অনীশ হাসপাতালের কেবিন ধরাধরি ছাড়া পাওয়া যায় না, এই প্রচলিত ধারণা সম্ভবত পুরােপুরি সত্যি নয়। মিসির আলি পেয়েছেন, ধরাধরি ছাড়াই পেয়েছেন। অবশি জেনারেল ওয়ার্ডে থাকার সময় একজন ডাক্তারকে বিনীতভাবে বলেছিলেন, ভাই একটু দেখবেন—একটা কেবিন পেলে বড় ভালাে হয়। এই সামান্য কথাতেই কাজ হবে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আজকাল কথাতে কিছু হয় না। যে–ডাক্তারকে অনুরােধ করা হয়েছিল, তিনি বুড়াে।
মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হয় সমগ্র মানবজাতির ওপরই তিনি বিরক্ত। কোনাে ভয়ংকর দুর্ঘটনায় মানবজাতি নিঃশেষ হয়ে আবার যদি এককোষী এ্যামিবা থেকে জীবনের শুরু করে তাহলে তিনি খানিকটা আরাম পান। তাঁকে দেখে মনে হয় নি তিনি মিসির আলির অনুরোধ মনে রাখবেন। কিন্তু ভদ্রলােক মনে রেখেছেন। কেবিন জোগাড় হয়েছে পাঁচতলায়। রুম্ম নাম্বার চার শ‘ নয়। | সব জায়গায় বাংলা প্রচলন হলেও হাসপাতালের সাইনবাের্ডলি এখনাে বদলায় নি।
ওয়ার্ড, কেবিন, পেডিয়াট্রিকস—এ–সব ইংরেজিতেই লেখা। শুধু রােমান হরফের জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে বাংলা হরফ। হয়তাে এগুলির সুন্দর বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যায় নি। কেবিনের বাংলা কী হবে? কুটির? জেনারেল ওয়ার্ডের বাংলা কি ‘সাধারণ কক্ষ।
অনীশ-পর্ব-(১)
যতটা উৎসাহ নিয়ে মিসির আলি চার শ ন নম্বর কেবিনে এলেন ততটা উৎসাহ থাকল না। ঘন্টাখানেকের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করলেন—–বাথরুমের ট্যাপ বন্ধ হয় যত কষেই প্যাচ আটকানাে যাক, ক্ষীণ জলধারা ঝরনার মতাে পড়তেই থাকে। কমােডের ফ্লাশও কাজ করে না। ফ্লাশ টানলে ঘড়ঘড় শব্দ হয় এবং কমােড়ের পানিতে সামান্য আলােড়ন দেখা যায়। এই পর্যন্তই। তার চেয়েও ভয়াবহ আবিষ্কারটা করলেন রাতে ঘুমােতে যাবার সময়। দেখলেন বেড়ের পাশে সাদা দেয়ালে সবুজ রঙের মার দিয়ে লেখা
“এই ঘরে যে থাকবে সে মারা যাবে। ইহা সত্য। মিথ্যা নয়।।
মিসির আলির চরিত্র এমন নয় যে এই লেখা দেখে তিনি আঁতকে উঠবেন এবং জেনারেল
ওয়ার্ডে ফেরত যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। তবে বড় রকমের অসুখ–বিসুখের সময় মানুষের মন দুর্বল থাকে। মিসির আলির মনে হল তিনি মারাই যাবেন। সবুজ রঙের এই ছেলেমানুষি লেখার কারণে নয়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়মে। তার লিভার কাজ করছে না বললেই হয়। মনে হচ্ছে লিভারটির আর কাজ করার ইচ্ছাও নেই। শরীরের একটি অঙ্গ নষ্ট হয়ে গেলে অন্য অঙ্গগুলিও তাকে অনুসরণ করে। একে বলে সিমপ্যাথেটিক রিঅ্যাকশন।
অনীশ-পর্ব-(১)
কারও একটা চোখ নসত হলে অন্য চোখের দৃষ্টি কমতে থাকে। তাঁর নিজের বেলাতেও মনে হচেছ তা–ই হচ্ছে। লিভারের শােকে শরীরের অন্যসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও কাতর। একসময় ফট করে কাজ বন্ধ করে দেবে। হৃদপিণ্ড বলবে – কী দরকার গ্যালন গ্যালন রক্ত পাম্প করে?
অনেক তাে করলাম। শুরু হবে অনির্দিষ্ট্রের পথে যাত্রা। সেই যাত্রা কেমন হবে তিনি জানেন। মা। কেউই জানে না। প্রাণের জন্ম–রহস্য যেমন অজানা, প্রাণের বিনাশ-রহস্যও তেমনি অজানা।
তিনি শুয়ে পড়লেন। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। বেল টিপে নার্সকে ডাকলেই সে কড়া কোনাে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেবে। মিসির আলির ধারণা এরা ঘুমের ট্যাবলেট অ্যাপ্রনের পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রােগীর সামান্য কাতরানির শব্দ কানে যাবামাত্র ঘুমের ট্যাবলেট গিলিয়ে দেয়। কাজেই ওদের না ডেকে মাথার যন্ত্রণা নিয়ে শুয়ে থাকাই ভাল। শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর পরের জগৎ নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।
অনীশ-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ
‘বমি গলা পর্যন্ত এসে থেমে আছে। এটাকে যদি ভালো বলেন তাহলে ভালাে।
আপনার কি মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে? ‘হচ্ছে। ‘খুব বেশি ?
হ্যা, খুব বেশি। ‘আপনি শুয়ে থাকুন। আমি রেসিডেন্ট ফিজিসিয়ানকে ডেকে নিয়ে আসছি। তিনি হয়তাে আপনাকে ঘুমের কোনাে অষুধ দেবেন। তা ছাড়া আপনার গা বেশ গরম। মনে হচ্ছে টেম্পারেচার দুই–এর উপরে।
সুস্মিতা জ্বর দেখল। এক শ’ দুই পয়েন্ট পাঁচ। সে ঘরের বাতি নিভিয়ে ডাক্তারকে খবর দিতে গেল। | মিসির আলি লক্ষ করছেন, তার মাথার যন্ত্রণা ক্রমেই বাড়ছে। ঘর অন্ধকার, তবু চোখ বন্ধ করলেই হলুদ আলাে দেখা যায়। চোখের রেটিনা সম্ভবত কোনাে কারণে উত্তেজিত। ব্যথার সঙ্গে এর কোনাে সম্পর্ক আছে কি? আচ্ছ-~~জ্বর মাপার যন্ত্র আছে থার্মোমিটার। ব্যথা মাপার যন্ত্র এখনাে বের হল না কেন? মানুষের বাথা–বােধের মূল কেন্দ্র—মস্তিষ্ক। স্নায়ু ব্যথার খবর মস্তিষ্কে পৌছে দেয়। যে–ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল ৰার্থীর পরিমাপক, সেই সিগন্যাল মাপ কি অসম্ভব?
অনীশ-পর্ব-(১)
ব্যথা মাপার একটা যন্ত্র থাকলে ভালাে হত। প্রসববেদনার তীব্রতা নাকি সবচেয়ে বেশি। তার পরেই হার্ড ডিগ্রী বার্ন। তবে ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতাও একেক মানুষের একেক রকম। কেউ–কেউ অতি তীব্র ব্যথাও শান্তমুখে সহ্য করতে পারে। মিসির আলি পারেন না। তাঁর ইচ্ছা করছে দেয়ালে মাথা ঠুকতে।
ব্যথা ভােলবার জন্যে কী করা যায়? মস্তিষ্ককে কি কোনাে জটিল প্রক্রিয়ায় ফেলে দেওয়া যায় না? উল্টো করে নিজের সঙ্গে কথা বললে কেমন হয়? কিংবা একই বাক্য চক্রাকারে বলা যায় না?
বহু কি বাবা?
বখ কি খাব্য?
শিবে বখু কি খাব ?
নার্স ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকল। বাতি জ্বালাল। ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কী ব্যাপার?
মিসির আলি বললেন, আমার ডেলিরিয়াম হচ্ছে। একটি বাক্য বারবার উল্টো করে বলছি। “ব্যথা কি খুব বেশি—এই বাক্যটিকে আমি উল্টো করে বলছি, শিবে বুখু কি থাব্য? | ডাক্তার সাহেব বললেন, কোনাে রুগীর যখন ডেলিরিয়াম হয়, সে বুঝতে পারে
যে ডেলিরিয়াম হচ্ছে। | ‘আমি বুঝতে পারি। কারণ আমার কাজই হচ্ছে মানুষের মনােজগৎ নিয়ে। ডাক্তার সাহেব, আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিন। সম্ভব হলে খানিকটা অক্সিজেন দেবারও ব্যবস্থা করুন। আমার মস্তিষ্কে অক্সিজেন ডিপ্রাইভেশন হচ্ছে। আমার হেলুসিনেশন হচ্ছে।”
অনীশ-পর্ব-(১)
‘কি হেলুসিনেশন? ‘আমি দেখছি আমার হাত দুটো অনেক লম্বা হয়ে গেছে। এখনাে লম্বা হচ্ছে। মিসির আলি গানের সুরে বলতে লাগলেন—
শ্বাল তক তহা রমা। স্বাল ক ত রমা। স্বাল তক হা রমা।” ডাক্তার সাহেব নার্সকে প্যাথিড্রিন ইনজেকশান দিতে বললেন।
মিসির আলির ঘুম ভাঙল সকাল নটার দিকে।
ট্রে–তে করে হাসপাতালের নাশতা নিয়ে এসেছে। দু’ স্লাইস রুটি, একটা ডিম সেদ্ধ, একটা কলা এবং আধ গ্লাস দুধ। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের একটির জন্যে বেশ ভালাে খাবার স্বীকার করতেই হবে। তবু বেশির ভাগ রুগী এই খাবার খায় না । তাদের জন্যে টিফিন ক্যারিয়ারে ঘরের খাবার আসে। ফ্লাস্কে আসে দুধ।
জেনারেল ওয়ার্ডের অবস্থা অবশ্য ভিন্ন। সেখানকার রুগীরা হাসপাতালের খাবার খুব আগ্রহ করে খায়। যারা খেতে পারে না, তারা জমা করে রাখে। বিকেলে তাদের আত্মীয়স্বজনরা আসে। মাথা নিচু করে লজ্জিত মুখে এই খাবারগুলি তারা খেয়ে ফেলে।
সামান্য খাবার, অথচ কী আগ্রহ করেই–না খায়! বড়াে মায়া লাগে মিসির আলির। কতবার নিজের খাবার ওদের দিয়ে দিয়েছেন। ওরা কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়েছে।
আজকের নাশতা মিসির আলি মুখে দিতে পারলেন না। পাউরুটিতে কামড় দিতেই বমি ভাব হল। এক চুমুক দুধ খেলেন। কলার খােসা ছাড়ালেন, কিন্তু মুখে দিতে পারলেন না। শরীর সত্যি–সত্যি বিদ্রোহ করেছে।
খাবার নিয়ে যে এসেছে, সে তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ চোখে। রুগী খাবার খেতে পারছে না, এই দৃশ্য নিশ্চয়ই তার কাছে নতুন নয়।
Read more
