দ্বৈরথ পর্ব:৫ হুমায়ূন আহমেদ

দ্বৈরথ পর্ব:৫

দ্বৈরথ পর্ব:৫

তোমার বয়সী মেয়েদের দারুণ ভালো লাগবে, পড়তে পড়তে কাঁদবে এইরকম একটা বই তোমাকে দিচ্ছি তবে একটা জিনিস মনে রেখো সোমা, পাঠকের চোখ ভিজিয়ে দেওয়া কিন্তু একটা বইয়ের উদ্দেশ্য হতে পারে না। যদি হয় তাহলে বুঝতে হবে বইটি নিম্নমানের।সোমা বই নিয়ে চলে এল। বইটির নাম: শোন বরনারী সুবোধ ঘোষের লেখা। একটা বই পড়েই সোমার বইয়ের নেশা ধরে গেল। বইটা সে তিনবার পড়ল এবং তিনবারই ফুঁপিয়ে কাঁদল। ঐ বাড়ির ভদ্রলোককে তার মনে হতে লাগল ডাক্তার হিমাদ্রী। হিমাদ্রীর মতোই কেমন যেন বিষ চেহারা ভদ্রলোকের। কথা বলতে বলতে হঠাৎ তিনি খেই হারিয়ে ফেলেন। এত ভালো লাগে দেখতে।

দুদিন পর পর লোমা বই আনতে যেত। বেশিরভাগ সময়ই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হত না। সোমা বই নিয়ে খাতায় নাম লিখে চলে আসবার সময় খানিকক্ষণ তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলত। ভদ্রমহিলা তেমন কিছু বলতেন না তাকিয়ে থাকতেন, মাঝে-মাঝে হা হু করে জবাব দিতেন। কথা বেশিরভাগই বলত সোমা।আজ আপনার শরীর কেমন? ভালো।

আপনার গল্পের বই পড়তে ইচ্ছে করে না

একসময় করত, এখন করে না।

আপনার তো একটা হুইল চেয়ার আছে। হুইল চেয়ারে বসে এদিক-ওদিক গেলে নিশ্চয়ই আপনার ভালো লাগবে।আমার ভালো লাগে না।আপনার মেয়েটা এ-বাড়িতে বেশি থাকে না—তাই না? ও তার মামার বাড়িতে থাকে। ওখানে ওর সমবয়েসী অনেকে আছে।আমি যে প্রায়ই এসে বই নিয়ে যাই আপনি বিরক্ত হন না তো? না।ভদ্রলোকের সঙ্গে বেশিরভাগ সময় দেখা হত ছুটির দিনে। দেখা হলে তিনি প্রথম যে কথাটা বলতেন তা হচ্ছে—তারপর সোমা, বইয়ের নেশা ধরিয়ে দিয়েছি তাই না?

হ্যাঁ দিয়েছেন।আফিমের নেশার চেয়েও কড়া নেশা হচ্ছে বইয়ের নেশা। আফিমের নেশা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় কিন্তু বইয়ের নেশা থেকে কোন মুক্তি নেই।মুক্তি থাকবে না কেন? আপনি তো আর এখন পড়েন না। আপনার তো মুক্তি ঘটেছে।মোটই না। এখনো কোনো বই হাতে নিলে শেষ না করে উঠতে পারি না। এই ভয়েই বই হাতে নেই না। হা-হা-হা। বস সোমা, তোমার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করি।সোমা বসে। ভদ্রলোকে বক্তৃতা দেয়ার ভঙ্গিতে বলেন, আচ্ছা দেখি তোমার বুদ্ধি কেমন? বলতো বই পড়তে মানুষের ভালো লাগে কেন?

সোমা জবাব দিতে পারে না। চট করে কোন জবাব মাথায় আসে না।আচ্ছা আরো সহজ করে বলছি, গান শুনতে মানুষের ভালো লাগে কেন? একটা সুন্দর ছবি দেখলে মানুষের ভালো লাগে কেন?আমি জানি না।জানি না কথাটা বলতে সোমার খুব লজ্জা করে। ভদ্রলোক তা বুঝতে পারেন।এতে লজ্জিত হবার কিছু নেই। এখন থেকে চিন্তা করবে। চিন্তাটা শুরু করবে কোথায় জান? শুরু করবে ভালোলাগা ব্যাপারটা কি? বিষয়টা বেশ জটিল। তবে জানা দরকার। শুধু খাওয়া এবং ঘুমের মধ্যে আমাদের জীবন না—এই জন্যেই এসব জানা দরকার। ভাববে, মন লাগিয়ে ভাববে একসময় দেখবে তোমার ভাবতেও ভালো লাগছে। এবং বুঝতে পারবে আমাদেরকে প্রকৃতি কত ঐশ্বর্য দিয়ে পাঠিয়েছেন।

সোমার অনিদ্রার অসুখ এই সময় প্রথম হল। কিছুতেই ঘুম আসতে চাইত না। জেগে জেগে অদ্ভুত সব কল্পনা করতে ভালবাসত। সেইসব কল্পনার একটি ছিল সোমার খুবই প্রিয়। কল্পনাটা এরকম—এক দুপুরে সোেমা বই আনতে যাচ্ছে। দুপুরটা আর সব দুপুরের মতো নয়, একটু যেন অন্যরকম। মেঘলা দুপুর। ঐ বাড়ির কাছাকাছি যেতেই ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি শুরু হল। সোমা দৌড়ে বাড়িতে গিয়ে উঠতেই ঝড় শুরু হয়ে গেল।ঐ বড়িতে ভদ্রলোক ছিলেন তিনি অবাক হয়ে কললেন, কি ব্যাপার সোমা ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে, ইস ভিজে গেছ দেখি। যাও গামছা দিয়ে গা মোছ।সোমা বলল, বাসায় কেউ নেই? না। অরুণা মেয়েকে নিয়ে ভাইয়ের বাসায় গিয়েছে। কাজের মেয়েটাও সঙ্গে গেছে।

আপনি গেলেন না কেন?

আমার শরীরটা ভালো না–জ্বর।

বেশি জ্বর?

বেশি বলেই তো মনে হচ্ছে।

কই দেখি?

বলেই সোমা ভদ্রলোকের কপালে হাত রাখল। হাত রাখতেই তার শরীর ঝিম-ঝিম করতে লাগল। মনে হল তার নিজেরই প্রচণ্ড জ্বর এসে যাচ্ছে। সোমা বলল, আমি নতুন একটা বই নিয়ে বাসায় চলে যাব। আপনি শুয়ে থাকুন।পাগল। এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে বাসায় যাবে কি? তুমি বরং একটা বই নিয়ে আসো। আমি শুয়ে তাকি তুমি পড়ে শোনাও।সোমা তাই করল।উনি সারা শরীর চাদরে ঢেকে শুয়ে আছেন। বই পড়তে পড়তে সোেমার চোখে পানি এসে গেছে।

তিনি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সোমার দিকে। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি। হাওয়ার তুমুল মাতামাতি। হঠাৎ….. সোমার কল্পনা এই পর্যন্তই। বাকিটা সে আর ভাবতে পারে না। বুক ধড়ফড় করে। এই কল্পনাটা সে যতবারই করে ততবারই ঠিক করে রাখে আর কোনোদিন সে ঐ বাড়িতে যাবে না। কোনোদিন না, মরে গেলেও না। দিনের বেলা মনে হয়—আচ্ছা, আর একবার শুধু যাব। আর যাব না। শুধু একবার। বইটা শুধু দিয়ে চলে আসব। এই শেষবারের মত……. জাহানারা একদিন বললেন, তোর চেহারা এমন খারাপ হয়েছে কেন? তোর কি কোনো অসুখ-বিসুখ হয়েছে?

বুঝতে পারছি না।তোর বাবাকে দেখিয়ে ওষুধ-টষুধ খা। তোর দিকে তো তাকানো যাচ্ছে না।সাইফুদ্দিন সাহেব মেয়েকে দেখে টেখে বললেন, লিভারের কোনো সমস্যা। হজমে গণ্ডগোল হচ্ছে। একটা ডাইজেসটিভ এনজাইম দিচ্ছি। ওতেই কাজ হবে। আর শোন মা, তুই রাতদিন মুখের ওপর বই নিয়ে পড়ে থাকবি না, একটু হাঁটাহাঁটি করবি। এক্সারসাইজের দরকার আছে। খুব ভোরবেলা উঠে খানিকক্ষণ ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ করবি।

সেই সময় ঘটনাটা ঘটল।খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, ঐদিনের দুপুরটা ছিল সোমার কল্পনার দুপুরের মতো মেঘলা-বাতাস ছিল মধুর। ঐ বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ৰূপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। সোমা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজল। যোক-সবকিছু কল্পনার মতো হোক।ভদ্রলোকই দরজা খুলে দিয়ে বিস্মিত হয়ে বললেন, এই বৃষ্টির মধ্যে?

বাবা বইয়ের তো দেখি ভালো নেশা ধরে গেছে।সোমা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, বাসায় আর কেউ নেই।তিনি বললেন, থাকবে না কেন? সবাই আছে। এসো। আজ দেখি শাড়ি পড়ে এসেছ। ভেরি গুড। শাড়ি হচ্ছে একটা এলিগ্যান্ট ড্রেস। এবং এই ড্রেসের সবচেয়ে বড় বিউটি কি জান? জ্বি না।পৃথিবীর অন্য সব ড্রেসের সমস্যা হচ্ছে একজনেরটা অন্যজনের গায়ে লাগে না। দরজি দিয়ে বানাতে হয়। শাড়িতে এই সমস্যা নেই। কি ঠিক বলি নি?

হ্যাঁ ঠিক।

তুমি আজ এত গম্ভীর হয়ে আছ কেন বল তো? কি হয়েছে?

কিছু হয় নি।

জ্বর-জারি না তো?

জ্বি না।

সাবধান থাকবে। এখন খুব অসুখ বিসুখ হচ্ছে। এস আজ আমি নিজেই তোমাকে পছন্দ করে বই দেব। এস।তারা লাইব্রেরি ঘরে ঢুকল।ঘরটা এমনিতেই অন্ধকার অন্ধকার। আজ আকাশ মেঘলা থাকায় আরো যেন বেশি অন্ধকার লাগছে। সোমার কেমন যেন লাগছে। বুক শুকিয়ে কাঠ, অসম্ভব তৃষ্ণাবোধ হচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে মানুষটার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে।

কি ব্যাপার সোমা এত ঘামছ কেন? তুমি বস তো এই চেয়ারটায় আমার মনে হচ্ছে তোমার শরীর ভালো না। দাঁড়াও ফ্যানটা ছেড়ে দিচ্ছি।সোমা কাতর গলায় বলল, আমি বাসায় যাব।তিনি বিস্মিত হয়ে তাকালেন। আর ঠিক তখনি পাশের ঘর থেকে অরুণা তীব্র ও তীক্ষ্ণ গলায় চেচিয়ে উঠল, তোমরা ঐ-ঘরে কি করছ?

তোমরা ঐ-ঘরে কি করছ? তোমরা দুজন ঐ-ঘরে কি করছ?ভদ্রলোক হতভম্ব হয়ে তাকালেন সোমার দিকে। তারপরই শান্ত ভঙ্গিতে স্ত্রীর ঘরে ঢুকে ভারী গলায় বললেন, এরকম করছ কেন অরুণা? ছিঃ, এসব কি? আমার স্বভাব-চরিত্ৰ তুমি জান না?অরুণা আকাশ ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগলেন, আমি দেখেছি। আমি দেখেছি। আমি জানি তোমরা কি করছ। আমি জানি। আমি জানি।কাজের মেয়েটি ছুটে এল। একতলার ভদ্রমহিলা ছুটে এলেন। পাশের ঘরের জানালা খুলে গেল। বাড়ির সামনের গেটে দুজন পথচারী থমকে দাঁড়ালেন।

হিস্টিরিয়াগ্রস্ত মানুষের মতো অরুণা চেঁচাচ্ছেন, আমি জানি, আমি জানি।সোমা ছুটে বের হয়ে গেল।এরকম ঘটনা এ-পাড়ায় অনেকদিন ঘটে নি। সাইফুদ্দিন সাহেবের বাসার সামনে দেখতে দেখতে লোক জমে গেল। নিতান্ত অপরিচিত লোকজন দরজায় কড়া নেড়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল, মেয়েটাকে ওরা কি করেছে বলেন দেখি ভাই। ঐ হারামজাদার আমরা চামড়া খুলে ফেলব।প্রফেসর সাহেবের ঐ দোতলা বাড়ির চারদিকে ছেলেপুলে জমে গেল। ঢিল পড়তে লাগল—সেই সঙ্গে কুৎসিত গালাগাল—তলে তলে ফুর্তি। রস বেশি হয়ে গেছে।

আয় হারামজাদা রস বের করে দিই।সন্ধ্যার পর শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যে পাড়ায় পুলিশ চলে এল। সাইফুদ্দিন সাহেব সেই রাতেই মেয়েকে খালার বাড়ি টাঙ্গাইলের বড় বাসালিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন। খালার সেই পাঁচিল ঘেরা বড়ি ছিল দুর্গের মতো। সোমার মনে হল এই দুর্গ থেকে কোনোদিন সে বেরুতে পারবে না। দু মাস পর সাইফুদ্দিন সাহেব মেয়েকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। সোমার দিকে তখন তাকানো যায় না। চোখ বসে গেছে। মাথার সামনের দিকের চুল খানিকটা উঠে গেছে। কথা বাৰ্তাও কেমন অসংলগ্নভাবে বলে।

জাহানারা মেয়েকে দেখে কেঁদে ফেললেন।পাড়ার মেয়েরা রোজ দল বেঁধে আসে। নানান কথা বার্তার পর একসময় বলে, কৈ, মেয়ে এসেছে শুনলাম। মেয়েকে লুকিয়ে রেখেছেন কেন? লুকিয়ে রাখার দরকার কি? তারা নিজেদের মধ্যে চোখে-চোখে কথা বলেন। সেই চোখের ভাষা জাহানারা পড়তে পারেন। তিনি আতঙ্কে শিউরে ওঠেন।পাড়ার মেয়েরা নিজেদের মধ্যে প্রকাশ্যেই আলোচনা করে, পেট নামিয়ে এসেছে। দেখলেই বোঝা যায়। কোন আনাড়িকে দিয়ে কাজ করিয়েছে কে জানে-দেখেন না মেয়ের কি অবস্থা? প্রায় মেরে ফেলতে বসেছিল।

একদিন সন্ধ্যায় সোমা কি জন্যে যেন বাইরের বারান্দায় গিয়েছে—দুটি ছেলে তাকে দেখে শিশুদের কান্নার নকল করে ওঁয়া ঔয়া করতে লাগল। সোমা মাকে গিয়ে বলল, মা, ওরা এমন করছে কেন? জাহানারা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তার পরেরদিন আবার তাকে টাঙ্গাইল পাঠিয়ে দেওয়া হল। জাহানারা তাঁর বোনকে লিখলেন—আপা, তুমি যেভাবেই পার আমার এই মেয়েটাকে একটা বিয়ে দিয়ে দাও। কানা, খোঁড়া, অন্ধ যাই হোক। তুমি এটা কর, আমি তোমার কাছে হাতজোড় করছি।

আমার মন কেমন করছে। মনে হচ্ছে এই মেয়ের কোনোদিন বিয়ে হবে না। আপা, তুমি আমাদের বাঁচাও।পৌষ মাসে সোমার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ে টাঙ্গাইলে হল, খুব তাড়াহুড়ার বিয়ে বলে কাউকে খবর দেওয়া গেল না। বিয়েতে বাবা-মা কিংবা ভাই-বোনেরা কেউ আসতে পারল না।বিয়েতে সোমা খুশিই হয়েছিল।সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল বিয়ের রাতে কামালের ব্যবহারে। সে তার স্ত্রীকে বিয়ের রাতে কোনোরকম বিরক্ত করে নিহাই তুলে বলেছে, সকাল-সকাল ঘুমিয়ে পড়।

রাত থাকতে উঠতে হবে, দিনে-দিনে চিটাগাং পৌঁছাতে হবে। বিরাট যন্ত্রণা চিটাগাংয়ে ফেলে এসেছি। বিয়েটা তিনদিন পরে করলে আরাম করা যেত। বলেই লোকটা শুয়ে পড়ল। আর শোয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঘুম। কিছুক্ষণের মধ্যে লোকটার নাক ডাকার শব্দ শোনা যেতে লাগল। কোনো আদর না। কোনো গল্প না। ভালবাসার কোনো কথা না। সোমা সারারাত খাটের এক মাথায় কাঠ হয়ে বসে রইল। তার সারাক্ষণ ভয় ভয় করছিল—এইবুঝি লোকটা জেগে বলবে, এই এদিকে আসতো। লোকটার চোখে থাকবে অন্য ধরনের আহ্বান।

সেরকম কিছুই হল না।খুব ভোরে ফার্স্ট বাস ধরে তারা চলে এল ঢাকায়।কামাল বলল, চল তোমাদের বাসায় যাই। চা-টা খেয়ে গোসল-টোসল করে চিটাগাংয়ের বাস ধরি।সোমা বলল, আমি বাবার বাড়িতে যাব না।লোকটা অবাক হয়ে বলল, যাবে না কেন? ইচ্ছা করছে না।

ইচ্ছা না করলে দরকার নেই। জোর-জবরদস্তির কোনো ব্যপার না। জোর-জবরদস্তি আমার কাছে নাই।দুই কামরার একটা বাসায় তাদের বিবাহিত জীবন শুরু হল। দামপাড়ায় বাসা। বাসার কাছেই মসজিদ। মাইক বাজিয়ে সারাদিন সেই মসজিদে ওয়াজ হয়। লোকটা দাঁত বের করে বলল, দিনরাত আল্লাহ-খোদার নাম শুনবে। নামাজ রোজা ছাড়াই সোয়াব হবে। বাসা পছন্দ? সোমা পুরুষ-পুরুষ গন্ধের সেই ঘরের বিছানায় চুপচাপ বসে রইল। পছন্দ-অপছন্দের কিছুই তার তখন নেই। পৃথিবীর সবকিছুই তার পছন্দ আবার সবকিছুই তার অপছন্দ।চা বানাতে পার? শিখেছ এইসব?

সোমা তাকিয়ে রইল। কি-রকম অমার্জিত ভঙ্গিতে কথা বলছে লোকটা। এই কথাগুলো কি আরো সুন্দর করে বলা যায় না?যাওচা বানাও, রান্নাঘরে জিনিসপত্র আছে। চা খেয়ে হেভি গোসল দিব। তারপরে দিব ঘুম। শালা ঘুম কারে বলে দেখবে। ঘুম নাম্বার ওয়ান। হা-হা-হা।সোমা চা বানিয়ে আনল। লোটা হাঁটুর ওপর লুঙ্গি তুলে খালি গায়ে বসে আছে। দৃশ্যটা যে কি পরিমাণ কুৎসিত সে বোধহয় জানেও না।লোকটা বলল, তোমার জন্য চা আনলে না?

আমি চা খাই না।না খেলে কি আর করা। না খেলে নাই। বস আমার সামনে, দু একটা কথা বলি।সোমা বসল।লোকটা চুক চুক করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, তোমার কিছু সমস্যা আছে, আমি জানি। এও জানি সমস্যাটা ভালো না। সমস্যা আছে বলেই আমার মতো ছেলের সাথে তোমার বিয়ে হল। আমি কচি খোকা না। আল্লাহতায়ালা আমাকে কিছু বুদ্ধি দিয়ে পাঠিয়েছেন।

এই জিনিস অনেককে তিনি দেন না। যাই হোক, এখন আমি কি বলছি মন দিয়ে শোন। তোমার কি সমস্যা আছে আমি জানতে চাই না। হয়ে গেছে শেষ হয়ে গেছে। গু কাটি দিয়ে ঘাঁটলে গন্ধ ছড়ায়। গন্ধের আমার দরকার নাই। তোমার যেমন কিছু সমস্যা আছে আমারও আছে। আগে একটা বিয়ে করেছিলাম। বিয়ে টিকে নাই। এই কথা তোমার আত্মীয়-স্বজনেরে বলি নাই। আগ বাড়িয়ে সব কথা বলার দরকার কি? তুমি যদি জানতে চাও বলব। জানতে না চাইলে বলব না। তারপর ধর…

সোমা তার কথা শেষ করতে দিল না। কথার মাঝখানেই স্পষ্ট করে বলল, আমার কোনো সমস্যা নেই।লোকটা বিস্মিত কণ্ঠে বলল, কি বললে তুমি? আমার কোনো সমস্যা নেই।না থাকলে তো ভালো। কাছে আস।সোমা কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে কাছে এগিয়ে গেল।বস। সোমা বসল।লোকটা হাতের সিগারেট দূরে ছুঁড়ে ফেলে খুবই সহজ ভঙ্গিতে সোমার বুকে হাত রাখল।

সোমা কাঠ হয়ে গেল। লোকটা বলল, যাও জানালাগুলো বন্ধ করে দাও।সোমা তাকিয়ে রইল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে। না।যাও জানালাগুলো বন্ধ কর। লজ্জার কিছু নাই।সোমা উঠে গিয়ে জানালা বন্ধ করল। তার অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে। এই মানুষটার সঙ্গে তার বাকি জীবন কাটাতে হবে? কেন? সে এমন কি অপরাধ করেছে?

সোমাদের ঢাকা পৌঁছানোর সাত দিনের দিন সাইফুদ্দিন সাহেব মেয়েকে দেখতে এলেন। মেয়ের ছোট্ট এবং গোছানো সংসার দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন। জামাইয়ের জন্যে দামি একটা ঘড়ি এবং পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে এসেছিলেন। ঘড়ি এবং টাকা দিয়ে জামাইকে ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথাই বললেন যার তেমন কোন অর্থ নেই। কামাল নত মস্তকে সব শুনল এবং প্রতিবারই বলল, অবশ্যই। যা বলেছেন সবই খাঁটি কথা। একটাও ফেলে দেবার কথা না।

জামাইয়ের ব্যবহারে তিনি মুগ্ধ হলেন। তাঁর কাছে মনে হল—ছেলেটার বয়স একটু বেশি হলেও সে অতি নম্ৰ, অতি ভদ্ৰ।ঢাকায় ফিরে আসার আগে সোমাকে জিজ্ঞেস করলেন, জামাই কি করে সেটাতো বুঝলাম না? ছেলে করে কি? সোমা ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগল।সাইফুদ্দিন সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। ব্যাপারটা কি? কামাল তার শ্বশুরকে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিল। সাইফুদ্দিন সাহেব ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্তে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা, তুমি কি কর ঠিক বুঝলাম না। ব্যবসা?

কামাল দাঁত বের করে হাসল। জবাব দিল না।সাইফুদ্দিন সাহেব গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে ঢাকায় ফিরলেন। লম্বা চিঠি লিখলেন মেয়েকে। কোনো উত্তর পেলেন না। আবার লিখলেন, তার উত্তর নেই। তিনি আবার চিটাগাং গেলেন, সোমারা ঐ বাড়িতে নেই। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে না।

বাড়িওয়ালা বলল, ঐ লোক আপনার কি হয়? বিরাট ফক্কড় লোক। তাকে বাড়ি ভাড়া দিয়ে বিরাট যন্ত্রণায় পড়েছি। দু দিন পরে-পরে পুলিশ এসে খোঁজ করে। বাড়িটার বদনাম হয়ে গেছে।সাইফুদ্দিন সাহেব মাটিতে বসে পড়লেন। পরের তিন মাস তিনি মেয়ে-জামাইয়ের কোনো খোঁজ বের করতে পারলেন না। তিন মাস পর খুলনা থেকে মেয়ের চিঠি পেলেন

বাবা,

আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে তোমরা দুশ্চিন্তা করবে না। ইতি,

তোমাদের

সোমা।

পুনশ্চ: মাকে সালাম দিও। বিজু এবং ঊর্মিকে আদর।

কামালের চোখের অবস্থা খুব খারাপ হয়েছে। আগে মাঝে-মাঝে পানি পড়ত, এখন ক্রমাগত পড়ে। রোদে বের হলে যন্ত্রণা হয়। চিনচিনে ব্যর্থ হয়। ঘন কালো রঙের চশমা একটা সে কিনেছে। সেই চশমা চোখে দিলে দিনে-দুপুরে ঢাকা শহর অন্ধকার হয়ে যায়। কাউকে চেনা যায় না। এও এক যন্ত্ৰণা।ঢাকা শহরে প্রতিটি লোকের মুখের দিকে তাকিয়ে পথ হাঁটতে হয়।

চিনে চিনে। পথ চলা। এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না। পথ চলতে হচ্ছে অন্ধের মত। তার মতো মানুষের জন্যে এটা খুবই বিপজ্জনক।একদিন দুপুরে গুলিস্তানের মোড়ে তাকে পিছন থেকে কে যেন ডাকল, কে কামাল সাহেব না? এইসব ক্ষেত্রে কামাল কখনো মাথা ঘুরিয়ে পিছন দিকে তাকায় না। দ্রুত সরে পড়তে চেষ্টা করে। সেদিনও তাই করল।

প্রায় লাফ দিয়ে চলন্ত একটা বেবিট্যাক্সিতে উঠে পড়ল। বেবিট্যাক্সিওয়ালা তার দিকে ফিরতেই বলল, তাড়াতাড়ি যাও। পিজি। পেটে ব্যথা উঠেছে। মরে যাচ্ছি।বেবিট্যাক্সিওয়ালা ঝড়ের গতিতে বেবিট্যাক্সি পিজিতে নিয়ে এল। কামাল ভাড়া মিটিয়ে শিশুপার্কের দিকে হাঁটা ধরল। বেবিট্যাক্সিওয়ালা তাকিয়ে রইল হতভম্ব হয়ে। পেটে ব্যথার রুগী শিশুপার্কে যায় কেন?

 

Read more

দ্বৈরথ পর্ব:৬ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *