নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

নীল অপরাজিতা

রিণরিণে গলায় বলল, লিচু চোরলিখেছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকিছুদূরআবৃত্তি করেই সে গণ্ডগােল করে ফেললআবার শুরু করল গণ্ডগােল আগের জায়গায় এসে আবারাে গণ্ডগােলতারিনী বাবু ছেলেকে হাত ইশারায় ডাকলেনসে কাছে এগিয়ে আসতেই, প্রচণ্ড চড় কষিয়ে বললেন গাধাযা পিছনে কানে ধরে বসে থাক। 

শওকত সাহেব খুবই মন খারাপ করে লক্ষ্য করলেন ছেলেটি সত্যি সত্যি সবার পেছনে কানে ধরে চুপচাপ বসে আছেতিনি এই স্কুলে আসার কারণে বাচ্ছা একটি ছেলে লজ্জিত অপমানিত হল। 

অনুষ্ঠান শেষে হেডমাস্টার সাহেব ঘােষণা করলেন মহান অতিথির এই স্কুলে পদার্পন উপলক্ষ্যে আগামী বুধবার স্কুল বন্ধ থাকবে। 

আজ লিখতে খুব ভাল লাগছে। 

কলম চলছে দ্রুত গতিতেআকাশ মেঘলাঅল্প অল্প বাতাস দিচ্ছেসেই বাতাসে বজরা দুলছেএই দুলুনীর সঙ্গে কোথায় যেন লেখার খানিকটা মিল আছেঘুঘু ডাকছেঘুঘু নামের এই বিচিত্র পাখি সকালে বা সন্ধ্যায় কেন ডাকে ? বেছে বেছে ক্লান্ত দুপুরে ডেকে দুপুরগুলিকে কেমন অন্য রকম করে দেয়। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

প্রকাণ্ড এক ছাতিম গাছের গুড়ির সঙ্গে নৌকা বাধাবজরার জানালা থেকে ছাতিম গাছের ডালপালা এবং তার ফাক দিয়ে দূরের আকাশ দেখা যায়শওকত সাহেব লেখা থামিয়ে ছাতিম গাছটার দিকে তাকিয়ে রইলেনতার হঠাৎ মনে হল বৃক্ষরাজি সব সময় আকাশ স্পর্শ করতে চায়তারা সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকেমানুষ চায় মাটি এবং জলের কাছাকাছি থাকতেতিনি খুব কম মানুষকেই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছেন । 

স্যার আপনের খাওয়াবাবু টিফিন ক্যারিয়ার হাতে ঠে এসেছে। তিনি আকাশের কাছ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেনবাবু হাঁটুর উপর লুঙ্গী তুলে 

কালাে গেঞ্জী গায়ে চলে এসেছেকি কুৎসিত ছবি। 

আজ স্যার গােমাংসবৃষ্টি বাদলার দিনতাে খাইয়া আরাম পাইবেনধুম বৃষ্টি হইব, আসমানের অবস্থা দেখেন। 

তুমি টিফিন ক্যারিয়ার রেখে যাও। আমি খেয়ে নেবউপস্থিত থাইকা আপনেরে খাওয়াইতে বলছেকে বলেছেপুষ্প ?পুষ্প ছাড়া আর কে? শেষ বাটির মধ্যে দৈ মিষ্টি আছেতুমি খেয়েছ? জ্বি নাআপনের খাওয়া শেষ হইলে পুষ্প আর আমি খাইতে বসব। 

আজ তিন দিন হল পুষ্পের সঙ্গে তার দেখা নেইতার পক্ষে কাদা ভেঙ্গে বজরায় আসা অবশ্যি কষ্টকর, তবু ইচ্ছে করলে সে কি আর আসতে পারত না

অবশ্যই পারত। 

স্যার কি মঠদেখতে গেছিলেন ? হ্যা। 

আমি গতকাল পুষ্পেরে নিয়া গেলামঢুকলাম ভিতরেপুষ্প না করতেছিল সাপখােপ থাকতে পারেআমি বললাম, ভয়ের কিছু নাইআমি সাপের বাবা সর্পরাজহাহাহা 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

কি দেখলে?আরে দূর দূর কিছু না শিয়ালের গু ছাড়া কিছু নাই। 

শওকত সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে খেতে বসলেনযত তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করা যাবে তত তাড়াতাড়ি এই আপদ বিদেয় হবে। 

স্যার আইজ কয় পৃষ্ঠা লেখলেন?লিখেছি কয়েক পৃষ্ঠালেখা শেষ? নাকিছুটা বাকি আছেএত লেখালেখি করেন আঙুল ব্যাথা করে না?তিনি চুপ করে রইলেনকথাবার্তা চালানাের কোন অর্থ হয় না। 

আমি স্যার পরীক্ষার হলে তিন ঘন্টা লেখি তারপরে আঙুলের যন্ত্রণায় অস্থির হইআঙুল যদি দাঁতের মত বাঁধানাের ব্যবস্থা থাকত তা হইলে লেখকরা সব আঙুল বাধিয়ে ফেলতকেউ রূপা দিয়া কেউ সােনা দিয়াঠিক বললাম নাস্যার

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

হ্যা ঠিকআপনে কি দিয়া বাধাইতেন? সােনা না রূপা ?বাবুজ্বিখাওয়ার সময় কথা বলতে আমার ভাল লাগে নাজানতাম না স্যার। 

কথা শুনতেও ভাল লাগে নাআর কথা বলব না স্যারকি লেখলেন একটু পইড়া দেখিনালেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি কাউকে পড়তে দেই না। 

বাবু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, পড়লেও কিছু বুঝব নাস্যার আপনি লালুভুলু পড়েছেন? একটা হীট বই চোখের পানি রাখা মুশকিলআমি যতবার পড়ি ততবার কাদি। 

শওকত সাহেব খাওয়া বন্ধ করে উঠে পড়লেনখাওয়া হয়ে গেল

কিছুই তাে খান নাইগােমাংস ভাল লাগে না স্যার?” 

লাগেআজ খেতে ইচ্ছা করছে না। তুমি এখন টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে যাও। 

ভি আচ্ছা। 

শওকত সাহেব খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তুমি পুষ্পকে একবার এখানে আসতে বলতাে। 

কখন আসতে বলব, এখন?এক সময় এলেই হবেসন্ধ্যার সময় আমি সাথে করে নিয়ে আসবকোন অসুবিধা নাই। 

থাক সন্ধ্যায় আসার দরকার নাই

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *