ফজু বাপ-মায়ের একমাত্র ছেলে। গ্রামের উচ্চ বংশীয় ঘরের ছেলে। বাপ মায়ের বড় আদরের বলে তাকে কোনো কাজ কাম করতে হয় না৷ সারাদিন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়ায়৷ পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে দিন কাটে ফজুর৷ এতে বাপ মায়ের কোনো আপত্তি নেই৷ চাষাবাদের জমি আছে মাঠময়৷ প্রতিদিন দু বিশজন চাষা তাদের চাষের জমিতে কাজ করে৷
অভাব বলতে কী, সেটা ফজু জানে না৷ অভাবের সাথে তার কোনো দিন দেখা হয়নি৷
কিন্তু ফজুর বাপের সম্পদের অভাব না থাকলেও মনে বড় অভাব ছিল একটা অপূরনীয় ইচ্ছার৷ গ্রামের গেরস্থ বাড়ির ছেলে। টাকা পয়সা কম নেই। তার ছেলে বিদেশ যাবে নাতো কে যাবে? বিদেশে যাওয়ার জন্য গ্রামের মধ্যে তার ছেলেই একমাত্র যোগ্যতা রাখে৷
অথচ দালালের চক্করে পড়ে বেশ কয়েকবার টাকা মার খেয়েছে৷ তবুও হাল ছাড়েনি ফজুর বাপ।
ঘুরতে ঘুরতে একদিন ফজুর ভাগ্যের চাকাও ঘুরে গেল৷ বাড়ি শূন্য করে উড়াল দিল বিদেশে৷
ফজুর বাপ এখন গর্ব করে বলেন, আমার পোলা বিদ্যাশে আছে৷
বিদেশে থাকতে পারাটা যেন গর্বের৷
পুরনো ঘর ভেঙ্গে সেখানে তুলেছে ইটের দালান৷ টাকা পয়সা কামিয়েছে দু হাত ভরে৷ কিন্তু এরমধ্যে হঠাৎ মারা গেলেন ফজুর বাপ৷ বাপের মরা মুখটা একবারের জন্যেও চোখের দেখা হলো না ফজুর৷ এ নিয়ে ফজুর মায়ের বুক ফাটা বিলাপ৷
মলিন মুখে বড্ড দুঃখ নিয়ে বাড়ি ফিরল ফজু। বাড়ি ঘরের চেহারা ফিরেছে৷ ছোট্ট ঘরের জায়গায় দালান উঠেছে৷ কিন্তু যে বাপ তাকে এত আদর ভালোবাসা দিয়ে বড় করল, হাসি খুশি রেখে যাওয়া বাপটা আজ আর নেই। শেষ দেখাটাও হয়নি ফজুর।
বিদেশ ফিরে পাশের গ্রামে বিয়ে করল ফজু৷ এক বছরের মাথায় একটা ফুটফুটে মেয়ে এল ফজুর ঘরে৷ জমিজমা আর নগদ টাকা পয়সার অভাব নেই ফজুর৷ কিন্তু অভাব না থেকেও যেন বড্ড অভাব তার মনে৷ বাপকে না দেখার অভাব৷ শুধু মনে পড়ে এইত বাপ সুস্থ রেখে বিদেশ গেল ফজু৷ অথচ আজ বাপ নেই৷
ফজুর মেয়েটা বড় হচ্ছে৷ দাদির বয়স হয়েছে৷ তবুও দাদিই তার একমাত্র আশার আলো। ফজুর মৃত্যু পর বৌটা চলে গেছে বাপের বাড়ি৷ বৌয়ের এক কথা, এত এত সম্পদ আর টাকা পয়সা থেকে লাভ কী, যদি মানুষটাই না থাকে?
মেয়েটাকে দাদির কোলে দিয়ে চলে গেল সেদিন৷ এখন সে অন্য বাড়ির বৌ।
——- আহা জীবন!
