নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

 আমার দাদাজান সেই আমলে লাখপতি হয়ে বাড়ি বানিয়েছিলেন, তারপর অপঘাতে মারা গেলেনঅবস্থা পড়ে গেলএই বাড়িটা ছাড়া এখন আমাদের আর কিছুই নাইবাড়িটাও হয়েছে বাসের অযােগ্যআমি নীচের তিনটা ঘরে থাকিউপরটা তালাবন্ধ থাকে

নীল অপরাজিতাআপনার জন্যে উপরের একটা ঘর ঠিক ঠাক করে রেখেছি। বাড়ির চারদিকে কি এক সময় কদম গাছ ছিলজ্বি নাএকটা কদম গাছ বাড়ির সামনে ছিলতিন বছর আগে গাছের উপর বজ্রপাত হলচলুন স্যার আপনার ঘরটা দেখিয়ে দেই। 

চলুনসিড়িতে সাবধানে পা ফেলবেনমাঝে মধ্যে ভাঙ্গা আছেবাথরুম আছে তােজ্বি আছেবাথরুম আছে, আপনার ঘরের সাথেই আছেখাবার পানি কোখেকে আনেন? নদীর পানি ?” জ্বি নাটিউব ওয়েল আছেবজলুর রহমান সাহেব চিঠিতে জানিয়েছেন আপনাকে পানি ফুটিয়ে দিতেপানি ফুটিয়ে বােতলে ভরে রেখেছি। 

ভাল করেছেনস্যার আপনি কি গােসল করবেন? গােসলের পানি গরম করে দেব? পানি গরম করতে হবে নাঠাণ্ডা পানিতেই গােসল করব। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা স্যার আমার এখানে করেছিদরিদ্র অবস্থায় যা পারি সামান্য আয়ােজন। 

মােফাজ্জল করিম সাহেব, কিছু মনে করবেন না আপনাকে একটা কথা বলি, আপনি একজন বাবুর্চির ব্যবস্থা করুনযে আমার জন্যে রান্না করবেআমি টাকা দিয়ে দেব” 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

তা কি করে হয়?” 

তাই হতে হবেআমি তাে বজলুর রহমান সাহেবকে বলেছিলাম আপনাকে এই ভাবে চিঠি দিতেচিঠি দেন নি। জ্বি না, এইসব কিছু তাে লিখেন নাই। উনি আমাকে বলেছেন, বাবুর্চির ব্যবস্থা হয়েছে, আমি তাই মনে করে এসেছিনয়ত আসতাম না। 

আপনি একজন অতি বিশিষ্ট ব্যক্তিআপনার সামান্য সেবা করার সুযােগ পাওয়াতাে স্যার ভাগ্যের কথা : ভাই আপনাকে যা করতে বলছি করুন। 

রাতে মােফাজ্জল করিম সাহেব, শওকত সাহেবকে খাবার জন্যে ডাকতে এলেননীচু গলায় বললেন, বাবুর্চির ব্যবস্থা স্যার কাল পরশুর মধ্যে করে ফেলবঅজ পড়া গাঁ জায়গাবাবুর্চিতা পাওয়া যাবে নাএকটা মেয়েটেয়ে জোগাড় করতে হবেআজ গরীবখানায় সামান্য আয়ােজন করেছি। 

শওকত সাহেব বললেন, আপনি একটা কাজ করুন, খাবারটা এখানে পাঠিয়ে দিন। কিছু বিশিষ্ট লােককে দাওয়াত করেছিলাম স্যারহেড মাস্টার সাহেব, ময়নাতলা থানার ওসি সাহেবও এসেছেনময়নাতলা থানার ওসি সাহেব বিশিষ্ট ভদ্রলােকসাহিত্য অনুরাগী। 

আমি এখন আর নীচে নামব নাআপনি কিছু মনে করবেন নাস্যার উনারা আগ্রহ নিয়ে এসেছিলেনঅন্য কোন এক সময় তাঁদের সঙ্গে কথা বলব। 

মােফাজ্জল করিম সাহেব খুবই অপ্রস্তুত মুখ করে নীচে নেমে গেলেনপ্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উঠে এলেনশওকত সাহেব বললেন, কি ব্যাপার

স্যার আপনার বােতলটা এসে পৌঁচেছেএই যে স্যার বােতলটেবিলের উপর রেখে দিনআপনার খাবার কি স্যার নিয়ে আসব?’ অতিথিরা চলে যাকতারপর আনবেনআমি বেশ রাত করে খাইযদি সম্ভব হয় এক কাপ চা পাঠাবেন। জি আচ্ছাচিনি বেশী করে দিতে বলবেনআমি চিনি বেশী খাইজ্বি আচ্ছা। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রথম দর্শনে বাড়িটা যত খারাপ লেগেছিল এখন তা লাগছে নাভাল লাগছে। শুধু ভাল নাবেশ ভাল লাগছেতিনি বসে আছেন বারান্দায়বারান্দায় এই অংশে রেলিং আছে বলে বসে থাকতে কোন রকম অস্বস্তি বােধ করছেন নাতাঁর সামনে গােল টেবিলটেবিলের উপর কুরুশ কাঁটার টেবিল ক্লথ। টেবিলের ঠিক মাঝখানে ফুলদানীতে চাঁপা ফুলমিষ্টি গন্ধআসছে সেখান থেকেবৃষ্টি থেমে আকাশ পরিষ্কার হওয়ায় অসংখ্য তারা ফুটেছেঢাকার আকাশে তিনি কোনদিন এত তারা দেখেন নিআকাশের তারার 

চেয়েও তাঁকে মুগ্ধ করেছে জোনাকী পােকামনে হচ্ছে হাজার হাজার জোনাকী ঝাক বেঁধে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছেদৃশ্যটা এত সুন্দর যে মহাকবি বজলুর রহমানের মত চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা করে পাগল হয়ে যাব। 

চাঁদ উঠেছেচাঁদের আলােয় দূরের নদী দেখা যাচ্ছে অস্পষ্টভাবেচাঁদের আলাে ঘােলাটে নয়, পরিষ্কারএই আলােয় কেমন যেন জল জল ভাব আছে। 

সবচে যা তাঁকে বিস্মিত করল তা হচ্ছে নীরবতাকোন রকম শব্দ নেইঘরে একটা তক্ষক আছেতক্ষকটা মাঝে মাঝে ডাকছেশব্দ বলতে এইতিনি ভেবেছিলেন, যেহেতু বর্ষাকাল চারদিকে অসংখ্য ব্যাঙ ডাকবেতা ডাকছে নাএই অঞ্চলে কি ব্যাঙ নেই

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

মােফাজ্জল করিম সাহেব হাতে কেরােসিনের টেবিল ল্যাম্প নিয়ে উঠে এসেছেনল্যম্পটা বেশ বড়কাঁচের চিমনী ঝকঝকে পরিষ্কারপ্রচুর আলাে আসছে। 

স্যার ওসি সাহেব, আপনার জন্য টেবিল ল্যাম্পটা পাঠিয়েছেনআপনি নিশ্চয়ই রাতে লেখালেখি করবেনহারিকেনের আলাে কমটেবিল ল্যাম্প 

আপনার ঘরে দিয়ে আসি?” 

জি দিয়ে আসুনআপনার চা একবার বানিয়েছিল তিতা হয়ে গেছেআবার বানাচ্ছে। ঠিক আছেকোন তাড়া নেই। আচ্ছা করিম সাহেব আপনাদের এদিকে ব্যাঙ ডাকে না?” 

ডাকে তােডাকবে না কেন? ব্যাঙের ডাকে ঘুমাতে পারি না এই অবস্থাআমি কিন্তু এখন পর্যন্ত শুনিনিতাই নাকিবলেন কি

শওকত সাহেব হেসে বললেন, ব্যাঙ না ডাকার জন্যে আপনাকে খুব লজ্জিত বলে মনে হচ্ছে

মােফাজ্জল করিম কি বলবেন ভেবে পেলেন নাব্যাঙ না ডাকায় তার আসলেই খারাপ লাগছেশহর থেকে এসেছেন লেখক মানুষব্যঙের ডাক, ঝিঝির ডাক এইসব শুনতে চান। 

স্যার, একটা হারিকেন কি বাইরে দিয়ে যাব? অন্ধকারে বসে আছেনঅসুবিধা নেই অন্ধকার দেখতেই বসেছিআলাে নিয়ে এলে তাে আর অন্ধকার যাবে নাতাই না

অবশ্যই স্যারঅবশ্যইআলাে থাকলে অন্ধকার কি করে দেখা যাবে

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *