তিনি প্রথম চিঠি লিখলেন লায়লা খালার ছােট বােনটিকে। ইনার নাম আমার মনে নেই। এই দুইবােন আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতেন। তাদের বাবা কৃষি কর্মকর্তা ছিলেন। চিঠিটি সেই তরুণী রাগী রাগী মুখে নিল।
চিঠি পড়ে বলল, কাজল, চিঠি আনা–আনির কাজ আর কখনাে করবে না। এইসব ভালাে না। আরেকবার যদি চিঠি আন থাপ্পড় খাবে।
আমি ফিরে এলাম। বড়মামা চিঠি পাওয়ার পর তরুণী কী করল জানতে চাইল। আমি আসল ঘটনা চেপে গিয়ে বললাম, উনি খুশি হয়েছেন। বড়মামার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হলাে। তিনি তরুণীকে লেখা আরাে কিছু চিঠি আমাকে দিয়ে পাঠালেন। সেইসব চিঠি যথাস্থানে পৌছালাম না। চিঠির সঙ্গে পাওয়া পয়সা খুব কাজে এলাে।
মেয়েটির প্রতি মামার প্রেম গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে লাগল। তিনি শুরু করলেন গান লেখা । আমি মামার গানের সর্বকনিষ্ঠ শ্রোতা।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি ক্লাস টু’র
শটু কক
কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ ভবন।
ছাত্র। সেইসব গানে ভাটি অঞ্চলের এক মেয়ের কথা থাকত । যে ঘাটে বসে থাকত আউলা চুলে। তাকিয়ে থাকত উজানের দিকে।
আমি শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবির জন্যে একটা গান লিখেছিলাম—
একটা ছিল সােনার কন্যা
মেঘবরণ কেশ ভাটি অঞ্চলে ছিল
সেই কন্যার দেশ
এখন মনে হচ্ছে এই গানের বীজ বড়মামার রােপণ করা। তার ভাটি অঞ্চলের মেয়ে শ্রাবণ মেঘের দিন‘ ছবিতে মূর্ত হয়েছে। এই ছবি দেখে যেতে পারলে তার নিশ্চয়ই খুব ভালাে লাগত। বড়মামা আমাদের সঙ্গেই দীর্ঘদিন থাকলেন। সিলেট থেকে বদলি হয়ে বাবা কত না জায়গায় গিয়েছেন, বড়মামা আছেন আমাদের সঙ্গে। অতি বুদ্ধিমান একজন মানুষ তার সমস্ত মেধা দুলাভাইয়ের সংসারে শেষ করে পড়ন্ত বেলায় নিজ অঞ্চলে চলে গেলেন।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
পরম করুণাময় তার কোনাে বাসনা পূরণ না করলেও একটি বাসনা কিন্তু পূরণ করলেন। ভাটি অঞ্চলের রূপসী এক কন্যার সঙ্গে তার বিয়ে হলাে। পুরােপুরি বিয়ে না, আকদ অনুষ্ঠান। বিয়ের লেখাপড়া । শুভদিন দেখে বউ উঠিয়ে আনা হবে।
ভাটি অঞ্চলের এই মেয়েকে দেখতে অনেকের সঙ্গে আমিও গেলাম। বড়মামা আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলে দিলেন, নজর করে মেয়ে দেখবে। শুনেছি মেয়ে কালাে। এটা তাে ঠিক না। কালাে মেয়ে তাে আমি বিবাহ করব। উজ্জ্বল শ্যামলা পর্যন্ত চলে। তার নিচে চলে না।
মেয়েটিকে দেখার দৃশ্যটি এখনাে আমার চোখে ছবির মতাে ভাসছে। আমাকে একটি বিশাল বড় ঘরে নিয়ে যাওয়া হলাে । পাকা দালান। মেয়েটি পুরনাে আমলের খাটের উপর বসে আছে। মেয়েটির পেছনে প্রকাণ্ড জানালা। জানালা দিয়ে হাওর দেখা যাচ্ছে। হাওর থেকে হাওয়া আসছে। হাওয়ায় মেয়েটির চুল উড়ছে। মেয়েটি হাত দিয়ে বারবার তার চুল ঠিক করছে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
মেয়েটির একপাশে সবুজ রুমালে কী যেন বাঁধা। সে হাত ইশারা করে আমাকে ডাকল [আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। আমি অস্বস্তিতে মরে যাচ্ছি। কেন জানি খুব লজ্জাও লাগছে। আমি কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই মেয়েটি সবুজ সিল্কের রুমাল আমার হাতে তুলে দিয়ে মিষ্টি করে হাসল । আমার কাছে মনে হলাে, মেয়েটার গায়ের রঙ কালাে কিন্তু মেয়েটা তাে খুবই রূপবতী।
আমি রুমাল নিয়ে ফিরে এলাম । রুমাল খুলে সবাই হকচকিয়ে গেল । রুমালে আছে বিশটা রুপার টাকা। তখন রুপার টাকার প্রচলন ছিল। নজরানা এবং সালামি হিসেবে রুপার টাকা দেয়া হতাে। অনেকেই টাকাগুলি আমার কাছ থেকে নিয়ে সাবধানে রাখতে চাইল। আমি কিছুতেই রাজি হলাম না। প্যান্টের পকেটে সব টাকা থাকত। যেখানে যেতাম টাকার ঝনঝন শব্দ হতাে।
একসময় জোর করে টাকাগুলি আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
বিয়েতে কিছু একটা সমস্যা হয় । সমস্যার ধরন আমার কাছে পরিষ্কার না । আমার ধারণা যৌতুক বিষয়ক সমস্যা। এই লেখাটি শুরু করার সময় মার কাছে ঘটনা জানতে চেয়েছিলাম। তিনি এড়িয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, ঘটনা দুঃখজনক। যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত তারা কেউ বেঁচে নেই। কেন আর পুরনাে কষ্ট খুঁজে বের করা!
পুরনাে কষ্ট আমার খুঁজে বের করতে ইচ্ছা করছে। এই কষ্টের সঙ্গে আমার আনন্দও জড়িত। ভাটি অঞ্চলের কিশােরী একটি মেয়ে আমার হাতে সবুজ সিল্কের রুমাল তুলে দিয়েছিল। রুমালভর্তি ঝকঝকে রুপার টাকা।
আমি আরেকটি তথ্য বের করেছি। মেয়ে দেখতে কার মতাে। মেয়েটি অবিকল অভিনেত্রী শাওনের মতাে।
আচ্ছা, এটা কি প্রকৃতির কোনাে খেলা ? সে মানুষকে একই দৃশ্য বার বার দেখাতে পছন্দ করে ? কেন করে ?
আমার নানাজান শক্ত মানুষ ছিলেন। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন ততদিন কেউ তার মুখের উপর কোনাে কথা বলতে পারে নি। তার হুকুমে মেয়ে উঠিয়ে আনা হলাে না। দীর্ঘদিন এই বিয়ে ঝুলে রইল। তারপর ভেঙে গেল। আমি আমার বড়মামাকে নিয়ে একটি গল্প লিখেছি।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
যে বিয়ে বড়মামা করতে পারেন নি, লেখক হিসেবে সেই বিয়ে আমি তাকে দিয়েছি। লেখক ঈশ্বরের মতােই অকৃপণ। লেখক কালাে মেয়েকে কলমের এক খোঁচায় পৃথিবীর সেরা রূপবতীদের একজন করে দেয় । মধুর মিলনে সমাপ্তির ক্ষমতা লেখকের আছে। আমার বড়মামাকে জানার জন্যে পাঠকরা গল্পটা পড়ন।
গল্পের শিরােনাম বড়মামা এবং রাজকুমারী সুবর্ণরেখা।
বড়মামা এবং রাজকুমারী সুবর্ণরেখা আমার বড়মামা ছিলেন খুব প্রতিভাবান মানুষ। প্রতিভাবান মানুষদের সব লক্ষণ তার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল। আমরা ছােটরা তা খুব ভালাে বুঝতাম। বড়রা মােটেই বুঝত না। বড়দের ধারণা মামা হচ্ছেন মহাগাধা। এতে অবশ্যি মামা রাগ করতেন না। প্রতিভাবান মানুষরা সহজে রাগ করে না। কেউ রাগের কোনাে কথা বললে তারা হাসে। সেই হাসি হচ্ছে ক্ষমাসুন্দর হাসি।
মামাকে গাধা বললে আমরা রাগ করতাম। এই দেখে মামা আমাদের সবাইকে ডেকে ছােট্ট একটা বক্তৃতা দিয়ে দিলেন—
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
কাউকে গাধা বললে রাগ করা উচিত না, বরং খুশি হওয়া উচিত। প্রাণিজগতে গাধার স্থান অতি উচ্চে। গাধা হচ্ছে অসম্ভব বিনয়ী ও নিরহংকারী। তাকে বকাঝকা করলে সে কিছু বলবে না। নীরবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। গাধা হচ্ছে খুব পরিশ্রমী। পর্বতপ্রমাণ বােঝা পিঠে নিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাবে। গাধার অন্তরে আছে সঙ্গীতপিপাসা, যা অন্য প্রাণীদের মধ্যে কখনাে দেখা যায় না।
Read more