বৃহন্নলা-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

বৃহন্নলা-পর্ব-৫

এই কথা বলতেবলতে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। 

আমার মামা খুবই আবেগপ্রবণ মানুষঅল্পতে রাগতেও পারেন, আবার সেই রাগ হিমশীতল পানিতে রূপান্তরিত হতেও সময় লাগে নাতিনি মেয়ের বড়চাচাকে জড়িয়ে ধরে নিজেও কেঁদে ফেললেনকাতর গলায় বললেন, আপনি আমাদের নিয়ে মােটেও চিন্তা করবেন নাআমাদের কিচ্ছু লাগবে না, আপনি বাড়ির ভেতরে যান বেয়াই সাহেব। 

অদ্ভুত একটা অবস্থা! এর চেয়ে যদি শুনতাম মেয়ে পালিয়ে গেছে, তাও ভালাে ছিলকারাে ওপর রাগ ঢেলে ফেলা যেত। 

আমরা বরযাত্রীরা খুবই বিব্রত বােধ করছিস্থানীয় লােকজন এখন দেখতে পাচ্ছি। 

তারা বােধহয় এতক্ষণ ভেতরের বাড়িতে ছিলেনআমরা বসার ঘরেই আছিখিদেয় একেক জন প্রায় মরতে বসেছিখাবার কোনাে ব্যবস্থা হচ্ছে কি না বুঝতে পারছি নাএই পরিস্থিতিতে খাবারের কথা জিজ্ঞেসও করা যায় নাএকজন মামাকে কানে কানে এই ব্যাপারে বলতেই তিনি রাগী গলায় বললেন, তােমাদের কি মাথাটাথা খারাপ হয়েছেএত বড় একটা শশাকের ব্যাপার, আর তােমরা খাওয়ার চিন্তায় অস্থির! ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! এক রাত না খেলে হয় কী? খবরদার, আমার সামনে কেউ খাবারের কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করবে না‘ 

আমরা চুপ করে গেলামবারতের বছরের ফুটফুটে একটি মেয়ে এসে পানভর্তি একটা পানদান রেখে গেল। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটি চোখ ফুলিয়ে ফেলেছেএখনও কাঁদছে। 

বৃহন্নলা-পর্ব-(২)

মামা মেয়েটিকে বললেন, লক্ষ্মী সােনা, তােমাদের মােটেই ব্যস্ত হতে হবে নাআমাদের কিছুই লাগবে নারাত আটটার দিকে থাকা এবং খাওয়ার সমস্যার একটা সমাধান হলস্থানীয় লােকজন ঠিক করলেন, প্রত্যেকেই তাঁদের বাড়িতে একজনদুজন করে গেস্ট নিয়ে যাবেনবিয়ে হবে পরদিন বিকেলে

আমাকে যিনি নিয়ে চললেন, তাঁর নাম সুধাকান্ত ভৌমিকভদ্রলােকের বয়স ষাটের কাছাকাছি হবেবেঁটেখাটো মানুষশক্তসমর্থ চেহারাএই বয়সেও দ্রুত হাঁটতে পারেনভদ্রলােক মৃদুভাষীমাথার চুল ধবধবে সাদাগেরুয়া রঙের একটা চাদর দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন বলেই কেমন যেন ঋষিঋষি লাগছে। 

আমি বললাম, সুধাকান্তবাবু, আপনার বাসা কত দূর? উনি বললেন, কাছেই। 

গ্রাম এবং মফস্বলের লােকদের দূরত্ব সম্পর্কে কোনাে ধারণা নেইতাদের কাছেইআসলে দিল্লি হনুজ দূর অস্তের মতােআমি হাঁটছি তাে হাঁটছিই। 

অগ্রহায়ণ মাসগ্রামে এই সময়ে ভালাে শীত থাকেআমার গায়ে পাতলা একটা পাঞ্জাবিশীত ভালােই লাগছে। 

আমি আবার বললাম, ভাই, কত দূর? কাছেই। 

আমরা একটা নদীর কাছাকাছি এসে পড়লামআঁতকে উঠে বললাম, নদী পার হতে হবে নাকি

পানি নেই, জুতাে খুলে হাতে নিয়ে নিন। 

রাগে আমার গা জ্বলে গেলএই লােকের সঙ্গে আসাই উচিত হয় নিআমি জুতে খুলে পায়জামা গুটিয়ে নিলামহেঁটে নদী পার হওয়ার কোনাে আনন্দ থাকলেও থাকতে পারেআমি কোনাে আনন্দ পেলাম না, শুধু ভয় হচ্ছে কোনাে গভীর খানাখন্দে পড়ে যাই কি নাতবে নদীর পানি বেশ গরম। 

বৃহন্নলা-পর্ব-(২)

সুধাকান্তবাবু বললেন, আপনাকে কষ্ট দিলাম। 

ভদ্রতা করে হলেও আমার বলা উচিত, না, কষ্ট কিসের!তা বললাম নানদী পার হয়ে পায়জামা নামাচ্ছি, সুধাকান্তবাবু বললেন, আপনি ছেলের কে হন

ফুপাতাে ভাইবিয়েটা নাহলে ভালাে হয়সকালে সবাইকে বুঝিয়ে বলবেন। 

সে কী! মেয়েটার কারণে ছেলেটা মরলএখন চট করে বিয়ে হওয়া ঠিক নাকিছুদিন যাওয়া উচিত‘ 

কী বলছেন সব! ছেলেটা সকালবেলা বিষ খেয়েছেধুতরা বীজএই অঞ্চলে ধুতরা খুব হয়। 

আপনি বলছেন কী ভাই?ছেলের বাবা রাজি হলেই পারতছেলেটা বাঁচতগোঁয়ারগগাবিন্দ মানুষতার নামানেই না। 

ছেলেমেয়ের এই প্রেমের ব্যাপারটা সবাই জানে নাকি?জানবে না কেন? মফস্বল শহরে এইসব চাপা থাকে নাআপনাদের শহরে অন্য কথাআকছার হচ্ছে। 

আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলকী সমস্যা! বাকি পথ দুজন নীরবে পার হলাম। 

পুরােপুরি নীরব বলাটা বােধহয় ঠিক হল নাভদ্রলােক নিজের মনেই মাঝে মাঝে বিড়বিড় করছিলেনমন্ত্রটন্ত্র পড়ছেন বােধহয়ভদ্রলােকের বাড়ি একেবারে জঙ্গলের মধ্যেএকতলা পাকা দালানপ্রশস্ত উঠোনউঠোনের মাঝখানে তুলসী মঞ্চবাড়ির লাগােয়া দুটি প্রকাণ্ড কামিনী গাছএকপাশে কুয়া আছেহিন্দু বাড়িগুলাে যেমন থাকে, ছবির মতাে পরিচ্ছন্নউঠোনে দাঁড়াতেই মনে শান্তিশান্তি একটা ভাব হলআমি বললাম, এত চুপচাপ কেন? বাড়িতে লােকজন নেই

বৃহন্নলা-পর্ব-(২)

আপনি একা নাকি?” 

বলেন কী! একাএকা এত বড় বাড়িতে থাকেন। 

আগে অনেক লােকজন ছিলকিছু মরে গেছেকিছু চলে গেছে ইণ্ডিয়াতেএখন আমি একাই আছিআপনি স্নান করে ফেলুন। 

স্নানফান লাগবে নাআপনি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করুন, তাহলেই হবেএকটু সময় লাগবে, রান্নার জোগাড় করতে হবে। 

আপনি কি এখন রান্না করবেন? রান্না না করলে খাবেন কী ? বেশিক্ষণ লাগবে নাভদ্রলােক গামছা, সাবান এবং একটা জলচৌকি এনে কুয়ার পাশে রাখলেন। 

স্নান করে ফেলুনসারা দিন জার্নি করে এসেছেন, স্নান করলে ভালাে লাগবেকুয়ার জল খুব ভালােদিন, আমি জল তুলে দিচ্ছি‘ 

আপনাকে তুলতে হবে নাআপনি বরং রান্না শুরু করুনখিদেয় চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে। 

এই লুঙ্গিটা পরুনপােয়া আছেআজ সকালেই সােডা দিয়ে ধুয়েছিআমার 

আবার পরিষ্কার থাকার বাতিক আছে, নােংরা সহ্য করতে পারি না। 

ভদ্রলােক যে নােংরা সহ্য করতে পারেন না, তা পরিষ্কার বােঝা যাচ্ছেতিনি রান্না করতে বসেছেন উঠোনেউঠোনেই পরিষ্কার ঝকঝকে দুটো মাটির চুলাসুধাকান্তবাবু চুলার সামনে জলচৌকিতে বসেছেনথালা, বাটি, হাঁড়ি সবই দেখি দুবার তিন বার করে ধুচ্ছেন। 

বৃহন্নলা-পর্ব-(২)

সুধাকান্তবাবু? বলুন  আপনি বিয়ে করেন নি

চিরকুমার?” 

আর কিআপনি করেন কী

শিক্ষকতা করিহাই স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক! মনােহরদি হাই স্কুলরান্নাবান্না আপনি নিজেই করেন

হ্যা, নিজেই করিএক বেলা রান্না করিএক বেলা ভাত খাই, আর সকালে চিড়া, ফলমূলসব খাই। 

কাজের লােক রাখেন না কেন

দরকার পড়ে নাখালি বাড়ি পড়ে থাকে, চুরি হয় না

‘না। চোর নেবে কী? আমি এক জন দরিদ্র মানুষআপনি স্নান করে নিনস্নান করলে ভালাে লাগবে।’ 

অপরিচিত জায়গায় ঠাণ্ডার মধ্যে গায়ে পানি ঢালার আমার কোনােই ইচ্ছে ছিল কিন্তু সুধাকান্তবাবু মনে হচ্ছে আমাকে না ভিজিয়ে ছাড়বেন নালােকটি সম্ভবত শুচিবাইগ্রস্ত। 

 

Read more

বৃহন্নলা-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *