অনিল কাঠাল গাছের মাথার মুকুটের দিকে তাকিয়ে মন ঠিক করে ফেলল। দেশটা ঠিকঠাক হলে এই দেশে যা কিছু সুন্দর জিনিস আছে সে তার বাবাকে আর অতসীদিকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখবে। প্রথম ছয়মাস শুধু ঘুরে বেড়াবে। কোন একটু সুন্দর জিনিসের সামনে বাবাকে দাড় করিয়ে দিয়ে সে বলবে— বাবা দেখ তাে, এর ছবি আঁকা যাবে কি-না। বাবা মাথা নাড়তে নাড়তে বলবেন, অসম্ভব। অতসীদি খিলখিল করে হাসবে। বাবা বিরক্ত হয়ে বলবেন, হাসছিস কেন মা? সৌন্দর্যের একটা অংশ থাকে, কখনাে যার ছবি আঁকা যায় না। এই জিনিসটা বুঝতে হবে…
গফুর সাহেবের ঘর থেকে কোরান তেলাওয়াতের সুর ভেসে আসছে। তিনি উঠেন অন্ধকার থাকতে থাকতে। নামায পড়েন। নামাযের পরে অনেকক্ষণ কোরান তেলাওয়াত করেন। তার গলার স্বর মিষ্টি। পড়েনও খুব সুন্দর করে । প্রায়ই ভােরে অনিল বারান্দায় দাড়িয়ে শুনে। তার ভালাে লাগে। শুধু ভালাে লাগে বললে কম হয়, বেশ ভালাে লাগে। গফুর সাহেব দরজা খুলে অনিলকে দেখলেন। ক্লান্ত গলায় বললেন, ‘রাতে ঘুম হয়েছিল অনিল ?’।
‘আমার এক ফোটা ঘুম হয় নি। সারারাত জেগে কাটালাম। খুব খারাপ লাগছে। গত রাতে ঘুমাতে পারি নি। এভাবে দিন কাটালে তাে বাচব না। কিছু একটা করা উচিত? “কি করবেন ? তাই তাে জানি না। করব কি ? গফুর সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিচু গলায় বললেন, ‘তােমার একটা খবর আছে অনিল। কাল বিকেলে একটা ছেলে তােমার খোঁজে এসেছিল।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
অনেকক্ষণ তােমার জন্যে অপেক্ষা করে আমাকে চিঠি দিয়ে গেছে। খুবই দুঃসংবাদ। তােমাকে দুঃসংবাদটা কীভাবে দেব বুঝতে পারছিলাম না। রাতে এই জন্যেই ঘুম হয় নি। সারারাত চিন্তা করেছি। এখন মনে হচ্ছে দুঃসংবাদটা দেয়া উচিত। সব মানুষেরই দুঃসংবাদ জানার অধিকার আছে। মন শক্ত কর অনিল।
অনিল তাকিয়ে আছে। গফুর সাহেব তার কাঁধে হাত রেখে প্রায় অস্পষ্ট গলায় বললেন, ‘তােমার বাবা মারা গেছেন অনিল। এটা সহজভাবে নেয়ার চেষ্টা কর। আরাে অসংখ্য মৃত্যু ঘটবে। এগুলাে নিয়ে আমরা এখন কোন কান্নাকাটি করব না। দেশ স্বাধীন হােক। দেশ স্বাধীন হবার পর আমরা চিৎকার করে কাঁদব। নাও চিঠিটা পড়।’
অনিল চিঠি পড়ল। তার চোখ শুকনাে। মুখ ভাবলেশহীন। অনিলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গফুর সাহেবের চোখে পানি এসে গেছে। তিনি পাঞ্জাবির প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছছেন। অনিল ছেলেটিকে তিনি খুবই পছন্দ করেন। দশজন- ১৯ ভদ্র, লাজুক এবং অতি বিনয়ী ছেলে। কোরান পাঠের পর বারান্দায় এলে রােজই এই ছেলেকে দেখেন। একদিন সে লাজুক গলায় বলল, আমি চিঠি পেয়েছি আমার বাবা খুব অসুস্থ। নতুন চাকরি, এরা ছুটি দিচ্ছে না। যেতে পারছি না। আপনি কি আমার বাবা জন্যে একটু প্রার্থনা করবেন ?
গফুর সাহেব বললেন, অবশ্যই করব, অবশ্যই। আমি খাস দিলে উনার জন্য দোয়া করব। আলাদা নফল নামায পড়ব । তুমি মােটেও চিন্তা করবে না। দেখি আস, আস আমার ঘরে, চা খাও।’ অনিল তার ঘরে এসে কেঁদে ফেলল। সেই ছেলে বাবার মৃত্যুসংবাদের চিঠি হাতে নিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে আছে।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
চিঠিটা সে দ্বিতীয়বার পড়ে নি। তার চোখ শুকননা । সে তাকিয়ে আছে কাঁঠাল গাছটার দিকে। কে জানে ছেলেটার মনের ভেতর এখন কি হচ্ছে।গফুর সাহেব নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। আজকের মতাে কোরান পাঠ তিনি শেষ করেছিলেন। এখন আরাে খানিকটা পড়তে ইচ্ছা করছে। “আলিফ লাম মীম। জালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফীহা, হুদাল্লিল মুত্তাকীন।”
ইহা সেই গ্রন্থ যাহাতে কোনই সন্দেহ নাই। যাহা বিশ্বাসীদের পথ প্রদর্শক। অনিল ঘরে ঢুকল। জানালা খুলে দিল। অন্ধকার ঘর ক্রমে আলাে হয়ে উঠছে। আকাশ পরিষ্কার। ঝকঝকে নীল। বাতাস মধুর। শ্রাবণ মাসের অপূর্ব সুন্দর একটা সকাল। অনিল কাপড় পরছে। সে রূপেশ্বর রওনা হবে। তার এখন কেন জানি মােটেই ভয় লাগছে না। চুল আঁচড়াবার জন্য চিরুণি খুজতে ড্রয়ারে টান দিতেই একগাদা চিঠি বেরিয়ে পড়ল। দু’একটা পড়েছে মেঝেতে। অনিলের কাছে লেখা তার বাবা এবং অতসীদির চিঠি। তার কাছে লেখা তার বাবার শেষ চিঠিটিই সে শুধু সঙ্গে নিয়ে যাবে।
বাকিগুলাে থাকুক যেমন আছে শেষ চিঠিতে সুরেশ বাগচী লিখেছেন “বাবা অনিল”, অত্যন্ত বিষন্ন মনে তােমাকে পত্র দিতেছি। চারিদিকের আবহাওয়া আমার ভালাে বােধ হইতেছে না। শংকিত বােধ করিতেছি। মন বলিতেছে এই দেশ বড় ধনের কোন বিপর্যয়ের ভিতর দিয়া যাইবে। নিজের জন্যে এবং অতসীর জন্যে আমার কোন চিন্তা নাই। তােমাকে নিয়াই যত ভয়। রাজধানীতে আছ।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
বিপর্যয়ের প্রথম ধাক্কাটা তােমাদের উপর দিয়াই যাইবে। তুমি ভীতু ধরনের ছেলে, কি করিতে কি করিবে তাহাই আমার চিন্তা। বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রাখিও এবং ঈশ্বরকে স্মরণ রাখিও। ভুলিও না– মঙ্গলময় ঈশ্বর তাহার বিরাট জগতের প্রতিটি জীবের কথা ভাবেন। আমাদেরও উচিত তাহার কথা ভাবা ।।
অতসী ভালাে আছে তাহাকে সুপাত্রে সম্প্রদান করা আমার বড় দায়িত্বের একটি। তেমন সন্ধান পাইতেছি না। তাহার বড় মামা কলিকাতা হইতে পত্র দিয়াছেন যেন আমি অতসীকে কলিকাতা নিয়া যাই। সেইখানে পাত্রের সন্ধান করিয়া বিবাহ দিবেন। আমি তাহাতে সম্মত হই নাই। অতসী এই দেশের মেয়ে। এই দেশে তাহার বিবাহ হইবে। এই বিষয়ে তােমার ভিন্ন মত থাকিলে আমাকে জানাইবে।
মােক্তার পাগলি মাঝে মধ্যে তােমার সন্ধানে আসে। কিছু দিন পূর্বে কয়েকটা পাকা কামরাঙ্গা নিয়া আসিয়াছিল। তােমাকে দিতে চায়। একজন পাগল মানুষের ভালবাসার এই প্রকাশ দেখিয়া আমার চোখে জল আসিয়া পড়িল। আমি অতসীকে বলিলাম যত্ন করিয়া সে যেন মােক্তার পাগলিকে চারটা ভাত খাওয়াইয়া দেয়। তাহাকে বারান্দায় পাটি বিছাইয়া খাইতে দেওয়া হইল। সে অনেকক্ষণ ভাত মাখাইয়া কিছু মুখে না দিয়া উঠিয়া চলিয়া গেল।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
এই পাগল মানুষটি তােমার প্রতি যে ভালবাসা দেখাইল তাহা তুমি স্মরণ রাখিও। আরেকজন মানুষের কথা স্মরণ রাখিও যিনি তােমার প্রতি কোন ভালবাসা দেখাইবার সুযােগ পান নাই। তিনি তােমার মা। তােমার জন্মমুহূর্তেই তাহার মৃত্যু হইয়াছে। মায়েরা সন্তানের জন্যে অসীম ভালবাসা নিয়া আসেন।
এই মা সেই অসীম ভালবাসার কিছুই ব্যবহার করিতে পারেন নাই। তাই বলিয়া মনে করিও না সেই ভালবাসা নষ্ট হইয়াছে। এই পৃথিবীতে সবই নশ্বর, কিছুই টিকিয়া থাকে না, কেবল ভালবাসা টিকিয়া থাকে। | যদি কখনাে বড় বিপদে পড় ঈশ্বরকে স্মরণ করিবে। সেই সঙ্গে তােমার মা’কেও স্মরণ করিবে। ইহাই আমার উপদেশ। পরম করুণাময় তােমার মঙ্গল করুন।
রেস্টুরেন্টের নাম কিছুদিন আগেও ছিল বাংলা রেস্টুরেন্ট। এখন নতুন নাম। কায়দে আযম রেস্টুরেন্ট। সাইন বোের্ড ইংরেজি, উর্দু এবং বাংলায় লেখা। সবচে’ হােট হরফ বাংলায়। বাঙালিরা এসব দেখছে। কিছু বলছে না। চুপ করে আছে। ছাব্বিশে মার্চের পর সবাই অতিরিক্ত রকমের চুপ। রেস্টুরেন্টে ফ্রেমে বাধাই করা আছে বড় বড় অক্ষরে লেখা “রাজনৈতিক আলােচনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
” তার প্রয়ােজন ছিল না। রাজনৈতিক আলােচনা কেউ করছে না। মনে হচ্ছে এ বিষয়ে এখন কারাে কোন আগ্রহ নেই।অনিল কায়দে আযম রেস্টুরেন্টে নাশতা খেতে এসেছে। ভালােমতাে খেয়ে নেবে, তারপর রওনা হবে টাঙ্গাইলের দিকে। বাস আছে নিশ্চয়ই। পত্রিকায় বার বার লেখা হচ্ছে— ‘দেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। যােগাযােগ ব্যবস্থা
প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দুষ্কৃতকারীর খবরও কিছু আছে, তা ভেতরের পাতায়। নিতান্ত অবহেলায় এক কোণে ছাপা। তবু কি করে জানি এই সব খবরের দিকেই চোখ চলে যায়। অনিল চা খেতে খেতে কাগজ পড়ছে।প্রথম পাতার খবর হল হাজির হওয়ার নির্দেশ। চোখে কালাে চশমা, বগলে ব্যাটনসহ টিক্কা খানের হাসি হাসি মুখের এক ছবির নিচে লেখা—-খ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক কর্নেল ওসমানীকে হাজির হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। সরকারি নির্দেশে বলা হয়—
“৪০ নম্বর সামরিক আইন বিধি অনুযায়ী প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে আমি ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক লে, জে, টিক্কা খান এম, পি, কে,, পি এসসি– আপনি কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানীকে (অবসরপ্রাপ্ত) আপনার বিরুদ্ধে পাকিস্তান দণ্ডবিধির ১২১, ১২৩, ১৩১ ও ১৩২ নম্বর ধারা এবং ১০ ও ১৪ নম্বর সামরিক আইনবিধি অনুযায়ী আনীত অভিযােগের জবাব দেয়ার জন্যে ১৯৭১ সালের ২০ শে আগস্ট সকাল আটটার সময় ঢাকার দ্বিতীয় রাজধানীস্থ ১ নম্বর সেক্টরের উপসামরিক আইন প্রশাসকের সামনে হাজির হাজির হতে আদেশ দিচ্ছি।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
যদি আপনি হাজিরে ব্যর্থ হন তাহলে আপনার অনুপস্থিতিতেই ৪০ নম্বর সামরিক আইন বিধি অনুযায়ী আপনার বিচার হবে।” | বাণিজ্য, শিল্প ও আইন মন্ত্রী আখতার উদ্দিন আহমেদ সাহেবেরও একটি ছবি ছাপা হয়েছে টিক্কা খানের ছবির নিচে। মন্ত্রী জনসভায় বলেছেন “আল্লাহ না করুক, পাকিস্তান যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে মুসলমানরা তাদের আলাদা বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলবে এবং হিন্দুদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়বে।”
বক্স করে ছাপা হয়েছে- “সাবধান, গুজব ছড়াবেন না। আপনার গুজব শক্রকেই সাহায্য করে।” দু পৃষ্ঠার খবরের কাগজ এইটুকুতেই শেষ। শেষের পাতায় সামরিক নির্দেশাবলি যা কিছুদিন পর পর ছাপা হচ্ছে। ভেতরের দু’পাতার সবটাই বিজ্ঞাপন। এক কোণায় ছােট করে একটা সংবাদ শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার কয়েকজন গ্রেপ্তার।
“গত রােববার রাতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন অংশে কয়েকটি সফল অভিযান চালিয়ে বেশ উল্লেখযােগ্য পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গােলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কয়েক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেশপ্রেমিক নাগরিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযানগুলাে চালানাে হয়।”
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
গ্রেফতার করা দুটি ছেলের ছবি ছাপা হয়েছে। ছেলে দুটির বয়স কিছুতেই আঠারাে উনিশের বেশি হবে না। দু’জনেরই হাত পেছন দিকে বাঁধা। কিন্তু এদের মুখ হাসি হাসি। ছবি তােলার সময় এরা কি সত্যি হাসছিল না অনিল। কল্পনা করছে, এরা হাসছে ? এদের নাম দেয় নি, নাম দেয়া উচিত ছিল।ভাইজান, খবরের কাগজটা দেখি।অনিল তার সামনে বসা মানুষটির দিকে কাগজ এগিয়ে দিল।
সেও সব খবর ফেলে এই খবরটিই পড়ছে। একটা খবর পড়তে এতক্ষণ লাগে না। নিশ্চয়ই বার বার পড়ছে। মানুষটার চোখে-মুখে আনন্দের আভা। পত্রিকা বন্ধ করার পরেও সে আরেকবার খুলল, তাকিয়ে আছে ছবিটার দিকে। অনিল বলল, কাগজটা আপনি রেখে দেন। “জ্বি-না, দরকার নেই। ‘রেখে দেন। অন্যকে দেখাবেন।’ লােকটা হেসে ফেলে চাপা গলায় বলল, দুই বাঘের বাচ্চা, কি বলেন ভাইজান? অনিল বলল, বাঘের বাচ্চা তাে নিশ্চয়ই।‘খাটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। দেখেন চোখ দেখেন। চোখ দেখলেই বােঝা যায়।’
অনিল আরেকবার তাকাল। ছেলে দুটির চোখ দেখা যাচ্ছে না। মারের জন্যেই মুখ ফুলে চোখ ভেতরে ঢুকে গেছে। তবু এর মধ্যেই তেজি চোখ এই মানুষটা দেখতে পাচ্ছে। তাই তাে স্বাভাবিক। চায়ের দাম দিয়ে অনিল উঠে পড়ল। সে অফিসে যাবে। বড় সাহেবের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে রওনা হবে দেশের দিকে। পৌছতে পারবে কি-না তা সে জানে না। চেষ্টা করবে।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
কি সুন্দর দিন! কি চমৎকার বােদ! শ্রাবণ মাসের মেঘশূন্য আকাশের মতাে সুন্দর কিছু কি আছে ? এই রােদের নাম মেঘভাঙা রােদ। রিকশা নিতে ইচ্ছা করছে না। হাঁটতে ইচ্ছা করছে। রাস্তা এখনাে ফাকা। তারচেয়েও বড় কথা রাস্তায় কোন শিশু নেই। এখনকার এই নগরী শিশুশূন্য। বাবা-মা’রা তাদের সন্তানদের ঘরের ভেতরে আগলে রাখছেন। শহর এখন দানবের হাতে। শিশুদের দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।
বড় রাস্তার মােড়ে মেশিনগান বানাে একটি ট্রাক। পাশেই জীপ গাড়ি। বিশাল ট্রাকের পাশে জীপটাকে খেলনার মতাে লাগছে। একজন অফিসার কথা বলছেন একজন বিদেশির সঙ্গে। বিদেশির কাঁধে কয়েক ধরনের ক্যামেরা। দু’জনের মুখই খুব হাসি হাসি। এই বিদেশি কি একজন সাংবাদিক? কয়েকদিন আগে অনিল পত্রিকায় পড়েছিল, বিদেশি সাংবাদিকদের আহ্বান করা হয়েছে তারা যেন নিজেদের চোখে দেখে যায় কি সুন্দর পরিবেশ পূর্ব পাকিস্তানে।
এই লােকটি তাই দেখতে আসছে ? সুন্দর পরিবেশ দেখে মােহিত হচ্ছে ? কিছুটা মােহিত হতেও পারে। রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন। বস্তি নেই। ২৫ শে মার্চেই বস্তি উজাড় হয়েছে। ভিখিরীও নেই। ভিখিরীরা ভিক্ষা চাইতে কেন বেরুচ্ছে না কে জানে ? এরা সম্ভবত ভিখিরীদেরও গুলি করে মারছে।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
বিদেশি দ্রলােক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন অনিলের দিকে। হাত ইশারা করে তিনি অনিলকে ডাকলেন। শুধু অনিল না, আরাে কয়েকজনকে তিনি ডেকেছেন। তারা ভয়ে ভয়ে এগুচ্ছে। অনিল এগিয়ে গেল।সেনাবাহিনীর অফিসারটি ইংরেজি-বাংলা-উর্দু মিশিয়ে যে কথা বলল, তা হচ্ছে ইনি ইউনাইটেড প্রেসের একজন সাংবাদিক। খবর সংগ্রহ করতে এসেছেন।
তােমাদের যা বলার ইনাকে বল। ভয়ের কিছু নাই। whatever you want to say, say it. কোই ফিকির নেই। সাংবাদিক ভদ্রলােক একজন দোভাষী নিয়ে এসেছেন। বিহারী মুসলমান। সে কথা ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিচ্ছে। নীল হাওয়াই সার্ট পরে একজন মানুষকে প্রথমে জিজ্ঞাসা করা হল। প্রশ্নোত্তরের পুরাে সময় মুখের সামনে মাইক্রোফোন ধরা থাকল।‘আপনার নাম ? ‘আমার নাম মােহাম্মদ জলিল মিয়া। ‘কি করেন ?
আমি একজন ব্যবসায়ী আমার বাসাবােয় ফার্নিচারের দোকান আছে। ‘দেশের অবস্থা কি? ‘জনাব অবস্থা খুবই ভালাে। মুক্তিবাহিনী শহরে গেরিলা অপারেশন চালাচ্ছে, এটা কি সত্য? ‘মমাটেই সত্য না। ‘একটা পেট্রল পাম্প তাে উড়িয়ে দিয়েছে। ‘এগুলাে হল আপনার দুষ্কৃতকারী। ‘আপনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উপর সন্তুষ্ট।’ ‘জ্বি জনাব। এরা দেশ রক্ষা করেছে। পাকিস্তান জিন্দাবাদ। ‘শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে আপনার কি অভিমত?’ তিনি আমাদের ভুল পথে পরিচালনা করেছেন। ইহা উচিত হয় নাই।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
আপনাকে ধন্যবাদ।’ ‘আপনাকেও ধন্যবাদ। পাকিস্তান জিন্দাবাদ। মাইক্রোফোন এবার অনিলের কাছে এগিয়ে আনা হল।আপনার নাম? আমার নাম অনিল। অনিল বাগচী।’ ‘আপনি কি করেন? ‘আমি একটা ইলুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করি। আলফা ইলুরেন্স।’ ‘দেশের অবস্থা কি ? ‘দেশের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ‘কেন বলছেন দেশের অবস্থা খারাপ?
‘স্যার, আপনি নিজে বুঝতে পাছেন না ? আপনি কি রাস্তায় কোন শিশু দেখেছেন? আপনার কি চোখে পড়েছে হাসতে হাসতে, গল্প করতে করতে কেউ যাচ্ছে? শহরে কিছু সুন্দর সুন্দর পার্ক আছে। গিয়ে দেখেছেন পার্কগুলােতে কেউ আছে কি-না ? বিকাল চারটার পর রাস্তায় কোন মানুষ থাকে না। কেন থাকে? স্যার, আমার বাবা মারা গেছেন মিলিটারীর হাতে। ‘কি করতেন আপনার বাবা?’ “তিনি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আপনি কি আওয়ামী লীগের কর্মী ?’। না, আমি আওয়ামী লীগের কর্মী না। আপনাকে ধন্যবাদ।’
সবাই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে অনিলের দিকে। সবচে’ বেশি অবাক হয়েছে ফানির্চার দোকানের মালিক। অনিল একবারও মিলিটারী অফিসারের দিকে তাকাল না। তাকে চলে যেতে বলা হয়েছে। সে চলে যাচ্ছে। ভুলেও পিছনে ফিরে তাকাচ্ছে না। সারাক্ষণই মনে হচ্ছে এই বুঝি এক ঝাক গুলি এসে পিঠে বিধল। ফানির্চার দোকানের মালিক অনিলের সঙ্গে সঙ্গে আসছে।
অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৩
সে ফিসফিস করে বলল, “জানে বাচার জন্যে মিথ্যা কথা বলতে হয় ভাই সাহেব। এতে দোষ নাই। আপনি গলির ভিতর ঢুকে পড়েন। গলির ভিতর ঢুকে দৌড় দিয়া বের হয়ে যান।অনিল গলির ভিতর ঢুকে পড়ল। ভদ্রলােক রাস্তার মােড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে লজ্জিত ও ব্ৰিত মনে হচ্ছে। অনিল এগুচ্ছে দ্রুত পায়ে। তার মাথায় ঝন ঝন করে বাজছে— বিপদে মিথ্যা বলার নিয়ম আছে। বিপদে মিথ্যার বলার নিয়ম আছে।
Read more
