সন্ধ্যে সবে ঘন হয়েছে। মায়া এল তার কাছে। তখনও বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়েছিল দীপাবলী । মায়া একটা চেয়ার টেনে পাশে বসতে সে ধীরে ধীরে উঠে বসে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করেছিল, “কি ব্যাপার ?
‘আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলি ?’ মায়ার গলায় কোন তাপ নেই।
হঠাৎ কথা বলার ইচ্ছে, এতক্ষণ ধরে জমে থাকা কথাগুলাে যেন হাবিয়ে ফেলল দীপাবলী। সে নীরবে মাথা নেডে হ্যাঁ বলল। মায়া বলল, ‘শােন, তাের সঙ্গে কয়েকটা কথা আছে। আমি শমিতের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তুই যদি ইচ্ছে করিস তাহলে শমিতকে বিয়ে করতে পারিস।
চমকে উঠল দীপাবলী । বুকের ভিতটাই যেন টলে উঠল। সে কপালে ভাঁজ ফেলে মায়ার দিকে তাকাল। মায়ার মুখ পাথরের মত।
মায়া মুখ ফেরাল, শমিত আমাকে বলেছে কি ঘটনা ঘটেছিল। ‘তােকে শমিত বলেছে ? বিশ্বাস করতেই পারছিল না দীপাবলী।
হুম। ও স্বীকার করেছে যে তােক ভালবাসে ? ‘কেউ যদি আমাকে ভালবাসে তাহলে আমার কি করার আছে ? হঠাৎই এক উদাসীনতা দীপাবলীর গলায় জড়িয়ে গেল।
‘কি বলছিস দীপা?
নতুন কিছু না। পৃথিবীর কোটি কোটি পুরুষ প্রতি মুহূর্তে কোন না কোন মেয়েকে ভালবেসে ফেলছে। এ নিয়ে মাথা ঘামালে মেয়েদের তাে কোন কাজই করা হবে না।
‘তােকে শমিত কি বলেছে ?
যা শুনেছিস। ‘তাের প্রতিক্রিয়া হয়নি?
হয়নি বললে মিথ্যে বলা হবে। নিজেকে খুব।। ‘চুপ করলি কেন ?
বলতে ইচ্ছে করল না, তাই। ‘শােন, তােকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করছি, তুই শমিতকে ভালবাসিস ? ‘কিসে একথা মনে হল ?
‘মনে হয়েছে। শমিত তােকে যাদবপুরে পৌঁছে দিতে গিয়েছিল শিফট করার সময়। মুখে না বলেও আমার অসুস্থতার সময় তুই নাটক করলি আর যেই আমি সুস্থ হলাম নিজেকে গুটিয়ে নিলি। শমিত তােকে এই হােস্টেল ঠিক করে দিয়েছে। শমিতের কাছে চাকবির জন্যে গিয়েছিলি ? মিথ্যে কথা ?
সাতকাহন পর্ব-(১৩)
দীপাবলী হাসল, ‘মায়া, তাের সম্পর্কে আমার অন্যরকম ধারণা ছিল। যারা রাজনীতি করে, পাঁচটা ছেলের সঙ্গে দলের প্রয়ােজনে দিনরাত মেশে, যাদের পড়াশুননা আছে তাদের দেখার চোখ অনেক ব্যাপক বলে ভাবতাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল। যে কোন ঘরকুনাে মেয়ের সংকীর্ণতার সঙ্গে তােদর কোন পার্থক্য নেই, অন্তত ঘা খেলে যে যুবােটা খুলে যায় সেটা বুঝতে পারছি।
‘তুই আমাকে অপমান করছিস দীপা। আমি সংকীর্ণ ? সংকীর্ণ হলে নিজে এসে তােকে বলতাম না শমিতকে গ্রহণ কর।
‘আমি কাকে গ্রহণ করব তা তুই ঠিক করে দিবি ? ‘আমার তাে তাই মনে হয়েছিল। তুই শমিতকে আমার কথা বলেছিলি ?
বলেছিলাম। কারণ আমি বিশ্বাস করি তুই শমিতকে ভালবাসিস। না, মায়া, আমি শমিতের জন্যে মােটেই ব্যগ্র নই। একথা ভাল লাগছে শমিত যা করেছে, তা তােকে বলেছে। লােকটা খুব ছােট হয়েছিল এতক্ষণ আমার কাছে, এখন সত্যি শ্রদ্ধা হচ্ছে। কিন্তু আমি জানি তুই ওকে ভালবাসিস। তুই নিশ্চিন্ত থাক, শমিতের জন্যে আমার কোন আগ্রহ নেই।
‘তুই একথা শমিতকে বলতে পারবি ? “নিশ্চয়ই। আমি তাে বলেই এসেছি ওকে, বন্ধু হিসেবে সম্পর্ক রাখতে।
হঠাৎ মায়া দুহাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে ফেলল, ‘আমি এখন কি করব? দীপাবলী উঠল এক হাতে মায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল, এবার তােকে আমার হিংসে
‘ঠাট্টা করছিস ?’ মুখ না তুলে বলল মায়া ।
নারে তাের মত এমন ভালবাসা যদি কাউকে বাসতে পারতাম। ‘কি হবে বেসে ! শমিত আমাকে বুঝতে চায় না, বােঝে না। ‘অপেক্ষা কর।” দীপাবলী মায়ার মাথায় হাত বুলিয়েছিল, শমিত নিশ্চয়ই বলতে পারবে। আমাকে নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করিস না।’
এরও দিন সাতেক বাদে শমিতের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। হােস্টেলের সামনের রাস্তায়। একেবারে মুখখামুখি, তােমার কাছে যাচ্ছিলাম।
সাতকাহন পর্ব-(১৩)
‘বলুন। ‘তােমার চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের স্কুলের সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলেছি। তুমি কাল সকাল ঠিক সাড়ে নটায় আমাদের বাড়িতে চলে এস। আমি স্কুলে নিয়ে যাব।
মন স্থির করাই ছিল। দীপাবলী হাসল, ‘আপনি অনেক করলেন আমার জন্যে। কিন্তু আমার পক্ষে আর আপনার স্কুলে চাকরি করা সম্ভব নয়।
সে কি ? কেন ? অবাক হয়ে গেল শমিত । ‘আর সম্ভব নয়। মাথা নেড়েছিল দীপাবলী। ‘আমি কারণটা জানতে চাইছি।’ ‘আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। সব কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
‘কিন্তু আমাকে আগামীকাল কৈফিয়ত দিতে হবে সেক্রেটারিকে। তুমি কি এই ব্যাপারটাকে ছেলেখেলা বলে মনে কর? আমি অসম্মানিত হব তুমি চাইছ ?
‘বেশ, তাহলে বলি। সেদিন আপনার ব্যবহার আমি মেনে নিতে পারিনি।’ ‘ও! থমকে গেল শমিত। ‘আপনার খারাপ লাগতে পারে কিন্তু আমার পক্ষে এক স্কুলে কাজ করা সম্ভব নয়, কারণ আপনাকে দেখলেই ওইসব মনে পড়বে। মায়া আপনাকে কিছু বলেনি ?
‘মায়া ? না তাে! ‘ও। আপনি যে ব্যবহার করেছিলেন তা হৃদয়ের সম্পর্ক নিবিড় হলেই মানুষ করে থাকে বলে শুনেছি। আপনাকে আমি ওই স্তরে ভাবতে পারছি না। অথচ আপনি যেহেতু প্রস্তাব করেছেন তাই একসঙ্গে কাজ করলে মনে হবে আমি সমস্যা তৈরী করছি।
সাতকাহন পর্ব-(১৩)
এই অস্বস্তিতে আমি থাকতে চাই না।’
‘এটাই তাহলে তােমার শেষ কথা ? ‘হ্যাঁ। ‘কিন্তু তুমি বলেছিলে বন্ধুত্ব থাকবে। ‘বলেছিলাম। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বন্ধুত্বের মধ্যেও একটা ছােট্ট দেওয়াল থাকে। আপনি সেই দেওয়ালটাকে নড়বড়ে করে দিয়েছেন। তবে দেখা হলে নিশ্চয়ই কথা বলব। আশা করব আপনিও সহজ হয়ে কথা বলবেন।
সেই শেষ দেখা। চাকরি নেবার সময় মায়াদের বাড়িতে গিয়েছিল দীপাবলী। মায়া ছিল । ওর মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল। ভদ্রমহিলা এসব ব্যাপারে কিছুই জানেন না। নিজের চাকরির বিস্তারিত ব্যাপার মহিলাকে জানিয়েছিল সেদিন। আর তারপর কলকাতা চোখের আড়ালে। খুব খারাপ লেগেছিল লাবণ্যর কাছ থেকে বিদায় নিতে। মেয়েটা এতদিনে যেন অনেক বুঝতে শিখেছে। সে বারংবার ওর দিদিমাকে বলেছিল লাবণ্যকে অন্তত গ্রাজুয়েট যেন করা হয়। শিক্ষিত একটি মেয়ে তার অতীত যা পূর্বনারীরা তাকে দিয়েছিল জেনে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরী করে নিক। ততদিন তার জন্যে সুস্থ পরিবেশ রাখা
অত্যন্ত জরুরি।
‘ব্যাপস ! এত রাত্রেও জল ঠাণ্ডা হয় না এখানে ?
চমকে মুখ তুলল দীপাবলী। পাজামা পাঞ্জাবি পরে মাথায় ভেজা গামছা ঘষতে ঘষতে ঘরে ঢুকল শমিত, পরনের গুলাে বাথরুমের বালতিতে ভিজিয়ে দিয়েছি। ওগুলাে আর
গায়ে রাখা যাচ্ছিল না।
‘ঠিক আছে তিরি কেচে দেবে।’
‘তােমার কাজের মেয়েটির নাম বুঝি তিরি ? ফ্যানটাসটিক নাম তাে ? তিরি মানে কি ? তিরতিরে থেকে এসেছে নাকি ? শমিত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে প্রশ্নটা করা মাত্র ভেতরের বারান্দা থেকে কৌতুক মেশানাে হাসি ছিটকে উঠেই আচমকা থেমে গেল। সেদিকে তাকিয়ে শমিত বলল, “বাঃ, চমৎকার বাংলা বােঝে তাে !
দীপাবলী ঠোঁট কামড়াল । বারান্দায় অন্ধকার । তিরি ওখানে যে ছিল বা আছে তা বােঝার উপায় নেই। কিন্তু নির্ঘাৎ সে কথা শােনার লােভেই কাছাকাছি রয়েছে। শমিত আর কোন বিষয় পেল না বলবার। সমস্ত ব্যাপারটাই খুব বিশ্রী লাগছিল দীপাবলীর। খাট থেকে নেমে বলল, তুমি বাইবেব ঘরে গিয়ে বসাে, রাতের খাবার পেতে সময় লাগবে।
সাতকাহন পর্ব-(১৩)
‘আপাতত এক কাপ চা হলেই চলবে, সঙ্গে বিস্কুট। শমিত পা বাড়াল।
বারান্দার দিকে মুখ করে দীপাবলী গলা তুলল, “তিরি, তাের কানে গিযেছে নিশ্চয়ই। চা নিয়ে আয়।
বাইরের ঘরে ঢুকে দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, ‘তাহলে তুমি একখনও নাটক করছ ?
Read more
