অতিপ্রাকৃত গল্পে গল্পের চেয়ে ভূমিকা বড় হয়ে থাকে। গাছ যত–না বড়, তার ডালপালা তার চেয়েও বড়। এই গল্পেও তাই হবে। একটা দীর্ঘ ভূমিকা দিয়ে শুরু করব। পাঠকদের অনুরােধ করছি তাঁরা যেন ভূমিকাটা পড়েন। এর প্রয়ােজন আছে।
আমার মামাতাে ভাইয়ের বিয়ে।
বাবা–মার একমাত্র ছেলে, দেখতে রাজপুত্র না হলেও বেশ সুপুরুষ। এম এ পাস করেছে। বাবার ব্যবসা দেখাশােনা করা এবং গ্রুপ থিয়েটার করা—এই দুইয়ে তার কর্মকাণ্ড সীমিত। বাবা–মা’র একমাত্র ছেলে হলে যা হয় বিয়ের জন্যে অসংখ্য মেয়ে দেখা হতে লাগল। কাউকেই পছন্দ হয় না। কেউ বেশি লম্বা, কেট বেশি বেঁটে, কেউ বেশি ফর্সা, কেউ বেশি কথা বলে, আবার কেউ–কেউ দেখা গেল কম কথা বলে। নানান ফ্যাকড়া।। শেষ পর্যন্ত যাকে পছন্দ হল, সে–মেয়ে ঢাকা ইডেন কলেজে বিএ পড়ে ইতিহাসে অনার্স! মেয়ের বাবা নেই। মা‘র অন্য কোথায় বিয়ে হয়েছে। মেয়ে তার বড়চাচার বাড়িতে মানুষ। তিনিই তাকে খরচপত্র দিয়ে বিয়ে দিচ্ছেন।
আমার মামা এবং মামী দু জনের কেউই এই বিয়ে সহজভাবে নিতে পারলেন না। যে–মেয়ের বাবা নেই, মা আবার বিয়ে করেছে—পাত্রী হিসেবে সে তেমন কিছুনা। তা ছাড়া সে খুব সুন্দরীও না। মােটামুটি ধরনের চেহারা। আমার মামাতাে ভাই তবু কেন জানি একবারমাত্র এই মেয়েকে দেখেই বলে দিয়েছে—এই মেয়ে ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করবে না। মেয়ের বাবা নেই তো কী হয়েছে? সবার বাবা চিরকাল থাকে নাকি? মেয়ের মা’র বিয়ে হয়েছে, তাতে অসুবিধাটা কী? অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন, তাঁর তাে বিয়ে করাই উচিত। এমন তাে না যে, দেশে বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ।
বৃহন্নলা-পর্ব-(১)
মামা–মামীকে শেষ পর্যন্ত মত দিতে হল, তবে খুব খুশিমনে মত দিলেন না, কারণ মেয়ের বড়চাচাকেও তাঁদের খুবই অপছন্দ হয়েছে। লােকটা নাকি অভদ্রের চুড়ান্ত। ধরাকে সরা জ্ঞান করে। চামার টাইপ।
বিয়ের দিন তারিখ হল।
এক মঙ্গলবার কাকডাকা ভােরে আমরা একটা মাইক্রোবাস এবং সাদা রঙের টয়ােটায় করে রওনা হলাম। গন্তব্য ঢাকা থেকে নব্বই মাইল দূরের এক মফস্বল শহর। মফস্বল শহরের নামটা আমি বলতে চাচ্ছি না। গল্পের জন্যে সেই নাম জানার প্রয়ােজনও নেই।
তেত্রিশ জন বরযাত্রী। অধিকাংশই ছেলেছােকরা। হৈচৈয়ের চূড়ান্ত হচ্ছে। এই মাইক বাজছে, এই মাইক্রোবাসের ভেতর ব্রেক ডান্স হচ্ছে, এই পটকা ফুটছে। ফাঁকা রাস্তায় এসে মাইক্রোবাসের গিয়ারবক্সে কী যেন হল। একটু পরপর বাস থেমে যায়। সবাইকে নেমে ঠেলতে হয়। বরযাত্রীদের উৎসাহ তাতে যেন আরাে বাড়ল। শুধু আমার মামা অসম্ভব গম্ভীর হয়ে পড়লেন। আমাকে ফিসফিস করে বললেন, এটা হচ্ছে অলক্ষণ। খুবই অলক্ষণ। রওনা হবার সময় একটা খালি জগ দেখেছি, তখনি মনে হয়েছে একটা কিছু হবে। গিয়ারবক্স গেছে, এখন দেখবি চাকা পাংচার হবে। না হয়েই পারে না।‘
হলও তাই। একটা কালভার্ট পার হবার সময় চাকার হাওয়া চলে গেল। মামা বললেন, ‘কি, দেখলি? বিশ্বাস হল আমার কথা ? এখন বসে–বসে আঙুল চোষ।
স্পেয়ার চাকা লাগতেও অনেক সময় লাগল। মামা ছাড়া অন্য কাউকে বিচলিত হতে দেখলাম না। বরযাত্রীদের উৎসাহ মনে হল আরাে বেড়েছে। চিৎকার হৈচৈ হচ্ছে। একজন গান গাওয়ার চেষ্টা করছে। শুধুমাত্র বিয়েবাড়িতে পৌছানাের পরই সবার উৎসাহে খানিকটা ভাটা পড়ল।
বৃহন্নলা-পর্ব-(১)
মফস্বল শহরের বড় বাড়িগুলি সাধারণত যে–রকম হয়, সে–রকম একটা পুরনাে ধরনের বাড়ি। এইসব বাড়িগুলি এমনিতেই খানিকটা বিষন্ন প্রকৃতির হয়। এই বাড়ি দেখে মনে হল বিরাট একটা শশাকের বাড়ি। খাঁ–খাঁ করছে চারদিক। লােকজন নেই। কলাগাছ দিয়ে একটা গেটের মতাে করা হয়েছে, সেটাকে গেট না–বলে গেটের প্রহসন বলাই ভালাে। একদিকে রঙিন কাগজের চেইন, অন্য দিকে খালি। হয় রঙিন কাগজ কম পড়েছে, কিংবা লােকজনের গেট প্রসঙ্গে উৎসাহ শেষ হয়ে গেছে। আমার মামা হতভম্ব। বরযাত্রীরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ব্যাপারটা কি?
হাফশার্ট–পরা এক চ্যাংড়া ছেলে এসে বলল, ‘আপনারা বসেন। বিশ্রাম করেন।
আমি বললাম, আর লােকজন কোথায়? মেয়ের বড়চাচা কোথায়?‘ সেই ছেলে শুকনাে গলায় বলল, ‘আছে, সবাই আছে। আপনারা বিশ্রাম করেন।
আমি বললাম, ‘কোনাে সমস্যা হয়েছে? সেই ছেলে ফ্যাকাসে হাসি হেসে বলল, ‘জ্বি–না, সমস্যা কিসের?‘ এই বলেই সে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। আর বেরুল না!
বসার ঘরে চাদর পেতে বরযাত্রীদের বিশ্রামের ব্যবস্থা। বারান্দায় গােটা দশেক ফোল্ডিং চেয়ার। বিয়েবাড়ির সজ্জা বলতে এইটুকুই।
মামা বললেন, ‘বলেছিলাম না অলক্ষণ? এখন বিশ্বাস হল ? কী কাণ্ড হয়েছে কে জানে! আমার তাে মনে হয় বাড়িতে মেয়েই নেই। কারাের সঙ্গে পালিয়েটালিয়ে গেছে। মুখে জুতাের বাড়ি পড়ল, স্রেফ জুতাের বাড়ি।
বৃহন্নলা-পর্ব-(১)
মামা অল্পতেই উত্তেজিত হন। গত বছর তাঁর ছােটখাটো স্ট্রোক হয়ে গেছে। উত্তেজনার ব্যাপারগুলি তাঁর জন্যে ক্ষতির কারণ হতে পারে। আমি মামাকে সামলাতে চেষ্টা করলাম। হাসিমুখে বললাম, ‘হাত–মুখ ধুয়ে একটু শুয়ে থাকুন তাে মামা। আমি খােজ নিচ্ছি কী ব্যাপার।‘ মামা তীব্র গলায় বললেন, ‘হাত–মুখটা খােব কী দিয়ে, শুনি? হাত–মুখ ধােবার পানি কেউ দিয়েছে? বুঝতে পারছিস না? এরা বেইজ্জতির চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে।
কী যে বলেন মামা!
কথা যখন অক্ষরে–অক্ষরে ফলবে, তখন বুঝবি কী বলছি। কাপড়চোপড় খুলে ন্যাংটো করে সবাইকে ছেড়ে দেবে। পাড়ার লােক এনে ধােলাই দেবে। আমার কথা বিশ্বাস না–হয়, লিখে রাখ।
মামার কথা শেষ হবার সঙ্গে–সঙ্গেই খালিগায়ে নীল লুঙ্গি–পরা এক লােক প্লাস্টিকের বালতিতে করে এক বালতি পানি এবং একটা মগ নিয়ে ঢুকল। পাথরের মতাে মুখ করে বলল, ‘হাত–মুখ ধােন। চা আইতাছে।
মামা বললেন, ‘খবরদার কেউ চা মুখে দেবে না, খবরদার! দেখি ব্যাপার কী।
ভেতরবাড়ি থেকে কান্নার শব্দ আসছে। বিয়েবাড়িতে কান্না কোনাে অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু এই কান্না অস্বাভাবিক লাগছে। মধ্যবয়স্ক এক লােক এক বিশাল কেটলিতে করে চা নিয়ে ঢুকল!! আমি তাঁকে বললাম, ব্যাপার কী বলেন তাে ভাই? সেই লােক বলল, ‘কিছু না। ভেতরবাড়ির কান্না এই সময় তীব্র হল। কান্না এবং মেয়েলি গলায় বিলাপ। কান্না যেমন হঠাৎ তুঙ্গে উঠেছিল, তেমনি হঠাৎই নেমে গেল। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মেয়ের বড়ােচাচা ঢুকলেন।
বৃহন্নলা-পর্ব-(১)
ভদ্রলােককে দেখেই মনে হল তার ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। তিনি নিচু গলায় যা বললেন, তা শুনে আমরা স্তম্ভিত। কী সর্বনাশের কথা ! জানলাম যে কিছুক্ষণ আগেই তাঁর বড়ছেলে মারা গেছে। অনেক দিন থেকেই অসুখে ভুগছিল। আজ সকাল থেকে খুব বাড়াবাড়ি হল। সব এলােমেলাে হয়ে গেছে এই কারণেই। তিনি তার জন্যে লজ্জিত, দুঃখিত ও অনুতপ্ত। তবে যত অসুবিধাই হােক— বিয়ে হবে। আজ রাতে সম্ভব হবে না, পরদিন।
Read more
