কিছু শৈশব-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

বিশেষ কোনাে একটা বড় মাছের নাম বলুনআমার সবচেপছন্দ ছােট মাছএইটা কী কথা বললেন ? কোনাে একটা বড় মাছের নাম বলেনবাবা অনেক ভেবে টেবে বললেন, বােয়ালবােয়াল মাছ তাে আপনাকে খাওয়াতে পারব নাবােয়াল জাতের মাছ নাজাতের মাছের নাম বলেন । রুই, কাতল, চিতলের মধ্যে বলেন। 

কিছু শৈশবরুই মাছ। আলহামদুলিল্লাহ। 

তিনি উঠে গেছেন। মাছ হাটায় লােক চলে গেল সবচেবড় রুই যেন চলে আসে । 

খাবার সময় জামাইয়ের পাতে তুলে দেয়া হবে মাছের মাথারুই মাছের অন্য কোনাে অংশ নাএকই মাছ দিয়ে তিনচার পদ হবে নাভাজা হবে অন্য কোনাে মাছ, সালুন হবে আরেক পদের মাছেরমাছের পদ হবে আট দশ রকমেরতারপর আসবে মুরগির কোরমা, ক্ষেত্রবিশেষে খাসির মাংসগরুর মাংস কখনাে নাগরুর মাংস জাতের মাংস নাজামাইয়ের পাতে গরুর মাংস দেয়া জামাইকে অপমান করার মতাে অপরাধ। 

জামাইয়ের পাতে তিনচারজন খেদমতগার যে পরিমাণ খাবার তুলে দিত তা দেখলে গামা পালােয়ানও ভিরমি খেতেন। 

বাবা ছিলেন স্বল্পাহারী মানুষদুই চামচ ভাত, ভর্তা, ছােট মাছের সালুনে তাঁর খাওয়া সীমাবদ্ধশ্বশুরবাড়িতে এই মানুষটার কী অবস্থাই না হতাে

কিছু শৈশব-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

আজকালকার জামাইরা বঞ্চিতজামাই আদরের তারা কিছুই দেখে না বলে বিশ্বাসএখনকার জামাইকে আদর করার মতাে সময় শ্বশুরশাশুড়িইবা 

কোথায় ? জামাইরাও সেরকমশ্বশুরশাশুড়িকে বাবামা ডাকে না বললেই হয়হু হা বলে কোনােমতে চালিয়ে নেয়া । 

এক মদের আসরে শ্বশুরজামাইকে একসাথে মদ্যপানও করতে দেখেছিআধুনিক জামাই, তারচেয়েও আধুনিক শ্বশুর, কী করা যাবে

পুরনাে প্রসঙ্গে ফিরে যাইনানাজানের বেড়াতে আসা আমাদের কাছে ছিল ঈদের দিনের আনন্দের চেয়েও অনেকগুণ বেশি আনন্দেরঈদ একদিনেই শেষনানাজানেরটা একদিনেই শেষ না। তিনি যতদিন থাকবেন ততদিনই ঈদকারণ— 

. তিনি শাহজালাল সাহেবের মাজারে বেশ কয়েকবার যাবেন, প্রতিবারই 

নাতিনাতনিদের নিয়ে যাবেনহালুয়া কিনে দেবেনমাজার শরীফের সেই হালুয়া কত না স্বাদেরবিশ গজ দূর থেকেও ঘিয়ের গন্ধ পাওয়া যায়তিনি আমাদের দেখাতে নিয়ে যাবেন মাজারের শিন্নি রান্নার পাতিলপাতিলের ভেতরটা যেন দেখতে পারি সে জন্যে আমাকে উঁচু করে ধরে রাখবেনপাতিলের ভেতর দেখার কিছু নেই বলে ধমক দেবেন নাতিনি যতবার বাসা থেকে বের হবেন আমাদের সাথে নেবেনতাঁর সাথে কত কী দেখেছিআলী আমজাদের ঘড়িলােহার পুলযেদিন আমাদের সঙ্গে নিতেন না সেদিন ফেরার সময় কিছু না কিছু নাতিনাতনিদের জন্যে আনবেনবাইরে থেকে খালি হাতে ফেরার 

কিছু শৈশব-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

মানুষ তিনি না. তিনি খেতে বসবেন নাতিনাতনিদের দুপাশে নিয়েখাওয়ার মেনু 

উন্নতডাল, ডালের বড়া নানানাজান তাঁর মেয়ের আর্থিক সামর্থ্যের কথা জানেনতিনি সেই প্রস্তুতি নিয়েই আসেনপ্রায়ই বাজারে যান, | প্রচুর কেনাকাটা করেন. তিনি মজলিশি মানুষ ছিলেননাতিনাতনীদের সঙ্গে নানা মজার 

মজার গল্প করেন, তিনি উপস্থিত থাকা অবস্থায় মা কখনাে আমাদের বকাঝকা করেন 

বড় অপরাধেও নাসন্ধ্যাবেলা পড়তে না বসলেও কিছু বলেন 

নানাজান বছরে একবার বড় মেয়েকে না দেখে থাকতে পারেন নাকাজেই প্রতি বছর আমাদের ভেতর আনন্দের ঝড় তুলতে তিনি উপস্থিত হনতিনি চলে 

যাবার সময় আমরা কাঁদতে কাঁদতে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাঁর রিকশার পেছনে দৌড়াইএখন দাদাজান প্রসঙ্গতিনি একবার মাত্র সিলেট এসেছিলেনদীর্ঘদেহী গৌরবর্ণের একজন সুফি সাধক টাইপ মৌলানামুখভর্তি ধবধবে সাদা দাড়িপায়জামা সাদা, পাঞ্জাবি সাদাসেই পাঞ্জাবির ঝুল মাটি স্পর্শ করে করে অবস্থা। 

তিনি বেশকিছু দিন থাকবেনআমার মা তটস্থ কোনাে কিছুতে যদি শ্বশুরের অমর্যাদা হয়! মাদেখাদেখি আমরাও তটস্থআমাদের উপর হুকুম জারি হয়েছে, দাদাজান যতক্ষণ ইবাদত বন্দেগি করবেন ততক্ষণ আমরা কোনাে শব্দ করতে পারব নাকথাবার্তা বলতে হবে নিচু গলায়সমস্যা হচ্ছে, উনি সারাক্ষণই ইবাদত বন্দেগি করেননামাজ পড়ছেন তাে পড়ছেনইনামাজ শেষ হলে তসবি। সেই তসবি টানা চলতেই থাকে। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

একদুই দিন পর পর উনি শাহজালাল সাহেবের দরগায় গেলেন, কিন্তু আমাদের কাউকে নিলেন নাতিনি দশপনেরাে মিনিটের জন্যে যান না, তিনি সেখানে দীর্ঘ সময় কাটানশিশুদের নেয়া মানে যন্ত্রণাদাদাজানের সঙ্গে গিয়ে হালুয়া খাওয়া হলাে না। 

তিনি যে আমাদের সঙ্গে গল্প করেন না তানাসবাইকে ডেকে গল্প বলেনসব গল্পই উপদেশমূলকশেখার কিছু থাকেগল্প শেষ করেই তিনি প্রশ্ন করেন, এই গল্প থেকে কী শিখলা বলাে দেখি

আমি প্রায় সময়ই বিরক্ত হয়ে বলি, কিছুই শিখি নাইতিনি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেনমাগরেবের নামাজের সময় তার সঙ্গে আমাকে মসজিদে যেতে হয়। নামাজ জানি না তাতে কীঅভ্যাস থােক। 

মসজিদ থেকে ফিরেই বই নিয়ে তার সামনে বসতে হয়তিনি পড়া জিজ্ঞেস করেনকঠিন শিক্ষক । 

একদিন তার বিশাল পাঞ্জাবির একটা চুরি হয়ে গেলচোর জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে পাঞ্জাবি নিয়ে গেলআমরা খুশিদাদাজানের একটা ক্ষতি তাে হলাে। আমার মা রসিকতা করে বলে বসলেন, বাবা, আপনার পাঞ্জাবি নিয়ে চোর তাে বিরাট বিপদে পড়েছে। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

দাদাজান বললেন, কথাটা তাে মা বুঝলাম না। 

মা বললেন, এত বড় পাঞ্জাবি চোর পরতেও পারবে নাকাউকে দিতেও পারবে নাকারাে গায়ে লাগবে নাঅর্ধেক মাটিতে পড়ে থাকবে। 

দাদাজান গম্ভীর হয়ে গেলেন

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(২৩)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *