আমি এবং কয়েকটি প্রজাপতি পর্ব:০৮ হুমায়ূন আহমেদ

আমি এবং কয়েকটি প্রজাপতি পর্ব:০৮

আমি ছোটনকে কলেজে নামিয়ে দিতে গেলাম। আমার অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে ছোটন খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ল। আমি নিশ্চিত সে কলেজে যাবার পথে আমি তার সঙ্গে কী আচরণ করব তা নিয়েই তার দুশ্চিন্তা। কী করবে মানুষটা? চট করে হাত ধরে ফেলবে? তার দিকে ঘেঁসে আসবে? গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে বসার চেষ্টা করতে করতে গদগদ গলায় প্রেমের কথা বলার চেষ্টা করবে? ছোটন যা ভাবছে সে-রকম কোনো কিছুই করা যাবে না। উদ্ভট কিছু করা যাবে না। মেয়েরা প্রেমিকের উদ্ভট আচরণ পছন্দ করে। অন্যদের কাছ থেকে উদ্ভট আচরণ আশাও করে না, পছন্দও করে না।আমি গাড়িতে ড্রাইভারের পাশে বসলাম। পেছনের সিটে ছোটনের সঙ্গে বসলাম না।

গাড়িতে সারা পথে একটি কথাও বললাম না, একবারও পেছন ফিরে তাকালাম না। ছোটন গাড়ি থেকে নেমে আমার জানালার পাশে ঝুঁকে এসে ভয়। পাওয়া গলায় বলল, আমি যাই।আমি ছোটনের দিকে না তাকিয়ে বললাম, আমি বুঝতে পারছি আমার অদ্ভুত কথাবার্তায় তোমার খুব মন খারাপ হয়েছে। তোমার চেয়ে একশ’ গুণ মন। খারাপ হয়েছে আমার। তুমি কিছু মনে করো না। আমি ঠিক করেছি, যে অপরাধ করেছি তার জন্যে আমি নিজেকে শাস্তি দেব।ছোটন বলল, কী শাস্তি?

আমি ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, সেটা তোমার জানার দরকার নেই।ছোটনকে দেখে মনে হলো সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। তবে আমি জানি এই স্বস্তি সাময়িক। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মধ্যে জন্ম নেবে হতাশা। এবং দুঃখবোধ। কী রকম দুঃখবোধ–ব্যাখ্যা করি? মনে করুন সাত-আট বছরের একটি শিশু হঠাৎ রাস্তায় তার খুব পছন্দের খেলনা কুড়িয়ে পেয়েছে। খেলনাটা হাতে নিতে তার খুব ইচ্ছা করছে কিন্তু সাহস করে নিতে পারছে না। অন্যের খেলনা কেন সে নেবে? তারপরে সে ঠিক করল সে খেলনাটা বাড়িতে নিয়ে যাবে না, শুধু হাতে নিয়ে একটু দেখবে। এই ভেবে যেই সে খেলনার দিকে তাকাল সে দেখল খেলনাটা নেই। এরকম কিছু যদি ঘটে তাহলে শিশুটির মনে যে দুঃখবোধ তৈরি হবে, ছোটনের মনেও ঠিক এরকম দুঃখবোধই তৈরি হয়েছে। আমি সেই দুঃখবোধকে ব্যবহার করে এগুব।কেন এরকম করছি?

আমি এক ধরনের খেলা খেলছি। খেলার মধ্যে সবচে’ আনন্দময় খেলা হলো মনের খেলা। এই খেলা সবাই খেলতে পারে না। কেউ কেউ পারে। যারা পারে। তারা এই খেলা খেলে খুব আনন্দ পায়। আমি পারি।সে-রাতে আমরা তিনজন খেতে বসেছি। আমি প্লেটে ভাত নিলাম। ইলিশ মাছ ভাজার প্লেটটা কাছে টেনেই হাত গুটিয়ে নিয়ে বললাম, আমি খাব না।রূপা বলল, কেন, ক্ষিধে হয় নি? আমি বললাম, ক্ষিধে হয়েছে। কিন্তু আমি খাব না। না খেয়ে নিজেকে কষ্ট দেব।ছোটন চমকে আমার দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল। রূপা বিস্মিত হয়ে বলল, নিজেকে কষ্ট দেবে কেন? আমি বললাম, আমি পাপ করেছি। পাপের শাস্তি দেয়ার কেউ নেই। আমাকেই শাস্তিটা দিতে হবে।রূপা বলল, কী পাপ করেছ?

আমি বললাম, সেটা তোমার জানার দরকার নেই।পরের দু’দিন এবং দুই রাত্রি সর্বমোট আটচল্লিশ ঘণ্টা আমি পানি ছাড়া কিছুই খেলাম না। রূপা এবং ছোটন হতভম্ব হয়ে গেল। আটচল্লিশ ঘণ্টা পার। হবার পর ছোটনের সঙ্গে আমার কিছু কথাবার্তা হলো। ছোটন এসে বলল, দুলাভাই, আপনি যদি অনশন ভঙ্গ করেন তাহলে আপনি যা বলবেন আমি তাই শুনব। আমার নিজের স্বার্থে আমি এটা বলছি না। আপার মুখের দিকে তাকিয়ে বলছি। আপনি লক্ষ করছেন না যে আপা পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছে। সে কিছুই। খেতে পারছে না। যা খাচ্ছে বমি করে দিচ্ছে। সে যে আপনাকে কতটা ভালোবাসে তা আপনি জানেন না। কারণ অন্যের ভালোবাসা বোঝার ক্ষমতা আপনার নেই। আপার একটা ডায়েরি আছে। ডায়েরিটা পড়ে দেখবেন।আমি ছোটনের কথা থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললাম, আমি অনশন ভঙ্গ করলে তুমি আমার যে-কোনো কথা শুনবে?

হ্যাঁ।অন্যায় কথাও শুনবে? হ্যাঁ।ভয়ঙ্কর অন্যায় কথাও শুনবে? হ্যাঁ।বেশ, রাতে তোমাদের দু’বোনের সঙ্গে একসঙ্গে খেতে বসব। রাতের খাওয়া শেষ হবার পর আমি জর্দা দিয়ে একটা পান খাব। একটা সিগারেট ধরাব–তারপর কথাটা বলব। ঠিক আছে? ছোটন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ঠিক আছে।আমি বললাম, মনে রেখো, তুমি কিন্তু বলেছ আমার ভয়ঙ্কর অন্যায় আবদারও তুমি রাখবে।ছোটন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। পাথরের মূর্তির সঙ্গে তার একটাই তফাত–পাথরের মূর্তির ঠোট কাঁপে না, ছোটনের ঠোট কাপছে। ছোটনের মনে হয় শ্বাসকষ্টও হচ্ছে। সে হা করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি তার সমস্ত চিন্তা চেতনায় আছে–ভয়ঙ্কর অন্যায় চাওয়াটা কী হতে পারে?আমি বললাম, ছোটন, দাঁড়িয়ে আছ কেন? রাতের খাবারের আয়োজন কর। খাবারটা যেন ভালো হয়। তোমার কি দুশ্চিন্তা লাগছে?

সে জবাব দিল না।আমি বললাম, আজ রাতে যখন খেতে বসবে, সুন্দর করে সেজে খেতে বসবে। শাড়ি পরবে। কপালে টিপ দেবে। চুল বাঁধবে।কেন? তুমি এমনিতেই খুবই রূপবতী। সাজলে তোমার রূপ বাড়ে না কমে এটা দেখার ইচ্ছা। খুব রূপবতীরা সাজতে পারে না। সাজলে তাদের ভালো দেখায় না।ছোটন শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলল। আমার সামনে থেকে চলে গেল না। দাড়িয়েই রইল।রাতে খেতে বসেছি। ছোটন শাড়ি পরেছে, কপালে টিপ দিয়েছে, চুল বেঁধেছে। রূপা বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, কী হয়েছে? ছোটন বলল, কিছু হয় নি তো।রূপা বলল, এমন সাজগোজ করেছিস কেন?

ছোটন বলল, এমনি।রূপা বলল, ঠিক করে বল তো ছোটন, তোর কি কোনো সমস্যা হয়েছে? কয়েকদিন ধরে লক্ষ করছি তোর আচার-আচরণ যেন কেমন কেমন।ছোটন বলল, আমার কিছু হয় নি।রূপা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার কাছে কি মনে হচ্ছে না ওর আচার-আচরণ অস্বাভাবিক? আমি বললাম, মনে হচ্ছে।রূপা বলল, কী মনে হচ্ছে বলো তো? মনে হচ্ছে ও একটা ঘোরের মধ্যে আছে। প্রবল ঘোর। কোনো মেয়ে যদি প্রথম কারো প্রেমে পড়ে তাহলে তার মধ্যে এমন ঘোর তৈরি হয়। তার মধ্যে শশক-প্রবৃত্তি চলে আসে।

কী প্রবৃত্তি?

শশক-প্রবৃত্তি।

সেটা আবার কী?

শশক হলো খরগোশ। খরগোশ কী করে দেখ না? কিছুক্ষণ চুপচাপ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে। নড়বে না। প্রায় পাথরের মূর্তি। তারপর হঠাৎ ছুটে কিছুদূর গিয়ে আবার মূর্তির মতো হয়ে যাবে। প্রথম প্রেমের সময় মেয়েরা এরকম করে।ছোটন হঠাৎ হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। আমি বললাম, তুমি কি কিছু বলতে চাচ্ছিলে? ছোটন বলল, এখন বলতে চাচ্ছি না।রূপা বলল, তোর কিছু বলার থাকলে বল। ঝিম ধরে থাকবি না। তোর এই খরগোশের মতো ঝিম ধরে থাকাটা আমার মোটেই ভালো লাগছে না।আমি বললাম, ছোটনের মনে একটা প্রশ্ন এসেছিল। প্রশ্নটা সে করত। হঠাৎ মনে হলো–প্রশ্নটা এমন কিছু জরুরি না। না করলে কিছু যায় আসে না। তাই না ছোটন?

হ্যাঁ।তোমার প্রশ্নটা আমি জানি। উত্তর দেব? ছোটন হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। রূপা বলল, ওর মাথায় কী প্রশ্ন তুমি জানবে কী করে? তুমি তো থট রিডিং জানো না।আমি বললাম, থট রিডিং জানব না কেন? কিছু তো অবশ্যই জানি। প্রকৃতি সমস্ত প্রাণীজগতকে থট রিডিং-এর ক্ষমতা দিয়েছে।রূপা বলল, ছোটন কী প্রশ্ন করতে চাচ্ছিল যদি জানো তাহলে উত্তর দাও। ওর ভাবভঙ্গি আমার মোটেই ভালো লাগছে না।আমি বললাম, ছোটনের প্রশ্ন ছিল প্রথম প্রেমে পড়ার সময় মেয়েদের মধ্যে দেখা যায় শশক-প্রবৃত্তি। ছেলেদের মধ্যে কী দেখা যায়? ছোটন, এটাই তো তোমার প্রশ্ন? ঠিক ধরেছি না?

ছোটন হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।আমি বললাম, প্রথম প্রেমে পড়লে ছেলেদের মধ্যে দেখা যায় বানর-প্রবৃত্তি। বানর যেমন অকারণে লাফ ঝাপ দিয়ে ডিগবাজি খায়, সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা চালায়, প্রথম প্রেমে পড়া পুরুষের ক্ষেত্রে তাই হয়। লাফ ঝাপ ডিগবাজি। সবাইকে জানানো–দেখ আমি প্রেমে পড়েছি।রূপা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। মনে হচ্ছে সেও কিছু বলতে চাচ্ছে। সে কিছু বলল না। ছোটনের প্লেটে ইলিশ মাছ তুলে দিল।ছোটন বোনের দিকে একবার তাকিয়ে খাওয়া বন্ধ করে উঠে চলে গেল।রূপা বিস্মিত হয়ে বলল, ওর কী হয়েছে? আমি নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করলাম। হাত ধুতে ধুতে রূপাকে বললাম, আমি কিছুক্ষণ ছাদে শুয়ে থাকব। তারা দেখব। ছোটনকে দিয়ে আমার কাছে এক কাপ চা পাঠিও। ওকে নিরিবিলিতে জিজ্ঞেস করব ওর কী হয়েছে?

আমি ছাদে পাটি পেতে শুয়ে আছি। আকাশে তারা আছে। সপ্তর্ষিমণ্ডল দেখা যাচ্ছে। প্রশ্নবোধক চিহ্নের এই সপ্তর্ষিমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে। যেন কেউ একজন তার প্রশ্ন ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশের গায়ে।দুলাভাই, চা নিন।ছোটন চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হয় অনেকক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে আছে। আমি এক দৃষ্টিতে আকাশ দেখছিলাম বলেই বোধহয় তাকে লক্ষ করি নি। আমি বললাম, কেমন আছ ছোটন? সে যন্ত্রের মতো বলল, ভালো। এখন বলুন আপনি আমার কাছে কী চান? আমাকে কী করতে হবে? আমি চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বললাম, তোমাকে যা করতে হবে তা হলো সবসময় সুন্দর করে সেজেগুজে থাকতে হবে। হাসতে হবে। দরজা বন্ধ করে কান্নাকাটি করা চলবে না।

এই আপনার চাওয়া?

হ্যাঁ, এই আমার চাওয়া।

এটাকে আপনি কেন বলছেন ভয়ঙ্কর অন্যায় চাওয়া? তুমি দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছ। পরিবারের দু’জন সদস্যের মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে আমি তোমাকে বলছি হাসিখুশি থাকতে, সেজেগুজে থাকতে এটা অন্যায় না? এই চাওয়া কি ভয়ঙ্কর চাওয়া না? ছোটন বলল, এখন কি আমি চলে যাব? হ্যাঁ, যাও।তারপরেও ছোটন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। আমি যখন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আবারো আকাশ দেখতে থাকলাম তখন তার পায়ের শব্দ শুনলাম। সে চলে যাচ্ছে। পায়ের শব্দেই বলে দিতে পারছি সে এলোমেলো ভঙ্গিতে পা ফেলছে।

আপনি কি বুঝতে পারছেন ছোটন মেয়েটি এই ঘটনার পর আমার প্রেমে হাবুড়ুবু খেতে থাকবে? একবার ড়ুববে আবার ভাসবে। আবার ড়ুববে। শুরু হবে ভাসা ড়ুবার খেলা। নানান জটিলতা তৈরি হবে তার মনে। ত্রিমুখি জটিলতা। একদিকে তার দু’কুল ভাসানো প্রেম। অন্য আরেক দিকে তার অতি আদরের বোন রূপা, রূপার সংসার। তৃতীয় দিকে তার মৃতা বড় বোন এবং পিতা। ত্রিমুখি টানাটানির যন্ত্রণা থেকে সে মুক্তির পথ খুঁজবে। মুক্তির পথও কিন্তু আমি দেখিয়ে দিয়েছি। নিজে রেলিং-এ দাঁড়িয়ে ঝাঁপ দেয়ার কথা বলেছি। সেই স্মৃতি অবশ্যই ছোটনের মাথায় ঢুকে গেছে। সেই স্মৃতি ড়ুব দিয়ে আছে মস্তিষ্কের সাব-কনসাস লেভেলের নিচে। যথাসময়ে সেই স্মৃতি বের হয়ে আসবে।

যাতে বের হয়ে আসে, সূক্ষ্মভাবে সেই চেষ্টা আমি করব। আমাকেও এগুতে হবে সাবধানে। ডমিনো প্রাসাদ তৈরি হয়েছে। টোকা দিলে সেই প্রাসাদ ভেঙে পড়বে। কোন দিকে ভাঙবে তা নির্ভর করবে টোকাটা কোথায় দেয়া হবে তার উপর।অনেকদিন পর সেই রাতে কাঁসা-কন্যার দেখা পেলাম। আমি আকাশের তারা দেখছি, সে মিষ্টি গলায় বলল, কী দেখছেন? আমি বললাম, তারা দেখছি।সে হাসল। আমি বললাম, হাসছ কেন? কাঁসা-কন্যা বলল, ছোটন বেচারির আশাভঙ্গ দেখে মজা পেয়ে হাসছি। বেচারি ভয়ঙ্কর কিছু আশা করেছিল। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান আছে না? ‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়।’ গানটা কি তুমি জানো?

কেন জানব না! আমি পৃথিবীর সব গান জানি, সব সুর জানি।বেশ, তাহলে গানটা শোনাও।এটা না, অন্য একটা গান শোনাই। তুমি তারা দেখতে থাক, আমি গান গাইতে থাকি।আমাকে তুমি আপনি করে বলতে; আজ হঠাৎ ‘তুমি করে বলছ কেন? আমরা অনেক কাছাকাছি চলে এসেছি তো, এই জন্যে তুমি করে বলছি। আরো যখন কাছাকাছি আসব তখন তুমিও বলব না। কিছুই বলব না।আরো কাছাকাছি আসার সুযোগ কি আছে? অবশ্যই আছে। যখন কেউ থাকবে না, যখন শুধু তুমি আর আমি থাকব তখন…। রূপা কোথায় যাবে? কাঁসা-কন্যা বলল, এত কথা বলতে ভালো লাগছে না। এখন গান শোনো।কাঁসা-কন্যা গান শুরু করল। আহারে কী মধুর কিন্নর কণ্ঠ! আমি তাকিয়ে আছি, গান হচ্ছে। আকাশের তারারা ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছে। তাদের আলো নরম হয়ে চোখের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। কাঁসা-কন্যা গাইছে—

বঁধু, কোন্ আলো লাগল চোখে!

বুঝি দীপ্তিরূপে ছিলে সূর্যলোকে!

ছিল মন তোমারি প্রতীক্ষা করি

যুগে যুগে দিন রাত্রি ধরি,

ছিল মর্মবেদনাঘন অন্ধকারে–

জন-জনম গেল বিরহশোকে।

জন্ম-জনম গেল বিরহ শোকে লক্ষ করেছেন কি সুন্দর লাইন? জন্ম গেল, আবার জনমও গেল। তিনি লিখতে পারতেন–জনম জনম গেল বিরহশোকে। সেটাও কম সুন্দর হতো না। কাজী নজরুল লিখেছেন–জনম জনম তব তরে কাদিব।’ এত সুন্দর লাইন মানুষের মাথায় আসে কী করে? মানুষ হলো অস্বাভাবিক ক্ষমতাধর এক প্রাণী। সে পারে না এমন কিছু কি আছে? তার চিন্তা এবং কল্পনার বাইরে কি কিছু আছে? পেটেন্ট অফিসের সামান্য একজন কেরানি মাথা চুলকাতে চুলকাতে হঠাৎ একদিন বলে বসলেন–আলোর গতি বিষয়টা তো গোলমেলে। গোলমালটা ঠিক করা দরকার। বের হয়ে গেল আপেক্ষিক তত্ত্ব। মানব সভ্যতা একদিনে হাজার বছর এগিয়ে গেল।আমরা খুবই এলোমেলো পৃথিবীতে বাস করি। এলোমেলো ব্যাপারটা ঠিক করতে করতে এগিয়ে যাই। একটু এগুতেই আবার পঁাচ লেগে যায়। আমি ভয়ঙ্কর এলোমেলো এক জগতে বাস করছি। ঠিক করতে পারছি না। কাঁসা-কন্যা কি পারবে? তাকে জিজ্ঞেস করব?

না থাক, বেচারি দরদ দিয়ে গান করছে। তার চোখে অশ্রু টলমল করছে। গানের কোন লাইনে অশ্রুবিন্দু ঝরে পড়ে এটা দেখা দরকার। আমি কাঁসাকন্যার চোখের জল এবং গানের লাইন লক্ষ করছি। দু’টি পর্যবেক্ষণ কি একই সঙ্গে সম্ভব? হাইজেনবার্গের Uncertainity principle কী বলে? অবশ্যি অনিশ্চয়তার এই সূত্র Macro বস্তুজগতে কাজ করে না। কাঁসা-কন্যা কি Macro বস্তু? আপনি কি শুশুক দেখেছেন? কেউ কেউ বলে শিশু। দেখেছেন শিশু? নৌকায়। যাচ্ছেন, ভুস করে নদীর পানিতে কিছু একটা ভেসে উঠেই ড়ুবে গেল। অবশ্যই দেখেছেন। এই শুশুক যে ডলফিনের প্রজাতি তা কি জানেন? জানেন না?

শুশুক হলো ডলফিনের একটা প্রজাতি। এই প্রজাতি জন্মান্ধ। এর জন্মান্ধ হবার পেছনের কারণটা জানেন? শুশুক থাকে নদীতে। এদেশের নদীর পানি প্রচণ্ড ঘোলা। এই পানিতে যে বাস করে সে কিছু দেখতে পায় না। কাজেই তার চোখ থাকা না-থাকা একই। প্রকৃতি তখন কী করল–শুশুকের চোখ বাতিল করে দিল। বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা? উইপোকার মতো আরেকটি অন্ধ প্রজাতি জন্ম নিল। উইপোকা যে জন্মান্ধ তা জানেন না? প্রাণীজগতের অনেক প্রজাতিই জন্মান্ধ।

এখন লজিকে আসুন। মনে করুন আপনাকে নির্জন নির্বাসন দেয়া হয়েছে। আপনাকে খাবার দেয়া হয় ঠিকই কিন্তু কেউ আপনার কাছে আসে না। মানুষ তো দূরের কথা, পশুপাখিও না। মনে করুন কুড়ি বছর এইভাবে কেটে গেল। আপনার ভেতর ভালোবাসার যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল, তার কোনোরকম ব্যবহার হলো না। তখন প্রকৃতি কী করবে? আপনার ভালোবাসার ক্ষমতা বাতিল করে দেবে না? শুশুকের বেলায় যে-রকম হয়েছিল? বিশ বছর পর আপনি যদি আত্মীয়স্বজনদের কাছে ফিরে যান তখন দেখবেন কারো প্রতি কোনো ভালোবাসা, আকর্ষণ বিকর্ষণ কিছুই বোধ করছেন না।

আমার ক্ষেত্রেও হয়তোবা সে-রকম কিছু ঘটেছে। প্রকৃতি আমার ভেতর থেকে ভালোবাসার ক্ষমতা তুলে নিয়েছে। আনন্দিত হবার দুঃখিত হবার ক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছে। আমি শুশুক প্রজাতির মতো অন্ধ হয়ে গিয়েছি।অর্থাৎ আমার মানসিকতার স্বাভাবিক গঠনের অবনতি ঘটেছে। মানুষের ক্ষেত্রে যে এরকম ঘটবে তার উল্লেখ কিন্তু আমাদের ধর্মগ্রন্থে আছে। সূরা ইয়াসিনে আল্লাহপাক বলছেন—‘আমান নুআম্মিরহু নুনাক্কিছহু ফিল খালাক।’ যার অর্থ হলো, ‘আমি যাহাকে জীবনদান করি তাহার স্বাভাবিক গঠনে অবনতি ঘটাই।’ বুঝতে পারছেন কিছু?

আমি আল্লাহ বিশ্বাস করি কি করি না, এই বিষয় নিয়ে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলব না। আমার বিশ্বাসের সঙ্গে আমার গল্পের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে সিজিওফ্রেনিক রোগীরা ধর্মবিশ্বাসী হয়। তারা গভীর বিশ্বাসে ধর্মকর্ম করে। কঠিনভাবেই করে। সাইকিয়াট্রিস্টরা যখন কোনো রোগীর সিজিওফ্রেনিয়া হয়েছে। বলে সন্দেহ করেন তখন তার প্রথম প্রশ্নই থাকে–’আপনি কি ধর্মকর্ম করেন? ধর্মের নিয়মকানুন কঠিনভাবে পালন করেন? নিশিরাতে প্রার্থনায় মগ্ন থাকেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তরে আপনি যদি হ্যাঁ বলেন তাহলে সাইকিয়াট্রিস্ট ভদ্রলোকের মনে বিরাট আনন্দ হবে। তিনি মনে মনে বলবেন, ‘তরে পাইছি’।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *