অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৪ হুমায়ূন আহমেদ

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৪

সুরেশ বাগচী মিথ্যা বলা বিষয়ে তার ছেলেমেয়েদের একটি গল্প বলেছিলেন। মহাভারতের গল্প। অশােক বনে শর্মিষ্ঠা নামের অতি রূপবতী এক রমণী কিছুকালের জন্যে বাস করেছিলেন। একদিন মহারাজ যযাতি বেড়াতে বেড়াতে চলে এলেন অশােক বনে। শর্মিষ্ঠা তাকে দেখে ছুটে গিয়ে বললেন, মহারাজ, আমার স্বামী নেই, আমি যৌবনবতী, আপনি আমার সঙ্গে রাত্রিযাপন করুন।

আমার ঋতু রক্ষা করুন। যযাতি বললেন, ‘তা সম্ভব না। তােমার সঙ্গে শয্যায় গেলে আমাকে মিথ্যা কথা বলতে হবে। মহা পাপ হবে।’ শর্মিষ্ঠা বললেন, “নন নমযুক্তং বচনং হিনস্তি ন স্তীষু রাজন ন বিবাহকালে প্রাণাত্যয়ে সর্বধনাপথরে  পঞ্চান্তানাহুর পাতকানি” তার মানে হল, পাঁচ অবস্থায় মিথ্যা বললে পাপ হয় না।

পরিহাসে, মেয়েমানুষকে খুশি করায়, বিবাহকালে, প্রাণ সংশয়ে এবং সর্বস্ব নাশের সম্ভাবনায়। আপনি আমার সঙ্গে রাত্রিযাপন করলে আমাকে খুশি করবেন। কাজেই আপনার পাপ হবে না। এই কথায় মহারাজ যযাতি শর্মিষ্ঠার সঙ্গে রাত্রিযাপনে রাজি হলেন। সুরেশ বাগচী বললেন, ‘গল্পটা কেমন লাগল? অনিল, অতসী কেউ কিছু বলল না। “মহারাজ যযাতির কাজটা কি ঠিক হয়েছে ? 

অতসী বলল, “ঠিক হয় নাই। ‘হ্যা, ঠিক হয় নাই । ধর্মগ্রন্থে যাই থাকুক কোন অবস্থাতেই মিথ্যা বলা যায় । বাবারা, এটা যেন মনে থাকে। অনিল অসম্ভব ভীতু। কিন্তু বাবার চিঠি বুকে নিয়ে সে মিথ্যা বলতে পারছে না। তাকে সত্যি কথাই বলতে হবে। চিঠিটা কি ফেলে দেয়া ভালাে না ? আলফা ইস্যুরেন্স কোম্পানির হেড অফিস মতিঝিলে। তাদের অফিস ছােট কিন্তু ব্যবসা ভালাে। জাহাজের মালামাল ইস্যুরেন্স করাই এই কোম্পানির ব্যবসা।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৪

এই ধরনের ব্যবসায় বিশাল অফিস লাগে না। একটা টেলিপ্রিন্টার, আন্তর্জাতিক টেলিফোন লাইন, উপরের মহলের সঙ্গে ভালাে যােগাযোেগই যথেষ্ট। অল্পকিছু কাজ জানা লােকই যথেষ্ট। কোম্পানির মালিক জোবায়েদ সাহেব। অবাঙালি। ১৯৫০ সনে বিহার থেকে মােহাজের হয়ে বাবা মার সঙ্গে ঢাকা এসেছিলেন। তখন তার বয়স মাত্র একুশ বছর। সেই সময় তাঁদের পরিবারের সম্বল ছিল মায়ের আঠারাে ভরি সােনার গয়না।

মাত্র কুড়ি বছরের ব্যবধানে সেই বিত্ত ফুলে ফেঁপে একাকার হয়েছে। জোবায়েদ সাহেব আলফা ইসুরেন্সের একটা শাখা অফিস খুলেছেন করাচিতে। খুব সম্প্রতি লন্ডনেও একটা অফিস নেয়া হয়েছে। অফিস চালু হবার আগেই ঝামেলা লেগে গেল। তিনি ঠাণ্ডা মাথায় ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ্য রাখছেন। এমনিতেই তার মাথা ঠাণ্ডা। এখন তা আরাে অনেক ঠা হয়ে গেছে। 

অফিসের কাজকর্ম নেই বললেই হয়। টেলিপ্রিন্টারে খট খট বেশ কিছুদিন হল শােনা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক লাইন সব সময় ব্যস্ত। লাইন চাইলেই পাওয়া যায় না। গতকাল সারাদিন অপেক্ষা করে করাচীর লাইন পেলেন। তাও কথাবার্তা পরিষ্কার না। করাচী অফিসের নবী বখশ বলল, বাঙালি কুত্তাগুলাের খবর কি? কুত্তাগুলাের ল্যাজ সােজা হয়েছে ?

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৪

জোবায়েদ সাহেব প্রসঙ্গ পাল্টে ব্যবসার কথা তুললেন। জানা গেল ব্যবসা মােটামুটি। খুব খারাপ না, আবার ভালােও না। নবী বখশ আবার বাঙালি প্রসঙ্গ তুলল, ইংরেজিতে যা বলল তার বঙ্গানুবাদ হচ্ছে— সব বাঙালি পুরুষগুলাের বিচি অপারেশন করে ফেলে দেয়া দরকার। বিচি ফেলে দিলেই এরা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। বিচি গরম হওয়ায় এরকম করছে। গরম দেশে গরম বিচি ভালাে না। 

জোবায়েদ সাহেব চিন্তিত বােধ করছেন। পশ্চিমাদের মনােভাব এই হলে ঝামেলা মিটবে না। তারা বাঙালিদের যতটা তুচ্ছ করছে তত তুচ্ছ করার কিছুই নেই। বরং এরা জাতি হিসেবে ভয়ংকর। ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এই বাঙালিগুলােই শুরু করেছিল। যাদের রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না তারা যে পালিয়ে বাঁচল তা গান্ধিজীর জন্যে না। চরকা কাটা, দেশি লবণ খাওয়া এগুলাে ফালতু ব্যাপার। ব্রিটিশ সিংহ চরকা ভয় পায় না। ব্রিটিশ সিংহ ভয় পেয়েছিল—– ক্ষুদিরাম মার্কা ছেলেগুলােকে। 

বাঙালিগুলাে মহাঅলস, একটু ভালাে-মন্দ খেতে পারলে মহাখুশি, গল্প করার সুযােগ পেলে খুশি, রাজনীতি নিয়ে দু’একটা কথা বলতে পারলে আনন্দে আত্মহারা, নিজের বউ নিয়ে বেড়াতে যাবার সময় আড়চোখে অন্যের স্ত্রীকে একটু দেখতে পারলে মহা আনন্দিত। তবে এদের রক্তের মধ্যে কিছু একটা আছে। বড় কোন গণ্ডগােল আছে। মাঝে মাঝে এরা ক্ষেপে যায়। কিছু বুঝতে চায় না, শুনতে চায় না।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৪

সাহস বলে এক বস্তু যে এদের চরিত্রে নেই সেই জিনিস কোখেকে চলে আসে। জোবায়েদ বুঝতে পারছে সামনের দিন পাকিস্তানিদের জন্যে ভালাে না। শুধু ভালাে না বললে কম বলা হবে, সামনের দিনগুলাে ভয়ংকর। আশ্চর্যের ব্যাপার, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কেউ তা ধরতে পারছে না। এরা এখন মােটামুটি সুপ্ত। দেশ দখলে নিয়ে এসেছে। থানা পর্যায়ে সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। চলে এসেছে মিলিশিয়া, রেঞ্জার পুলিশ। ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে কমান্ডাে গ্রুপের সুশিক্ষিত সৈন্য। আরাে আসছে। জাহাজ আসছে। 

সিগন্যাল কোরের কর্নেল এলাহীর সঙ্গে জোবায়েদ সাহেবের সুসম্পর্ক। কর্নেল এলাহীর এক শালাকে তিনি লন্ডন ব্রাঞ্চের অফিসের দায়িত্ব দিয়েছেন। এলাহী সাহেব মাঝে মাঝে জোবায়েদ সাহেবের অফিসে কফি খেতে আসেন। গল্প-গুজব করে বিদেয় হন। ব্যাপারটা জোবায়েদের পছন্দ না, কারণ শহরের মুক্তিবাহিনী নামক গেরিলারা তৎপর হচ্ছে। কর্নেল এলাহী এখানে আগমন তাদের চোখে পড়তে পারে। অফিসে বােমা মেরে দেয়া বিচিত্র কিছু না।

অবশ্যি জোবায়েদ সাহেব জানেন গেরিলা তৎপরতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনার এখনাে কোন কারণ ঘটে নি। অল্পবয়েসী কিছু ছেলে-পুলে এই কাজটা করছে। গেরিলা জীবনের রােমান্টিক অংশটাই তাদের আকৃষ্ট করছে। তবে এটাকে হেলাফেলা করাও ঠিক না। যুদ্ধে অতি তুচ্ছ ব্যাপারও অবেহলা করতে নেই। ঘােড়ার নালের জন্যে পেরেক ছিল না বলে রাজত্ব চলে গেল। গল্পের রূপক অংশটি অগ্রাহ্য করা ঠিক না। জোবায়েদ সাহেব ঠিক নটার সময় অফিসে আসেন। তার ঘরে চুপচাপ বসে থাকেন।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৪

এক ঘণ্টা পর পর কফি খান। এক কাপ কফি, একটা সিগারেট। বেলা একটার মধ্যে পাঁচটা সিগারেট এবং পাচ কাপ কফি খাওয়া হয়। একটা বাজার পাঁচ মিনিট পর তিনি অফিস থেকে বের হন। বাড়ি চলে যান। বাকি সময়টা বাড়িতেই থাকেন। বাড়ি থেকে বের হন না। গত দু’মাস ধরে এই তার রুটিন। এক মাস আগে পরিবারের সবাইকে করাচি পাঠিয়ে দিয়েছেন। তার ধারণা এক সময় হঠাৎ করে পশ্চিম পাকিস্তানে যাবার চাপ সৃষ্টি হবে।

বিমানের টিকিট পাওয়া যাবে না। তার ধারণা সচরাচর ভুল হয় না। তিনি নিজে যাবার কথা ভাবতে পারছেন না। কারণ তার সম্পদ চারদিকে ছড়ানাে। সিলেটে চা বাগানে ত্রিশ পার্সেন্ট শেয়ার কেনা আছে। দিলখুশা এলাকায় কিনেছেন পাচ বিঘা জমি। এই জমি সােনার খনির মতাে। বিশ বিঘা জমি নারায়ণগঞ্জে কেনা আছে। একটা ফ্যাক্টরি দেবার কথা ভাবছিলেন।

দুটি বাড়িও ঢাকা শহরে তার আছে। সেই তুলনায় করাচিতে কিছুই নেই। তিনি অতি বিচক্ষণ লােক হয়েও এই বড় ভুলটি করেছেন। সম্পদ এই অংশে তৈরি করে যাচ্ছেন। | দেশ যদি সত্যি সত্যি স্বাধীন হয়ে যায় তাহলে কি হবে? ইন্ডিয়া দখল করে নেবে ? সেই সম্ভাবনা কতটুকু ? এখনাে বুঝতে পারছেন না।

ইন্ডিয়া কি এত বড় ভুল করবে? মনে হয় না। এই দেশের মানুষগুলাের ইন্ডিয়া প্রসঙ্গে কোন মােহ নেই। যারা ইন্ডিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে, তাদের উপর দেশের মানুষ খানিকটা বিরক্ত বলেই মনে হয়। বড় সাহেবের দরজার পর্দা ফাক করে মােবারক ঢুকল। হাসিমুখে বলল, কর্নেল সাব আয়া।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৪

জোবায়েদ সাহেব বিরক্ত হলেন। তার বিরক্তির কারণ দুটি। এক, কর্নেল সাহেবের সঙ্গে তিনি কথা বলতে চাচ্ছেন না। দুই, মােবারক এখন আর বাংলা বলছে না। মােবারক অবাঙালি কিন্তু কথা বলত বাংলায়। নিখুঁত ঢাকাইয়া বাংলায়। কিছুদিন হল সে আর বাংলা বলছে না। দাত বের করে যখন-তখন হাসছে। মনে হচ্ছে পুরাে দেশটা সে তার চকচকে গােলাপি শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে বসে আছে। এখন নিশ্চিন্ত মনে জর্দা দিয়ে পান খেয়ে ঠোট লাল করা যায়। 

জোবায়েদ সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন, আমাদের কফি দাও।’ মােবারক পান খাওয়া লাল দাত বের করে বলল, কফি তুরন্ত আ যায়ে গি। কর্নেল এলাহী শুধু খালি হাতে আসেন নি। একটা চকলেটের টিন নিয়ে এসেছেন। বিদেশি চকলেট, বেশ দামি জিনিস। তিনি কখনাে খালি হাতে আসেন না। এর আগের বার এসেছিলেন ‘আতর’ নিয়ে। তাদের ভেতর কথাবার্তা ইংরেজিতে হল। 

এলাহী ঃ তােমার মুখ এমন গম্ভীর কেন? ব্যবসার হাল কি ভালাে না ? জোবায়েদ ঃ না। ব্যবসা মন্দা। 

এলাহী ঃ খুব সাময়িক ব্যাপার। কয়েকটা দিন যাক, দেখবে ব্যবসা হু হু করে বাড়বে। 

জোবায়েদ ঃ কয়েকটা দিন মানে কত দিন? এলাহী ঃ এই ধর তিন মাস। জোবায়েদ ও তিন মাসে সব ঠিক হয়ে যাবে ? 

এলাহী ঃ ঠিক তাে এখনই হয়ে গেছে। থানায় থানায় আমাদের লােক আছে। এখন হচ্ছে কম্বিং অপারেশন। প্রতিটি মানুষকে এক এক করে দেখা হচ্ছে। 

জোবায়েদ ও কম্বিং অপারেশনের পর কি হবে ? 

এলাহী ঃ কি হবে তা কর্তা ব্যক্তিরা ঠিক করবেন। আমি অতি ক্ষুদ্র মৎস্য । তবে আমার যা অনুমান ওদের শায়েস্তা করার পর একটা রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাওয়া হবে। এক ধরনের আই ওয়াশ আর কি । হা-হা-হা । তখন ওদের যা বলা হবে তাতেই তারা রাজি হবে। দুদু খাবে ?’-~~ বললে ওরা বলবে, ‘খাব।’ তামাক খাবে ?– বললেও ওরা বলবে, ‘খাব।’

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৪

জোবায়েদ ঃ তােমাদের অবস্থা তাহলে ভালাে। এলাহী ঃ ভালাে মানে? একসেলেন্ট! Can no be better. জোবায়েদ ও শুনছি তােমরা মেয়েদের উপর অত্যাচার করছ— এটা কি ঠিক? এলাহী ঃ কোথেকে শুনছ ? ইন্ডিয়া বেতার ? জোবায়েদ ঃ হ্যা, বিবিসিও বলছে। 

এলাহী ঃ তুমি কি আজকাল প্রপাগাণ্ডা নিউজ শােনা ধরেছ ? সবচে’ বড় ক্ষতি করছে এই সব প্রপাগাণ্ডা নিউজ। 

জোবায়েদ ? তাহলে তােমরা মেয়েদের উপর কোন অত্যাচার করছ না ? 

এলাহী ঃ কিছু কিছু হয়ত হচ্ছে। ওয়ার ফেয়ারে এগুলাে হয়। আমরা তাে হাডুডু খেলছি না। যুদ্ধ করছি। এরা আমাদের শত্রুপক্ষ। এই দেশের মেয়েরা 

তাে আমার শ্যালিকা নয়। শ্যালিকাদের সঙ্গেও যেখানে ফষ্টি-নষ্টি করার সুযােগ আছে সেখানে এদের সঙ্গে কেন করা হবে না তুমি আমাকে বল । | কফি চলে এসেছে। কর্নেল এলাহী কফিতে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির ভঙ্গি করল । জোবায়েদ সিগারেট ধরাল। এই সিগারেটটা বাড়তি। আজ একটার ভেতর ছয়টা সিগারেট খাওয়া হয়ে যাবে। কফিও এক কাপ বেশি খাওয়া হবে। জোবায়েদের বিরক্তি-ভাব বাড়ছে। তিনি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, কর্নেল এলাহী! বলে ফেল। 

তুমি নিজে কি কোন বাঙালি মেয়েকে রেপ করেছ? ঠিকঠাক জবাব দাও। তােমার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। আগুন হাতে নিয়ে মিথ্যা বলাটা ঠিক হবে না।’  ‘মিথ্যা বলতে চাচ্ছি এই ধারণা তােমার হল কেন ? মিথ্যা বলার তাে তেমন প্রয়ােজন দেখছি না। মেয়েদের সঙ্গ পেয়েছি এবং পাচ্ছি। তবে আমি বাড়ি থেকে মেয়ে ধরে এনে ‘রেপ করি না। উপহার হিসেবে আমার কাছে পাঠানাে হচ্ছে।’ 

কারা পাঠাচ্ছে ? ‘এই দেশের মানুষই পাঠাচ্ছে। হা-হা-হা। হিন্দু মেয়েদের সম্পর্কে আমার খানিকটা আগ্রহ ছিল। কামাসূত্রা’র দেশের কন্যা, না-জানি কি। মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি এরা হচ্ছে মােস্ট অর্ডিনারী। আরেক কাপ কফি দিতে বল। তােমার এখানে দেখি অসাধারণ কফি তৈরি হয়।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৪

জোবায়েদ আরেক দফা কফি দিতে বল। আজ সাত কাপ কফি খাওয়া হবে। সাত কাপ কপি, সাতটা সিগারেট। খুব খারাপ একটা দিনের শুরু হচ্ছে। খুব খারাপ দিন। কর্নেল এলাহী কতক্ষণ এখানে থাকবে বােঝা যাচ্ছে না। মানুষটাকে এই মুহূর্তে অসহ্য বােধ হচ্ছে। কর্নেল এলাহী!’ “ইয়েস মাই ফ্রেন্ড। 

‘তুমি কফি খেয়েই বিদেয় হবে। আমার অতি জরুরি কিছু কাজ আছে। তুমি না গেলে তা করতে পারছি না।’ ‘অফকোর্স বিদেয় হব। রাতে কি তুমি ফ্রি আছ?’ ‘কেন বল তাে? ‘অফিসার্স মেসে ছােট্ট একটা পার্টি হবে। খুব এক্সকুসিভ। ‘পার্টিতে যেতে বলছ ? হ্যা। তােমার মন মরা ভাব কাটানাে দরকার। পার্টিতে সেই চেষ্টা সাধ্যমতাে করা হবে। সন্ধ্যায় বাসায় থাকবে। আমি নিজে এসে নিয়ে যাব। চমৎকার কফি। 

অনিল বড় সাহেবের জন্যে অনেকক্ষণ ধরেই অপেক্ষা করছে। কর্নেল সাহেব বসে আছেন বলে যেতে পারছে না। কয়েকটি কারণে বড় সাহেবের সঙ্গে তার দেখা প্রয়ােজন। হাতে টাকা-পয়সা নেই। কিছু যদি পাওয়া যায়। তাছাড়া বড় সাহেবকে সে পছন্দ করে। নিজেও জানে না। চাকরির ইন্টারভ্য দিতে এসে সে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। প্রায় কুড়ি জনের মধ্যে তার বিদ্যাই সবচে’ কম। 

ইন্টারভ্য বাের্ডে জোবায়েদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সঙ্গে কি কোন প্রশংসাপত্র আছে?’ অনিল প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বলল, একটা আছে কিন্তু আমি স্যার দিতে চাচ্ছি। ‘কেন দিতে চাচ্ছেন না ? ‘প্রশংসাপত্রটা আমার বাবার দেয়া। আমি কারাে কাছ থেকে প্রশংসাপত্র জোগাড় করতে পারি নি, কাজেই বাবাই একটা লিখে দিলেন। কি করেন আপনার বাবা?’ স্কুল শিক্ষক। ‘প্রশংসাপত্রটা দেখি।’

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৪

 অনিল খুবই অস্বস্তির সঙ্গে হাতে লেখা কাগজটা এগিয়ে দিল। তার ধারণা ছিল, প্রশংসাপত্রটা পড়ে তিনি হেসে ফেলবেন এবং বাের্ডের অন্য মেম্বারদের দেখাবেন। কারণ প্রশংসাপত্রে লেখা যাহার জন্যে প্রযােজ্য একজন পিতাই তাহার পুত্রকে সঠিক চিনিতে পারেন। মা ভাল চিনিতে পারেন , কারণ সন্তান নয় মাস গর্ভে ধারণ করিবার কারণে মায়ের চিন্তা ভালবাসায় আচ্ছন্ন হইয়া থাকে। ইহাই স্বাভাবিক। একজন পিতা সেই ত্রুটি হইতে মুক্ত। আমি অনিল বাগচীর পিতা ।

সে যােগ্যতায় বলিতেছি— আমার পুত্রের ভেতর সততার মতাে বড় একটি গুণ পূর্ণ মাত্রায় আছে। সে তেমন মেধাবী নহে। তাহার মেধা সাধারণ মানের। ঈশ্বর মানুষকে পরিপূরক গুণাবলি দিয়ে পাঠান। সেই কারণেই আমার পুত্রের মেধার অভাব পূরণ করিয়াছে তাহার সততা। অন্য কোন গুণ আমি আমার পুত্রের ভিতর লক্ষ্য করি নাই। যাহা লক্ষ্য করিয়াছি। তাহাই বলিলাম। 

বড় সাহেব প্রশংসাপত্র ফিরিয়ে শুকনাে গলায় বললেন, “আচ্ছা আপনি যেতে পারেন।’ অনিল বাড়ি চলে এল। দশদিনের মাথায় রেজিস্ট্রি ডাকে চিঠি দিয়ে তাকে জানানাে হল যে চাকরি দেয়া হয়েছে। তার পােস্টিং হবে লন্ডন ব্রাঞ্চে। তবে কাজ শেখার জন্যে তাকে এক বছর ঢাকা অফিসে থাকতে হবে। 

অনিল মুখ শুকনাে করে বলল, লন্ডনে আমি গিয়ে থাকব কি করে ? অসম্ভব। আমি এই চাকরি করব না। মরে গেলেও না।’ এই সংসারে না বলে সহজে পার পাওয়া যাবে যায় না। সুরেশ বাগচী স্কুল থেকে রিটায়ার করেছেন। সংসার অচল। অনিলকে ঢাকায় আসতে হল। মােবারক এসে অনিলকে বলল, কর্নেল সাহেব চলা গিয়া।

অনিল উঠল। বড় সাহেবের সঙ্গে দেখা করবে। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। দিনের আলাে থাকতে থাকতে টাঙ্গাইল পৌছানাে দরকার। রাস্তাঘাট কেমন কিছুই জানে না। জোবায়েদ সাহেব চোখ তুলে তাকালেন। অনিল বলল, ‘স্যার আসব ? ‘আস।।স্যার, আমি একটু দেশে যাব। ছুটি চাচ্ছি।’ ‘দেশে যাবার মতাে রাস্তাঘাট কি এখন নিরাপদ? ‘নিরাপদ না হলেও যেতে হবে। আমার বাবাকে স্যার মিলিটারীরা মেরে ফেলেছে। বােনটা আছে অন্য এক বাড়িতে। ‘বস।’ 

 

Read more

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *