শমিত জিজ্ঞাসা করল, আমি কি তােমাকে অসুবিধেতে ফেললাম ? ‘কেন ? ‘তােমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে ! ‘না। আমি ভাবছি হঠাৎ কি কারণে তুমি তােমার নাটক ছেড়ে এতদূরে, আমার ঠিকানাই বা পেলে কোথায় ?
‘এসবই চেষ্টা করলে পাওয়া যায় দীপা। কিন্তু আমি খুব ক্ষুধার্ত, সারা শরীর গরমে ঘামে পচছে। একটু আরাম করে স্নান করা দরকার তার আগে।
‘নিশ্চয়ই। কিন্তু এই অঞ্চলে জল খুব মূল্যবান বস্তু। অতএব একটু কৃপণের মত খরচ করলে সবার উপকার হয়।‘ দীপাবলী উঠে ভেতরের ঘরের দিকে যেতেই তিরিকে দেখতে পেল, বাথরুমে একটা আলাে দে।
বাইরের ঘর থেকে শমিতের গলা ভেসে এল, ‘আমার কাছে স্নানের সব সরঞ্জাম আছে। ‘যেমন ? গলা তুলল দীপাবলী । ‘গামছা, সাবান।
দীপাবলীর ঠোঁটে হাসি মিলিয়ে গেল। তিরি ফিরে আসা পর্যন্ত সে ভেতরের ঘরেই দাঁড়িয়ে রইল। তিরি বলল, ‘হয়ে গিয়েছে। দীপাবলী বাইরের ঘরে বেরিয়ে এল, একটু সাবধানে যাও। এখানে ইলেকট্রিক নেই । ব্যাগটা ওখানেই থাক। শমিত বােলাটা নিয়েই তিরিকে অনুসরণ করে ভেতরে চলে গেল। খাটে এসে বসল দীপাবলী । অভদ্রতা করা যেখানে অসম্ভব, খুশি যেখানে চেষ্টা করেও হওয়া যায় না সেখানে একধরনের চাপা অস্বস্তি থিক থিক করে দীপাবলী কিছু ভাবতেই পারছিল না। তার এখন কি করা উচিত?
সাতকাহন পর্ব-(১২)
এই সময় তিরি ফিরে এল, ‘দিদি, উনি কি রাত্রে খাবেন ? ‘তাই তাে মনে হচ্ছে। ‘কি হবে তাহলে? আমি তাে মাত্র আমাদের জন্যে বেঁধেছি । ‘আবার ভাত বসিয়ে দে। ডিম নেই ? মাথা নাড়ল তিরি, কিন্তু শােবে কোথয় ? ‘দেখি ভেবে। তিরি এক মুহূর্ত চুপ করে জিজ্ঞাসা করল, ‘তােমার কে হয় ?
দীপাবলী চমকে উঠল। কেউ না বলতে গিয়েও থমকে গেল । যেটা স্বাভাবিক, সেই বন্ধু শব্দটি উচ্চারণ করলে তিরি হজম করতে পারবে না। অথচ এমন প্রশ্নের জবাব দেবার একটা দায় থেকেই যায়। কর্তৃত্ব দেখিয়ে ধমকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। দীপাবলী উত্তর দিল, “আমাদের আত্মীয়। তুই রান্নাঘরে যা।
তিরি চলে গেলে এই একটি বাংলা শব্দের কাছে কৃতজ্ঞ হল সে। আত্মীয় শব্দটি ঠিক আকাশের মত । কোন গণ্ডীতে আটকানাে নয়। রক্ত অথবা আত্মার সম্পর্ক থাকলে তাে বটেই আবার পাঁচজনের চোখে যা কাছের তাকে দুরে ঠেলতেও ওই একই শব্দ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু শমিত কেন এখানে ? বছরগুলাে বেশি পুরনাে নয়। সেই দুপুরে শমিতের বাড়ি থেকে চলে আসার পরে দীপাবলী ভেবেছিল হয়তাে কিছুদিন সে তার সামনে আসবে না। সেদিন হােস্টেলে ফিরে এসেছিল একটা ঘােরের মধ্যে । যত সময় যাচ্ছিল তত ভাল লাগা কুয়াশার মত তার দশদিক আড়াল করে দিচ্ছিল।
সাতকাহন পর্ব-(১২)
একটি ছেলে নাটক করে, কোন বদ–অভ্যাস নেই, পড়াশুনা করতে ভালবাসে এবং সেইসঙ্গে ব্যক্তিত্ব, তার ভালবাসা উপেক্ষা করার একটাই যুক্তি ভবিষ্যতে স্বাচ্ছন্দ্য আসবে কিনা তার স্থিরতা নেই। কিন্তু ক্রমশ মনে হচ্ছিল সেই ঝুকি নেওয়া যায়। সং শিল্পের সঙ্গে যে মানুষ জড়িত তার পাশে থাকায় নিশ্চয়ই এক ধরনের তৃপ্তি আছে । সেই তৃপ্তি ধনসম্পদের বিনিময়ে পাওয়া যাবে না।
শমিত প্রচণ্ড আবেগ নিয়ে তাকে স্পর্শ করেছিল। সেই স্পর্শে কাম ছিল কি না এখন বােধে নেই । সে এমন অপ্রাপ্তমনস্ক নয় যে শমিতের মন তার জন্যে তৈরি এই কথাটা এতদিনে বােঝেনি। অতএব নিরালায় একা পেয়ে শমিতের বাঁধ যদি ভেঙে যায় তাহলে প্রাথমিক যে কুণ্ঠা মনে আসে তা দূর করার মত যুক্তি খুঁজে নিচ্ছিল দীপাবলী। সেই কত বছর আগে জীবনীশক্তি ফুরিয়ে যাওয়া একটি অর্ধমৃত মানুষ শুধু আদেশ পালন করার তাগিদে তার শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তখন এই শরীর তৈরি হয়নি কোন পুরুষের জন্যে। যে মানুষটি স্বামী হিসেবে ফুলশয্যার রাত্রে তাকে মা করতে চেয়েছিল তার ক্ষমতা কত সীমিত ছিল যে সামান্য প্রতিরোেধ সহ্য করতে পারেনি।
একধরনের জ্বালা ঘেন্না আতঙ্ক তার মনে তৈরি করে মানুষটি নেতিয়ে পড়েছিল। এত বছর পরে সেই ভাবনা মুখ নামিয়ে ছিল মনের কোণে। কোন পুরুষ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি, পুরুষের স্পর্শের জন্যে একটুও আকাঙক্ষা হয়নি তার। ওই দুপুরে শমিতের স্পর্শে সেই ভাবনা মুখ তুলেছিল। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় সেই ঘেন্না আকাশ ছুঁয়েছিল।
সাতকাহন পর্ব-(১২)
কিন্তু রাত্রে সব কিছু থিতিয়ে যাওয়ার পর অনেক বছর আগের মৃত মানুষটিকে ছাপিয়ে একটি স্বাস্থ্যবান পুরুষের আবেগজড়াননা স্পর্শ তাকে যেন বিপরীত দিকে টানতে লাগল। সেই মুহুর্তে তার সারা আকাশ জুড়ে শমিত। যদি রাত না অন্ধকার ছড়াতে, যদি বাস-ট্রাম বন্ধ না হয়ে যেত তাহলে হয়তাে সে ছুটে যেতে পারত শমিতের কাছে। কি বলত তা জানা নেই, জানতে ইচ্ছেও ছিল না। শুধু ছুটে যাওয়ার এক উগ্র আকাঙক্ষা বুকের পাঁজরে বারংবার ঘা মারছিল।
রাত কেটেছিল আধাে ঘুম আধাে জাগরণে। সেই একটি রাত যা তার সমস্ত ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে মৃত করে দিয়েছিল। জলপাইগুড়ি থেকে যে প্রতিজ্ঞা নিয়ে কলকাতায় এসেছিল তা যেন অর্থহীন মনে হয়েছিল। এক ফোঁটা ভালবাসার জন্যে যদি কোন মানুষ লক্ষ মাইল হেঁটে যেতে পারে তাহলে একটা পুরাে সমুদ্র পেলে সে কি করবে ? সকাল হল। রােদ উঠল রােদের মতন। অদ্ভুত আলস্য নেমে এসেছিল শরীরে, মনে। কিন্তু ভাল লাগছিল না, কিছু না। এমনকি মান বা খেতেও মন আসছিল না। দুপুর যখন ঠিক দুকুরবেলা, তখন সে বেরিয়েছিল হােস্টেল থেকে। প্রায় উদভ্রাতের মত হাজির হয়েছিল মায়াদের বাড়িতে। মায়া বাড়িতে ছিল না। মাসীমা তাকে দেখে চমকে উঠে জানতে চেয়েছিল, কি হয়েছে ?
‘কই ! কিছু না তাে! হঠাৎ যেন নিজের ব্যবহারে আটপৌরে ভঙ্গী আনতে চাইল সে। ‘কিছু একটা হয়েছে। শরীর কেমন আছে ? ‘ভাল। মায়া কোথায়? ‘বেরিয়েছে। ‘কোথায় ?
সাতকাহন পর্ব-(১২)
বলে তাে গেল ও আর সুদীপ শমিতের বাড়িতে যাচ্ছে। নামটা শােনামাত্র বুকের বাতাস স্থির হল, কেন ? ‘কাল নাকি শমিত রিহাসালে আসেনি। ও তাে এমন কখনও করে না। ‘মায়া সুদীপের সঙ্গে গিয়েছে ?
বলে তত গেল। একাও যেতে পারে। আমি মেয়েকে বুঝি না বাবা। ‘কেন ?
‘মুখে আলগা আলগা ভাব দেখায় কিন্তু মনে যে শমিতের জন্যে টান আছে তা লুকিয়ে রাখতে চায়। দ্যাখাে, শমিত ভাল ছেলে। কিন্তু হঠাৎ চুপ করে গেলেন মাসীমা, তারপর মাথা নাড়লেন, ‘নাঃ যখন ঠিক করেছি বাধা দেব না, তখন কিছুতেই বাধা দেব না। নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই বুঝে নিক। আমাকে তাে দায়ী করতে পারবে না।
মাসীমা নিঃশ্বাস ফেললেন। আর এই কথাগুলাে শােনামাত্র মাথা থেকে একটা স্রোত ধীরে ধীরে পায়ের বুড়াে আঙুলে, শেষে শরীরের বাইরে নেমে উধাও হয়ে গেল দীপাবলীর । আচমকা যেন সবকিছু সহজ হয়ে গেল। হােস্টেলে ফিরে এসে চুপচাপ নিজের খাটে শুয়ে শুধু একধরনের শূন্যতাবােধ ছাড়া আর কিছু মনে জড়িয়ে ছিল না ।
অথচ সেই শূন্যতাবােধের যে কতখানি ভারী তার টের সে পেতে লাগল সময় যত পেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ যেন সিংহাসন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এমন অনুভূতি প্রবল হচ্ছিল। এবং সেই সঙ্গে এল ঈষা, রাগ, অভিমান। নিজেকে খুব খেলাে মনে হতে লাগল। মায়া কোন এক সময় তাকে ঠাট্টার গলায় বলেছিল, দেখিস বেশী জড়িয়ে যাস না। সেটা কি সতর্কীকরণ ছিল ? আমার সম্পত্তিতে হাত দিও না! কিন্তু শমিত কারাে সম্পত্তি হতে পারে।
সাতকাহন পর্ব-(১২)
মায়া শমিতকে ভালবাসে এটা নিছক অনুমানেই ছিল তাব। সেইমত শমিতকে বলেছিল ওইসময়। শমিত অস্বীকার করেছিল, অথাৎ ভালবাসা টাষা নয়, স্রেফ শরীরের প্রয়ােজনে তাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল। যা একসময় আবেগের চূড়ান্ত প্রকাশ বলে মনে হয়েছিল তাকেই এখন পরিকল্পিত লাম্পট্য বলে মনে হল। আর তখনই অপমানবােধ প্রবল হল। ওই দুপুরের পর নিজের যে পরিবর্তন হয়েছিল তার জন্যে লজ্জায় ঘেন্নায় নুইয়ে যাচ্ছিল সে। ইচ্ছে করছিল সােজা মায়ার কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বলে দেয়। যে পুরুষ প্রেমিকাকে প্রতারণা করে তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা বােকামি। মায়াকে সতর্ক করে দেওয়া দরকার । মায়ার সঙ্গে কোন আত্মিক সম্পর্ক নেই বলে শমিত যে তাকে ভুল বুঝিয়েছে তাও মায়ার জানা দরকার। মন স্থির করে ফেলেছিল দীপাবলী। আর তখনই ঘটনাটা ঘটল ।
Read more
