দ্বৈরথ পর্ব:১
বাথরুমের দরজা খোলা। লোকটা অনেকক্ষণ ধরে বাথরুমে। বিশ্রী রকমের একটা আওয়াজ আসছে। গঁরল-গঁল-গঁরল। একজন মানুষ এমন কুৎসিত শব্দে গার্গল করে কিভাবে? সুন্দর শোভন কিছুই কি মানুষটার নেই? সোমা হাই তুলল। মাত্ৰ নটা বাজে। এর মধ্যে হাই ওঠার কথা না। কিন্তু এই মানুষটি আশেপাশে থাকলে তার হাই ওঠে। লোকটি অবশ্য বুঝতে পারে না।
তাই ওঠার সঙ্গে যে অবহেলার একটা ব্যাপার আছে, তা বোধহয় সে জানেও না। জানলেও তার হয়তো কিছু যায় আসে না। সোমা।লোকটার গলার স্বর অবশ্যি মিষ্টি। না, মিষ্টি বলাটা ঠিক হচ্ছে না। পুরুষদের গলা মিষ্টি হয় না। ধাতব একটা ঝংকার শুধু থাকে। এই লোকের তা আছে। শুনতে ভালো লাগে। কথা শুনলে জবাব দিতে ইচ্ছে করে।
এই সোমা।আসছি।একটু লবণ দাও।লবণ দিয়ে কী করবে?দাঁত ঘষব। শালা দাঁতে পেইন উঠেছে।
সোমা লবণ আনতে গেল। তার কানে ঝনঝন করে বাজছে—দাঁত ঘষব। শালা দাঁতে পেইন উঠেছে। লোটা কি ইচ্ছে করলে শালা শব্দটা বাদ দিতে পারত না? বোধহয় না। এইসব শব্দ তার রক্তে মিশে আছে। এই ঘরে একটা সাদা রঙের বিড়াল আসে। বিড়ালটার একটা চোখ নষ্ট। তাই সে বিড়ালটাকে ডাকে কানাশালি। বিড়ালটাকে শালি না ডাকলে কি চলত না?
সোমা ঝকঝকে একটা পিরিচের ঠিক মাঝখানে খানিকটা লবণ নিল। কিছু ছড়িয়ে গিয়েছিল সাবধানে সে একত্র করল। অসুন্দর কোনকিছুই তার ভালো লাগে না। যদিও তাকে বাস করতে হয় অসুন্দরের মধ্যে।লোকটা তার হাত থেকে পিরিচ নিল। লবণ কত সুন্দর করে সাজানো সেদিকে সে লক্ষও করছে না। আঙুলে লবণ নিয়ে বিকট ভঙ্গিতে দাঁত ঘষছে। মাঝে-মাঝে থুথু করে থুথু ফেলছে। সোমা বাথরুমের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার দাঁড়িয়ে না থাকলেও চলত, তবুও সে দাঁড়িয়ে আছে। কেন আছে লোকটা কি তা জানে? মনে হয় জানে না।
সোমা।বল।শালার রক্ত পড়ছে। মাঢ়ী নষ্ট হয়ে গেছে। নিমের ডাল জোগাড় করতে হবে। টুথপেস্ট ফুপেস্ট দাঁতের বারটা বাজিয়ে দেয়।কিছু বলবে না বলবে না করেও সোমা বলল, নিমের ডাল কোথায় পাবে?আছে সবই আছে। ঢাকা শহরে সব আছে। শালার ইন্টারেস্টিং একটা শহর। ভেরি ইন্টারেস্টিং।ভাত বাড়ব? বাড়। মিনু হারামজাদী কোথায়?
ঘুনুচ্ছে।নয়টা বাজতেই ঘুম-হারামজাদী পেয়েছে কী? মাসে সত্তর টাকা দিই ওর মুখ দেখার জন্য? কানে ধরে তোল। এগারটার আগে ঘুমাতে দেখলে থাপ্পড় দিয়ে হারামজাদীর দাঁত ফেলে দেব।ওর জ্বর। আমি ভাত বাড়ছি—অসুবিধা তো কিছু নেই।অসুবিধা থাকুক আর না থাকুক, নটার সময় ঘুমাবে কেন? ফাজিলের ফাজিল।
সোমা রান্না ঘরে চলে গেল। খাবার গরম করল। কেটলিতে চায়ের পানি চড়িয়ে দিল। খাওয়াদাওয়ার পর তোকটা এক কাপ চা খায়। আদা দিয়ে কড়া এক কাপ চা। এতে নাকি পিত্ত পরিষ্কার হয়। আজ খাওয়ার আয়োজন ভালো না। ছোট মাছের তরকারি, আলু ভাজা এবং ডাল। মুগের ডাল। লোটার খুব প্রিয় জিনিস। হুসহস শব্দ করে ডাল খাবে। চোখ চকচক করতে থাকবে।
খাবার সময় বেশ কয়েকবার বলবেলো হয়েছে। গুড কুকিং। এক নম্বরি ডাল।তারা খেতে বসতে বসতে দশটা বেজে গেল। বারান্দায় টেবিল। দুজনে বসেছে। মুখোমুখি। লোকটা প্লেটে ডাল নিতে নিতে বলল, মুগের ডাল না-কি? সোমা জবাব দিল না। লোকটা হাসি-হাসি মুখে তাকিয়ে আছে। ডালের গন্ধটা ফাইন। মনে হচ্ছে গুড কুকিং হয়েছে। ডাল ভেজে নিয়েছিলে?
হুঁ।গুড। ভেরি গুড। মুগের ডালের আসল রহস্য ভাজার মধ্যে। অল্প ভাজাও যাবে না, আবার বেশিও ভাজা যাবে না। ডিফিকাল্ট। খুব ডিফিকাল্ট।সাদা বিড়ালটা চলে এসেছে। লোকটার পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছে। খামচি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। খেতে না দেওয়া পর্যন্ত এরকম করতেই থাকবে। মাঝে-মাঝে কামড়ও দেবে। সোমা। বল। কানাশালির আবার পেট হয়েছে—দেখছ? শালি ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে। প্রতি তিন মাসে এক বার করে পেট। অবস্থাটা চিন্তা কর। শালি মনে হচ্ছে বিরাট প্রেমিকা।
সোমা মুখ নিচু করে খেয়ে যাচ্ছে। কথাগুলো শুনতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু উপায় নেই। শুনতেই হবে। অসুন্দর কোনো দৃশ্য দেখতে না চাইলে আমরা চোখ বন্ধ করতে পারি। কান বন্ধ করার কোন উপায় নেই।সোমা।বল।শালির লাইগেশন করিয়ে দিলে কেমন হয়? ফুর্তি করে বেড়াবে। পেট হবে না। ফাইন ব্যবস্থা। বিড়ালেরও লাইগেশন হয়। তুমি জান? জানি না।হয়। খোঁজ নিয়েছি। বদরুল সায়েবের এক শালা পশু হাসপাতালের কম্পাউন্ডার। তার কাছে শুনলাম। শালিকে পশু হাসপাতালে নিয়ে যাব। কষ্টটা দেখ না, তিন মাস পর-পর-ডালটা ভালো হয়েছে। গুড কুকিং।
সোমা জবাব দিল না। জবাব দেবার কিছু নেই।লোকটা গম্ভীর গলায় বলল, বিড়াল জানোয়ার ভালো। ফুর্তিফার্তা যা করে মানুষের আড়ালে করে, আর কুকুরের অবস্থাটা দেখ–সোমা ভাবল লোকটাকে কঠিন কিছু বলবে। শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল। থাক আজ আর বলে কি হবে? কোনো দরকার নেই। সোমা উঠে পড়ল। লোটা বিস্মিত হয়ে বলল, খাওয়া হয়ে গেল? হুঁ।একটা বাটিতে করে শালিকে খানিকটা দুধ খেতে দাও। এখন শালির ভালো মন্দ খাওয়া দরকার। ডালটা ভালো হয়েছে সোমা। গুড কুকিং।
সোমা বাটিতে করে বেশ খানিকটা দুধ বিড়ালটাকে এনে দিল। বিড়ালটা জিত ভিজিয়ে ভিজিয়ে দুধ খাচ্ছে আবার ফিরে যাচ্ছে লোকটার পায়ের কাছে। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আবার ফিরে আসছে বাটির কাছে। সোমার কাছে এক বারও আসছে না। বিড়ালরাও অনেক কিছু বুঝতে পারে।সোমা।বল।শালিকে এখন থেকে রোজ খানিকটা দুধ দেবে। এই সময় খাওয়াটা ভালো দরকার। তিন মাস পরপর পেট হয়ে যাচ্ছে। কি অবস্থা দেখা লোকটা শব্দ করে ঢেকুর তুলল। বাটিতে সামান্য যা ডাল ছিল চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলল। গোঁফে হলুদ রঙের ছোপ। সোমা এক বার ভাবল, বলবে গোঁফে ডাল লেগেছে। শেষ পর্যন্ত আর বলল না।
চা দাও সোমা, খাওয়া হয়ে গেছে। আজকের মতো একসেলেন্ট ডাল অনেক দিন খাওয়া হয় নি। মাছের একটা মাথা যদি দিতে পারতে তা হলে দেখতে কি জিনিস হত।সোমা চা দিতে এসে দেখে লোকটা মেঝেতে উবু হয়ে বসে আছে। বিড়ালের দুধ খাওয়া দেখছে। এখন হাত দেয়া হয় নি। ডাল শুকিয়ে হলুদ দাগ পড়েছে।চা নাও।শালির দুধ খাওয়ার কায়দাটা দেখেছ?
কেমন ঘুরে ঘুরে খায়। অদ্ভুত কাণ্ড।সোমা দাঁড়িয়ে রইল। সে বিড়ালের দুধ খাওয়া দেখছে না। লোকটাকে দেখছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই যাকে সে অত্যন্ত কঠিন কিছু কথা বলবে। কঠিন কথাগুলো শুনে সে কি করবে কে জানে, চায়ের কাপ ছুঁড়ে ফেলবে? চিৎকার চেঁচামেচি করবে? গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে? কিছুই বলা যাচ্ছে না। বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে একটা মানুষ কেমন আচরণ করে তা বলা খুবই কঠিন।চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
শালি কেমন ঘুরে ঘুরে দুধ খায় দেখেছ? ইন্টারেস্টিং। ভেরি ইন্টারেস্টিং।সোমা সহজ স্বাভাবিক, স্বরে বলল, হাত-মুখ ধুয়ে তুমি বসার ঘরে একটু আসবে? তোমার সঙ্গে খুব জরুরি কিছু কথা আছে।লোকটা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে সোমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে কি কিছু আঁচ করতে পারছে? মনে হয় না। আঁচ করতে পারলে থমথমে গলায় বলত কি জরুরি কথা? সে কিছুই না বলে বাথরুমে হাত-মুখ ধুতে ঢুকল। বাথরুম থেকেই চেচিয়ে বলল, চা খাব না। একটা পান দাও।
সোমাদের বসার ঘরটা ছোট। এই ছোট ঘরের একটা অংশে মিনু শুয়ে আছে। বার বার এ-পাশ ও-পাশ করছে। জ্বর বেড়েছে বোধহয়। অন্য সময় হলে সোমা মেয়েটার জ্বর দেখত। ঘুম ভাঙিয়ে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করত। আজ তা করল না। জরুরি কথাগুলো শেষ হোক। তারপর যদি সুযোগ হয় তখন দেখা যাবে।বসার ঘরে চারটা বেতের চেয়ার। মাঝখানে গোল টেবিলে ধবধবে সাদা টেবিল কথ। টেবিল ক্লথের ঠিক মাঝখানে লাল রঙা পিরিচে পান।
সাদা, লাল এবং সবুজ রঙ কি সুন্দর লাগছে।লোকটা সোমার সামনের চেয়ারে বসল। তার চোখ লালচে। রাতের বেলা তার চোখ লালচে হয়ে থাকে। ভোরবেলা আবার সাদা হয়ে যায়। বাঁ চোখ অবশ্যি সাদা হয় না। লালচে আভা খানিকটা থেকেই যায়। ছোট বেলায় নাকি বাঁ চোখে চোট খেয়েছিল।পান দাও।লোকটা পান নিতে নিতে কঠিন চোখে তিন চার বার তাকাল। আজ তার চোখ অন্য দিনের চেয়েও লাল মনে হচ্ছে। না-কি এটা সোমার মনের ভুল?
সোমা! বল।তোমার কোনো জরুরি কথা বলার দরকার নেই। জরুরি কথা আমি জানি। বিজু এসেছিল—ও সব কথা বলল।কখন এসেছিল? দুপুরের দিকে রহমতের চায়ের স্টলে।রহমতের চায়ের স্টলে লোকটা রোজ এক বার যায়। দুপুরের দিকেই যায়। ঐ স্টলে তার শেয়ার আছে কিন্তু বিজুর তো তা জানার কথা না। জানল কি করে? সোমা পান খায় না। তখন একটা মুখে দিল। জৰ্দা দেওয়া পান। পানের কষটা পিকে মুখ ভরে যাচ্ছে। মাথা ঝিম্ ঝিম করছে। জর্দার রসে মুখ ভর্তি হয়ে আসছে। ফেলার উপায় নেই। ফেলতে হলে উঠে যেতে হবে। এখন ওঠা সম্ভব না।
বিজু যা করছে বলার না। চেঁচামেচি হৈ চৈ। আমি বললাম, ভদ্রলোকের ছেলে চেঁচাচ্ছ কেন? এতে তার রাগ আরো বেড়ে গেল। লোকজনের সামনে ইতর ছোটলোক, জেলের ঘুঘু এইসব বলেছে।সোমা বিব্রত স্বরে বলল, বিজুর মাথা সবসময় গরম। ওকে কেউ তোমার কাছে। যেতে বলে নি। নিজে নিজেই গিয়েছে।গিয়েই ভালো করেছে। না গেলে জানতাম যে তুমি আজ ডিভোর্স পেয়ে বসে আছ? বিজুর কারণে জানলাম।তুমি তো জানতে যে আমি ডিভোর্স চেয়ে চিঠি দিয়েছি। জানতে না? হ্যাঁ জানতাম। ব্যাপারগুলো এত তাড়াতাড়ি হয় জানতাম না। এক বার কোর্টে যেতে হল না, কিছু না–হঠাৎ শুনি ডিভোর্স।
এইসব কেইস কোর্টে যায় না।তাইতো দেখছি। ব্যাপারটা এত সহজ আমি জানতাম না।জানলে কী করতে?করতাম আর কি? করার কি আছে? বিজু কি খুব হৈ চৈ করেছিল? করেছিল মানে? দেখার মতো একটা দৃশ্য। লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি বলে কি-তুই জেলের ঘুঘু, চামারের চামার। জেল যখন খেটেছি জেলের ঘুঘু তো বলবেই।তুই তোকারি কেন?ওর মাথা গরম।
মাথা আমারও গরম। আমার কি মাথা ঠাণ্ডা? মাথা ঠাণ্ডা হলে চার বছর জেল। খেটে আসি? ঠাণ্ডা মাথায় কটা লোক জেলের ভাত খায়? তোমার মাথা অনেক ঠাণ্ডা।সমাজে চলতে ফিরতে হয় এই জন্যে ঠাণ্ডা রাখি। আসলে ঠাণ্ডা না। তুমি এতসব ঝামেলা না করে আমাকে গুছিয়ে বললেই হত।বললেই তুমি আমাকে চলে যেতে দিতে? যে থাকতে না চায় তাকে ধরে রাখা যায়? আমার কি জেলখানা আছে যে তোমাকে জেলখানায় আটকে রাখব?সোমা খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বলল, কাগজপত্র দেখতে চাও?কাগজ দেখে কি হবে? কিছু হবে না, তবু যদি দেখতে চাও।দূর দূর।
লোকটা হাই তুলল। কী আশ্চর্য! এই অবস্থায় কেউ হাই তুলতে পারে? সত্যি সত্যি কি লোকটার ঘুম আসছে? নাকি সে ভান করছে। না, ভান নিশ্চয়ই করছে না। লোকটা ভান করতে পারে না। আচ্ছা এই লোক কি নির্বোধ? কারণ একমাত্র নির্বোধরাই ভান করতে পারে না। সাদা বিড়ালটা এসে লোকটার পায়ে গা ঘষছে। আঙুল কামড়ে ধরছে। বড় ঝামেলা করছে। মাঝে মাঝে বিড়ালটা খুব বিরক্ত করে—তখন লাথি খায়। আজও নিশ্চয়ই লাথি খাবে। কিংবা কে জানে হয়তো লাথি খাবে না। আজকের রাতটা আর অন্য দশটা রাতের মতো নয়। লোকটি আবার হাই তুলল; চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। লাথির ভয়েই হয়তো বিড়ালটা ছুটে পালিয়ে গেল।
সোমা।বল।কাল কখন যাবে? দশটা এগারটার দিকে।
ও আচ্ছা। আমি আটটার সময় চলে যাব। নারায়ণগঞ্জ যেতে হবে। ঘুম ভাঙলে হয়। শালার ঘুম ভাঙে না।আমি সাতটার সময় ডেকে দেব।নাশতা-টাশতার হাঙ্গামা করার দরকার নেই। চা খেয়ে চলে যাব। যাও ঘুমুতে যাও।লোকটা সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শোবার ঘরে চলে গেল। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে কিন্তু তার কোন ছাপ তার আচার আচরণে নেই। যেন আজকের রাতটা অন্য আর দশটা রাতের মতোই।
যেন সোমার সঙ্গে সামান্য কিছু কথা কাটাকাটি হয়েছে এবং মিটমাটও হয়ে গেছে। শাবার ঘর থেকে সিগারেটের গন্ধ আসছে। লোকটা দিনের শেষ সিগারেটটা ধরিয়েছে। খুক খুক করে কাশছে। সোমা সামনে থাকলে নিৰ্ঘাত বলত শালার সিগারেট। ধরা যায় না ছাড়াও যায় না। সিগারেট শেষ করে সে একটা কাঁচা রসুন খাবে। পুরোটা খেতে পারবে না। খানিকটা খেয়েই মুখ বিকৃত করবে। বিড় বিড় করে রসুনকে খানিকক্ষণ গালাগালি করবে।
সোমা চায়ের কাপ নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল। সব ধুয়ে রেখে যাবে। ময়লা অপরিচ্ছন্ন কিছু যেন না থাকে। রান্না ঘরটার জন্যে মায়া লাগছে। কেন লাগছে কে জানে।সোমা।সোমা শোয়ার ঘরে ঢুকল। লোকটা পা তুলে বুড়ো মানুষের মতো চেয়ারে বসে আছে। সিগারেট ফেলে দিয়েছে। পুরোটা খেতে পারে নি। কখনো পারে না।সোমা।বল।অনেক দুঃখ কষ্ট তোমাকে দিয়েছি, কিছু মনে রেখ না। মনের মধ্যে রাগ রাখা ঠিক না। স্বাস্থ্যের খুব ক্ষতি হয়।তোমার উপর আমার কোনো রাগ নেই।আমারও নেই।সোমা খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বলল, আমি চলে যাব ভেবে তোমার কি খারাপ লাগছে?
না। তেল আর পানি কোনদিন মেশে না এটা ঠিক নামেশে, তবে খুব ঝাঁকাঝাঁকি করতে হয়। আমার ঝাঁকাঝাঁকি করতে ভালো লাগে না।সোমা তাকিয়ে রইল। লোকা মাঝে মাঝে মজার কথা বলে। ফিলসফারের মতো কথা। সব মানুষের মধ্যেই বোধহয় একজন ফিলসফার থাকে। লোকটা চেয়ার থেকে নেমে মশারির ভেতর ঢুকে পড়ল। নিচু গলায় বলল, ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।
সারা দিন অনেক ধকল গিয়েছে। বিজুর মাথাটা এরকম গরম হল কেন বল তো? বিপদে পড়বে তো। দিনকাল খারাপ।তুমি আজ রসুন খেলে না? বাদ দাও শরীরটা ভালোনা। রসুন খেতে গেলে বমি হয়ে যাবে। বাতিটা নিবিয়ে দিয়ে যাও।সোমা বাতি নিবিয়ে দিল। ঘর পুরোপুরি অন্ধকার হল না। পাশের ঘর থেকে আলো আসছে। বারান্দায় বাতি জ্বলছে।
সোমা বলল, টাকা পয়সা সব স্টিলের আমিরায় আছে। চাবি টেবিলের ড্রয়ারে।লোকটা কোনো উত্তর দিল না। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। সোমা বারান্দার বাতি নিবিয়ে দিল। অনেক দিন আর এই বারান্দায় আসা হবে না। আটটা ফুলের টব বারান্দায় সাজানো, দুটোতে আছে বকমভিলিয়া। টবে না-কি বকমভিলিয়া হয় না, তবু সে পরীক্ষা করার জন্যে লাগিয়েছে। দুটো গাছ বড় হয়েছে, এখনো পাতা ছাড়ে নি। কি রঙের পাতা ছাড়বে কে জানে। কাল এই টব দুটো সঙ্গে নিয়ে যাবে? না থাক। এ বাড়ির কিছুই সে নেবে না। এসেছিল খালি হাতে, ফিরেও যাবে খালি হাতে।
সোমা বসার ঘরে ঢুকল। বিড়ালটা আবার ফিরে এসেছে। লোকা যে চেয়ারে বসেছিল বিড়ালটাও ঠিক সেই চেয়ারে বসেছে। এক চোখে তাকিয়ে আছে সোমার দিকে। সোমা বিড়ালের সামনের চেয়ারে বসল। সে সারা রাত জাগবে। নিশি যাপনের জন্যে একজন সঙ্গী দরকার। পাশের ঘর থেকে লোকটার নিঃশ্বাসের ভারি শব্দ আসছে। চারদিকে সুনসা নীরবতা। সোমা জেগে আছে। বিড়ালটাও জেগে আছে। এক চোখে আগ্রহ নিয়ে দেখছে সোমাকে। এই বাড়ি ছেড়ে কাল ভোরে সে চলে যাবে।
আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, অথচ এজন্যে তার তেমন খারাপ লাগছে না। একটু খারাপ লাগা উচিত ছিল। কেন লাগছে না কে জানে।টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ মেঘে ঢাকা। মেঘের রঙ ক্রমেই কালো হচ্ছে। মনে হচ্ছে সারা দিনই বৃষ্টি হবে। পর্দা ঢাকা রিকশা, তবু সোমা অনেকখানি ভিজে গেছে। খুব বিরক্ত লাগছে। ভেজা শাড়ি গায়ে লেপ্টে থাকবে আর সে নামবে রিকশা থেকে।
রাস্তা ভালো নাখানাখন্দ। একেক বার এমন ঝাঁকুনি খাচ্ছে মনে হচ্ছে সোমা উলটে পড়ে যাবে। সে কড়া গলায় বলল, আস্তে চালান না ভাই। মেয়েরা আস্তে চালাতে বললে রিকশাওয়ালারা সাধারণত খুব দ্রুত চালাতে শুরু করে। এখানেও তাই হল রিকশা চলল ঝড়ের গতিতে। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে সবকিছু নিয়ে রিকশা উলটে পড়বে। দ্বিতীয় বার রিকশাওয়ালাকে আস্তে চালানোর অনুরোধ করতে ইচ্ছা হচ্ছে না। হোক একটা অ্যাকসিডেন্ট। সোমার ভাগ্যে অ্যাকসিডেন্ট যোগ আছে। ওর পঁচিশ বছরের জীবনে তিন বার সে রিকশা নিয়ে উলটে পড়েছে।
আশ্চর্যের ব্যাপার কোনো বারই তার নিজের কিছু হয় নি। গায়ে সামান্য আচড়ও লাগে নি। অথচ রিকশাওয়ালা প্রতি বারই জখম হয়েছে। এক বার তো এক জন একেবারে মর মর। হাসপাতালে ছিল অনেক দিন। সোমা দুবার দেখতে গিয়েছে। রিকশাওয়ালার স্ত্রী খাটের কাছে বসে থাকত। সোমাকে দেখলেই বাঘিনীর মতো তাকাত, যেন সমস্ত দোষ সোমার।আফা কোন বাড়ি? পরের গলিটা দিয়ে ঢেকেন। সাবধানে যাবেন রাস্তা ভাঙা।ভাঙা রাস্তায় সাবধানে গাড়ি চালাইলে অ্যাকসিডেন্ট বেশি হয় আফা।বেশ তা হলে অসাবধান হয়েই চালান।
ঝিকাতলার এই বাড়ির অর্ধেক সোমাদের। সোমার দাদা গ্রামের সমস্ত জমিজমা বিক্রি করে ঢাকা শহরে দুতলা বাড়ি করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দুই ছেলে বাড়ি পেয়ে গেল। দুজনেই মোটামুটিভাবে অপদার্থ। সোমার বাবা সাইফুদ্দিন সাহেব এল এম এফ ডাক্তার। দীর্ঘ দিনেও তাঁর কোনো পসার হল না। সারা দিন ডিসপেনসারিতে বসে থাকেন, একটা রুগী আসে না। এক ডিসপেনসারির মালিক তো এক দিন বলেই বসল, আপনি ভাই অপয়া মানুষ। অন্য কোথাও গিয়ে বসেন। ডাক্তারের কাছে রুগী না এলে ওষুধপত্র বিক্রি হয় না। বুঝলেন না?
সোমার বড় চাচা ছদরুদ্দিন সাহেবও একই পদের মানুষ। তাঁর কাজ হচ্ছে টীকা ফাটকা ব্যবসা করা এবং বড় বড় কথা বলা। গা জ্বলে যাবার মতো কথা। তাঁর কথা যেই শোনে তারই গা জ্বলে যায়—তিনি বিমলানন্দ উপভোগ করেন।বাড়ির একতলা পেল সোমারা, দোতলা পেলেন ছদরুদ্দিন সাহেব। ছদরুদ্দিন সাহেবের ধারণা তিনি ক্যাপিটালের অভাবে বড়কিছু করতে পারছেন না। একটা বড় রকমের ক্যাপিটাল পেলেই ভেলকি দেখিয়ে দেবেন।
ভেলকি দেখাবার আশাতে তিনি তাঁর নিজের অংশ বিক্রি করে দিলেন। ছোট ভাইকে বললেন, এক মাসের মামলা, এক মাসের মধ্যে দুতলা কিনে নেব। টাকা কিছু বেশি দিতে হবে। উপায় কি। এই এক মাস তোর সঙ্গে থাকব। তবে মাগনা থাকব মনে করি না। পুরো রেন্ট পাবি। হা-হা-হা। নিজের ভাই বলে যে বাড়তি সুযোগ নেব, আমি এই রকম মানুষই না।
Read more
