা হলােপ্রায় চোখে দেখা যায় না এমন একটা স্প্রিং মাথা মাথা করছে। কী অপূর্ব দৃশ্যকৌতূহল মেটার পর ঘড়ির ডালা বন্ধ করে আগের জায়গায় রেখে দিলাম। 

সন্ধ্যাবেলা বাবা অফিস থেকে ফেরার পর মা তাকে জানালেন, ঘড়িটা চলছে না। 

বাবা অবাক হয়ে বললেন, চলবে না কেন? নতুন ঘড়িতিনি তৎক্ষণাৎ ঘড়ি নিয়ে গেলেন সারাই করতে। ঘড়ি ঠিক হয়ে বাড়ি ফিরল। কয়েকদিন পর আমি সেই ঘড়ি আবারাে নিয়ে গেলাম ঘড়ির ভেতরে স্প্রিংএর ছােটাছুটি দেখতে ইচ্ছা করল। কী অপূর্ব দৃশ্য। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ

ঘড়ি আবার নষ্ট। 

হযরত শাহজালাল (:)এর দরগার প্রবেশমুখে প্রধান ফটক।  

ঘড়ির ব্যাপারে বাবামা দুজনই হতাশ হয়ে গেলেনদুদিন পরপরই সারাই করতে পাঠানাে হচ্ছেটাকা খরচ হচ্ছে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন এই ঘড়ি আর সারানাে হবে নামা সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন, কারণ ঘড়িটার উপর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে তার মনে উঠে গিয়েছিলবাবার পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রমােশন বাতিল করে তাকে আবার আগের পােস্টে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল যেপ্রমােশন উপলক্ষে ঘড়ি সেই প্রমােনই তাে বাতিল

কিছু শৈশব-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ

পঞ্চাশ বছর পরের কথাব্যাংককের এক দোকানে শাওন কেনাকাটা করছেতার ইচ্ছা নুহাশ চলচ্চিত্রের সব স্টাফকে সে একটা করে ঘড়ি উপহার দেবেসে ঘড়ি পছন্দ করছে, আমি পাশে দাড়িয়ে আছিহঠাৎ তাকে বললাম, এই ঘড়িটা কেনাে তাে। 

শাওন বলল, এটা তাে মেয়েদের ঘড়িআমি বললাম, ঘড়িটা আমি আমার মাকে উপহার দেব। 

শাওন বলল, উনার জন্যে আরাে অনেক দামি ঘড়ি কেননা এটা তাে তেমন দামি না । 

আমি বললাম, আমার এই ঘড়িটাই দরকার। 

ঘড়িটা অবিকল আমার মায়ের প্রথম ঘড়িটার মতােযেন স্বামীর সেই ঘড়ি সন্তানের হাতে ফিরে এসেছে। 

মা এখন পল্লবীতে তার কনিষ্ঠ পুত্রের সঙ্গে থাকেনআমি উপহার তার কাছে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আম্মা ঘড়ি পছন্দ হয়েছে

তিনি বললেন, হ্যাহাতে পরেছেন ? তিনি বললেন, হ্যাআমি বললাম, ঘড়িটা কি আপনি চিনতে পেরেছেন? তিনি জবাব দিলেন নাআমি টেলিফোন রেখে দিলাম

কিছু শৈশব-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ

বড়মামা শেখ ফজলুল করিম আমার লেখক হয়ে ওঠার পেছনে বড়মামা শেখ ফজলুল করিমের কিছু ভূমিকাআছেতিনি কবিতা গান লিখতেন। কাব্যনাটক লিখতেনতাঁর লেখা নাটক আমাদেরকে দিয়ে করাতেনছবি আঁকতেনআমাদের ছবি আঁকা শেখাতেনতবে ছবির মধ্যে শুধু হাতি আঁকতে পারতেনহাতি ছাড়া অন্যকোনাে জীবজন্তু আঁকতে পারতেন নাতাঁর কথা বিশদভাবে বলা প্রয়ােজন। 

বড়মামা আমাদের সঙ্গেই থাকতেনআগেই বলেছি, তার প্রধান কাজ ছিল ক্যারাম খেলা এবং ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে ফেল করাতাঁর অপ্রধান কাজ ছিল আশেপাশের তরুণীদের প্রেমে পড়াতরুণীদের নিয়ে বিচ্ছেদমূলক গান রচনা করাএবং তাদেরকে দীর্ঘ চিঠি লেখাদীর্ঘ চিঠির বাহক আমি। ডাকপিয়নের কাজটা আমার জন্যে আনন্দময় ছিলপ্রতিবার চিঠি নিয়ে গেলে দুই পয়সা (তখন দুই পয়সার মুদ্রা ছিল), কখনাে বা একআনা পাওয়া যেত। 

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *