আয়নাঘর-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর-হুমায়ূন আহমেদ

লিলিয়ান ইংরেজিতে বলল, আহা বেচারা কথা বলতে এত পছন্দ করে আর তুমি তাকে কথা বলতেই দিচ্ছ নাবলুক না কথাকি ক্ষতি তাতে? আমার তাে ওর কথা শুনতে ভাল লাগছে। 

আয়নাঘর

বুঝতে পারছ? কিছু কিছু পারছিযতই কথা শুনব ততই আরাে বেশি বুঝব। 

তুমি এক কাজ কর নূর মিয়ার সঙ্গে বসে বসে গল্প করআমি ঘুমিয়ে পড়ি। 

চারদিকে অসহ্য সুন্দর, এর মাঝখানে তুমি ঘুমিয়ে পড়বে

কাব্যভাব আমার একেবারেই নেই লিলিআমি মানুষটা পাথর টাইপঅনুভূতিশূন্য। 

আমি কি এই অনুভূতিশূন্য মানুষটির কাছে একটি আবেদন রাখতে পারি ? হ্যা পারআমেরিকায় ফিরে গিয়ে কি হবে? চল, আমরা এখানেই থেকে যাইতাহের সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, এই জঙ্গলে থেকে যেতে চাও? হ্যা চাই। 

তোমার মাথা থেকে পোকাগুলি দূর কর লিলিয়ানতুমি আমার গ্রামের বাড়ি দেখতে চেয়েছিলে বলে তােমাকে নিয়ে যাচ্ছিসেখানে আমি থাকব খুব বেশি হলে তিন দিনতারপর বাংলাদেশের সুন্দর সুন্দর জায়গাগুলি ঘুরে ঘুরে দেখব কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেটতারপর যাব নেপালহিমালয় কন্যা নেপাল দেখার পর আমেরিকা ফিরে যাব| লিলিয়ান ছােট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে শান্তগলায় প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমার একটা অদ্ভুত কথা মনে হচ্ছেআমার মনে হচ্ছে আমাদের দুজনের কেউই এই জায়গা ছেড়ে কোনদিন অন্য কোথাও যেতে পারব নাবাকি জীবনটা আমাদের থেকে যেতে হবে এইখানে। 

আয়নাঘর-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

তারা ইন্দারঘাটে পৌছল সন্ধ্যার পরকাকতালীয়ভাবেই পূর্ণিমা পড়ে গেছেচাদ উঠেছে, তবে চাঁদের আলাে এখনাে জোরালাে হয় নিগাছপালায় সব কেমন ভূতুড়ে অন্ধকারতাহের বলল, হাত ধর লিলিয়ান, বনের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। এক সময় এটা ছিল সুন্দর বাগানএখন পুরােপুরি ফরেস্টহালুমশব্দ করে বাঘ বের হয়ে এলেও অবাক হব নাএখনো বের হচ্ছে না কেন সেও এক রহস্য| বাড়ি দেখে লিলিয়ান একই সঙ্গে মুগ্ধ দুঃখিত হলবিশাল অট্টালিকা, কিন্তু অন্তিম দশাবাড়ির পলেস্তারা খসে খসে পড়ছেদক্ষিণ দিকের দেয়াল ধসে পড়েছেপুরাে বাড়ি ঘন শ্যাওলায় ঢাকাদোতলায় উঠার সিঁড়ি ভাঙা, রেলিং ধসে গেছেএকতলার বারান্দায় গােবরের স্তুপ দেখে মনে হয় বৃষ্টির সময় এই জায়গাগরুছাগলের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

তাহের বিরস গলায় বলল, বাড়ি দেখলে লিলিয়ান? হঁ্যা দেখলামকোন কমেন্ট করতে চাও? চাই” 

করে ফেলএই বাড়ি আমার চেনা। আমি এই বাড়ি আগে দেখেছিতােমাকে আমি লােহার প্যাচানাে সিঁড়ির কথা বলেছিলামতুমি বলেছিলে রকম সিড়ি নেই। 

সেই সিঁড়ি কি এখন দেখতে পাচ্ছ? স্বপ্নে আমি অবিকল এই সিড়ি, এই বাড়ি দেখেছি। 

লােহার সিঁড়ি তাহেরের চোখে পড়লবাড়ির যে অংশ ধসে পড়েছে সিঁড়ি সেই দিকেসিড়ির গা ঘেঁসে তেঁতুল পাতার মত চিকন পাতার একটা গাছতাহের বলল, আমি এ বাড়িতে খুব ছােটবেলায় থেকেছিএই কারণেই সিড়ি চোখে পড়ে নি ... যাই হােক, তুমি দাবি করছ এই বাড়িই তুমি স্বপ্নে দেখেছ

আয়নাঘর-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

স্বপ্নের সব ভাঙা বাড়ি এক রকম হয়লিলিয়ান ক্লান্ত গলায় বলল, হয়ত হয়। 

তাহেরের দূরসম্পর্কের চাচা ইস্কান্দর আলি, তার দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেনহাতে হারিকেনএই গরমেও ইস্কান্দর আলির গায়ে চাদরপরনের লুঙ্গিটা সিল্কের, চিকচিক করছেসঙ্গের ছেলে দুটির গায়ে গেঞ্জিদুজনেরই শক্তসমর্থ চেহারাএরা কোন কথা বলছে না, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লিলিয়ানের দিকেতাকানাের ভঙ্গি শালীন নয়তাহের একবার ভাবল ধমক দিয়ে বলে, এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? বলল নানিজেকে সামলে নিলচাচার দিকে তাকিয়ে বলল, বাড়ির অবস্থা তাে শােচনীয়। 

ইস্কান্দর আলি কাশতে কাশতে বললেন, পুরানা বাড়ি, এর চেয়ে ভাল আর কি হইব? ভাইঙ্গা যে পড়ে নাই এইটাই আল্লাহর রহমত। 

ঠিকঠাক করার জন্যে প্রতি মাসে টাকা পাঠাইপ্রতিমাসে পাঠাও নামাঝেমইদ্যে পাঠাওঅবস্থা যা তাতে মনে হয় না বাড়িতে থাকা যাবে। 

থাকতে পারবাদুইতলার কয়েকটা ঘর পরিষ্কার করাইয়া থুইছিথাকা যাবে ? যাবেসাথের এই মাইয়া কি তােমার ইসতিরি?” 

খিরিস্তান বিবাহ করছ?” 

মেয়ে দেখতে সুন্দর আছেবিবাহ করছ ভাল করছখিরিস্তান বিবাহ করা জায়েজ আছেনবী করিম নিজেও একটা খিরিস্তান মেয়ে বিবাহ করেছিলেন। 

বাবুচির ব্যবস্থা করতে লিখেছিলামব্যবস্থা করেছেন?  গেরাম দেশে বাবুর্চি কই পামু? আমার ঘরে রান্ধা হইবটিফিন বাক্সে কইরা 

তােমরারে খানা দিয়া যাবতােমরা থাকবা কয় দিন?” 

আয়নাঘর-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

এখনাে বলতে পারছি নাডাকাইতের খুব উপদ্রববেশি দিন না থাকনই ভালআমার সঙ্গে আছে কি যে ডাকাত নেবে?” 

তােমার ইসতিরিরে নিয়া যাবেসুন্দর মেয়েছেলে হইলদা চামড়া, বিলাতিডাকাইতরা খুশি হইয়া তােমার ইসতিরিরে নিয়া যাবে। 

আপনি কি আমাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছেন

তােমারে ভয় দেখাইয়া আমার ফয়দা কি ? তােমার স্ত্রী মাছভাত খায়, নাপাউরুটি খায়

মাছভাত খায়শুয়ােরের গােশত খায়?” 

তাহের ক্ষিপ্ত গলায় বলল, খেলে কি করবেন? শুয়ােরের গােশত ব্যবস্থা করবেন ? রাগ হও ক্যান? কথার কথা বললামতােমার ইসতিরি দেখি হাসতাছেসে বাংলা কথা বুঝে?” 

আয়নাঘর-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

তাকেই জিজ্ঞেস করুনএকলা একলা বাড়িতে ঢুকতেছে, তারে নিষেধ করনিষেধ করতে হবে নাতার বুদ্ধিশুদ্ধি আছেলিলিয়ান হারিকেন হাতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছেখুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উঠছেমনে হচ্ছে এটা তার অনেকদিনের চেনা বাড়ি| ইস্কান্দর আলি থু করে তাহেরের পায়ের কাছে একদলা থুথু ফেললেনতাহের চমকে সরে গেল। ইস্কান্দর আলি হাই তুলতে তুলতে বললেন

খাওয়ার জইন্যে কিছু খরচ দিওজিনিসপত্র অগ্নিমূল্যমাছ এক জিনিস পাওয়াই যায় নাএকটা মুরগির বাচ্চা হের দামই তােমার চল্লিশ, পঞ্চাশ। 

 

Read more

আয়নাঘর-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *