![]()
মনিকা শকুন্তলা।
দিগন্তের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে এক মা কেবল কাঁদে আর কাঁদে।
ধূ ধূ প্রান্তরে যতদুর চোখ যায় কেবলই সবুজ ঘাসের আচ্ছাদন।
কিন্তু মাতৃজননীর চোখের কোণে চিকচিক করে অশ্রুরেখা। কখনো কখনো শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় গলা।
হাত পা সমস্ত শরীর যেনো অসার বলে বোধগম্য হয়।
কেউ আর নতুন করে এখন কিছু জিজ্ঞেস করেনা এই মাকে।
কারণ তারা জেনে গেছে যে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যাবেনা।
কেবলমাত্র ফ্যালফ্যালিয়ে চেয়ে থাকবে সে।
নির্বাক মুখে ঝড়ে পরবে অশ্রুর ফোঁটা।
আজ থেকে ঠিক বছর পাঁচেক আগে সীমান্তবর্তী গ্রামে একটি ছেলে এসেছিল সাপ্তাহিক বাজারে।
তার সঙ্গে ছিল গৃহপালিত একটি ষাড়গরু।
সামনেই কোরবানি ঈদ, অভাব অনটনের সংসার তাই ছেলের মা বলেছিল এবারের ঈদে খরচ মেটাতে এই গরুটাই ভরসা আমাদের।
যাও বাবা সন্ধ্যা হবার আগেই ঘরে ফিরে এসো। জানোই তো তোমাদের আব্বু বেঁচে নেই।
তোমার আরো দুটো ছোট ছোট ভাইবোন রয়েছে।
তিনি থাকলে হয়তো এতো ভাবতে হতোনা আমাকে।
সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরে আসবে আমি রান্না করে বসে থাকবো সবাই মিলে একসাথে খাবো আমরা রাতের খাবার।
ছেলেটির নাম ছিল রাখাল। ছোট থেকেই গরু চড়াতে ভালোবাসত তাই সবার মুখে মুখেই ওর নাম হয়ে গেছে রাখাল।
ঝিনাইদহ জেলার সীমান্তবর্তী এক গ্রামে বসবাস করতো ওরা। প্রতি বৃহস্পতিবার হাটবার। সেদিন হাটবারে সেই যে গেলো আর ফিরে আসেনি কখনো কোনোদিন।
মা তাই নির্বাক। ছোট ভাইবোনেরা অনেক প্রশ্নের ভীড়ে এখনো এটা জানার চেষ্টা করে যে তাদের বড় ভাই রাখাল কোথায় হারিয়ে গেলো তাদের ছেড়ে?
সেদিন হাটবারে গরু বিক্রি হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু জীবন আর টাকা কোনোটাই রক্ষা হয়নি।
নিষ্ঠুর প্রকৃতির কিছু নরপিশাচ টাকা টা কেড়ে নেয়।
অবশেষে প্রতিবাদ করায় প্রাণটাও যায় রাখালের।
প্রত্যক্ষদর্শী ওদেরই আত্মীয় তাই ব্যাপারটা বেশিদিন আড়ালে থাকেনি।
থাকলেই বা কি? যে গেছে সে কি আর ফিরে আসবে কোনো কালে?
আইন চলছে মৃদুপায়ে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই রাখালের মায়ের। অবাক বিস্ময়ে কাটাতারে ঘেরা সীমান্তের দিগন্তে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে কেবল ভাবে এই বুঝি খোকা মা বলে দৌড়ে এলো….
কিন্তু না খোকা আসেনা। দুখিনী মায়ের চোখে মুখে তাই ভরা বরষা। সারা বছর জুড়ে…
তবু সেখানে ফুল ফসলের বাড় বাড়ন্ত নেই।
বাংলার দুখী জননীরা তাই বুঝি এখনো অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করে।
রাখাল তুই কি আর ফিরবি না বাবা…
মা আচমকা ডেকে ওঠে।
(ছোটগল্প )
