পুষ্প নীচু গলায় বলল, বইটার মূল বিষয়টাই ভূল।। ‘মূল বিষয়ই ভূল ? কি বলছ তুমি?
‘ঐটি একটি প্রেমের উপন্যাস। উপন্যাসের মূল বিষয় হল ভালবাসলে ভালবাসা ফেরত দিতে হয়। আপনার বই এর চরিত্ররা তাই করেছে। কিন্তু এমনতাে কখনাে হয় না। মনে করুন একটা কালো, কুর্দশন মেয়ে প্রচণ্ড আবেগ নিয়ে একটি রূপবান ছেলেকে ভালবাসল। সেই ছেলে কি তার ভালবাসা ফেরত দেবে? কখনাে না।
আপনি লিখেছেন মানুষ হচ্ছে আয়নার মত। ভালবাসার আলাে সেই আয়নায় পড়লে তা ফিরে আসবে। মানুষ আয়নার মত না। আমার চেয়ে আপনি তা অনেক ভাল করে জানেন। একটা ভুল কথা লিখেছেন – কিন্তু এমন সুন্দর করে লিখেছেন যে পড়লে সত্যি মনে হয়। মন অসম্ভব ভাল হয়ে যায়।
‘মন ভাল হওয়াটাকে তুমি তুচ্ছ করছ কেন?‘ ‘ভুল কথা বলে মন ভাল করলে সেটাকে তুচ্ছ করা কি উচিত না? ‘পুষ্প আমি আরেক কাপ চা খাব।
পুষ্প উঠে গেল। শওকত সাহেব চুপচাপ বসে রইলেন।
পুষ্প চা নিয়ে ফিরে এল।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
তিনি বললেন, থ্যাংক ইউ। বলেই হাসলেন। হাসিব অর্থ তুমি যা বলেছ শুনলাম। আমি রাগ করিনি। কিন্তু তিনি যে রাগ করেছেন তা ঢাকতে পারছেন ।
‘স্যার আমি কি আপনার নাস্তা নিয়ে আসব?” ‘নিয়ে আস।
মেয়েটিকে প্রচণ্ড ধমক দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। বলতে ইচ্ছা করছে – শােন বােকা মেয়ে, আমি এই পৃথিবীটাকে যেমন দেখি, যেমন ভাবি তেমন করেই লিখি। সত্যিকার পৃথিবীটা কেমন তা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। সত্যিকার ছবি হচ্ছে ফটোগ্রাফী। সাহিত্য ফটোগ্রাফী নয়, তৈলচিত্র। সেই তৈলচিত্রে আমি কিছু রঙ বেশী ব্যবহার করেছি। মানুষকে যেভাবে দেখতে ভালবাসি আমি সেইভাবে আঁকি। যদিও জানি মানুষ সে রকম নয়। আমি নিজেও তেমন নই। কিন্তু আমার সে রকম হতে ইচ্ছে করে। কাজেই আমি ধরে নিয়েছি অন্যদেরও তাই হতে ইচ্ছে করে। আমি মানুষের ইচ্ছের ছবি এঁকেছি।
এইসব কথার কিছুই বলা হল না। তিনি নিঃশব্দে নাশতা খেলেন। নাশতা শেষ করে লেখার টেবিলে গিয়ে বসলেন। পুষ্প পেছনে পেছনে এল।
“কিছু বলবে পুষ্প?
পুষ্প নরম গলায় বলল, আপনি আমার কথায় এতটা মন খারাপ করবেন আমি ভাবি নি। আমি অতি সামান্য মেয়ে, আমার কথার কি গুরুত্ব আছে?
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
‘আমার সহজে মন খারাপ হয় না। কঠিন আঘাতও আমি সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি। কিন্তু এই বইটির ব্যাপারে আমার এক ধরনের স্পর্শকাতরতা আছে। লেখক হিসেবে আমার আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। প্রথম বইটি প্রকাশিত হবার পর তিন বছর একটি লাইন লিখতে পারিনি। তারপর এই বইটি লিখলাম। লেখার পর মনে হল নিজের স্বপ্ন অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা আমার আছে। হােক না স্বপ্নটা মিথ্যা।
‘আপনি নিজে যদি এটা বিশ্বাস করেন তাহলে আমার উপর এত রাগ
করলেন কেন?”
‘তােমার উপর রাগ করেছি কারণ তুমি আমাকে যা বলেছে তাও কিন্তু আমি বিশ্বাস করি।
‘তা কেমন করে হয় ?
হয়। একই সঙ্গে আমরা ভালবাসি, আবার যাকে ভালবাসি তাকে ঘৃণাও করি। তুমি সম্ভবত এখনাে কারাে প্রেমে পড়নি। প্রেমে পড়লে বুঝতে পারতে।
‘আপনি কি এখন লিখবেন?” ‘হ্যা। ‘লেখার সময় আমি যদি পাশে বসে থাকি আপনি কি রাগ করবেন ?
‘আমি চাই না লেখার সময় কেউ আমার আশে–পাশে থাকে। লিখতে লিখতে প্রায়ই আমার চোখে পানি আসে। এই দৃশ্য অন্যের কাছে হাস্যকর মনে হবারই কথা।
‘তাহলে আমি যাই।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
আচ্ছা যাও – ভাল কথা, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। Young lady, you are sat. এখন যাও আমি লেখা শুরু করি।
‘আজও কি দুপুরে খাবেন না?
‘খাব। এখানে খাবার আনতে হবে না। ঠিক দু‘টার সময় আমি তােমাদের ঘরে আসব।
‘বিকেলে কি আমার সঙ্গে মঠটা দেখতে যাবেন ? ‘যাব। ‘সত্যি যাবেন? ‘হ্যা, সত্যি যাব।
মঠ ব্যাপারটা আসলে ইটের বিশাল স্থূপ। | বােঝা যাচ্ছে এক সময় অনেক উচু ছিল, এখন ভেঙ্গে একাকার হয়ে আছে। চল্লিশ পঞ্চাশ ফিটের মত উঁচু। উপরে উঠার সিড়ি আছে। মােফাজ্জল করিম সাহেবও সঙ্গে আছেন। তিনিই সবচে অবাক হলেন, এইটা কি ব্যাপার? জিনিসটা কি?
শওকত সাহেব বললেন, আপনি কখনাে আসেন নি ?
‘আসবাে না কেন? এই রাস্তায় কত আনাগােনা করেছি। জঙ্গলের ভিতর কখনাে ঢুকি নাই। অবশ্য শুনেছি মঠের কথা।
পুষ্প বলল, বাবা সিঁড়ি দিয়ে উঠলে কেমন হয়?
করিম সাহেব আঁৎকে উঠলেন, পাগল হয়েছিস? এটা সাপের আড্ডাখানা। তার উপর বর্ষাকাল। কাছে পিছেই বেশীক্ষণ থাকা উচিত না।
শওকত সাহেব বললেন, জিনিসটা কি কেউ কি বলতে পারে ? দেখতে অনেকটা বাতিঘরের মত। এই জায়গায় বাতিঘর থাকবে কেন? বৌদ্ধদের কিছু নাতাে?
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
করিম সাহেব বললেন, না। এই অঞ্চলে কোন বৌদ্ধ নাই। এরকম ভূপ কি একটাই না আরাে আছে ?
জানি না তাে। ‘খোজ নেয়া যায় ?
‘অবশ্যই খোজ নেয়া যায়। স্কুলে একটা নােটিশ দিয়ে দিলেই হবে। দূর দূর থেকে ছেলেরা পড়তে আসে।
‘তাহলে একটা নােটিশ দিয়ে দেবেন তাে? আমি খুবই অবাক হচ্ছি। জঙ্গলের ভেতর এমন বিশাল ব্যাপার দেখব আশা করিনি বলেই বােধ হয় অবাক হচ্ছি।
‘শীতকালে একবার আসবেন স্যার। আমি সব পরিষ্কার–টরিষ্কার করে রাখব। শীতকালে জায়গাটা এম্নিতেও খুব সুন্দর হয়। সােহাগী নদীর দুই ধারে কাশফুল ফোটে। আহ দেখার মত। চলেন স্যার, আজ ফেরা যাক। কাদায় মাখামাখি হয়ে গেছেন।
‘চলুন। ‘আপনার জন্যে স্যার একটা ভাল খবর আছে। ‘বলুন শুনি।
‘ওসি সাহেবকে বলেছিলাম একটা বজরার ব্যবস্থা করতে। উনি খুবই করিঙ্কর্মা লােক। ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। সন্ধ্যার মধ্যে বজরা ঘাটে চলে আসবে।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
শওকত সাহেব অবাক হয়ে বললেন, বজরা দিয়ে আমি কি করব? ‘বজরায় বসে লেখালেখি করবেন। ঘুরবেন। ‘আমি তাে ভাই রবীন্দ্রনাথ না। আমি যেখানে আছি ভাল আছি। ‘সেটা তাে স্যার রইলই। বজরাও রইল।
আগে আগে যাচ্ছেন করিম সাহেব, তার পেছনে শওকত সাহেব। পূষ্প এবং নৌকার মাঝি সবার পেছনে। পুষ্প নৌকার মাঝির সঙ্গে গল্প করতে করতে
আসছে। চুল দু‘বেণী করায় তাকে খুকী–খুকী লাগছে। আজ সে সুন্দর একটা শাড়ি পরেছিল। কাদায় শাড়ির অনেকখানিই নষ্ট। কাদার দাগ উঠবে বলে মনে হয় না। শওকত সাহেব লক্ষ্য করলেন, পুষ্প মাঝির সঙ্গে ময়মনসিংহের স্থানীয় ভাষায় টেনে টেনে কথা বলছে। মাঝির মত করেই বলছে। করিম সাহেব যদিও তা করছেন না। ভাষার ব্যাপারে তিনি যে খুব সাবধান তা বােঝা যাচ্ছে।
করিম সাহেব বললেন, স্যার কি গােমাংস খান ? ‘খাব না কেন?” ‘অনেকে খায় না। এই জন্যে জিজ্ঞেস করছি। আমি লােক পাঠিয়েছি।” ‘কোথায় লােক পাঠিয়েছেন ?
Read more
