অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫ হুমায়ূন আহমেদ

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫

অনিল বসল। জোবায়েদ সাহেব নিয়ম ভঙ্গ করে আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, “আমি শুনেছি রাস্তাঘাট এখন মােটেই নিরাপদ না। আমি শুনেছি বাস থেকে যাত্রীদের নামানাে হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যাদের কথাবার্তায় এরা সন্তুষ্ট হয় না তাদের অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় না।’ 

‘আমিও শুনেছি স্যার।’ 

‘এই অবস্থায় রিস্ক নেয়া কি ঠিক ? বেঁচে থাকাটা জরুরি। ইচ্ছে করে রিস্ক নেয়া বােকামি।’ 

অনিল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমার জায়গায় আপনি হলে কি করতেন স্যার ? ঢাকায় বসে থাকতেন ? 

বড় সাহেব ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, না। আমি রওনা হয়ে যেতাম। ‘আমি তাহলে স্যার উঠি?’। 

‘আগামীকাল গেলে কি তােমার চলে ? তুমি যদি আগামীকাল যাও তাহলে মিলিটারীর কাছ থেকে আমি একটা পাশ জোগাড় করে দিতে পারি। কর্নেল এলাহী আমার বিশেষ বন্ধু। 

‘মিলিটারীর কাছ থেকে কোন পাশ নেব না স্যার। 

“ঠিক আছে। তাহলে দেরি কর না, রওনা হয়ে যাও। মে গড় বি উইথ ইউ । এক প্যাকেট চকলেট আমার কাছে আছে, এটা নিয়ে যাও। 

‘অনিল হাত বাড়িয়ে চকলেটের টিন নিল।’ 

‘তােমার নিশ্চয়ই কিছু টাকা পয়সা দরকার। ক্যাশিয়ারকে বলে দিচ্ছি, এক হাজার টাকা নিয়ে যাও। যদি আমরা দুজন বেঁচে থাকি আবার দেখা হবে।’ 

যাই স্যার। 

অনিল দরজা পর্যন্ত গিয়ে থমকে দাঁড়াল। জোবায়েদ সাহেব বললেন, কিছু বলবে?’ 

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫

না সূচক মাথা নাড়ল অনিল। জোবায়েদ সাহেব লক্ষ্য করলেন ছেলেটি নিঃশব্দে কাদছে। কাঁদুক। কিছুক্ষণ কাঁদুক। তিনি অনিলের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। সান্ত্বনার কিছু বলা দরকার। একটি বাক্যও মনে আসছে না। তিনি আরেকটি সিগারেট ধরালেন। আজ সব গণ্ডগােল হয়ে যাচ্ছে। তিনি 

একের পর এক সিগারেট টেনে যাচ্ছেন। মাথা ধরেছে। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। 

‘মােবারক। 

ইয়েস স্যার। ‘কফি। কফি কামিং স্যার। ভালাে লাগছে না। কিছু ভালাে লাগছে না। 

বাস শেষ পর্যন্ত ছাড়বে কি-না বােঝা যাচ্ছে না। এগারােটায় এই বাস ছাড়বে এমন কথা ছিল। যাত্রী উঠে বসে আছে। বাস ছাড়ছে না। এখন বাজছে একটা।। সমস্যা কি তাও বােঝা যাচ্ছে না। ভূয়াপুর থেকে একটা বাস এসে পৌঁছেছে। বারটায়। তার ড্রাইভার কানে কানে অন্য ড্রাইভারকে কি সব বলেছে। ড্রাইভাররা বাস ছাড়ছে না। 

অনিল জায়গা পেয়েছে একবারে পেছনের সিটে। এক কোণায় সে, বাকি সবটা জুড়ে এক পারিবার বসে আছেন। বােরকা পরা এক মহিলা, তার স্বামী, এগারাে-বারাে বছরের একটি মেয়ে। আট বছর বয়েসী দুটি ছেলে, জমজ। অবিকল এক রকম দেখতে। এরা নিঃশব্দ, তবে খুব চালু। নিঃশব্দে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে চলছে। চার বছর বয়েসী একটি বাচ্চা মেয়ে। ভাইদের মারামারি সে আগ্রহ নিয়ে দেখছে এবং খুব মজা পাচ্ছে বলে মনে হয়। 

পরিবারের কর্তা বসেছেন অনিলের পাশে। ভদ্রলােকের বয়স চল্লিশের উপর। তিরিক্ষি মেজারের মানুষ। প্রচুর কথা বলেন। মারামারিরত দুই পুত্রের দিকে তাকিয়ে তিনি হুংকার দিয়ে বললেন, ‘কর মারামারি কর। খামচাখামচি কর। খামচি দিয়ে একজন আরেকজনের চোখ তুলে ফেল। কিন্তু খবরদার, টু শব্দ করতে পারবি না। শব্দ করলে কচুকাটা করে ফেলব। আমার নাম আয়ুব আলি।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫

আমার এক কথা। গলা দিয়ে শব্দ বের করেছিস কি মরেছিস।’ বড় মেয়েটি বাবার পাশে বসেছে। সে নিচু গলায় বলল, মা বলছে তার গরম লাগছে। বােরকা খুলে ফেলতে চায়।’ ‘খবরদার, বােরকা যেমন আছে তেমন থাকবে। যখনকার যে নিয়ম। এখনকার নিয়ম বােরকা। গরমে সিদ্ধ হলে উপায় কিছু নাই। মিলিটারীকে বলতে বলিস যে গরম লাগছে। মিলিটারী পাংখা দিয়ে হাওয়া করবে। 

গাড়ি ছাড়বে কি ছাড়বে না কিছুই বােঝা যাচ্ছে না। গাড়ির হেল্পার এসে বলে গেল নাও যাইতে পারে। সামনে অসুবিধা আছে। মালিক আসতাছে। মালিক আসলে উনি যা বলবেন তাই হবে। উনি যাইতে বললে যাব। যাইতে বললে নাই। যাত্রীরা সবাই বসে আছে। কেউ নড়ছে না। বােঝাই যাচ্ছে সবারই যাওয়া প্রয়ােজন। ড্রাইভারের সিটের ঠিক পেছনে বােরকা পরা দু’জন মহিলা যাত্রী যাচ্ছেন। বৃদ্ধ এক ভদ্রলােক তাদের নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বােরকা পরা মহিলা 

একজনকে তাল পাখায় ক্রমাগত হাওয়া করছেন। মহিলাটি কাদছেন ফুপিয়ে। এক সেকেন্ডের জন্যেও থামছেন না। বােরকা পরা অন্য মহিলা গাড়ির জানালায় মাথা রেখে চুপচাপ বসে আছেন। কৌতুহলী যাত্রীরা বেশ কবার জিজ্ঞেস করেছে কি হয়েছে। বৃদ্ধ কঠিন গলায় বলেছেন, কিছু হয় নাই।’ 

পুরাে গাড়িতে অনিল ছাড়া যুবক কেউ নেই। যুবকরা বাসে ট্রেনে চলাচল করে । প্রায় স্টেশনেই ট্রেনের কামরা চেক করা হয়। যুবকদের নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। হাতের মাসল টিপে দেখা হয় হাত শক্ত কি-না। শক্ত হলে অস্ত্র-ট্রেনিং নিয়েছে। সামান্যতম সন্দেহ হলে যুবকরা ফিরে আসে না। | বাসের জন্যেও চেক পােস্ট আছে। মিলিশিয়া নামের এক বস্তুর সম্প্রতি আমদানি হয়েছে।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫

কালাে কুর্তা পরে, কোমরে বাঁধা থাকে গুলির বেল্ট। এরা ইংরেজিও জানে না, উর্দুও জানে না। বিচিত্র ভাষায় কথা বলে। এরা ভয়ংকর চরিত্রের মানুষ এই জাতীয় কথা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কালাে পােশাকের মিলিশিয়া চোখে পড়লে মানুষের বুকে ধ্বক করে ধাক্কা লাগে। আয়ুব আলি বিড়ি ধরালেন। মেয়েটি বলল, বাবা, মা বিড়ি ফেলতে বলছে। বিড়ির গন্ধে মা’র বমি আসতেছে।

আয়ব আলি মুখ বিকৃত করে বললেন, বমি আসলে বমি করতে বল । তাের মায়ের হুকুমে এখন দুনিয়া চলবে না। সে জেনারেল টিক্কা খান না। আয়ুব আলি অনিলের দিকে ফিরে বললেন, ব্রাদার, আপনার কি অসুবিধা হচ্ছে ?  আপনার অসুবিধা হলে ফেলে দিতাম কিন্তু পরিবারের কথায় আমি পয়সায় কেনা বিড়ি ফেলে দিব, তা হয় না। আপনি যাবেন কই ?’  ‘রূপেশ্বর।। ‘কোন রূপেশ্বর ? 

অনিল পুরাে ঠিকানা বলল। টাঙ্গাইল পৌঁছতে পৌঁছতেই তাে রাত হয়ে যাবে। রূপেশ্বর যাবেন কীভাবে? রাতে রাতে যাব। হেঁটে চলে যাব। ‘এইটাই ভালাে। রাতে রাতে যাওয়া ভালাে। মিলিটারী বলেন আর মিলিশিয়া বলেন সন্ধ্যার পর তারার পাতলা পায়খানা শুরু হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর গলায় গামছা দিয়ে টেনেও এদের বের করতে পারবেন না। 

মেয়েটি বলল, বাবা, মা এসব কথা বলতে নিষেধ করতেছে।’ ‘তাের মারে চুপ থাকতে বল । কি বলব কি বলব না সেটা আমার বিষয়। ভাই সাহেব, বিড়ি খাবেন ?  ‘জি-না।”  ‘খেলে খেতে পারেন। এক স্যুটকেস ভর্তি বিড়ি নিয়ে নিয়েছি। এই যে যাচ্ছি যদি আটকা পড়ে যাই! কিছুই তাে বলা যায় না?

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫

যাচ্ছেন কোথায়?’ ‘শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি। আমার এক শ্যালক বিয়ে করবে। আমি বড় জামাই। গেলে বিয়ে হয় না। তা ভাই বলেন, এটা কি বিয়ের সময় ? মাছির মতাে মানুষ মরতেছে আর তুই ব্যাটা বউয়ের সাথে…আচ্ছা যা, বিয়ে করবি কর। তা আমি এমন কি রসগােল্লা দুলাভাই যে আমি ছাড়া বিবাহ হবে না। আরে ব্যাটা, আমরা যে তাের কারণে এতগুলা মানুষ যাচ্ছি যদি পথে ভালাে-মন্দ কিছু হয়?

ধর যদি তাের বােনরে মিলিটারী পথে নামায়ে রেখে দেয় তখন কি অবস্থাটা হবে? আমার শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ গাধা। একবারে গ আকারে গা, ধ আকারে ধা।’ মেয়েটি বলল, বাবা, মা বলছে নিচে গিয়া চা খেয়ে আসতে। স্ত্রীর এই পরামর্শ আয়ুব আলির মনে ধরল। তিনি তৎক্ষণাৎ উঠে দাড়ালেন। অনিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ব্রাদার, আসেন চা খাবেন। 

অনিলও উঠে দাঁড়াল। ছেলে দুটির একটি অন্যটির কান কামড়ে ধরেছে। ছেলেদের মা, কান ছাড়াবার চেষ্টা করছেন। আয়ুব আলি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, ‘খেয়ে ফেল। কামড় দিয়ে কান খেয়ে ফেল। যন্ত্রণা কমুক।’ আয়ুব আলি নামার সময় সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে কৌতূহলী চোখে তাকে দেখল । ভদ্রলােক ইতােমধ্যেই সবার কৌতূহল আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছেন।

ক্রন্দনরত বােরকা পরা মহিলার কাছে এসে তিনি থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মা, কান্নাকাটি যা করার এখন করে নেন। মিলিটারী চেকিংয়ের সময় গলা দিয়ে টু শব্দ বের করবেন না। এরা অনেক কিছু সন্দেহ করে বসতে পারে। শেষে বিপদে পড়ে যাবেন। আর মা যদি কিছু মনে না করেন— ফর্সা পা দেখা যাচ্ছে। যদি মােজা থাকে মােজা পরে নেন। সুন্দরী মেয়ে দেখলে হারামজাদাগুলাের হুস থাকে না। যদি বেয়াদবী কিছু করে থাকি নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫

বাস স্ট্যান্ডের লাগােয়া দুটি স্টল। দুটিই ফাকা। একটিতে রেডিও বাজছে, খবর হচ্ছে খুব চিকণ গলায় একজন মহিলা খবর পড়ছেন : আয়ুব আলি সেটিতেই ঢুকলেন। অনিল পেছনে পেছনে গেল। রেডিওর প্রধান খবর হল, নদ-নদীতে পানি বাড়ছে। কোনটিতে কত পানি বাড়ছে তা বলা হল।

বন্যার সম্ভাবনা সম্পর্কে বলা হল। উরুগুয়েতে মৃদু ভূমিকম্প হয়েছে। রেক্টার স্কেলে যার মাত্রা ৩.৪, এই তথ্যও জানা গেল। তারপর বলা হতে লাগল নিউ মেক্সিকোতে সড়ক দুঘর্টনায় এগারাে ব্যক্তির নিহত হবার সংবাদ। আয়ুব আলি মুখ বিকৃত করে বললেন, “শালা। অনিল বলল, কাকে বলছেন? 

‘রেডিওটারে বললাম, নিজের দেশের খােজ নাই, অন্য দেশে এগরাে জন নিহত। আরে শালা, তাের দেশে কয়টা নিহত সেইটা বল। অনিল হেসে ফেলল এবং খুবই আশ্চর্য হল যে এই অবস্থাতেও সে হাসতে পারছে। তার মধ্যে এই মুহূর্তে কোন দুঃখবােধ আছে বলে মনে হচ্ছে না। পথের বিপদ নিয়েও সে ভাবছে না।

কিছুই ভাবছে না। আয়ুব আলি স্টলের মালিকের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলেন, রেডিও বন’ করেন। দোকানের মালিক ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘রেডিও খােলা রাখা লাগে। কোন সময় কি বলে জানা দরকার। ধরেন, হঠাৎ কার্ফ দিল তখন কি করবেন ? খাইবেন কি চা-নাশতা ?’  ‘চা দাও। কাপ গরম পানি দিয়া ধুইয়া দিবা। চিনি কম। যাইবেন কই আপনারা?’

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫

‘তা দিয়া আপনার প্রয়ােজন নাই। চা দিতে বলছি চা দেন। চা দিয়া দাম নেন। অধিক কথা বলার সময় এখন না।’ রেডিওতে নজরুল গীতি হচ্ছে। নজরুলের প্রেমের গান, নয়ন ভরা জল গাে…’ দশজন- ২০ বিপ্লবী গানগুলাে বাজানাে হচ্ছে না। স্বাধীন বাংলা বেতার বাজাচ্ছে বিপ্লবী গান।। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নজরুলের প্রেম বিষয়ক সংগীতে এমন খুব উৎসাহী। হামদ এবং নাতে উৎসাহী, উচ্চাঙ্গ সংগীতে উৎসাহী। 

আয়ুব আলি চায়ে চুমুক দিয়ে বলেন, ভাইসাব, আপনার নামটা তাে জানা হল না। নাম জানা দরকার। আমার নাম অনিল। কি বললেন, অনিল? “জ্বি, অনিল বাগচী।’ ‘খাইছে আমারে। হিন্দু না-কি? ‘জুি। সাহস তাে কম না। হিন্দু হয়ে বাসে করে রওনা দিলেন ? চেকিং-এ ধরা পড়বেন। এরা চার কলমা জিজ্ঞেস করে। প্যান্ট খুলে দেখে খনা হয়েছে কি । জানেন না?’  ‘শুনেছি।’ 

‘আপনার কোন দিকে যাওয়ার দরকার না যেখানে ছিলেন সেখানে চলে যান। আর যদি ট্রেনে-বাসে যেতে হয় তবে আগে গােপনে খনা করায়ে ফেলেন। এর মধ্যে লজ্জা-শরমের কিছু নাই। জান বাচান ফরজ। আমি অনেক হিন্দু ছেলের কথা জানি না করায়ে ফেলেছে। চার কলমা মুখস্থ করেছে। আপনার কলমা কয়টা মুখস্থ ? 

‘একটা শুধু জানি। ‘আমি জানি মােট দুটা। চাপে পড়ে তিন নম্বরটা মুখস্থ শুরু করলাম— খালি বেড়াছেরা লাগে। তবে দুটা জানলেও চলে, এরাও দুটার বেশি জানে না। একটু সুর দিয়ে, দরদ-টরদ মাখায়ে কেরাতের মতাে পড়লেই এরা খুশি। বেকুবের জাত তাে। বেকুবের জাত অল্পে খুশি হয়, অল্পে বেজার হয়। ঠিক বললাম না ?

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫

জি। ‘শুধু বেকুব না। এরা হল হায়ওয়ানের জাত। হায়ওয়ান কি জানেন ? ‘হায়ওয়ান’ হল পশু। এরা পশুর জাত। পশু না হলে প্যান্ট খুলে খনা কেউ দেখে? বলেন আপনি, দেখে ? এটা কি মানুষের কাজ না পশুর কাজ ? আমি ততা ঠিক করে রেখেছি কেউ যদি আমার প্যান্ট খুলতে বলে প্যান্ট খুলব, তারপর হিস করে হারামজাদার মুখে পেশাব করে দেব। এরপর যা হয় হবে। মৃত্যু কপালে থাকলে হবে। কি বলেন? 

অনিল কিছু বলল না। আয়ুব আলি বিড়ির প্যাকেট বের করে বললেন, ‘নিন, বিড়ি ধরান। বিড়িতে একটা টান দেন। মাথা পরিষ্কার হােক। হিন্দু মানুষ,  সময়মতাে হিন্দুস্থানে চলে গেলে ঝামেলা হত না। এতক্ষণ বাড়িতে বসে আরাম করে কচ্ছপের কোরমা খেতেন। ভালাে কথা অনিল বাবু, কচ্ছপের কোরমা হয়? 

‘জানি না হয় কি-না। গভীর আগ্রহ নিয়ে আয়ুব আলি জিজ্ঞেস করলেন, কচ্ছপের মাংস খেতে কেমন ? গােসতের মতাে না মাছের মতাে ? অনিল নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। কথা বলতে ভালাে লাগছে না।’ সময়টাই খারাপ রে ভাই, সময়টাই খারাপ। কারাের কথা বলতে ভালাে লাগে না। আমি তাে বলতে গেলে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি। চুপচাপ ঘরে থাকি।

এর মধ্যে বড় শালার বিয়ে লেগে গেল। আরে ব্যাটা বলদ, এটা বিয়ে করার সময়? বড় শালি আবার একটা বাচ্চা দিয়ে ফেলল। মেয়ে বাচ্চা। নাম রেখেছে ‘পি। আমাকে বলল, দুলাভাই, নামটা সুন্দর না ? আমি বললাম, “পি আবার কেমন নাম? পিসাব হলেও একটা কথা ছিল। বুঝতাম ঘন ঘন পিসাব হয় বলে নাম পিসাব। এই শুনে সে আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫

মেয়ের আকিকা করেছে আমাকে বলে নাই। কত বড় ঘােটলােকের জাত চিন্তা করে দেখেন।।গাড়ি হর্ন দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে। আয়ুব আলি উঠে দাঁড়ালেন। চায়ের দাম অনিল দিতে গেল। তিনি এমনভাবে তাকালেন যেন অত্যন্ত আহত হয়েছেন। ‘চায়ের দাম দিবেন মানে? আমার কি টাকার শর্ট না-কি? ভাই শুনেন, আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে।

আপনিও দেখলাম আমার মতাে কম কথার মানুষ। পথে যদি চেকিং হয়- অনিল বাগচী নাম বলার কোন প্রয়ােজন নাই। নাম জিজ্ঞেস করলে বলবেন মহসিন। মহসিন হল আমার বড় শ্যালকের নাম। যে গাধাটার বিয়ে করছে ঐ গাধাটার নাম। বলবেন যে আপনি বিবাহ করতে দেশে যাচ্ছেন। কেউ বিয়ে-শাদী করতে যাচ্ছে শুনলে এদের মন একটু নরম হয়। মারধাের করলেও গুলি করে মারে না। নাম মনে থাকবে তাে ?

মহসিন। বিপদের সময় মানুষ আসল নামই ভুলে যায়, আর নকল নাম! গাড়িতে বসে কয়েকবার মনে মনে বলেন— মহসিন, মহসিন, মহসিন। দানবীর হাজি মােহাম্মদ মহসিনের নাম ইয়াদ রাখবেন, তাহলেই হবে।’ বাসে উঠে নিজের জায়গায় বসতে বসতে আয়ুব আলি ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইনি তােমার বড় মামা। ইনার নাম মহসিন। 

আয়ুব আলি সাহেবের স্ত্রী বােরকার পর্দা তুলে অবাক হয়ে তাকালেন অনিলের দিকে। আয়ুব আলি বললেন, ‘ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছ কেন? ড্যাব ড্যাব করে তাকানাের কিছু নাই। বােরকার পর্দা ফেল।’ আয়ুব আলি সাহেবের যমজ বাচ্চা দুটি এখন মারামারি করছে না। দু’জনেরই মুখ এবং হাত ভর্তি চকলেট। ছােট মেয়েটারও মুখ ভর্তি চকলেট ।

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৫

চকলেটের রস গড়িয়ে তার জামা মাখামাখি হয়ে গেছে। বড় মেয়েটা অনিলের দিকে তাকিয়ে বলল, “এরা আপনার চকলেটের টিন খুলে ফেলেছে।’ অনিল বলল, ভালাে করেছে। তুমি চকলেট খাওয়া না ? খাও, তুমিও খাও। তােমার নাম কি ? ‘পাপিয়া।’ ‘কোন ক্লাসে পড় ? ‘সিক্সে। ‘খুব ভালাে। পাপিয়া ভয়ে ভয়ে বলল, “আমি ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছি।’ বল কি ? কি কর বৃত্তির টাকা দিয়ে? “কিছু করি না। বাবা টাকা নিয়ে যায়। ‘খুবই অনুচিত। তােমার নিজের টাকা অনন্য নিয়ে যাবে কেন ? 

 

Read more

অনিল বাগচির একদিন পর্ব:০৬ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *