নীতুর সাইকিয়াট্রিস্ট ভদ্রলোকের নাম ইরতাজুল করিম। নামের শেষে বি সি ডি অনেক অক্ষর।এতগুলি অক্ষর যিনি জোগাড় করেছেন তাঁর অনেক বয়স হবার কথা, কিন্তু ভদ্রলোক মধ্যবয়স্ক এবং হাসিখুশি। মুখে জর্দা দেয়া পান। বিদেশি ডিগ্রীধারী ভদ্র্রলোকেরা জর্দ্দা দেয়া পান খান না। আর খেলেও বাড়িতে চুপিচুপি খান। কেউ এলে দাঁত মেজে বের হন। এই ভদ্রলোক দেখি বেশ আয়েশ করে পান খাচ্ছেন। এবং পিক করে অ্যাশট্রেতে পানের পিক ফেলছেন।
তাঁর চেম্বারটাও সুন্দর। অফিস-অফিস লাগে না, মনে হয় ড্রয়িংরুম। ডাক্তার সাহেবের ঠিক মাথার উপর ক্লদ মানের আঁকা water lily-র বিখ্যাত পেইনটিং-এর প্রিন্ট। প্রিন্ট দেখতেই এত সুন্দর, আসলটা না জানি কত সুন্দর! আমি ডাক্তার সাহেবের সামনের চেয়ারটায় বসলাম। ভদ্রলোক আমার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, কেমন আছেন হিমু সাহেব?
‘জ্বি ভাল।’ ‘ইয়াদ সাহেবের স্ত্রী মিসেস নীতু অনেক দিন আগেই আপনার ব্যাপারে আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। তাও একবার না, দু’বার। তাদের মত ফ্যামিলি থেকে যখন দু’বার টেলিফোন আসে তখন চিন্তিত হতে হয়। আমি চিন্তিত হয়েই আপনার জন্যে অপেক্ষা করছি। আরাম করে বসুন তো।’ আমি নড়েচড়ে বসলাম। ডাক্তার সাহেব আমার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, আসতে এত দেরি করেছেন কেন?
‘টাকাপয়সা ছিল না, তাই দেরি করেছি। আপনি কত টাকা নেন তা তো জানি না।’ ‘আমি অনেক টাকা নিই। তবে টাকা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনার চিকিৎসার সমস্ত ব্যায়ভার মিসেস নীতু নিয়েছেন।’ ‘আমি তাহলে অসুস্থ?’ ‘উনার তাই ধারণা।’ ‘আপনার কী ধারণা ডাক্তার সাহেব?’ ‘আপনার সঙ্গে খানিকক্ষন কথাবার্তা না বল ধরতে পারব না।’ ‘কথাবার্তা বললেই ধরতে পারবেন?’
‘হ্যাঁ পারব। পারা উচিত। অবশ্যি আমার প্রশ্নের উত্তরে আপনাকে সত্যি কথা বলতে হবে। আমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবেন না। অধিকাংশ লোক তাই করে—সাইকিয়াট্রিস্টদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।’ ‘বিভ্রান্ত করার চেষ্টা থেকেই তো আপনার ধরতে পারার কথা—লোকটি কী চায়? তার সমস্যা কি?’
‘ধরতে চেষ্টা করি। সব সময় পারি না। মানুষের ব্রেইন নিয়ে আমাদের কাজকর্ম—সেই ব্রেইন কেমন জটিল তা কি আপনি জানেন হিমু সাহেব?’ ‘জানি না, তবে আঁচ করতে পারি।’ ‘না, আপনি আঁচও করতে পারেন না। মানুষের ব্রেইনে আছে এক বিলিয়ন নিউরোন। এক-একটি নিউরোনের কর্মপদ্ধতি বর্তমানে আধুনিক কম্পুটারের চেয়ে জটিল। বুঝতে পারছেন কিছু?’ ‘না।’
‘বুঝতে পারার কথাও না। এখন আমরা কথা বলা। শুরু করি। আপনি বেশ রিলাক্সড ভঙ্গিতে নিজের কথা বলুন তো শুনি। যা মনে আসে বলতে থাকুন। নিজের কথা বলুন, নিজের বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনের কথা বলুন, বন্ধুবান্ধবের কথা বলুন।চা খেতে-খেতে, সিগারেট খেতে-খেতে বলুন।’ ‘আমাকে কি কৌচে শুয়ে নিতে হবে না?’ ‘না, ঐসব ফ্রয়েডীয় পদ্ধতি বাতিল হয়ে গেছে। আপনি শুরু করুন।’ ‘আপনার কি তাড়া আছে ডাক্তার সাহেব?’
‘না, আমার কোনো তাড়া নেই। অন্যসব রোগী বিদায় করে দিয়েছি। আপনি হচ্ছেন—বিশেষ এক রোগী, ভেরি স্পেশাল। চা দিতে বলি, নাকি কফি খাবেন?’ ‘চা কফি কিছুই লাগবে না। যা শুনতে চাচ্ছেন বলছি। দু’ভাবে বলতে পারি—সাধারণভাবে কিংবা ইন্টারেস্টিং করে। কীভাবে শুনতে চান?’ ‘সাধারণভাবেই বলুন। ইন্টারেস্টিং করার প্রয়োজন দেখছি না। আমার ধারণা এমনিতেই ইন্টারেস্টিং হবে।’ ‘আমি কি পা উঠিয়ে বসতে পারি?’ ‘পারেন।’ আমি জীবন-ইতিহাস শুরু করলাম।
‘ডাক্তার সাহেব, আমার বাবা ছিলেন একজন অসুস্থ মানুষ। সাইকোপ্যাথ। এবং আমার ধারণা খুব খারাপ ধরনের সাইকোপ্যাথ। তাঁর মাথায় কি করে যেন ঢুকে গেল—মহাপুরুষ তৈরি করা যায়। যথাযথ ট্রেনিং দিয়েই তা করা সম্ভব। তাঁর যুক্তি হচ্ছে—ডাক্তার , ইনজিনীয়ার, ডাকাত, খুনী যদি শিক্ষা এবং ট্রেনিং-এ তৈরি করা যায়, তাহলে মহাপরুষ কেন তৈরি করা যাবে না? অসুস্থ মানুষদের চিন্তা হয় সিঙ্গেল ট্র্যাকে। তাঁর চিন্তা সেইরকম হল—তিনি মহাপরুষ তৈরির খেলায় নামলেন। আমি হলাম তাঁর একমাত্র ছাত্র। তিনি এগুলেন খুব ঠাণ্ডা মাথায়। তাঁর ধারণা হল, আমার মা বেঁচে থাকলে তিনি তাঁকে এ-জাতীয় ট্রেনিং দিতে দেবেন না।
কাজেই তিনি মা’কে সরিয়ে দিলেন।’ ‘সরিয়ে দিলেন মানে?’ ‘মেরে ফেললেন।’ ‘কী বলছেন এসব!’ ‘আমি অবশ্যি মা’কে খুন হতে দেখিনি। তেমন কোনো প্রমাণও পাইনি। বাবা প্রমাণ রেখে খুন করবেন এমন মানুষই না। খুব ঠাণ্ডা মাথার লোক। তাঁর মাথা এত ঠাণ্ডা যে মাঝে মাঝে আমার মনে হয় হয়তো তিনি অসুস্থ ছিলেন না। অসুস্থ মানুষ এত ভেবেচিন্তে কাজ করে না। অসুস্থ মানুষের মাথা এত পরিষ্কার থাকে না।’
‘তারপর বলুন।’ ‘আপনার কাছে কি ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে?’ ‘অবশ্যই ইনটারেস্টিং, তবে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আপনি আমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন।’ আমি হেসে ফেললাম। ডাক্তার সাহেব বললেন, হাসছেন কেন? আমি বললাম, গল্প বলে আমি আপনাকে বিভ্রান্ত করব না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। যা বলছি সবই সত্যি। আপনাকে গল্প ছাড়াই আমি বিভ্রান্ত করতে পারি। ‘করুন তো দেখি!’
আমি হাসিমুখে কিছুক্ষণ ডাক্তার সাহেবের দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় বললাম, আপনার বাড়িতে এই মুহূর্তে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। আপনার ছোট মেয়ে কিছুক্ষণ আগে তার পায়ে কিংবা হাতে ফুটন্ত পানি ফেলেছে। তাকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। ‘আপনি আমাকে এই কথা বিশ্বাস করতে বলছেন?’ ‘জ্বি, বলছি।’ ইরতাজুল করিম সাহেব অ্যাসট্রেতে পানের পিক ফেলতে ফেলতে বললেন, হিমু সাহেব, আপনি কি চান আমি বাসায় টেলিফোন করি? ‘করুন।’
ডাক্তার সাহেব টেলিফোন করতে লাগলেন,লাইন এনগেইজড্ পাওয়া যাচ্ছে। ডাক্তার সাহেবের চোখ-মুখ শক্ত হতে শুরু করেছে। তিনি রিসিভার নামিয়ে রাখছেন, আবার ডায়াল করছেন। আমি সিগারেট ধরিয়ে আগ্রহ নিয়ে ডাক্তার সাহেবকে দেখছি। ডায়াল করতে করতে তিনি আমার দিকে সরু চোখে তাকাচ্ছেন।
লাইন পেতে তাঁর দশ মিনিটের মতো লাগল। এই দশ মিনিটে তিনি ঘেমে গেলেন। কপাল ভর্তি ফোঁটা-ফোঁটা ঘাম। লাইন পাবার পর তিনি কাঁপা গলায় বললেন, কে, কে? ওপাশের কথা শুনতে পাচ্ছি না। তবে ডাক্তার সাহেবের কথা থেকে বুঝতে পারছি ওপাশে তাঁর স্ত্রী ধরছেন। ডাক্তার সাহেব বললেন, কেমন আছ? সবাই ভাল? শুচি কী করছে? টিভি দেখছে? আমার আসতে দেরি হবে। আচ্ছা রাখি।
তিনি রিসিভার নামিয়ে রেখে রাগী গলায় বললেন, আমার ছোটমেয়ে শুচি ভাল আছে। টিভি দেখছে। আপনি আমাকে ভয় দেখালেন কেন? ‘ভয় তো দেখাইনি! বিভ্রান্ত করেছি। আপনার মতো অতি আধুনিক একজন মানুষ আমার কথা বিশ্বাস করে আতঙ্কে অস্থির হয়ে গেলেন। কাজেই দেখুন—বিভ্রান্ত করতে চাইলে আমি করতে পারি। আমি কি আমার জীবনবৃত্তান্ত বলব, না আপনি উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন?’
‘বলুন। সংক্ষেপে বলুন। ডিটেইলসে যেতে হবে না” ‘সংক্ষেপেই বলছি—বাবা আমাকে মহাপুরুষ বানানোর কাজে লেগে গেলেন। আমাকে সংসার, চারপাশের জীবন, অপরূপ প্রকৃতি প্রসঙ্গে নিরাসক্ত করতে চাইলেন।’ ‘কীভাবে?’ ‘বুদ্ধি খাটিয়ে আসক্তি কাটানোর তিনি নানা পদ্ধিতি বের করেছিলেন। সংক্ষেপে বলতে বলছেন বলেই পদ্ধতিগুলি আর বর্ণনা করছি না।’ ‘একটি পদ্ধতি বলুন।’
‘একবার বাবা আমার জন্যে একটা তোতা পাখি আনলেন। আমার বয়স তখন চার কিংবা পাঁচ। আমি পাখি দেখে মুগ্ধ। বাবা বললেন, তোতা খুব সহজে কথা শিখতে পারে। তুই ওকে কথা শেখা। রোজ এর কাছে দাঁড়িয়ে বলবি—হিমু, হিমু। একদিন দেখবি সে সুন্দর করে তোকে ডাকবে—হিমু। হি…মু….। আমি মহাউৎসাহে পাখিকে কথা শেখাই। একদিন সত্যি-সত্যি সে পরিষ্কার গলায় ডেকে উঠল—হিমু, হিমু। আমি আনন্দে কেঁদে ফেললাম। বাবা তখন পাখিটাকে খাঁচা থেকে বের করে একটানে মাথা ধড় থেকে আলাদা করে ফেললেন।’
ডাক্তার সাহেব চাপা গলায় বললেন, মাই গড! আমি হাসিমুখে বললাম, আপনি চাইলে আরো দু’-একটা পদ্ধতির কথা বলতে পারি। বলব? ‘না, থাক। আমি আর শুনতে চাচ্ছি না।’ ‘মানুষের চরিত্রের ভয়ংকর দিকগুলিও আমি যেন জানতে পারি বাবা সেই ব্যবস্থাও করলেন।
কিছু ভয়ংকর ধরনের মানুষের সঙ্গে আমাকে বাস করতে পাঠালেন। তাঁরা সম্পর্কে আমার মামা। পিশাচদের সঙ্গে কাটিয়েছি। তবে মামারা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। যাকে বলে অন্ধ স্নেহ। পাগলদের বিচিত্র মানিসকতা যেন আমি ধরতে পারি সে জন্যে তিনি প্রায়ই বাসায় পাগল ধরে নিয়ে আসতেন যত্ন করে দু’দিন-তিন দিন রাখতেন। একজন এসেছিল ভয়াবহ উণ্মাদ। সে রান্নাঘর থেকে বটি এনে আমার গায়ে কোপ বসিয়েছিল। পিঠে এখনো দাগ আছে। দেখতে চান?’
‘না। আজ বরং থাক। আর শুনতে ভাল লাগছে না। এক সপ্তাহ পর ঠিক এই দিনে আবার কথা বলব। আমি ডাইরিতে লিখে রাখলাম। একটু রাত করে আসুন, দশটার দিকে।’ ‘চলে যেতে বলছেন?’ ‘হ্যাঁ, চলে যান। আমার নিজের শরীরও ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে আপনার গল্প আমাকে এফেক্ট করেছে। যাবার আগে শুধু বলে যান—আপনার বাবার এক্সপেরিমেন্ট কি সফল হয়েছে?’
আমি উঠে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে বললাম—সফল হয়নি। বাবার এক্সপেরিমেন্টে ত্রুটি ছিল। তিনি মানুষের অন্ধকার দিকগুলিই আমাকে দেখাতে চেয়েছিলেন। আলোকিত দিক দেখাতে পারেননি। আমার প্রয়োজন ছিল ঈশ্বরের কাছাকাছি একজন মানুষ—যে আমাকে শেখাবে—ভালবাসা, আনন্দ, আবেগ এবং মঙ্গলময় মহাসত্য। আমি নিজে এখন সেইরকম মানুষই খুঁজে বেড়াচ্ছি। পাচ্ছি না। পেলে বাবার এক্সপেরিমেন্টের ফল দেখতে পারতাম। ‘আপনি বিশ্বাস করনে মহাপুরুষ হওয়া সম্ভব?’
‘হ্যাঁ, করি। ডাক্তার সাহেব, আর একটা কথা আপনাকে বলা দরকার। আমি কিন্তু মাঝে-মাঝে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি। কিছু-একটা বলি, তা লেগে যায়। আপনাকে যখন বললাম আপনার মেয়ে গরম পানিতে পুড়ে গেছে তখন আমি নিজে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম যে তাই ঘটেছে। আপনি হয়ত লক্ষ করেননি যে আমি বলেছি আপনার সবচে’ ছোট মেয়ে। আমি জানতাম না আপনার কয়েকটি মেয়ে আছে।’ ‘কাকতালীয় ব্যাপার, হিমু সাহেব।’ ‘ঠিক কাকতালীয় নয়। আপনি কি আরেকবার টেলিফোন করে দেখবেন?’
‘না। আপনি একবার আমাকে বিভ্রান্ত করেছেন। আমি দ্বিতীয়বার আমাকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ আপনাকে দেব না। আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান মানুষ, তবে আমাকে বোকা ভাবারও কারণ নেই।আমি হেসে ফেলাম। ডাক্তার সাহের বলালেন, আপনি কোথায় যাবেন বলুন? আসুন আমার সঙ্গে, আপনাকে নামিয়ে দিব। ‘চলুন।’
বেশির ভাগ ডাক্তার নিজের গাড়ি নিজেই চালান। শিক্ষকরা যেমন সবাইকে ছাত্র মনে করেন, ডাক্তাররাও সেরকম সবাইকে রোগী ভাবেন। গাড়িও তাঁদের কাছে রোগীর মত। নিজের রোগী অন্যকে দিয়ে ভরসা পান না বলে নিজেদের গাড়ী নিজেরাই চালান। তবে ইনি ব্যতিক্রমী ডাক্তার। কারণ তাঁর গাড়ী ড্রাইভার চালাচ্ছে। তিনি হাত-পা ছড়িয়ে পেছনে সীটে বসেছেন। আমি তাঁর পাশে বসলাম।
‘পান খাবেন হিমু সাহেব?’ ‘জ্বি-না।’ ‘পান খাওয়ার এক বিশ্রী অভ্যাস এক রোগী আমাকে ধরিয়ে দিয়ে গেছে। আমি জন্মেও পান খেতাম না। সেই রোগী রূপার তৈরী এক পানের কৌটা বের করে বলল, পান খাবেন ডাক্তার সাহেব? আমি কৌটা দেখে মুগ্ধ হয়ে একটা পান নিলাম। সেই থেকে শুরু। এখন দিনরাত পান খাই। পান কেনা হয় পণ হিসাবে।’ ‘সব বড় জিনিস ছোট থেকে শুরু হয়।’ ‘ঠিক বলেছেন—You start by killing a bird, you end by killing a man. আপনি নামবেন কোথায়?’
‘যে-কোনো একজায়গায় নামিয়ে দিলেই হবে।’ ‘সে কী। পাটিকুলার কোথাও নামতে চান না?’ ‘জ্বি-না। আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আমার এক বন্ধুকে কি আপনার কাছে নিয়ে আসতে পারি?’ ‘অবশ্যই পারেন। উনিও কি আপনার মতো?’ ‘না। আমার কেউ কারো মতো নই ডাক্তার সাহেব। আমরা সবাই আলাদা।’ ‘আমার কাছে আনতে চাচ্ছেন কেন?’
‘ঐ ভদ্রলোকের একটা সমস্যা আছে। উনি থাকেন খিলগাঁয়। একতলা বাসা। উনার বাড়ির সামনে কোনো গাছপালা নেই। কিন্তু উনি সবসময় বাড়ির সামনে একটা প্রকাণ্ড আমগাছ দেখেন। এর মানে কি?’ ‘ভদ্রলোককে একবার নিয়ে আসবেন।’ ‘আচ্ছা, আনব।’ ‘হিমু সাহেব।’ ‘জ্বি?’ ‘চলুন আমার সঙ্গে। আমার বাসায় চলুন—একসঙ্গে ডিনার করব। আপত্তি আছে?’ ‘না, আপত্তি নেই।’
আমরা ধানমণ্ডি তিন নাম্বার রোডে কম্পাউন্ড দেয়া দোতলা বাসার সামনে থামলাম। গেটটা খোলা। গেটের সামনে জটলা হচ্ছে। জানা গেল—এই বাড়ির ছোট মেয়েটা কিছুক্ষণ আগে গরম পানির গামলায় পড়ে ঝলসে গেছে। তাকে অ্যাম্বুলেন্স এসে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। ডাক্তার ইরতাজুল করিম ছুটে ভেতরে চলে গেলেন। আমি একা-একা দাঁড়িয়ে রইলাম।
ডাক্তার সাহেব প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ফিরলেন। যান্ত্রিক গলায় বললেন,চেম্বার থেকে ফিরে আমি সবসময় গরম পানিতে গোসল করি। ঘরে ওয়ার্টার হীটার আছে। আজই হীটারটি কাজ করছিল না বলে আমার জন্যে পানি গরম করেছে। আমি বললাম, খুব বেশি পুড়েছে? ডাক্তার সাহেব নিচু গলায় বললেন, হ্যাঁ। তাকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ‘চলুন, আমারাও হাসপাতালে যাই।’
ডাক্তার সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন, আপনাকে হাসপাতালে যেতে হবে না। সরি, আপনাকে আজ ডিনার খাওয়াতে পারছি না।মোরশেদ সাহেব সম্ভবত বাসায় ফেরেননি। এখন সবে সন্ধ্যা। যাদের ঘরে কোনো আকর্ষণ নেই তারা সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফেরে না। ঠিক সন্ধ্যায় তারা একধরনের অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়। এই অস্থিরতা শুধু মানুষের বেলাতেই যে হয় তা না—পশুপাখিদের ক্ষেত্রেও হয়। সেই কারণেই হয়তো সব ধর্মে সন্ধ্যা হল উপাসনার সময়।
মনের অস্থিরতা দুর করে মনকে শান্ত করার এক বিশেষ প্রক্রিয়া। পরম রহস্যময় মহাশক্তির কাছে আবেদন—আমাকে শান্ত কর। আমার অস্থিরতা দূর কর।দিনের কর্ম সাধিতে সাধিতে ভেবে রাখি মনে মনে কর্ম অন্তে সন্ধ্যাবেলায় বসিব তোমারি সনে।খোলা গেট দিয়ে ঘরে ঢুকলাম। ঘর অন্ধকার, তবে দরজার তালা নেই। কয়েকবার ধাক্কা দিতেই মোরশেদ সাহেব দরজা খুলে দিলেন। মুখ শুকিয়ে কালো হয়ে আছে। মাথা ভেজা।
‘কি ব্যাপার মোরশেদ সাহেব?’ ‘কিছু না ছোটমামা। আসুন, ভেতরে আসুন।’ ‘শরীর খারাপ?’ ‘জ্বি, দুপুরে একবার এপিলেপটিক সিজার হল। মেঝেতে পড়েছিলাম। ঘরে কেউ ছিল না।’ ‘একা থাকেন?’ ‘জ্বি।’ ‘বাতি জ্বালাননি কেন? সন্ধ্যাবেলা বাড়িঘর অন্ধকার দেখলে ভাল লাগে না।’
মোরশেদ সাহেব বাতি জ্বালালেন । আমি বসতে-বসতে বললাম, আপনার আত্মীয়স্বজন কেউ নেই? ওদের কাউকে সঙ্গে এন রাখতে পারেন না? আপনি অসুস্থ মানুষ। একজন কারো তো আপনার সঙ্গে থাকা দরকার।
‘ছোটভাই আছে। সে কানডায় থাকে। ছোটবোন ঢাকাতেই আছে। ওর নিজের স্বামী-সংসার আছে। ওকে বিরক্ত করতে ইচ্ছা করে না। আমি হলাম সবার বড়।’ ‘এষার সঙ্গে কি এর মধ্যে দেখা হয়েছে?’ ‘জ্বি, দেখা হয়েছে। ও এসেছি।’ ‘নিজেই এসেছিল।–বাহ্, ভাল তো।’
‘ওর দাদীমাকে নিয়ে এসেছিল। আমাকে বোঝাল যে ডিভোসই আমাদের দু’জনের জন্যে মঙ্গলজনক। আমিও দেখলাম এষা ঠিকই বলছে। তা ছাড়া বেচারি আমার সঙ্গে থাকতে চাচ্ছে না। আমি তো জোর করে কাউকে ধরে রাখতে পারি না।’
‘তা তো বটেই। পশুকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা যায়, মানুষকে যায় না।’ ‘আমি এষার সঙ্গে ম্যারিজ রেজিস্ট্রারের অফিসে গিয়ে কাগজপত্র সই করে এসেছি।’ ‘ভাল করেছেন।’ ‘এষার জন্যে হয়ত ভাল করেছি, আমার জন্যে না। আমার মনটা খুব খারাপ। মামা, আপনাকে চা করে দি। ঘরে আর কিছু নেই—শুধু চা।’ ‘শুধু চা’ই দিন। রান্নাবান্না কি আপনি নিজেই করেন?’
