বলপয়েন্ট পর্ব-০৩ হুমায়ূন আহমেদ

বলপয়েন্ট

ছফা ভাই বাইরে-বাইরেই থাকতেন, রাতে এসে শুধু ঘুমাতেন। বেশির ভাগ সময় বাইরে থেকে খেয়ে আসতেন।অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া পরিবারটির ওপর বাড়তি চাপ হয়তো দিতে চান নি।প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ছফা ভাই কিছু সময় মা’র সঙ্গে কাটাতেন। গত রাতে যেসব স্বপ্ন দেখেছেন তা মাকে বলতেন। মার দায়িত্ব স্বপ্ন ব্যাখ্যা করা।

আমার ধারণা, ছফা ভাই স্বপ্নগুলি বলতেন বানিয়ে বানিয়ে।স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে মাকে খুশি করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। আমার এরকম ধারণা হওয়ার কারণ হলো, ছফা ভাইয়ের স্বপ্নগুলিতে ডিটেলের কাজ খুব বেশি থাকত। স্বপ্নে এত ডিটেল থাকে না। একটা স্বপ্ন বললেই পাঠক বুঝতে পারবেন কাকিমা, কাল রাতে স্বপ্নে দেখলাম দুটা কাক।

একটা বড় একটা ছোট। ছোট কাকটার একটা নখ নেই। তার স্বভাব চড়ুই পাখির মতো। তিড়িং বিড়িং করে সে শুধু লাফায়।বড়টা শান্ত স্বভাবের। সে একটু পর পর হাই তোলার মতো করে। তাদেরকে ধান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ ধান খাচ্ছে না। ধানগুলি ঠোঁটে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিচ্ছে। এখন কাকিমা, বলুন, স্বপ্নটার অর্থ কী? আমি বিরাট চিন্তায় আছি।

বলতে ভুলে গেছি, আমার প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে কিন্তু এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ছফা ভাই। খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানির খান সাহেবকে পাঠিয়ে এই কাজটা করা। তখন তিনি লেখক শিবির নামক সংগঠনের প্রধান। তিনি লেখক শিবির থেকে নন্দিত নরকে উপন্যাসকে বছরের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসাবে পুরস্কারও দিয়ে দিয়েছেন। আমি অতি তরুণ ঔপন্যাসিক। আমার ওপর ছফা ভাইয়ের অনেক আশা।

তার ধারণী, আমি অনেকদূর যাব। তিনি চেষ্টা করছেন আমার অনেকদূর যাত্রার পথ যেন সুগম হয়।ছফা ভাই ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে সিট পেলেন। তিনি উঠে এলেন হোস্টেলে। আমি থাকি মুহসীন হলে। নিয়ম করে আমি এবং আমার বন্ধু আনিস সাবেত প্রতি রাতে তাঁর কাছে যাই। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা হয়। আড্ডা মানে ছফা ভাই কথা বলেন, আমরা দুজন শুনি। শিল্প- সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কথা। তিনি মহাকবি গ্যাটের রচনার বাংলা অনুবাদে হাত দিয়েছেন। অনুবাদ পড়ে শোনান।

একবার তাঁর ঘরে গিয়ে দেখি, তিনি বিশাল এক বাদ্যযন্ত্র কিনেছেন। সেকেন্ডহ্যান্ড জিনিস। দেখতে নিচু আলমারির মতো। ছফা ভাই জানালেন, প্রতি রাতেই তাঁর মাথায় নানা ধরনের সুর আসছে। সুর ধরে রাখার জন্যই এই বাদ্যযন্ত্র।আমি বললাম, ছফা ভাই! আপনি বাজাতে পারেন? ছফা ভাই বললেন, অবশ্যই পারি। তিনি বাদ্যযন্ত্রটার রিড টিপতে লাগলেন। বিচিত্র শব্দ হচ্ছে। তিনি পায়ে তাল দিচ্ছেন এবং মাথা নাড়ছেন।

এই সময় তিনি গান লিখতে শুরু করলেন। গান লিখে সঙ্গে সঙ্গে সুর দিয়ে দেন। আমি এবং আনিস সাবেত অবাক হয়ে সেই সঙ্গীত শুনি।হঠাৎ একদিন শুনি ছফা ভাই দেশে নেই। গাদ্দাফির নিমন্ত্রণে লিবিয়া চলে গেছেন। লিবিয়ায় বেশ কিছুদিন কাটিয়ে দেশে ফিরলেন। তাঁর মাথায় রঙিন গোল টুপি। আমাদের জানালেন, গাদ্দাফি নিজের হাতে তার মাথায় এই টুপি পরিয়ে দিয়েছেন। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গাদ্দাফির গ্রিন বুক অনুবাদের। ছফা

ভাইয়ের অনেক কথাই কল্পনারাজ্যের। তবে এই কথাটা হয়তো ঠিক। ছফা ভাইয়ের হাতে টাকাপয়সার নড়াচাড়া দেখা গেল। তিনি একটা প্রেস কিনে ফেললেন।কিছুদিনের মধ্যেই সেই প্রেস উঠেও গেল। ছফা ভাই কাঁধে একটা টিয়া পাখি নিয়ে ঘুরতে লাগলেন। তিনি নাকি টিয়া পাখির অনেক কথা বুঝতে পারেন।একটা পর্যায়ে আমার ক্ষীণ সন্দেহ হওয়া শুরু হলো যে, তিনি যে জগতে বাস করেন তা সম্পূর্ণই তাঁর নিজের।বাস্তব জগৎ থেকে অনেকটা দূরের। তাঁর রিয়েলিটি এবং আমাদের রিয়েলিটি এক নয়।

কারো যখন মোহভঙ্গ হয় তখন অতি দ্রুতই হয়। আমি তার বলয় থেকে সরে গেলাম। আনিস সাবেত পিএইচডি করার জন্য আমেরিকা চলে গেলেন।ছফা ভাই তার জন্য নতুন বলয় তৈরি করলেন। তিনি শূন্যস্থান পছন্দ করেন না। ছফা ভাইকে নিয়ে আমার অসংখ্য স্মৃতি আছে। তার ওপর দুশ’ পাতার একটা বই আমি অবশ্যই লিখতে পারি। এখানে একটি স্মৃতি উল্লেখ করছি। ১৯৮৫ বা ৮৬ সালের কথা। এতদিন লেখালেখির জগতে থেকেও ছফা ভাই বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান নি। আমি পেয়েছি অথচ ছফা ভাই পান নি, খুবই লজ্জিত বোধ করি। কীভাবে কীভাবে আমি তখন বাংলা একাডেমীর কাউন্সিলারদের একজন।

পুরস্কার কমিটিতে আছি। আমি জোরালোভাবে ছফা ভাইয়ের পুরস্কারের ব্যাপারটা বললাম। যথারীতি তা নাকচও হয়ে গেল। আমি ছফা ভাইয়ের জন্য সুপারিশ করেছি—এই খবর ছফা ভাইয়ের কানে পৌঁছল। তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তার বাসায় উপস্থিত হলাম। তিনি বললেন, হুমায়ুন, আপনার এত বড় স্পর্ধা যে আপনি আমার জন্য সুপারিশ করেন! আমি চেয়ারে বসেছিলাম। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম।ছফা ভাই বললেন, আমি বসতে না বলা পর্যন্ত এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন।আমি বললাম, জি আচ্ছা।আপনি আর কখনোই আমার বাসায় আসবেন না। আমি বললাম, জি আচ্ছা।

ছফা ভাইয়ের সঙ্গে এটাই সম্ভবত আমার শেষ দেখা। ভুল বললাম, আনিস সাবেত ক্যান্সারে মারা যাওয়ার সংবাদ দিতে আমি আরো একবার তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। তিনি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকার পর ‘আনিসরে’ ‘আনিসরে’ বলে চিৎকার করে কাঁদলেন। কান্না বন্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর নিজের ভুবনে ঢুকে গেলেন। চলে গেলেন রিয়েলিটির বাইরে। আনিস সাবেত ট্রাস্টি বোর্ড করতে হবে। সেই ট্রাস্টি দুস্থ লেখকদের বৃত্তি দেবে। দরিদ্র লেখকদের বই প্রকাশনার দায়িত্ব নেবে। ট্রাস্ট ফান্ড একটা আধুনিক স্কুল করবে টোকাইদের জন্য।

তিনি কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেলেন ট্রাস্টি বোর্ডের পরিচালক কারা কারা থাকবেন তাদের নাম লেখার জন্য। ট্রাস্টি বোর্ডের নীতিমালাও লিখতে হবে। তাঁকে দারুণ উত্তেজিত মনে হলো। তিনি লিখছেন, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছি অন্যভুবনের মানুষটিকে।আমাকে নিয়ে ছফা ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। আমি তাঁর কোনোটাই পূরণ করতে পারি নি। এত মেধা আমার ছিল না। প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা বৃত্ত থাকে। কেউ সেই বৃত্তের বাইরে যেতে পারে না। আমিও পারি নি। ছফা ভাই নিজেও পারেন নি। তাকে বন্দি থাকতে হয়েছে নিজের বৃত্তেই।

Why do people always expect authors to answer questions? I

am an author because I want to ask questions. If I had

answers I’d be a politician.

—Eugene Lonesco

খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানির মালিক খান সাহেব আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাকে যথেষ্ট বিরক্ত মনে হলো। তিনি নন্দিত নরকে উপন্যাসের প্রুফ আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, বই হোট হয়েছে। বড় করতে হবে।আমি বললাম, আমার গল্পটাই তো এতটুকু।

খান সাহেব বললেন, উপন্যাস ফর্মা হিসেবে লিখতে হয়।ফর্মা বুঝেন তো? ষোল পৃষ্ঠায় এক ফর্মা। আপনি একটা উপন্যাস লিখলেন তিন ফর্মা নয় পৃষ্ঠা। বাকি সাত পৃষ্ঠায় আমি কী করব? কাগজ-কলম নিয়ে বসেন। এখানেই ঠিক করেন।আমি বললাম, কোন জায়গাটা বড় করব বুঝতে পারছি না! খান সাহেব বললেন, একটা কোর্ট সিন নিয়ে আসেন। উকিল মন্টুকে জেরা করছে এই রকম। এই, হুমায়ূন সাহেবকে কাগজ আর কলম দে।আমি খান সাহেবের সামনেই ফর্মা মিলানোর জন্যে উপন্যাস বড় করতে শুরু করলাম।

উত্তেজনায় শরীর কাঁপছে তাহলে সত্যি সত্যি আমার বই বের হচ্ছে? বই বের হলো। দাম তিন টাকা। বইয়ের কভার আমার ছোটভাই জাফর ইকবাল এবং ভাস্কর শামীম শিকদার দুজনে মিলে করল। কয়েকজন মানুষ বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। কভার করার নিয়মকানুন (ব্লক পদ্ধতি) দুজনের কেউ জানে না। অতি অখাদ্য এক কভার হলো। মানুষগুলির একটা মুখেরও ব্লক ডিজাইন ঠিক হয় নি বলে নষ্ট হয়ে গেল। খান ব্রাদার্স থেকে তখন সুন্দর সুন্দর কবিতার বই বের হচ্ছে।

নির্মলেন্দু গুণের প্রেমাংশুর রক্ত চাই। কবি আবুল ,হাসানের রাজা যায় রাজা আসে। এইসব বইয়ের কভার করেছেন কভার ডিজাইনের গ্র্যান্ড মাস্টার কাইয়ুম চৌধুরী।নন্দিত নরকে বের হবার ছয় মাস পর খান সাহেব ডেকে পাঠালেন। হতাশ গলায় বললেন, বই তো কিছুই বিক্রি হচ্ছে না। পুশ সেল করেন। বন্ধুবান্ধবের কাছে বেচেন।আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, বইয়ের কভারটা কি চেঞ্জ করা যায়? কাইয়ুম চৌধুরীকে দিয়ে…।

আমাকে অবাক করে খান সাহেব ড্রয়ার থেকে দুশ’ টাকা বের করে আমার হাতে দিলেন এবং বললেন, টাকাটা কাইয়ুম সাহেবকে দিয়ে বইয়ের কভার নতুন করে করতে বলেন। উনি কভারের জন্য দুশ’ টাকা নেন। শুরু হলো আমার অন্তহীন ঘোরাঘুরি। কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে যাই, তিনি একটা তারিখে আসতে বলেন। সেই তারিখে যাই, তিনি আরেকটা তারিখ দেন। ধৈর্যে আমি রবার্ট ব্রুসকে হার মানালাম। হাঁটাহাঁটি করতে করতে আমার স্বাস্থ্য ভালো হয়ে গেল। কভারের দেখা নেই।

একদিন খান সাহেব বললেন, আমি যাব আপনার সঙ্গে।আমি অন্য এক সূত্রে তাকে চিনি। সেটা উল্লেখ করে যদি কিছু হয়। আপনি পুলাপান মানুষ বলে উনি আপনাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। আমি একজন বয়স্ক মানুষ।গেলাম খান সাহেবকে নিয়ে। ঘণ্টাখানিক বসে রইলাম।কাইয়ুম চৌধুরীর বসার ঘরে না। বসার ঘরের বাইরে ছোট্ট একটা ঘরে। কাইয়ুম চৌধুরী খবর পাঠালেন, তিনি একটা ডিজাইন নিয়ে বিশেষ ব্যস্ত। ডিজাইনটা শেষ হলেই আসবেন। আরো দশ-পনেরো মিনিট লাগবে।

দশ-পনেরো মিনিট পর কাইয়ুম চৌধুরী বের হলেন না।ভয়ালদর্শন এক কুকুর বের হয়ে খান সাহেবের পা কামড়ে ধরল। আমি খান সাহেবকে কুকুরের হাতে ফেলে রেখে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম। য পলায়তি স জীবতি।সেই দিনই খান সাহেবকে তার বাসায় দেখতে গেলাম।তিনি বিছানায় পড়ে আছেন। নাভিতে ইনজেকশন শুরু হয়েছে। সান্ত্বনাসূচক কিছু কথা বলা দরকার।

কোনো কথাই মাথায় আসছে না। খান সাহেব বললেন, কাইয়ুম চৌধুরীর হাত থেকে কভারের আশা ছেড়ে দিন। সামান্য কভারের জন্যে কুকুরের হাতে মৃত্যুর। মানে হয় না।আমি বললাম, জি আচ্ছা।খান সাহেব বললেন, আমি আপনার জন্যে দোয়া করলাম, আপনার বই কভার ছাড়া বের হলেও মানুষ যেন কিনে পড়ে।

কাইয়ুম চৌধুরী শেষ পর্যন্ত কভার করে দিয়েছিলেন।অপূর্ব কভার। কভার দেখে খান সাহেব কুকুরের কামড়ের দুঃখ ভুলে গেলেন।কভার ডিজাইন হাতে পাওয়ার দৃশ্যটা বলি। কাইয়ুম চৌধুরী ডিজাইন হাতে বের হয়ে এলেন। আমাকে বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে ছাপতে হবে। আমি বিদায় নিয়ে চলে আসছি, কাইয়ুম চৌধুরী বললেন, একটু দাঁড়ান। আমি দাঁড়ালাম।কাইয়ুম চৌধুরী বললেন, কভারটা করার আগে আপনার উপন্যাসটা আমি পড়েছি। আপনার হবে।

আমি ধন্যবাদসূচক কিছু বলতে যাব তার আগেই তিনি বললেন, সামান্য ভুল বলেছি। আপনার হবে না বলে বলা উচিত আপনার হয়েছে।এই বাক্যটি আমার লেখালেখি জীবনের প্রথম শোনা প্রশংসাসূচক বাক্য। উনিশ-কুড়ি বছরের একজন তরুণকে এই বাক্যটি কী আনন্দই না সেদিন দিয়েছিল।আনন্দের কথা যখন এসেছে, তখন নিরানন্দের কিছু কথা আসুক। Ph.D করে ফিরেছি। পুরোদমে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছি।

অনেকগুলি বই বের হয়ে গেছে। পত্রপত্রিকায় ইন্টারভ্যু দিতে খুবই আগ্রহী। কেউ ইন্টারভ্যু নিতে আসে না। হঠাৎ বিচিত্রা পত্রিকা থেকে ডাক পেলাম। তারা আমাকে এবং সৈয়দ শামসুল হককে নিয়ে একটা কভার স্টোরি করতে চাচ্ছে। দেশের প্রধান ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে তরুণ ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের কথোপকথন। আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়েরাজি হলাম।

বিচিত্রর শাহাদত ভাইয়ের উপস্থিতিতে কথোপকথন শুরু হলো। মডারেটর হচ্ছেন ঔপন্যাসিক মঈনুল আহসান সাবের। সৈয়দ শামসুল হক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হুমায়ুন, বলুন তো আপনার লেখাগুলি সবসময় ফর্মা হিসেবে বের হয় কেন? এরচেয়ে বড়ও হয় না, কমও হয় না। এর কারণটা কী? আমি তাকিয়ে দেখি শাহাদত ভাই মাথা নাড়ছেন। তার মাথা নাড়া থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, তরুণ ঔপন্যাসিক কঠিন পাচে পড়েছে।

আমি হক ভাইকে বললাম, হক ভাই, আপনি তো সনেট লেখেন। সনেটগুলো ১৪ লাইনে শেষ হতে হয়। আপনি যদি আপনার ভাবনা নির্দিষ্ট ১৪ লাইনে শেষ করতে পারেন আমি কেন আমার ভাবনা ফর্মা হিসেবে শেষ করতে পারব না? হক ভাই খানিকটা হকচকিয়ে গেলেন। এই উত্তর তিনি আমার কাছ থেকে আশা করেন নি। শাহাদত ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি আগের চেয়েও দ্রুত মাথা নাড়ছেন। তাঁর এই মাথা নাড়ার অর্থ হক ভাই প্যাঁচে পড়েছেন।লেখালেখির দোহাই, আমি হক ভাইকে প্যাঁচে ফেলতে চাই নি। হক ভাই।

যে প্যাঁচ তৈরি করেছেন, তার ভেতর থেকে বের হতে চেয়েছি। এই মুহূর্তে আমার হাতে হক ভাইয়ের কিছু উপন্যাস আছে। সবগুলিই ফর্মা হিসেবে এসেছে। কিংবা প্রকাশকরা ফর্মা হিসেবে সাজিয়ে নিয়েছেন। নন্দিত নরকে উপন্যাসে ফিরে যাই। হঠাৎ করেই বড় বড় মানুষরা (কবি শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান,..) নন্দিত নরকে নিয়ে লেখা শুরু করলেন। তাঁদের অনেকের লেখাই যথেষ্ট হাস্যকর। যেমন শামসুর রাহমান মৈনাক হিসাবে দৈনিক বাংলায় লিখলেন, শুনেছি বইটা ভালো হয়েছে। পড়ে দেখতে হবে।আমি এতেই খুশি।

এই অবস্থায় বন্ধু আনিস সাবেত উত্তেজিত ভঙ্গিতে আমাকে এসে বললেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তোমাকে নিয়ে দেশ পত্রিকায় লিখেছেন।বলেন কী? পত্রিকা সঙ্গে আছে, পড়ে দেখ। উনি আমার বই কোথায় পেলেন? সেটা তো জানি না। কেউ নিশ্চয়ই তাঁকে দিয়েছে।পত্রিকা ধরে রাখতে পারছি না, হাত কাঁপছে।সনাতন পাঠক ছদ্মনামে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কি সত্যিই নন্দিত নরকে বইটি নিয়ে লিখেছেন? কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?

এই ঘটনার অনেক অনেক বছর পর নুহাশ পল্লীর সুইমিংপুলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে দল বেঁধে আমরা নেমেছি।খুব আনন্দ হচ্ছে। হঠাৎ সুনীল বললেন, হুমায়ুন, আপনার প্রথম বইটি নিয়ে অনেক অনেক বছর আগে দেশ পত্রিকায় আমি একটা লেখা লিখেছিলাম। লেখাটি কি আপনার চোখে পড়েছিল? আমি বললাম, কী লিখেছিলেন সেটা কি আপনার মনে আছে? সুনীল বললেন, অবশ্যই। ঔপন্যাসিকের স্মৃতিশক্তি ভালো থাকতে হয়।

০৭.

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান। তাঁর কাছে কলেজে পড়ুয়া তরুণ এক কবি এসেছে। সেই তরুণ কবি সিরাজ স্যারের সামনে বসতে বসতে বলল, সিরাজ ভাই, আপনার অমুক লেখাটা পড়েছি। ভালো হয়েছে, তবে… সিরাজ স্যার তার উত্তরে বললেন,.. কী বললেন, সেটা আর উল্লেখ করলাম না। কারণ তা সিরাজ স্যারের চরিত্রের সঙ্গে যায় না।

আমার ধারণী গল্পটা বানানো। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের নিয়ে অনেক বানানো গল্প চালু আছে। পাঠক কি লক্ষ করছেন যে, আমি কৌতূহল জাগ্রত করে দূরে সরে গেছি। সিরাজ স্যার কী বললেন তা জানার আগ্রহ তৈরি করেছি, আগ্রহ মেটানোর ব্যবস্থা করি নি।আমি একজন Fiction writer. ফিকশন লেখার একটা ছোট্ট টেকনিক ব্যবহার করলাম। প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পাঠকের আগ্রহ যেন থাকে। সে যেন কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করে।

পাঠকের কিছু কৌতূহল মেটানো হবে। কিছু মেটানো হবে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় —‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে…’ Fiction writing-এ তৃপ্তির চেয়ে অতৃপ্তি গুরুত্বপূর্ণ।সর্বনাশ! আমি দেখি উপদেশমূলক রচনা শুরু করেছি।ফিকশন রাইটিংয়ের নিয়মকানুন শেখানো আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। ঔপন্যাসিক হবার আগ্রহ নিয়ে অনেকেই আসে আমার কাছে। গভীর আগ্রহে জানতে চায় লেখালেখির নিয়মকানুন।

আমি তাদের তেমন কিছুই বলতে পারি না। ক্রিয়েটিভিটি শেখানোর কলাকৌশল এখনো মানুষের আয়ত্তে আসে নি। আমার ধারণা ক্রিয়েটিভিটি শেখানো যায় না। যদি শেখানো যেত তাহলে রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় লেখকের নাম হতো রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের ছেলে।বাবার কাছ থেকে লেখালেখির সব কৌশল শিখে নেওয়ার সুযোগ তারই সবচেয়ে বেশি ছিল।

সিরাজুল ইসলাম স্যারকে নিয়ে শুরুতে যে গল্প ফেঁদেছি তার ভেতরে আছে বিশ্বাসযোগ্যতা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং হাঁটুর বয়েসি অনেক তরুণ লেখককে আমি নিজে সিরাজ ভাই সিরাজ ভাই করতে শুনেছি।আসল কথা, ফিকশন রাইটারের ফিকশন বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য একটা ঘটনার এমন বর্ণনা হতে হবে, যেন মনে হয়—এটাই তো হবে। অবিশ্বাস্য ঘটনার বিশ্বাস্য রূপের প্রথম পরিচয় পেলাম আমি যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র তখন। ঘটনাটা বলি।

কলেজ ছুটি হয়েছে। আমি কলেজ থেকে যাচ্ছি নানাবাড়িতে—মোহনগঞ্জে (নেত্রকোনা)। গৌরীপুর জংশনে ট্রেন বদল করতে হয়। পাঁচ থেকে ছ’ঘণ্টার যাত্রাবিরতি। সময় কাটানোর জন্য কিছু বই কিনে নিয়ে গেছি। মস্কোর প্রগতি প্রকাশনীর বই। বইগুলো দামে খুব সস্তা। সুন্দর কাগজ, ঝকঝকে ছাপা। একটি গল্প পড়তে শুরু করেছি—গল্পের নাম ‘হৈটি টৈটি’ অদ্ভুত নাম দেখে এই গল্পটি প্রথম পড়ার জন্য বাছলাম। লেখকের নাম খুব সম্ভব

আলেকজান্ডার বেলায়েভ (খুব সম্ভব বলছি, কারণ চল্লিশ বছর আগের স্মৃতি। ঝাপসা হয়ে আসছে।) গল্পে একটা মানুষের মাথায় হাতির ব্রেইন ট্রান্সপ্লান্ট করে দেয়া হয়। মানুষটি সম্পূর্ণ বদলে যায়, কারণ তার জগৎ হয়ে যায় হাতির জগৎ। তার স্মৃতি হাতির স্মৃতি।সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য গল্প। অথচ কী উপস্থাপনা! লেখক যা লিখছেন মনে হচ্ছে সবই সত্যি। কোথাও সামান্য অতিকথন পর্যন্ত নেই। এ ধরনের গল্প তো আগে পড়ি নি।

উত্তেজনায় আমার হাত-পা কাঁপা শুরু হলো। গল্প শেষ হবার পর আবার প্রথম থেকে পড়া শুরু করলাম। সায়েন্স ফিকশন নামক নতুন একধরনের রচনা পড়ার সেটাই শুরু। কী অপূর্ব শুরু! গৌরীপুর জংশনের কোলাহল। ট্রেনের আসা যাওয়া। ট্রেন চলে যাবার পর পর হঠাৎ কিছুক্ষণের নীরবতা। তার মধ্যে আমার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর প্রথম পাঠ।

পড়ার জন্য সায়েন্স ফিকশনের বই খুঁজি। পাই না। এই ধরনের রচনার লেখকের সংখ্যা হাতেগোনা। এসিমভ, লেরি নিভেন, আর্থার সি ক্লার্কের নাম তখনো শুনি নি। একদিন হাতে এল উভচর মানব নামের আরেকটি রচনা। কী অদ্ভুত উপন্যাস! সায়েন্স ফিকশন ঢুকে গেল আমার রক্তে তার ফলাফল হলো আমার তৃতীয় প্রকাশিত উপন্যাসটি একটি সায়েন্স ফিকশন।

নাম তোমাদের জন্যে ভালোবাসা। অঙ্কের গ্রান্ডমাস্টার ফিহাকে নিয়ে কাহিনী। ভূঁইয়া ইকবাল সম্পাদিত বিজ্ঞান সাময়িকী সাপ্তাহিক পত্রিকায় আমার এই উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে আবার ছাপাও হয়েছে। বই আকারে প্রকাশের সময় একটি নির্ঘন্ট যুক্ত করে দিয়েছি। আমার ভয় ছিল পাঠকরা নতুন নতুন শব্দ এবং ধারণা ঠিক বুঝতে পারবে না। যেমন— নিওরোন : মস্তিষ্কের যেসব কোষে স্মৃতি সজ্জিত থাকে।

দ্বৈত অবস্থানবাদ : একই সময়ে একই স্থানে দুটি বস্তুর উপস্থিতির সম্ভাবনা সম্পর্কীয় সূত্র। (কাল্পনিক) NGC 1303 : দূরবর্তী কোয়াজার। (কাল্পনিক) সিলঝিন : ১১৯তম ধাতু সিলঝিনিয়াম ও এক্টিনিয়ামের সংমিশ্রণে তৈরি বিশেষ ঘাতসহ সঙ্কর ধাতু। (কাল্পনিক) বই প্রকাশের সময় কভার নিয়ে একটা সমস্যা হলো। এ ধরনের বইয়ের কভার কী হবে কেউ বুঝতে পারছে না। শেষে দৈনিক বাংলার শিল্পী কালাম মাহমুদ (এখন প্রয়াত) একটা কভার করেন—কিছু চক্র, কিছু চতুর্ভুজ দিয়ে এক ধরনের খিচুড়ি। যার সঙ্গে বইয়ের কাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই।

তোমাদের জন্যে ভালোবাসা নিয়ে বিতং করে অনেক কিছু লিখলাম। কারণ নানান আলোচনায় দেখছি লেখা হচ্ছে তোমাদের জন্যে ভালোবাসা বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম সায়েন্স ফিকশন। বাংলা ভাষার কথা বলতে পারছি না, তবে বাংলাদেশে এটিই প্রথম প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। এই বা কম কী? আমার ছোটভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল এরপর সায়েন্স ফিকশন লেখায় হাত দেয় এবং চমৎকার কিছু লেখা লেখে।

তার বেশির ভাগ সায়েন্স ফিকশন হলো হার্ডকোর জেনারের অর্থাৎ বিজ্ঞানের সূত্র যেখানে নিখুঁতভাবে মানা হয়। বাংলাদেশের অনেক পাঠকের মতো আমিও আমার ছোটভাইয়ের হার্ডকোর সায়েন্স ফিকশনের ভক্ত। যেসব পাঠক আমার লেখা সায়েন্স ফিকশনের সঙ্গে পরিচিত না, তাদের জন্য একটি গল্প দিয়ে দিচ্ছি। গল্পটি পূর্বপ্রকাশিত। অঁহক ইন্টার গ্যালাকটিক স্পেসশিপগুলির পরিচালনা নীতিমালায় তিনটি না-সূচক সাবধান বাণী আছে। স্পেসশিপের ক্যাপ্টেনকে এই তিন ‘না’ মেনে চলতে হবে।

১. স্পেসশিপ কখনো নিউট্রন স্টারের কলয়ের ভেতর দিয়ে যাবে না।

২. ব্ল্যাকহোলের বলয়ের ভেতর দিয়ে যাবে না।

৩. অঁহক গোষ্ঠীর সীমানার কাছাকাছি যাবে না।

ভুলক্রমে যদি চলে যায়, অতি দ্রুত বের হয়ে আসবে।সমস্যা হলো নিউট্রন স্টার এবং ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব আগেভাগে টের পাওয়া যায়। সময়মতো ব্যবস্থা নেয়া যায়।কিন্তু অঁহকদের ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগেভাগে তাদের উপস্থিতি জানার কোনো উপায় নেই।অথচ অঁহকরা মহাশূন্যের বুদ্ধিমান প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু।

বিপদগ্রস্ত মহাশূন্যযানের সাহায্যের জন্যে অতি ব্যস্ত। তাদের কর্মক্ষমতাও অসাধারণ। যে- কোনো যন্ত্রাংশ তারা অতি দ্রুত ঠিক করতে পারে। এই অনন্ত মহাবিশ্বের যে-কোনো শ্রেণীর প্রাণীর যে- কোনো ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিক করে ফেলতে পারে। তারপরেও এদের কাছে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ।এদেরকে ব্ল্যাকহোল কিংবা নিউট্রন স্টারের মতোই বিপদজনক ভাবা হয়।অঁহকদের সম্পর্কে পরিপূর্ণ কোনো তথ্য কোথাও নেই।

গ্যালাকটোপিডিয়াতে লেখা আছে— অঁহক অতি উন্নত বুদ্ধিমত্তার প্রাণী। ছোট ছোট দলে এরা অনন্ত মহাশূন্যে ভেসে বেড়ায়। অসংখ্য বাহু বিশিষ্ট প্রাণী। এদের খাদ্যগ্রহণ পদ্ধতি অজ্ঞাত। ধারণা করা হয় এরা খাদ্য গ্রহণ করে না। মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে এরা প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করে। অন্যসব বুদ্ধিমান প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে চায়। তবে বিপদগ্রস্ত প্রাণীদের সাহায্যে অতিদ্রুত ছুটে আসে।

ভগ্ন যন্ত্রাংশ ঠিক করা এবং আহত প্রাণীদের চিকিৎসায় এদের ক্ষমতা সীমাহীন।অন্য বুদ্ধিমান প্রাণীদের কাছাকাছি এলে এরা নিজেদের অদৃশ্য রাখতে পছন্দ করে। এই ক্ষমতা তাদের আছে। তারা টেলিপ্যাথিক মাধ্যমেও বুদ্ধিমান প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম। আহত বুদ্ধিমান প্রাণীদের চিকিৎসা দান কালে। তারা এই ক্ষমত ব্যবহার করে আহতের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেয়।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *