কিছু শৈশব-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি আজ আর কিছুতেই থাকিব নালােকের কাছে কী করিয়া মুখ দেখাইব ? হাসনেবাবু, জয়নাব, সাহরে বানু এই তিনজনই আজ আমার নাম করিয়া অনেক কথা কহিয়াছে

কিছু শৈশবদূর হইতে তাহাদের অঙ্গভঙ্গি মুখের ভাব দেখিয়াই আমি জানিয়াছি যে সকলেই সকল কথা জানিয়াছেদাদির গুডবুকে আমার নাম উঠে গেলএখন আমার দুষ্টমী তিনি দেখেও দেখেন নাএকদিন কী এক অপরাধে মা আমাকে মারছেন, দাদি চিলের মতাে উড়ে এলেনমাহাত থেকে হ্যাচকা টান দিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, বৌমা, তুমি তাে আদব কায়দা কিছুই শেখ নাই শাশুড়ির সামনে হাত চালাইতেছলজ্জা নাই ? আর যেন এই জিনিস না দেখি । 

প্রায়ই মনে হয়ইশ, আমার দাদিকে আমি যদি আমার নিজের লেখা একটা বই পড়ে শােনাতে পারতাম! বৃদ্ধা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছেনগভীর আগ্রহে শুনছেনচোখের পানি ফেলছেনকী অসাধারণ ব্যাপারই না হতাে! পরকালে কি দাদির দেখা পাব ? সেখানে কি আমার লেখা কোনাে বই থাকবে ? আমি তাঁকে পড়ে শােনাতে পারব ? বড় ইচ্ছা করে। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

পৃথিবীর সবচেবড় পৃথিবীর সবচেবড় ঘড়ি কোনটা ? পৃথিবীর সবচে বড় ডেগ (পাতিল) কোথায় আছে এবং কত বড় ? পৃথিবীর সবচে বড় মাছের নাম কী ? সেই মাছ কোন দেশে পাওয়া যায় ? পৃথিবীর সবচেবড় লােহার ব্রিজটা কোথায় ? পৃথিবীর কোন দেশে সােনার মাছ পাওয়া যায়

অনেকদিন পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল সবই সিলেট শহরেপৃথিবীর সবচেবড় ঘড়ি আলী আমজাদের ঘড়িআমি যখন ছােট, এই ঘড়িটা চলতআমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতাম ঘড়ির মিনিটের কাঁটার ঘূর্ণন বােঝা যায় কি 

এটা বােঝার জন্যেআমাকে ঘড়ি দেখে সময় বলা শেখানাে হয় এই ঘড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে যিনি আমাকে শেখান তিনি আমার ছােট চাচা, নাম আজিজুর রহমান আহমেদআমি চাচাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, চাচা, এটা কি পৃথিবীর সবচে বড় ঘড়ি ? চাচা সঙ্গে সঙ্গে বলেছেন, অবশ্যই। 

পৃথিবীর সবচে বড় পাতিল শাহজালাল সাহেবের দরগায়; এমন ধারণাও ছিল ডেগে টাকাপয়সা ফেলার রেওয়াজ ছিলএখনাে নিশ্চয়ই আছেটাকা পয়সা ফেলার জন্যে আমাকে অনেক উপরে তােলা হতােপ্রতিবারই মনে হতাে, এত বড়

কিছু শৈশব-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

শৈশবে ধরেই নিয়েছিলাম, পৃথিবীর সবচেবড় মাছ দরগার গজার মাছনীলতিমি অবশ্যই নাআমাকে বলা হয়েছিল গজার মাছগুলাে আসলে মাছ না, অভিশপ্ত জ্বিনগজার মাছ মারা গেলে তাদের নাকি যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে কবর দেয়া হয়

শাহজালাল (.) সাহেবের দরগায় সােনার মাছ ছিলকুয়াভর্তি সােনালি রঙের মাগুর, কৈ মাছতাদের গায়ের হলুদ রঙ ঝকমক করতযে কুয়ায় এই মাছগুলাে থাকত সেই কুয়ার সঙ্গে নাকি যােগাযােগ ছিল মক্কা শরিফের আবে জমজমেরসােনার মাছভর্তি কুয়ার পানি ছােটবেলায় ভক্তিভরে খেয়েছি

সােনার মাছগুলাের কী হলাে? মাছের এমন অপূর্ব সােনা রঙের কারণটাইবা কী ? প্রাণী বিজ্ঞানীরা কী বলেন? ঐগুলাে কি বিশেষ কোনাে প্রজাতির মাছ ছিল

পৃথিবীর সবচেবড় লােহার ব্রিজটা অবশ্যই সুরমা নদীর উপরের লােহার ব্রিজ, কীন ব্রিজ। 

আরেকটা বাদ পড়ে গেলপৃথিবীর সবচে বড় লাইব্রেরি কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের লাইব্রেরি প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার লাইবেরিও না, ব্রিটিশ মিউজিয়ামও না। 

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শহর কোনটা

কিছু শৈশব-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

অবশ্যই সিলেট শহর। শৈশবে তাই মনে করতাম, এখনাে করিসিলেটে যতবার যাই, শান্তি শান্তি ভাব হয়আমার ছােট ভাই জাফর ইকবাল সিলেটকে তার কর্মস্থল হিসেবে এই কারণেই কি বেছে নিয়েছে ? সম্ভাবনা যে একেবারেই নেই তানা । 

আমার ছােট চাচা তাে সিলেটেই জীবন কাটিয়ে দিলেনবাবার সঙ্গে সিলেট শহরে গিয়েছিলেন একসময়, বাবা বদলি হয়ে দিনাজপুর চলে গেলেনছােট চাচা সিলেটের মায়া কাটাতে পারলেন না, সেখানেই থেকে গেলেনছােট একটা লাইব্রেরি করলেনদুঃখেকষ্টে জীবন পার করলেনমৃত্যুর পর তাঁকে ময়মনসিংহে পারিবারিক গােরস্থানে কবর দেয়ার প্রস্তাব উঠল সেটা করা গেল 

কারণ চাচা তাঁর শেষ ইচ্ছায় বলেছেন, তাঁর কবর যেন এই পবিত্র শহরেই হয়। 

তাকে সিলেটেই কবর দেয়া হয়েছে।  

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *