সে ও নর্তকী পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

সে ও নর্তকী পর্ব – ৪

খুব ইন্টারেস্টিংভাবে পরিচয় হয়েছে। আমি ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে একটা বই এনেছিলাম। আমার কাছে থেকে সেই বই নিয়ে গেল যূথী। আর তো বই ফেরত দেয় না, শুধু ফাইন হচ্ছে। শেষে একদিন করলাম কি অফিস থেকে যূথীর ঠিকানা নিলাম। বাসা খুঁজে বের করব। যূথী থাকে ভূতের গলিতে–কলাবাগান হয়ে যেতে হয়।

আমি একে-ওকে জিজ্ঞেস করে করে যাচ্ছি–এভাবে ভদ্রলোকের বাড়িতে উপস্থিত হলাম। খুব সুন্দর এটা বাড়ি। ছায়া ছায়া বাড়ি। শহরের মাঝখানে যেন ছোট্ট একটা বাঁশবনওয়ালা গ্রাম। বাড়ির সামনে জঙ্গলমতো হয়ে আছে। সেই জঙ্গলে ফুটফুটে একটা মেয়ে একা একা খেলছে। মেয়েটাকে দেখে এমন মজা লাগল। আমি বললাম, এই খুকি, এটা কার বাড়ি?

মেয়েটা বলল, আমাদের বাড়ি।

নাম্বার কত বাড়ির?

আমি তো জানি না নাম্বার কত।

জানো না কেন? তোমার এখন কঠিন শাস্তি হবে। আমি হচ্ছি বাড়ির ইন্সপেকটর।আমি যে মজা করছি মেয়েটা চট করে বুঝে ফেলল। সে হাসিমুখে বলল, ভেতরে আসুন, আন্টি।বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে আমার তখন পানির পিপাসা পেয়ে গিয়েছিল। কোনো বড়িতে ঢুকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেতে পারলে ভালোই হয়। আমি বললাম, তোমাদের বাড়িতে কি ফ্রিজ আছে।

আছে।

সেই ফ্রিজে পানির বোতল আছে?

হ্যাঁ।

সেই পানির বোতলে পানি আছে?”

হ্যাঁ।

তাহলে পানি খাওয়ার জন্য যাওয়া যায়। তোমাদের বাড়িতে তুমি ছাড়া আর কে আছে।

বাবা আছে।

মা কোথায় গেল?

মা মারা গেছেন। আমার জন্মের সময় মারা গেছেন।আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। কী ফুটফুটে একটা মেয়ে! মায়ের আদর কী জানে না। আমি বললাম, তাহলে এই সুন্দরবৗণ্ডিটাতে শুধু তুমি আর তোমার বাবা থাকো? বুয়া ছিল। গত বুধবার বুয়া করেছে কি, বাবার মানিব্যআির আমার পানির বোতলটা নিয়ে পালিয়ে গেছে।

বলো কি! এখন রান্না করছে কে?

বাবা আর আমি আমরা দুজনে মিলে রান্না করছি।

সেটা তো ভালোই।

আসুন আন্টি। ভেতরে আসুন।

তোমার বাবা আবার রাগ করবেন নাতো?

বাবা রাগ করবে না। বাবা ছবি আঁকছে। বাবা কিছু বুঝতেই পারবে না।আমি বাড়িতে ঢুকলাম। পানি খেলাম। জাহিন আমাকে তার বাবার স্টুডিওতে নিয়ে গেল। ভদ্রলোক ছবি আঁকছিলেন। কি ছবি জান মা, বিরাট সর্ষে ক্ষেতের মাঝখানে বাচ্চা একটা মেয়ে। পুরো হলুদ হয়ে আছে। সেই হলুদ মাঠে লাল ডুরে শাড়ি পরা বাচ্চা মেয়েটা কে জানো? উনার মেয়ে জাহিন। কী সুন্দর করে যে উনি ছবিটা এঁকেছেন! তুই পছন্দ করেছিস বিপত্নীক একটা মানুষ?

হ্যাঁ।স্বাতীর মা এই পর্যায়ে বিছানা থেকে উঠে বসবেন। হতভম্ব হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। স্বাতী বলবে–তুমি এ-রকম করে তাকিয়ে আছ কেন? বিপত্নীক মানুষকে পছন্দ করা যাবে না। বাংলাদেশের সংবিধানে এমন নিয়ম নেই।স্বাতীর মা থমথমে গলায় বলবেন, তুই ঐ মানুষটাকে বিয়ে করবি?

হুঁ।মা চোখে পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকবেন। তখন স্বাতী নিচু গলায় বলবে, বিয়ে না করে আমার উপায় নেই মা। আমি ভয়ানক একটা অন্যায় করে ফেলেছি।লিলি আসে নি। কাজেই স্বাতীর পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে গেল। মেজাজও খারাপ হতে লাগল। সারাদিন মানুষ আসছে–ফুপা, ফুপু, মামারা। ফুল আসছে। টেলিফোন আসছে এবং সবাইকে নাজমুল সাহেব সন্ধ্যার পর আসতে বলেছেন। হোটেল সোনারগাঁওয়ে কেকের অর্ডার দেয়া হয়েছে। সন্ধ্যাবেলা কেক কাটা হবে। সন্ধ্যার আগে আগে স্বাতী বলল–মা আমি একটু ঘুরে আসি?

রওশন আরা অবাক হয়ে বললেন, এখন কোথায় যাবি? সন্ধ্যাবেলা সবাই আসবে।সন্ধ্যার আগে আগে চলে আসব মা।তাহলে গাড়ি নিয়ে যা।গাড়ি লাগবে না।কলিং বেলে হাত রাখার আগেই জাহিনের তীব্র ও তীক্ষ্ণ গলা শোনা গেল–আন্টি আন্টি আন্টি।স্বাতী বলল, চেঁচাবি না। চেঁচিয়ে মাথা ধরিয়ে ফেলেছিস। বাবা আছে?

হুঁ।

কী করছে?

ছবি আঁকছে।

কীসের ছবি?

একটা বুড়ো লোকের ছবি।

ছবি আঁকার জিনিস পাচ্ছে না, বুড়ো লোকের ছবি আঁকতে হবে? বুড়ো লোকটা ছাতা মাথায় বৃষ্টির মধ্যে হাঁটছে।সুন্দর একটা মেয়ের ছবি আঁকবে যে বৃষ্টির ভেতর হাঁটবে—তা না… আন্টি, আজ তুমি কিন্তু আমার সঙ্গে গল্প করবে। বাবার সঙ্গে না। এর আগের দুবার যে এসেছিলে আমার সঙ্গে কোন গল্প কর নি।

তোর সঙ্গে কী গল্প করব? তুইতো কোনো গল্পই জানিস না।জাহিনের একটু মন খারাপ হলো, কারণ সে আসলেই কোনো গল্প জানে না। স্বাতী বলল, যারা দিনরাত গল্পের বই পড়ে তারা কোনো গল্প বলতে পারে না। যারা খুব জমিয়ে গল্প করে খোঁজ নিয়ে দেখবি তারা কোনো গল্পই জানে না।আন্টি, তুমি কি আমার জন্য কিছু এনেছ?

হুঁ

কী এনেছ?

এখন বলব না। এখন আমি চা খাব।

আমিও তোমার সঙ্গে চা খাব।

ভেরি গুড। চল রান্নাঘরে যাই।

আন্টি, তুমি কি গান জানো?”

গান জানি না। নাচ জানি।

নাচ জানো? সত্যি?

সত্যি। ছোটবেলায় আমার নাম কি ছিল জানিস? লিটল ড্যান্সার। ছোট নর্তকী।”

সবাই তোমাকে ছোট নর্তকী ডাকত?

সবাই ডাকত না। শুধু বাবা ডাকত–এখনও ডাকে।

স্কুলে আমাকে কি ডাকে জানো?

না।

স্কুলে আমাকে ডাকে চার চোখ। চশমা পরি তো এইজন্য চার চোখ। স্কুলে আমাদের আরেকটা মেয়ে আছে তার নাম কাঁচা মরিচ। স্কুলে তোমাকে কী ডাকত আন্টি।স্কুলে আমার নাম ছিল মিস গুণ্ডি। সবার সঙ্গে গুণ্ডামি করতাম এজন্য মিস গুণ্ডি নাম। শোন জাহিন, তোর সঙ্গে বকবক করে আমার মাথা ধরে গেছে। তুই আর কোনো কথা বলতে পারবি না। আমি চা বানাব তুই চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে থাকবি।

ইশারায় কি কথা বলতে পারব?

হ্যাঁ, ইশারায় বলতে পারবি।

স্বাতী চা বানাচ্ছে। তিন কাপ চা হচ্ছে। তার জন্য, জাহিনের জন্য এবং জাহিনের বাবার জন্য। জাহিন বেচারি আসলেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। একবার শুধু ইশারায় বলেছে তাকে চিনি বেশি দিতে হবে। স্বাতীর মায়া লাগছে, সে বলল, আচ্ছা বল, তোকে আর তিন মিনিট কথা বলার সুযোগ দেয়া গেল।জাহিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, আন্টি, তোমার সঙ্গে কি বাবার বিয়ে হচ্ছে? স্বাতী থতমত খেয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, হুঁ। তুই বুঝলি কী করে?

বাবা বলেছে।

কখন বলল?

পরশুদিন রাতে।

কথাটা কীভাবে বলল?

বাবা বলল, তোর স্বাতী আন্টি মেয়েটা কেমনরে? আমি বললাম, খুউল ভালো। তখন বাবা বলল, এই মেয়েটাকে আমাদের বাসায় রেখে দিলে কেমন হয়? আমি বললাম, খুব ভালো হয়। কীভাবে রাখবে? বাবা বলল, একদিন যখন বাসায় আসবে তখন দরজা-জানালা বন্ধ করে তাকে আটকে ফেলব আর যে দেব না। তখন আমি বুঝলাম বাবা তোমাকে বিয়ে করবে। বিয়ের কথা বলতে লজ্জা লাগছে তো এইজন্য ঘুরিয়ে বলছে। আমার বুদ্ধি বেশি তো এজন্য ধরে ফেলেছি।

বুদ্ধিমান কন্যা, এই নিন আপনার চা।

থ্যাংক য়্যু আন্টি।

আর এই নিন আপনার উপহার।

স্বাতী তার কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ থেকে গল্পের বই বের করল। একটা না কয়েকটা। জাহিনের চোখ চকচক করছে। মনে হচ্ছে সে কেঁদে ফেলবে। স্বাতী বলল, উপহার আরও আছে, এক প্যাকেট চকলেট আছে। এই চকলেটের নাম কি জানিস? না।

এর নাম সুইস গোল্ডবার আমার খুব প্রিয় চকলেট।এখন তুই বই নিয়ে পড়তে বোস। এক পাতা পড়বি, চকলেটে একটা কামড় দিবি।তুমি কি বাবার সঙ্গে গল্প করবে? হ্যাঁ।আজ তোমাকে দেখতে এত খারাপ লাগছে কেন? আজ আমার মনটা খারাপ। মন ভালো করার জন্য তোদের কাছে এসেছি।মন ভালো হয়েছে? এখনও হয় নি।বাবার কাছে গেলে মন আরও খারাপ হবে।কেন?

বাবা খুব রেগে আছে। তার ছবি ভালো হচ্ছে না–এজন্য রেগে আছে। আমার সঙ্গেও গম্ভীর হয়ে কথা বলেছে।সেটা অবশ্যি একদিক দিয়ে ভালো। দুজুন মন খারাপ লোক পাশাপাশি থাকলে মন খারাপ ব্যাপারটা চলে যায়।স্বাতী দুকাপ চা নিয়ে স্টুডিওতে ঢুকল। স্টুডিও অন্ধকার। জানালা বন্ধ। ঘরে কোনো আলো নেই। ঘরের ভেতরে সিগারেটের ধোঁয়া। কুয়াশার মতো জমে আছে। স্বাতী বলল, তুমি কোথায়?

কোনো জবাব পাওয়া গেল না। স্বাতী বলল, চা এনেছি।ঘরের এক কোনা থেকে ক্লান্ত গলায় হাসনাত কথা বলল, এদিকে এসো।হাসনাত শুয়ে আছে ক্যাম্পখাটে। এই গরমেও তা্র গায়ে চাদর। স্বাতী বলল, তোমার কী হয়েছে? প্রচণ্ড মন খারাপ।কেন?” তিন মাস ধরে একটা কাজ করলাম। দিনরাত কাজ করেছি। কাজটা নষ্ট হয়ে গছে।নষ্ট হলো কীভাবে? কাজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় নি। ছবি আঁকা হয়েছে। ছবিতে প্রাণ নেই।প্রাণ নেই কেন?”

সেটা জানি না। জানতে পারলে তো কাজই হতো। তুমি দূরে দাঁড়িয়ে আছ। কেন? কাছে এসো।স্বাতী ক্ষীণস্বরে বলল, আজ আমার জন্মদিন।আমার কাছ থেকে কী উপহার চাও? এখনও বুঝতে পারছি না। সুন্দর একটা ছবি এঁকে দিতে পারো, যে ছবিতে প্রাণ আছে।প্রাণের ব্যাপারটা বাইরে থেকে আসে। আমি ইচ্ছা করলেই প্রাণ দিতে পারি না। তুমি কাছে আসছ না কেন? তোমার ভেতর কি এখনও কোনো দ্বিধা আছে?

স্বাতী চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে সে এগুচ্ছে। ভয়ঙ্কর একটা অন্যায় করতে যাচ্ছে। তার পেছনে ফেরার পথ নেই।স্বাতী ফিসফিস করে বলল, এই, গায়ে হাত দিয়ে দেখ তো আমার জ্বর কি-না। স্বাতীর যত উদ্ভট কথা। জহিরুল হক স্যারের ক্লাস চলছে। মাছিদের যেমন এক লক্ষ চোখ, স্যারেরও তেমনি। স্যারের মনে হয় দুলক্ষ চোখ। কোথায় কি হচ্ছে সবই তিনি দেখেন।

শুধু দেখেই ক্ষান্ত হন না, ক্যাট ক্যাট করে কথা বলেন। লিলি জ্বর দেখতে যাবে আর স্যার দারুণ অপমানসূচক কোনো কথা বলবেন না, তা কখনও হবে না। গত সপ্তাহে, দুলালী তার ক্লাসে হাই তুলছিল। তিনি দুলালীর দিকে তাকিয়ে বললেন–এই মেয়ে, হাই তোলার সময় মুখের সামনে বই-খাতা কিছু ধরবে। তুমি যে রকম বড় করে হাই তোলো মুখের ভেতর দিয়ে একেবারে পাকস্থলী পর্যন্ত দেখা যায়।

ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে হো হো করে হেসে উঠল। হাসিতে ব্যাপারটার ইতি হলে কথা ছিল–ইতি হয় নি। কয়েকটা ছেলে দুলালীকে মিস পাকস্থলী ডাকা শুরু করেছে। যতবার ডাকছে ততবারই দুলালীর চোখে পানি চলে যাচ্ছে। কাজেই ছেলেরা এই ডাক সহজে ছাড়বে না। ইউনিভার্সিটিতে দুলালীকে আরও তিন বছর থাকতে হবে। এই তিন বছরে তার মিস পাকস্থলী স্থায়ী হয়ে যাবার সম্ভাবনা। কী ভয়াবহ সম্ভাবনা!

স্বাতী আবারও বলল, এই লিলি, দেখ, আমার জ্বর আসছে কি না।লিলি ফিসফিস করে বলল, এখন পারবনুর। ক্লাস শেষ হোক। তখন দেখব।স্বাতী বলল, ক্লাস শেষ হতে হতে আমার জ্বর কমে যেতে পারে, এখনি দেখ। নাও অর নেভার।আর তখনই জহিরুল হক স্যার পড়া বন্ধ করে গম্ভীর গলায় বললেন–এই টু উইম্যান, দুজনই উঠে দাঁড়াও।

লিলির বুক ধড়ফড় করছে। স্যার কী বলেন কে জানে। ছাত্ররা সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। স্যারের কাউকে দাঁড় করানো মানে মজাদার কিছু সময়। বিড়াল যেমন ইঁদুর মারার আগে ইঁদুর নিয়ে কিছুক্ষণ খেলা করে, তিনিও করেন। সেই খেলা দেখতে ভালো লাগে। লিলির চোখ-মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলেও স্বাতী বেশ স্বাভাবিক। সে দাঁড়িয়েছে হাসি হাসি মুখে।

স্যার বললেন, তোমরা কী নিয়ে গল্প করছিলে? লিলির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করা হলেও জবাব দিল স্বাতী। সহজ স্বাভাবিক গলায় বলল, স্যার, আমরা গল্প করছিলাম না। আমি লিলিকে বলছিলাম আমার গায়ে হাত দিয়ে দেখতো জ্বর আসছে কি-না। ও রাজি হচ্ছিল না।ও-টা কে? ও হচ্ছে লিলি, রোল থার্টি টু।সবাই হেসে উঠল। জহিরুল হক স্যারের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল। যে রসিকতা তার করার কথা সেই রসিকতা অন্য একজন করছে, এটা হজম করা তাঁর পক্ষে মুশকিল।তোমার কি জ্বর নাকি?

বুঝতে পারছি না স্যার। রোল থার্টি টুকে বললাম দেখে দিতে। ও দেখল না।স্বাতী করুণ ভঙ্গি করে কথা শেষ করল। সবাই আবারও হেসে উঠল। জহিরুল হক স্যারের মুখ রাগে ছাই বর্ণ হয়ে গেল। তিনি অনুভব করলেন কন্ট্রোল এই মুহূর্তে তার হাতে নেই, পরিস্থিতি দ্রুত সামলে নিতে না পারলে ভবিষ্যতে এই মেয়ে ক্লাসে অনেক যন্ত্রণা করবে। তিনি লিলির দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললেন–এই মেয়ে, দেখো, তোমার বান্ধবীর জ্বর দেখো। কপালে হাত দিয়ে দেখো ভালো মতো।লিলি দারুণ অস্বস্তি নিয়ে স্বাতীর কপালে হাত দিল।

কি, জ্বর আছে?

জি স্যার।

বেশি না কম?

মোটামুটি।

জ্বর নিয়ে ক্লাস করতে হবে না। যাও, চলে যাও।ক্লাস থেকে স্বাতী বই-খাত গুটিয়ে হাতে নিল। সে বেশ হাসিমুখে বের হচ্ছে। জহিরুল হক স্যার লিলির দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? তুমিও যাও। অসুস্থ বান্ধবীকে একা ছেড়ে দেবে, তা কি করে হয়।

স্বাতীর পেছনে লিলিকেও বের হতে হলো। স্বাতীর উপর রাগে লিলির গা জ্বলে যাচ্ছে। কী ভয়ানক অস্বস্তির মধ্যে স্বাতী তাকে ফেলে দিল। ওর সঙ্গে চলাফেরা করা মুশকিল হয়ে উঠছে।স্বাতী বলল, যাক, অল্পের ওপর দিয়ে পার পাওয়া গেল। এখন কী করা যায়। বল দেখি? সামথিং হ্যাজ টু বি ডান। কিছু-একটা তো করা দরকার।লিলি জবাব দিল না। তাদের পরের ক্লাস বিকাল তিনটায়। মাঝখানের আড়ই ঘণ্টা কিছুই করার নেই। স্বাতী বলল, আমার সঙ্গে চল এক জায়গায়।

আমি তোর সঙ্গে কোথাও যাব না।”

দারুণ একটা জায়গায় নিয়ে যাব।

বেহেশতে নিয়ে গেলেও যাব না।

এই আড়াই ঘণ্টা করবি কী?

যা-ই করি, তোর সঙ্গে যাব না।

আমি জ্বরে মরে যাচ্ছি আর তুই আমাকে পরিত্যাগ করছিস। এটা কি ঠিক হচ্ছে? আমার যে জ্বর সেটা তো মিথ্যা না।জ্বর নিয়ে ঘোরাঘুরিরই-বা দরকার কী? বাসায় চলে যা।স্বাতী নিশ্বাস ফেলে বলল, বাসাতেই যাব। জ্বর মনে হয় আরও বাড়বে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। তুই আমাকে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দে। না-কি তাও করবি না? বাসায় গিয়ে দুটো পারাসিটামল খেয়ে শুয়ে থাকব। তুই মার সঙ্গে গল্প করবি। ঘণ্টাখানেক রেস্ট নেয়ার পর আমার যদি শরীরটা ভালো লাগে তাহলে লাস্ট ক্লাসটা করব। কি, রাজি?

লিলি রাজি হলো। রিকশায় বসে হুড তুলতে তুলতে স্বাতী বলল, পথে আমি এক জায়গায় জাস্ট এক মিনিটের জন্য থামব। একজনের সঙ্গে দেখা করে দুটো কথা বলেই চলে আসব। তুই আমার সঙ্গে যেতে না চাইলে রিকশায় বসে থাকিস।রিকশায় বসে থাকার ব্যাপারটা হচ্ছে কথার কথা। লিলি খুব ভালো করেই জানে তাকেও নামতে হবে। স্বাতীর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন ব্যাপার। তার মনে যা আসে তা করবেই। লিলির ক্ষীণ সন্দেহ হচ্ছে–আজকের পুরো ব্যাপারটাই স্বাতীর সাজানো। হয়তো সে এক সপ্তাহ আগেই ঠিক করেছে–আজ জহিরুল হক স্যারের ক্লাসে একটা নাটক করে লিলিকে নিয়ে বের হয়ে আসবে…হয়তো… স্বাতী বলল, এ রকম মুখ ভোঁতা করে বসে আছিস কেন?

ভালো লাগছে না।পৃথিবীতে কোন বাক্যটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় জানিস লিলি? সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বাক্য হচ্ছে–ভালো লাগছে না। ভালো লাগছে এ-রকম কথা আমরা প্রায় বলিই না।ভালো লাগার মতো কিছু ঘটে না, তাই বলি না।

ভালো লাগার মতো অনেক কিছুই ঘটে। তারপরও আমরা বলি না এই যে আজ জহিরুল হক স্যারকে কোণঠাসা করে ফেললাম—তোর খুব ভালো লাগছিল কিন্তু তুই কি বলেছিস ভালো লাগছে? লিলি চুপ করে রইল। স্বাতী উৎসাহের সঙ্গে বলল, আজ তিনটার ক্লাসটা যে আমরা করব না এটা ভেবেও তোর ভালো লাগছে। কিন্তু মুখ ফুটে তুই তা বলবি না।তিনটার ক্লাস করছি না? না?

তুই না করলে না করবি। মরে গেলেও আমি ক্লাস মিস দেব না।স্বাতী হাসিমুখে বলল, তোর সঙ্গে এক শ টাকা বাজি, তুই আজকের ক্লাস মিস করবি। আমি তোকে আটকে রাখব না বা কিছু করব না। তুই নিজ থেকেই বলবি–আজকের ক্লাস করব না। রাজি?

আমি তোর কথাবার্তা কিছু বুঝতে পারছি না।বুঝতে পারছিস না কেন? আমি কখনও জটিল কথা বলি না। সহজ কথা বলি। যারা মানুষ হিসেবে খুব জটিল তারা খুব সহজ জীবনযাপন করে, খুব সহজ কথা বলে। আমি খুব জটিল মেয়ে, এজন্যই আমার জীবনযাত্রা সহজ।

লিলি বলল, তোর ধারণা তুই জটিল মেয়ে, আসলে জটিল না। তুই সহজ ধরনের মেয়ে।তোকে যে বাসায় নিয়ে যাচ্ছি সে-বাসায় পা দেয়া মাত্র তুই বুঝবি, আমি জটিল মেয়ে। সে-বাসায় একজন ভদ্রলোক থাকেন। বুড়ো বুড়ো টাইপের একটা লোক। বেঁটে-খাটো গাট্টাগোট্টা ধরনের। যার কোনো ফিক্সড ইনকাম নেই–দিনে-আনি দিনে-খাই টাইপ মানুষ।

 

Read more

সে ও নর্তকী পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *