এই বলে রাজকুমারী ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকবেন। তখন দস্যুসর্দার ভীম নাগ খােলা তরবারি হাতে প্রবেশ করবে। আমার হচ্ছে দস্যু ভীম নাগের পার্ট।
আমি রাজকুমারীর কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াব। কর্কশ গলায় বলব— ভীম নাগ : কে তুমি কাঁদিছ বসি
বনপ্রান্তে একা বেশভূষা চমক্কার যাইতেছে দেখা। চক্ষে অশ্রু জল। কী তার কারণ অতি সত্বর করহ বর্ণন ॥
পুরােদমে রিহার্সেল শুরু হয়ে গেল। মামার উৎসাহের সীমা নেই। সবার অভিনয় দেখিয়ে দিচ্ছেন। চড় চাপড়ও মারছেন। আমার গলা যথেষ্ট কর্কশ হচ্ছে
বলে কয়েকটা চড় খেলাম। এইসব নিয়ে আমরা কখনাে মন খারাপ করি না। কারণ মামা বলেছেন, অভিনয় ছেলেখেলা নয়। চড়–থাপ্পড়, কিল–ঘুসি না খেলে। অভিনয় শেখা যায় না। বড়ই কঠিন বিদ্যা।
এক মাসের মাথায় মামা বনমানুষের মতাে হয়ে গেলেন। মাথাভর্তি চুল, মুখভর্তি দাড়ি–গোঁফ, হাতের নখ বড় বড়। গােসল করছেন না বলে সারা শরীরে এক পরত ময়লা। কাছে গেলে বিকট গন্ধ পাওয়া যায়। মামা নির্বিকার । তিনি বাসায় খাচ্ছেন না।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ
হােটেল থেকে খাবার আসছে। আমার মা দেশের বাড়িতে চিঠি লিখেছেন। আমরা ভয়ে ভয়ে আছি। চিঠি পেয়ে নানাজান চলে এলে কী হবে কে জানে! নানাজান মানুষটি ছােটখাটো হলেও ভয়ঙ্কর ধরনের। তার স্বভাব–চরিত্র দত্মসর্দার ভীম নাগের চেয়েও খারাপ। ধমক ছাড়া কোনাে কথা বলতে পারেন না। সেই ধমকও ভয়াবহ ধমক। একবার রিকশা ভাড়া নিয়ে গণ্ডগােল হওয়ায় রিকশাওলাকে ধমক দিয়েছিলেন। সেই ধমকে রিকশার সামনের চাকার টায়ার বাস্ট হয়ে গিয়েছিল ।
মা চিঠি লিখেছেন ঠিকই, তবে আমরা সবাই জানি নানাজান আসবেন না। রেলে চড়তে তার খুব ভয় । তার ধারণা রেলগাড়ি বাহন হিসেবে খেলনা ধরনের। এত বড় একটা গাড়ি দু’টা সরু লাইনের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। সামান্য বাতাস লাগলেই গাড়ি যে পড়ে যাবে এটা তাে জানা কথা।
তিনি যে ময়মনসিংহ থেকে রেলে চড়ে সিলেট আসবেন না— এটা নিশ্চিত ধরে নেয়া যায়। এত দূরের পথ হেঁটে আসাও সম্ভব নয়। কাজেই আমরা মােটামুটি নিশ্চিন্ত হয়ে রিহার্সেল দিতে লাগলাম। অভিনয়ের বেশি দেরি নেই। আমি মামার উপদেশ মতাে তেঁতুল এবং দৈ খাচ্ছি, যাতে গলা ভেঙে কর্কশ হয়ে যায়।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ
বকুল আপা চুলে তেল দেয়া বন্ধ করেছেন, কারণ চুল আলুথালু থাকতে
স্টেজ রিহার্সেলের আগের দিন নানাজান এসে উপস্থিত । তিনি ট্রেনে আসেন নি। সুনামগঞ্জ পর্যন্ত এসেছেন লঞ্চে। সেখান থেকে হেঁটে সিলেট শহরে । বাসে আসা যায়, তিনি আসেন নি। কারণ ট্রেনের মতাে বাসও তার অপছন্দ। পেট্রলের ধোঁয়া সহ্য হয় না ।
বড়মামা সালাম করবার জন্যে নানাজানের সামনে গেলেন। আমরা সবাই ধরে নিয়েছি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধমকটি এখন শুনব। তা শুনলাম না। নানাজান শান্ত গলায় বললেন, ভালাে আছিস ?
জি।
নানাজান তাঁর চামড়ার হ্যান্ডব্যাগ খুলে কাঁচি, ক্ষুর, ব্রাশ এবং সাবান বের করলেন। আগের চেয়েও শান্ত গলায় বললেন, কাছে আয়, মাথা কামিয়ে দেই। জিনিসপত্র সব সাথে করে এনেছি।
মামা সুবােধ বালকের মতাে কাছে এগিয়ে গেলেন।
নানাজান যে নাপিতের কাজে এত দক্ষ আমাদের জানা ছিল না। দশ মিনিটের মাথায় বড় মামার চুল–দাড়ি সব উড়ে গেল। মামাকে দেখাতে লাগল সন্ন্যাসী উপগুপ্তের মতাে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ
নানাজান নিজের কাজে মুগ্ধ হয়ে বললেন, ভুরু দু’টা কামিয়ে ফেলব কিনা ভাবছি। গাধাটার শাস্তি হওয়া দরকার।
মা ক্ষীণ গলায় বললেন, ভুরু কামাবার দরকার নেই বাবা। নানাজান বিমর্ষ গলায় বললেন, আচ্ছা তাহলে থাক। তিনি মামার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই বাঁদর, উঠে দাড়া। মামা উঠে দাঁড়ালেন। নানাজান বললেন, আশেপাশে পুকুর আছে ? মামা বললেন, জি আছে ।
পুকুরে চলে যা। গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকবি। ঘড়ি দেখে পাক্কা তিন ঘণ্টা থাকবি। এই তিন ঘণ্টায় গায়ের ময়লা ভিজে নরম হবে। তারপর তােকে গােসল দেব। নিজের হাতেই দেব। গােসলের সাজসরঞ্জামও সাথে নিয়ে এসেছি। নারিকেলের ছােবড়া এনেছি– ডলে চামড়াসুদ্ধ তুলে ফেলব। তারপর সােড়া দিয়ে জ্বাল দিব।
জি আচ্ছা।
কাল ভােরে আমার সঙ্গে মৈমনসিং রওনা হবি। আমরা যাব হাঁটাপথে।। লঞ্চে যাওয়া যাবে না, লঞ্চেও পেট্রলের গন্ধ ।
বড় মামা মিনমিন করে বললেন, এতটা পথ হেঁটে যাব কীভাবে?
নানাজান হুঙ্কার দিয়ে বললেন, মােটেই এতটা পথ না। মাত্র ৯৬ মাইল। ঘণ্টায় তিন মাইল করে গেলে ৩২ ঘণ্টা লাগবে। কাল ভাের ছটায় রওনা হলে ইনশাআল্লাহ পরদিন দুপুরের মধ্যে বাড়ি পৌছে যাব।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ
পথে কোথাও থামা যাবে না। এখন সামনে থেকে যা, তাের গা থেকে পাঠার গন্ধ আসছে।
মামা বিষণমুখে চলে গেলেন। মা বললেন, এতদিন পর এসেছেন, দু‘একটা দিন থাকবেন না ?
নানাজান বললেন, না গাে মা। নানান কাজকর্ম ফেলে এসেছি। গাধাটাকে বাড়িতে নিয়ে একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
কী ব্যবস্থা করবেন ? বিয়ে দিয়ে দেব। একটা ভালাে মেয়ে সন্ধানে আছে। মা বললেন, রঞ্জুর বিয়ে দেবেন, আমরা কেউ থাকব না ?
এটা কোনাে সুখের বিয়ে না । শাস্তির অংশ হিসেবে বিয়ে। ভাত রান্না হলে আমাকে ভাত দাও। খাওয়া–দাওয়া করে শাহজালাল সাহেবের মাজার জিয়ারত করতে যাব।
এতটা পথ হেঁটে এসেছেন, খাওয়া–দাওয়ার পর শুয়ে বিশ্রাম করেন।
নানাজান বললেন, মুখের উপর কথা বলবে না। মুখে মুখে কথা বলা আমার পছন্দ না। ভাত দিতে বলছি ভাত দাও।
মা তাড়াতাড়ি ভাত বাড়তে গেলেন। আমি গেলাম পুকুরপাড়ে। এই প্রচণ্ড শীতে বড়মামা গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে পুকুরে বসে আছেন। মাথা কামানাের জন্যে তাঁকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। পুকুরের চারপাশে প্রচুর লােকজন। তারা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করছে– কী হইছে ? বিষয় কী ? ও ভাইজান, আপনের হইছে কী ? মামা এইসব প্রশ্নের কোনাে জবাব দিচ্ছেন না, তবে বড়ই বিরক্ত হচ্ছেন।
এক বুড়াে লোেক এর মধ্যে বলল, মনে হয় পাগল।
অনেকেই তাতে সায় দিল। কয়েকটা কুকুরও দেখলাম খুব মজা পাচ্ছে। মামার দিকে তাকিয়ে ঘেউঘেউ করছে।
Read more