নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

নীল অপরাজিতা

থার্মোমিটার পাওয়া গেলদেখা গেল জ্বর সত্যি সত্যি একশ দুইশওকত সাহেব বললেন, ভবেশ বাবু আপনি ভাল চিকিৎসক। 

এই কথাটা স্যার আপনি কাগজে লিখে দিয়ে নাম সই করে যাবেনসার্টিফিকেটের মত সাথে রাখব। 

পুষ্প বলল, আরাে পানি ঢালবেন চাচা

ভবেশ বাবু বললেন, অবশ্যই পানি জ্বর ধুইয়া নিয়ে যাইতেছেসেই সঙ্গে রােগের যে বিষ ছিল সেই বিষ। 

ভবেশ বাবুআজ্ঞে স্যারআপনাদের এখানে যে নদী আছে তার নাম কি

নদীর নাম সােহাগীআমিতাে জানতাম ছােটগাঙআগে তাই ছিল বজলুর রহমান বলে এক পাগল কিসিমের লােক নাম 

বদলায়ে দিল। 

কি ভাবে বদলালাে?” 

মজার ইতিহাসসভা মিছিল করে একটা হুলুস্থুল করেছেনরােজ সকালে উঠে নদীর ধার দিয়ে দৌড়াতেন আর চিৎকার করতেন সােহাগী, সােহাগী, সােহাগীস্কুলে ছাত্রদের গিয়ে বলেছেন তােমরা এই নাম চারদিকে ছড়ায়ে দিবেতারপর আপনের গান বাঁধলেন সােহাগী নাম দিয়ে

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

গানের লাইন মনে আছে? আজ্ঞে প্রথম কয়েকটা চরণ আছেবলুনতাে দেখিনদী তাের কানে আমি চুপে বলিলাম। 

সােহাগী তাের নামরে নদী, সােহাগী তাের নামএখন সবাই কি নদীটাকে এই নামেই ডাকে?জি ডাকেসবাই ডাকে।। 

শওকত সাহেব ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন আসলে সবাই বােধ হয় মনে মনে চাচ্ছিল এই নদীর সুন্দর একটা নাম হােকযেই মুহূর্তে নাম পাওয়া গেল সবাই সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করল। 

| ভবেশ বাবু বললেন, আর জল ঢালতে হবে না বলে মনে হয়জ্বর আরাে কমেছেএখন জ্বর হচ্ছে একশ একপুষ্প মা, থার্মোমিটারটা দিয়ে দেখতাে ঠিক বললাম কিনা। 

শওকত সাহেব বললেন, দেখতে হবে নাআপনার কথা বিশ্বাস করলামআজ্ঞে নাপরীক্ষা হয়ে যাকপরীক্ষা করা হল। জ্বর ঠিকই একশ এক। 

রুগীকে এখন ঘুমাইতে হবেপুষ্প মা, রুগীকে একা কইরা দাওকেউ থাকলেই রুগী কথা বলবােঘুম হবে না। 

তারা বের হয়ে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শওকত সাহেব ঘুমিয়ে পড়লেনঘুম ভাঙ্গল রাত এগারােটার দিকেচোখ মেলেই দেখলেন বিছনার পাশে পুষ্প বসে আছেএকটু দূরে চেয়ারে পা তুলে মােফাজ্জল করিম সাহেব বসে আছেনতার মুখ ভয়ে পাংশু বর্ণ। 

মােফাজ্জল করিম সাহেব বললেন, স্যার আপনার শরীর এখন কেমন

ভালশরীর ভালআমি আপনাদের দারুণ উদ্বেগে রেখেছি দয়া করে ক্ষমা করবেন। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

কিছু খাবেন স্যার? খাওয়ার রুচি হয়েছে?” 

নাতবে একেবারে খালি পেটে থাকা বােধ হয় ঠিক হবে নাএক গ্লাস দুধখেতে পারি। 

এশার নামাজ শেষ করে করিম সাহেব খেতে বসলেন। 

পুষ্পও বসল তার সঙ্গেকরিম সাহেব বললেন, তাের উপর দিয়ে আজ খুব ঝামেলা গেছেপুষ্প কিছু বলল না। 

ভবেশ বাবুকে বুদ্ধি করে খবর দিয়ে খুব ভাল কাজ করেছিস মাভবেশ বাবু চিকিৎসা কিছু জানেন নাকিন্তু এরা প্রাচীন মানুষ অনেক টোটকা ফোটকা জানেনসময়মত পানি না ঢাললে অবস্থা হয়ত আরাে খারাপ হততুইতাে কিছু খাচ্ছিস না মা। 

আমার খেতে ভাল লাগছে নাতাের আবার জ্বর আসেনিতাে? দেখি বাঁ হাতটা আমার কপালে ছোঁয়াতেজ্বর নেই বাবানা থাকুক ছোঁয়াতে বলেছি ছোঁয়া। 

পুষ্প বাবার কপালে হাত রাখলকরিম সাহেব বললেন, হাততাে সােহাগী নদীর পানির মত ঠাণ্ডা। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

বলেছিলাম তাে, জ্বর নাই। 

তাই দেখছিএদিকে আরেক কাণ্ড হয়েছে উনার আসার খবর দিকে দিকে রটে গিয়েছেকলমাকান্দার সার্কেল অফিসার চিঠি দিয়ে লােক পাঠালেন উনাকে নিয়ে তাঁর বাসায় যেন এক কাপ চা খেতে যাইআমি বলেছি ঠিক আছে” 

নিজ থেকে ঠিক আছে বললে কি জন্যে উনিতাে যাবেন না তুমি জানােই। 

যেতেও পারেএরা ঘন ঘন মত বদলায় কাল সকালেই হয়ত বলবেন, করিম সাহেব এক জায়গায় বসে থাকতেতে আর ভাল লাগছে নাচলুন একটু ঘুরা ফেরা করি। 

কোনদিনও এই কথা বলবেন নামাঝখানে তুমি অপমান হবে। 

আমাদের স্কুলের সেক্রেটারীর বাসায়ও গিয়েছিলাম বললাম উনার কথামহামূর্খ নামও শুনে নাইযাইহােক বললাম তরফদার সাহেব একটি সম্বর্ধনা স্কুলের তরফ থেকেতাে দেয়া লাগেউনি বলেন সম্বর্ধনা দিয়ে কি 

হবে? মন্ত্রী টস্ত্রী হলে সাহায্য পাওয়ার ব্যাপার ছিলমূখের কথাবার্তা আর কিযাই হােক শেষকালে রাজি হয়েছেন। তিনশ টাকা সংস্থান করেছেনএকটা হাতে লেখা মানপত্র দেয়া হবেস্কুলের সব টিচাররা মিলে উনাকে নিয়ে চাটা খাবেএক কাপ চা, সিঙ্গারা, মিষ্টি আর ধর একটা করে কলা

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ 

তােমাদের স্কুলের অর্ধেকটা উড়িয়ে নিয়ে গেছে ঝড়ে আর তােমরা উনার সম্বর্ধনায় পয়সা খরচ করবে

স্কুল উড়িয়ে নিয়ে গেছেআবার হবে উনাকে পাব কোথায়

খাওয়া শেষ করে করিম সাহেব কুয়াতলায় হাত ধুতে গেলেনপেছনে পেছনে পুষ্পও এলাে চাঁদ উঠেছেচাঁদের আলােয় আবছা করে সব দেখা যাচ্ছেপুষ্প থালাবাসন ধুচ্ছে করিম সাহেব একটু দূরে বসে সিগারেট টানতে টানতে মেয়েকে দেখছেনতাঁর বড় মায়া লাগছেমেয়েটা কষ্টে পড়ে গেছেএকা কত কি দেখতে হচ্ছেমতির মাকে কাল যে ভাবেই হােক জোগাড় করতে হবে। 

পুষ্পজি বাবা। 

কয়েকজন গ্রাম্য গাতককে খবর দেয়া দরকারসন্ধ্যাবেলা একদিন এইখানে একদিন আসর করলে, উনি খুব পছন্দ করবেন। 

উনাকে না জিজ্ঞেস করে কিছুই করাে না বাবা। 

‘জিজ্ঞেস করেই করবআমাদের কত বড় সৌভাগ্য চিন্তা করে দেখতাে মা উনার মত মানুষ এই বাড়িতে আছেন

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *