গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৪)-আহমদ ছফা

গাভী বিত্তান্ত

তিনি বাথরুমে গিয়ে মুখ হাতে পানি দিয়ে খেতে বসে গেলেন । ক্ষুধাটা পেটের ভেতর হুঙ্কার তুলছিল। তাই বাসী ভাতে আটকাল না । ঢকঢক পানি খেয়ে নিয়ে কিচেনে টুকে এক কাপ চা করে আস্তে আস্তে খেতে লাগলেন । চা খাওয়া হয়ে গেলে তিনি হুড়কো খুলে বাইরে চলে এলেন।

অল্প অল্প শীত করছিল। তাই একটি হাল্কা চাদর পরে নিয়েছিলেন। প্রথম সূর্যের আলাে গাছপালার ওপর এসে পড়েছে। ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দুগুলাে টলটল করছে। অনেকদিন এমন নরম তুলতুলে ভাের দেখেননি।

তিনি বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ির চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। হঠাৎ তার মনে একটা অনুভূতি জন্ম নিল, সঙ্গে আবু জুনায়েন থাকলে বেশ হত। তক্ষুনি গত রাতে যেসব ঘটনা ঘটেছে একটা একটা করে সবগুলাে মনে পড়ে গেল। তিনি নিজের মনে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করতে লাগলেন, ছােটলােক, ছােটলােক । এই ছােটলােকটাই তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে । গত রাতে আবু জুনায়েদকে যে সকল হুমকি দিয়েছিলেন, সেগুলাে মনে এল ।

তিনি তার আম্মা, ভাই এবং নিজের মেয়েকে ডেকে এনে যেসব কথা ফাস করবেন বলে ভয় দেখিয়েছিলেন, সেগুলাে নিয়ে মনের ভেতর খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করলেন। তাঁর মনে হল যেসব করবেন বলে রাগের মাথায় ঘােষণা দিয়েছিলেন, এই প্রভাতের আলােতে মনে হল তার কোনােটা করাই তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার মুখটা তেতাে হয়ে গিয়েছিল । ছােটলােক, তার ঠোটে আপনিই মন্ত্রের মতাে উচ্চারিত হতে থাকল। 

মনের মধ্যে অশান্তি, তবু সকাল বেলাটা তার মন্দ লাগছিল না। এরকম ভাের তাঁর জীবনে আর কখনাে আসেনি। তিনি মস্ত কম্পাউন্ডটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। এরই মধ্যে একটা বেলা হয়েছে। দারােয়ান ঘটাং করে লােহার গেট খুলে ফেলেছে ।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৪)

ঝাড় হাতে, খুন্তি হাতে একদল মেয়ে পুরুষ কম্পাউন্ডের ভেতরে প্রবেশ করল। নুরুন্নাহার বানু পায়ে পায়ে গেটের কাছে চলে এলেন। ঝাড়অলা ঝড় তুলে, খুন্তি অলা খুন্তি তুলে সালাম দিল । নুরুন্নাহার বানুর নিজেকে তখন রাণী মনে হচ্ছিল। তিনি খুব খুশি হয়ে উঠেছিলেন । তথাপি তার মনের মধ্যে একটা খুঁত থেকে গেল। তার ইচ্ছে হল বিষয়টা তিনি বুঝিয়ে দেবেন। পরক্ষণে চিন্তা করলেন, এসকল ছােটলােককে ভালাে কিছু শিখিয়ে লাভ হবে না। 

বরঞ্চ তিনি তাদের কাছে নিজের কর্তৃত্বটা জাহির করা অধিকতর উপযুক্ত মনে করলেন। কে কী কাজ করে জিজ্ঞেস করলেন। ঝাড়দার ঝাড়দারনী বলল, মেম সাহেব আমরা বাগানে ঝাড় দিতে এসেছি। বাড়িতে যারা ঝাড়ামােছার কাজ করবে, আসবে বেলা আটটার সময়।

সকালবেলা ওই সমস্ত ঝাড়দার ঝাড়ুদারনীর সঙ্গে কথা বলতে তাঁর মন চাইছিল না। তিনি মনে মনে ভেবে নিলেন, ঘুম থেকে উঠে, এই শ্রেণীর মানুষদের সঙ্গে দেখা হল, আজকের দিনটাই জানি কেমন যায়। মাথায় টুপি দাড়িঅলা বুড়াে মানুষটার দিকে তাকিয়ে মনে করলেন, হ্যা, এই লােকের সঙ্গে তবু কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলা যেতে পারে। নুরুন্নাহার বানু জিজ্ঞেস করলেন, তােমার কাজ কী? 

বুড়াে ভদ্রলােকের মুখে একটা ছায়া পড়ল । সেদিকে নুরুন্নাহার বানুর চোখ আদৌ গেল না। 

সালামত মিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক দিন থেকেই মালীর কাজ করে আসছেন। তার পেশার জন্য নয়, প্রাচীনতা এবং প্রবীণত্বের জন্য সকলেই তাঁকে সমীহ করেন, এবং আপনি সম্বােধন করেন। নুরুন্নাহার বানুর মুখে তুমি শব্দটা তার মনে আঘাতের মতাে বাজল। তিনি তার স্বাভাবিক গাম্ভীর্য ক্ষুণ না করে প্রশান্ত স্বরে জবাব দিলেন : 

আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হেড মালি । বিগত বিশ বছর ধরে আমি এই কাজ করে আসছি। হাতের খুন্তিখানা আদর করতে করতে বললেন, ওই জোয়ান ছাওয়ালটা দেখছেন সে আমার এ্যাসিস্টেন্ট এবং মেয়ের জামাইও । গত পাঁচ বছর ধরে আমার সঙ্গে কাজ করে।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৪)

বর্তমান উপাচার্যের আগের জনের আগের জন দয়া করে জামাইকে চাকরিটা দিয়েছিলেন। নুরুন্নাহার বানুর মনে হঠাৎ করে হুকুম করার আকাঙক্ষাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। তিনি বললেন : 

চলাে দেখাও দেখি তােমরা কী কাজ করাে। সালামত মিয়া বললেন, বেগম সাহেবা আমার সঙ্গে সঙ্গে আসেন। বিরাট প্রশস্ত বাগান। সালামত মিয়া তাকে সাত রকমের গােলাপের গাছ দেখালেন । ক্রিসেনথেমামের ঝাড়গুলাে দেখিয়ে বললেন, এগুলাে অল্প ক’দিন পরে ফুটবে।

শীতকালীন ফুলগুলাে যখন ফুটতে থাকবে দেখবেন বাগানের চেহারাই পাল্টে যাবে। সালামত মিয়া তার জামাইকে সদ্য ফোটা ফুল নিয়ে ঝটপট একটা তােড়া করতে বললেন। তােড়াটা নুরুন্নাহার বানুর হাতে দিয়ে বললেন, বেগম সাহেবা নিন। নুরুন্নাহার বানু হােড়াটা নিলেন, কিন্তু বিশেষ 

খুশি হতে পারলেন না। সেটা তার ভাব ভঙ্গিতে প্রকাশ পেল ।। 

তােমরা এতগুলাে মানুষ সব বেহুদা পাতাপুতা লতা এসব লাগিয়ে গােটা জমিটাই ভরিয়ে রেখেছ। ওগুলাে কোন কাজে আসবে? সব কেটে ফেলবে । এপাশে লাগাবে ঢেড়শ, ওপাশে বরবটি আর ওই যে খালি জায়গাটা রয়েছে ওখানে লাগাবে বেগুন এবং সুরমাই মরিচের চারা। বাজারে চারা পাওয়া না গেলে বলবে, আমার বড় বােনের বাড়িতে অনেক আছে, এনে দেব । 

নুরুন্নাহার বানুর কথা শুনে সালামত মিয়া একেবারে চুপ করে গেলেন।

তার মুখ থেকে কোনাে কথাই বেরােল না । নুরুন্নাহার বানু ধমক দিয়ে বলল : 

কী মিয়া চুপ করে আছ যে, কথাটা বুঝি মনে ধরল না? সালামত মিয়া আমতা আমতা করে বললেন : 

বেগম সাহেবা তরি তরকারি লাগানাে খুব ভালাে। আর এইটা সিজনও। আমি আপনাকে পেছনে একটা তরকারির বাগান করে দেব । অনেক জমি আছে। 

-কেন মিয়া সামনে লাগালে কী ক্ষতি। তরকারি বাগান সামনেই করাে । -না বেগম সাহেবা সামনে তরি তরকারির বাগান করা যাবে না । -কেন যাবে না শুনি। আমি বলছি সামনেই করাে । 

-বেগম সাহেবা এ বাড়িতে সামনে তরি তরকারি লাগানাের নিয়ম নেই। আপনি নতুন এসেছেন তাই বুঝতে পারছেন না।।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৪)

-কী বললে মিয়া? 

-বেগম সাহেবা আমাকে ভুল বুঝবেন না । আমি আপনার এ হুকুম তামিল করতে পারব না। 

সালামত মিয়ার কথা শুনে নুরুন্নাহার বানুর পায়ের তলা থেকে মাথার ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে উঠল । দাঁতে দাঁত চেপে তিনি একরকম দৌড়েই বাড়ির ভেতর গিয়ে ঢুকলেন । ভেজানাে দরজা ঠেলে ভেতরে পা দিয়েই তিনি অবাক হয়ে গেলেন। এই সাত সকালে পাঁচ পাঁচজন মানুষ ড্রয়িং রুমে বসে আছেন। তারা নুরুন্নাহার বানুকে উঠে সালাম দিলেন ।

তিনি কোনােরকমে সালামের জবাব দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন । তিনি দেখলেন, নতুন স্যুট টাই পরে আবু জুনায়েদ অপর দরজা দিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করছেন। নুরুন্নাহার বানুর একচোট মনের ঝাল ঝাড়ার ইচ্ছে ছিল। সেটাই মাঠে মারা গেল।

তারপরে তিনি কৌতূহলবশত ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখেন, সকালের নাস্তা দেয়া হয়েছে । আবু জুনায়েদ নাস্তা খাওয়ার সময় পাননি, তাকে জামা কাপড় পরে বের হতে হয়েছে। তখনই নুরুন্নাহার বানুর মনে পড়ল মানুষটা গত রাতেও কিছু খায়নি। আর এই সকালে চলে গেলস্বামীটির প্রতি তার মনে এক ধরনের মমতা জন্মাতে লাগল। মানুষটা বােকা সােকা। খুব সহজেই তাকে ঠকানাে যায়। তার সরল-সহজ স্বামীটিকে কোন ধুরন্ধর কোন বিপদে ফেলে দেয়, সে আশঙ্কায় তার মনটা গুড়গুড় করে উঠল। নুরুন্নাহার বানু মনে করেন, তিনি জীবনে যত জায়গা দেখেছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ জায়গা। হঠাৎ অনেকদিন বাদে তার ইচ্ছে হল, বেলা হয়ে গেলেও তিনি ফজরের নামাজটা পড়বেন। 

সেদিন দিবান্দ্রিা শেষ করে আবু জুনায়েদ বিছানায় বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে কি একটা বিষয় চিন্তা করছিলেন, এমন সময় নুরুন্নাহার বানু ঢুকলেন। তার মনে একটুখানি অনুশােচনার মতাে হয়েছিল। তবে রাগটা পুরােপুরি মরেনি। আবু জুনায়েদের সঙ্গে দুটো মিষ্টি কথা বলার ইচ্ছে তার মনের মধ্যে জন্মেছে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছেন না।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৪)

আর কি নিয়ে আলাপটা শুরু করবেন, বিষয় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ওগাে আমি তােমাকে ভালবাসি, তােমাকে না দেখলে মনটা আমার কেমন করে, এসব কথা বলার বয়েস কি নুরুন্নাহার বানুর আছে? যখন তরুণী ছিলেন তখনাে তিনি এ জাতীয় কথাবার্তাকে ন্যাকামি মনে করতেন। অনেক চিন্তা ভাবনা করে তিনি মুখ দিয়ে কথা বের করলেন : 

-সকালে নাস্তা পানি মুখে না দিয়ে অমন হন্তদন্ত হয়ে কোথায় ছুটে গিয়েছিলে? 

-আবু জুনায়েদ খুব খুশি হয়ে উঠলেন, তাহলে মেঘ কেটে গেছে।

তিনি মনে মনে খুব স্বস্তি বােধ করলেন ।

এ বেলাটা মনে হচ্ছে ভালােই কাটবে। 

-এখনাে কি তােমাকে আবার বেরুতে হবে? জিজ্ঞেস করলেন নুরুন্নাহার বানু। 

-না এ বেলা আর কোনাে প্রােগ্রাম নেই, ঘরে থাকব। ভাবছি চা খাওয়ার পর বাড়ির পেছনের দিকটা একবার দেখব। | নুরুন্নাহার বানুর মনে পড়ে গেল সকালবেলা সালামত মিয়া বলেছেন, পেছনে অনেক জমি আছে, সেখানে তাঁর তরকারির বাগান করে দেয়ার কথা বলেছেন। প্রস্ত বিটা তার খুব পছন্দ হয়ে গেল। 

-আগে চাটা খেয়ে নিই। তারপর দুজন এক সঙ্গে যাব । 

নুরুন্নাহার বানু এবং জুনায়েদ যখন বাড়ির পেছনে এলেন, তখন বিকেলের রােদের তেজটা মরে এসেছে। এই বাড়ির পেছনে ঝােপে ঝাড়ে ঢাকা এমন আশ্চর্য সুন্দর এক নির্জন পরিবেশ আছে, এখানে আসার আগে দুজনের কেউ চিন্তা করতে পারেননি।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৪)

তাঁরা কাঠবিড়ালিদের ছুটোছুটি করতে দেখলেন। দূরে কোথায় ঘুঘুর ডাক শুনতে পেলেন। সবুজ সতেজ দুর্বাবেষ্টিত প্রসারিত ভূমির ওপর হাঁটতে হাঁটতে আবু জুনায়েদের মনে এল, এখন তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তাঁর হাতে অনেক ক্ষমতা।

শিশু যেমন প্রথম মাত স্তন মুখে লাগিয়ে দুধের স্বাদ অনুভব করে, তেমনি আজ সকাল থেকে তিনি ক্ষমতার স্বাদ অনুভব করতে আরম্ভ করেছেন। এই ক্ষমতা নিয়ে কী করবেন চিন্তা করতে লাগলেন। এই ক্ষমতা নিয়ে কী করবেন? এই অপার ক্ষমতা দিয়ে যদি তার কোনাে একটা শখ পূরণ করতে পারতেন, তাহলে সবচাইতে খুশি হয়ে উঠতে পারতেন। সহসা তার মনে এল, তিনি একটা দুধেল গাই পুষবেন। অঢেল জায়গা, প্রচুর ঘাস । অনায়াসে একটা গাই পােষা যায় । গাইয়ের কথা মনে হওয়ার পর তার বাপের চেহারাটা চোখের সামনে জেগে উঠল ।

তার বাবা প্রতিদিন ধলেশ্বরির পাড়ে পাড়ে দড়ি ধরে গাই গরুটা চরাতে যেতেন। একদিন পাড় ভেঙে বাবা এবং গাই উভয়েই পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন। আয়ু ছিল তাই বেঁচে গিয়েছিলেন। এই গাইয়ের এক গ্লাস টাটকা গরম ফেনা ওঠা দুধ প্রতিদিন বিকেল বেলা তাকে পান করতে হত। বাবা মরেছেন কতদিন হয়ে গেল । তবু মনে হয় গত কালের ঘটনা। আৰু জুনায়েদ বারবার পরীক্ষায় ভালাে করতেন। পরীক্ষায় ভালাে করার পেছনের কারণ আৰু জুনায়েদের প্রকৃতিদত্ত মেধা নাকি গাইয়ের দুধের উপকার, দুটোর মধ্যে কোনটা সত্যি এখনাে স্থির করতে পারেন নি।

দুধের ব্যাপারে তিনি ভাবনা-চিন্তা করছিলেন, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই গয়লাদের কথা তার মনে এল। এঁদের স্বভাব-চরিত্র ভীষণ খারাপ। দুধের মধ্যে শহরের ড্রেনের পানি মিশেল দিতেও তাদের আটকায় না। সমস্ত গয়লা শ্রেণীর ওপর তার ভয়ানক রাগ। উপাচার্যের বদলে গয়লাদের শায়েস্তা করার কোনাে চাকরি যদি পেতেন তাঁর ধারণা তিনি আরাে সুখী হতেন।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৪)

মানুষের এই শত্রুদের তিনি থামের সঙ্গে বেঁধে আচ্ছা করে চাবকাবার হুকুম দিতেন। তিনি হাঁটছিলেন, আর অস্ফুটে কী সব বলছিলেন। নুরুন্নাহার বানুর মনে হল, তাঁর স্বামীটি তারই চোখের সামনে ভিন্ন। প্রাণীতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তার রূপান্তর, পরিবর্তনের সবগুলাে চিহ্ন তার চোখে এখন স্পষ্টভাবে ধরা পড়তে আরম্ভ করেছে । 

আবু জুনায়েদ ডালপালা প্রসারিত ছাতিম গাছটিতে পিঠ ঠেকিয়ে স্বগতােক্তি করার মতাে বলে ফেললেন : আমি একটা গাই গরু কিনব । এখন রাখার জায়গার অভাব নেই এবং ঘাসও বিস্তর। একটা গরু পােষার শখ অনেক দিনের। এবার আল্লাহ আশা পূরণ করার সুযােগ দিয়েছেন। 

নুরুন্নাহার শুনে লাফিয়ে উঠলেন : -সত্যি তুমি গাই কিনবে? হ্যা। আবু জুনায়েদ জবাব দিলেন । 

খুশিতে নুরুন্নাহার আবু জুনায়েদকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলেন । আবু জুনায়েদ তাঁর মুখ চুম্বন করলেন। 

মুহম্মদ আবু জুনায়েদ থ্রি পিস স্যুট পরতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলেন । দিলরুবা খানম যতই তাকে দরজির দোকানের ডামি বলে লােকসমাজে 

 অপদস্থ করতে চেষ্টা করুন না কেন, স্যুট টাই পরলে কোত্থেকে একটা আলগা বুকের বল তিনি অনুভব করেন। স্যুট পরে তিনি অফিস করেন, স্যুট পরে লােকজনের সঙ্গে দেখা করেন। যেদিন স্যুট গায়ে থাকে না, সেদিন নিজেকে ভারি বেচারা বেচারা বােধ করতে থাকেন।

আবু জুনায়েদ মনে করতে থাকেন তিনি উলঙ্গ রয়েছেন। আর সব মানুষ তার যাবতীয় অক্ষমতা, দুর্বলতা এমনকি পেটের ভেতরের নাড়ি কুঁড়ি পর্যন্ত দেখেফেলছে। বাড়িতেও সর্বক্ষণ স্যুট পরে থাকতে চেষ্টা করেন ।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৪)

এই পােশাকটা তার শরীরে নতুন জন্মাননা চামড়ার মতাে সাপটে থাকে। মােট কথা, এই কয়দিনে তার এতদূর রূপান্তর ঘটেছে, মাঝে-মাঝে তিনি ভাবতে চেষ্টা করেন, এই স্যুট এই টাইসহ তিনি মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন কি না। যেদিন থেকে তিনি উপাচার্যের আসনটিতে বসেছেন, বুঝে গেছেন এই পােশাকটাই তার একমাত্র ভরসা ।

এই পােশাকই তাঁকে সােলেমানী গালিচার মতাে বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার করবে । এই গােটা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজনও তাঁর বন্ধু নেই, সেই নিষ্ঠুর তেতাে সত্যটি তিনি দাঁত তােলার মতাে বেদনা দিয়ে অনুভব করেছেন । 

বেগম নুরুন্নাহার বানু তাঁর স্বামীর বেশভূষা দেখে হাসি-ঠাট্টা করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু মজার কথা হল নির্মল হাসি-ঠাট্টা নুরুন্নাহার বানুর মুখ থেকে বেরােয়। 

 তিনি জখম না করে কাউকে কিছু বলতে পারেন না। একবার আৰু জুনায়েদ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে টাইয়ের গেরােটি ঠিক করছিলেন, দেখে নুরুন্নাহার বানু মন্তব্য করে বসলেন 

তুমি কি মনে করাে স্যুট বুট করলে তােমাকে সুন্দর দেখায়? তােমার হনুমানের মতাে চেহারার কোনাে খােলতাই হয়? 

কথাটি শুনে আবু জুনায়েদ ভীষণ রেগে গেলেন । জবাবে বললেন আমাকে কেমন দেখায় তা নিয়ে তােমার মাথা ব্যথা কেন? 

নুরুন্নাহার বানু আবু জুনায়েদকে মুখ থেকে কথা টেনে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন : 

-আমার কেন মাথা ব্যথা হবে? মাথা ব্যথা হবে ওই খানকী দিলরুবা খানমের? আমার আব্বা যদি তােমার পেছনে গাঁটের টাকা না ঢালতেন, আজকে তুমি কোথায় থাকতে? 

 

Read more

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৫)-আহমদ ছফা

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *