একটা সাহসী কুকুর পানিতে নেমে সাঁতরে মামার দিকে খানিকটা গিয়ে ভয় পেয়ে ফিরে এলাে। মামার জন্যে আমাদের দুঃখের সীমা রইল না । আহা বেচারা! বড়মামা আমাদের শােকসাগরে ভাসিয়ে পরদিন ভােরে ঠিক দু’টায় নানাজানের সঙ্গে হাঁটাপথে ময়মনসিংহ রওনা হয়ে গেলেন।
বকুল আপা খুব কাঁদতে লাগল । বড় মামার জন্যে তার খুব মায়া। তার ধারণা, বড় মামা হচ্ছেন একজন মহা মহা মহা পুরুষ । কিছু কিছু ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড়। কারণ রবীন্দ্রনাথ চোখ বন্ধ করে হাতির ছবি আঁকতে পারতেন না। মামা পারেন ।
পনের দিনের দিন সিলেট মেইলে মামা চলে এলেন। তাঁর মাথায় সামান্য চুল গজিয়েছে। মনে হয় এই কদিন তাকে ঘরে বন্দি থাকতে হয়েছে কারণ চেহারা ফর্সা হয়ে গেছে। দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবি। পায়ে নতুন জুতা। তবে মামার চোখ দুটি বিষন্ন।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
ঘরে ঢুকেই মা’কে কদমবুচি করতে করতে বললেন, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে বুবু! জোর করে বিয়ে করিয়ে দিয়েছে। আত্মহত্যা করব বলে ভেবেছিলাম । আত্মহত্যা হচ্ছে জীবনের কাছে পরাজয়। এই মনে করে আত্মহত্যা করি নি। তবে সম্ভাবনা পুরােপুরি উড়িয়েও দিচ্ছি না।
মা বললেন, বিয়ে হলাে কবে ? গত পরশু । বিয়ের পরদিন প্রথম সুযােগেই পালিয়ে এসেছি।
সে কী!
মামা উদাস গলায় বললেন, সংসার আমার জন্যে না বুবু। এই ক‘দিনে নতুন একটা কাব্যনাট্য লিখেছি। নাম জীবন দেবতা‘। অসাধারণ জিনিস। খাওয়া–দাওয়ার পর পড়ে শােনাব।
বউ কেমন ? জানি না কেমন। বউ দেখিস নি ? এই প্রসঙ্গটা রাখ তাে বুবু। অসহ্য লাগছে। নাম কী বউ–এর ?
জানি না । নদীর নামে নাম— সুরমা কিংবা কুশিয়ারা কিছু একটা হবে। হু। কেয়ারস ? এইসব তুচ্ছ বিষয় আমার কাছে জানতে চেয়াে না তাে।
মামা শিস দিতে দিতে নিজের ঘরের দিকে রওনা হলেন। ফিরে আসতে পেরে তার আনন্দের সীমা নেই। আমাদেরও আনন্দের সীমা নেই।
অবশ্যি এই আনন্দ পরদিন বিকেলে নিরানন্দে পরিণত হলাে। নতুন করে রিহার্সেল শুরু হলে দেখা গেল আমরা সবাই পাট ভুলে গেছি। যেভাবে যা বলার কথা সেইভাবে বলতে পারছি না। বনরক্ষক অয়ােস্কান্তের দেখা হবে রাজকুমারী সুবর্ণরেখার সঙ্গে। সে দিনহীন বেশে রাজকুমারীকে দেখে ‘একী একী হেরিলাম’ বলে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাবে। গোঁ–গোঁ শব্দ করতে থাকবে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
রিহার্সেলের সময় অয়ােস্কান্ত (পাশের বাড়ির বাবলু) অনেকগুলি ভুল করল। ‘একী একী হেরিলামের জায়গায় বলল— “একী একী দেখিলাম। ডানকাত হয়ে পড়ার কথা, পড়ল বামকাত হয়ে। গোঁ–গোঁ শব্দ করার বদলে হিক্কা তুলতে লাগল।
বড়মামার মেজাজ সপ্তমে উঠে গেল । গম্ভীর গলায় বললেন, কানে ধরে এই গাধাটাকে তুল তাে। অসহ্য লাগছে। এই ক’দিনে সব খেয়ে বসে আছিস ? যার
শাহজালাল (র:)–এর দরগা প্রাঙ্গনে বহুল আলােচিত জালালী কবুতর।
যা মনে আসছে বলে যাচ্ছিস? দেখিলাম আর হেরিলাম এক হলাে ? শব্দের অর্থ এক হলেও এই দুয়ের মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক। তােদের তাে বােঝার বুদ্ধি নেই। এত কষ্ট করে একটা জিনিস দাঁড় করিয়েছি, তােরা সব জলে ভাসিয়ে দিলি! আমার হাত–পা কামড়াতে ইচ্ছা করছে। এখন থেকে দু‘বেলা রিহার্সেল করব। পৌষ উৎসবে নামাতেই হবে। এটা শেষ হবার পর প্রহসন ধরব।
প্রহসনটা কী ?
বললে বুঝতে পারবি না। অন্য জিনিস। হাসতে হাসতে দমবন্ধ হয়ে যাবে। এই হাসির ফাঁকে ফাঁকে আছে গুরুত্বপূর্ণ সব দার্শনিক কথা। অবহেলিত শােষিত মানুষের বাণীবদ্ধ অশ্রু।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
আমরা নতুন উৎসাহে রিহার্সেল শুরু করলাম। বড়রা সবাই তাতে বিরক্ত হলেন।
বাবা রাগী রাগী গলায় বললেন, এই গদৰ্ভটাকে কানে ধরে সকাল–বিকাল দু‘বেলা উঠবােস করানাে দরকার । বাড়িতে তাে মনে হয় বাস করা যাবে না।
নানাজান দেশ থেকে চিঠি লিখলেন মা’কে।
মামার আদেশে সেই চিঠি চুরি করে মামাকে পড়তে দিলাম। আমিও পড়লাম। বড়দের চিঠি পড়ে সাধারণত কিছু বােঝা যায় না। তারা সহজ কথা সহজভাবে লিখতে পারেন না। প্যাচিয়ে লেখেন। যাই হােক, নানাজান মা‘কে লিখেছেন
মা গাে,
দোয়া পর সমাচার এই যে, কুলাঙ্গারটি এক্ষণে নিশ্চয়ই তােমার কাছে উপস্থিত হইয়াছে। আমি বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকার কারণে আসিতে পারিতেছি না। যদি পারিতাম তবে কানে ধরিয়া কুলাঙ্গারকে নিয়া আসিতাম। তাহার যে বিবাহ দিয়াছি সেই সংবাদ নিশ্চয়ই অবগত হইয়াছ। বিবাহের পরদিন অতি প্রত্যুষে সে কাহাকেও কিছু না বলিয়া চলিয়া যায়। নূতন বৌ খুব কান্নাকাটি করিয়াছে। এই অতীব সুলক্ষণা, বুদ্ধিমতী মেয়েটির দুঃখে আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত। আমি নিজেও কিঞ্চিৎ অশ্রুবর্ষণ করিয়াছি।।
যাহা হউক, এখন কী করিব বুঝিতে পারিতেছি না। আমার বর্তমান পরিকল্পনা কুলাঙ্গারটিকে কঠিন শাস্তির বিধান করা। কীভাবে তাহা করা যায় তাহাই ভাবিতেছি। শরীর ভালাে না বলিয়া কোনাে পরিকল্পনাই কার্যকর করিতে পারিতেছি না। আল্লাহ পাকের দরবারে আমার জন্যে দোয়া করিবে যাতে অতি শীঘ্রই হাঁটাচলার সামর্থ্য লাভ করি এবং কুলাঙ্গারকে শাস্তি প্রদানে সক্ষম হই। আর কী– ভালাে থাকিবে। জামাই এবং পুত্রকন্যাদের আমার দোয়া দিবে। আল্লাহ হাফেজ।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
দোয়া গাে তােমার পিতা, মােহাম্মদ ইসমাইল খা। চিঠি পড়ে মামা খানিকটা গম্ভীর হলেও খুব কাবু হলেন না।
সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, এত সহজে বিছানা থেকে উঠতে হবে না । নব্বই মাইল হেঁটে শরীরের কলকজা উল্টেপাল্টে গেছে। ঝাড়া দু‘মাস বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে— আপাতত ভয়ের কিছু দেখছি না।
যেদিন আমাদের নাটক হবার কথা সেদিন ভােরবেলায় আমাদের নতুন মামি এসে উপস্থিত। তাঁকে দেখে আমাদের বিস্ময়ের সীমা রইল না। কী সুন্দর! কী সুন্দর! রাজকুমারী সুবর্ণরেখা’র চেয়েও একশ গুণ সুন্দর। আর মুখে সারাক্ষণ হাসি। যাই শুনছে তাতেই হাসছে। অবশ্যি আমার মাকে জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ খুব কাঁদলেন ।
মাও কাদলেন।
আমরা জানলাম, নতুন মামি আমাদের সঙ্গেই থাকবেন । মেয়েদের কলেজে তাকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হবে। তিনিও নাকি আগামী বছর আইএ পরীক্ষা দেবেন। মামা আমাকে ডেকে বললেন, গভীর ষড়যন্ত্র যে চলছে তা বুঝতে পারছিস ?
না।
গভীর চক্রান্ত। আমাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা। ওরা কি ভেবেছে আমি ঘাস খাই ? আমার সঙ্গে চালাকি ? তুই যা তাের মামিকে বলে আয় সে যেন ভুলেও আমার ঘরে না আসে।
এলে কী হবে মামা ?
আমার চিন্তা–ভাবনার অসুবিধা হবে।
Read more