লিলিয়ানের শােবার ঘর অন্ধকার। হারিকেন নিভে যাওয়ার পর সলতা থেকে বিশ্রী ধোয়া আসছে। লিলিয়ানের নাক জ্বালা করছে। ঘরে কি কার্বন মনােক্সাইড তৈরি হয়েছে ? তার কি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত? সিড়ির দরজায় ধাক্কার শব্দ হল। ভারী গলায় কে বলল – দরজা খুলেন।

লিলিয়ান বলল, কে ? খবর আছে। দরজা খুলেন Urgent খবর। লিলিয়ান সিড়ির দরজার কাছে চলে এল। দরজা খুলল না। তার মন বলছে – দরজার আড়ালে অপেক্ষা করছে ভয়ংকর বিপদ।
‘খুলেন দরজা। খুলেন।
কে যেন প্রচণ্ড শব্দে ধাক্কা দিচ্ছে। লিলিয়ান বলল, Go away.
দরজায় হিংস্র পশুর থাবার মত থাবা পড়ছে। একজন না, কয়েকজন। লিলিয়ানের মনে হল – খুব কম করে হলেও তিনজন আছে। লিলিয়ান খিকখিক হাসির শব্দও শুনল। তিনজনের কোন একজন আনন্দে হাসছে। এই আনন্দের উৎস
‘ঐ সাদা চামড়া দরজা না খুইল্যা কতক্ষণ থাকবি? আপােসে দরজা খােল।
লিলিয়ান নড়ল না। পঁাড়িয়ে রইল। প্রাচীন ভারী দরজা চট করে ভাঙবে না। ভাঙতে সময় লাগবে। কতক্ষণ সময় লিলিয়ান জানে না। তাহের ফিরে আসা পর্যন্ত। কি দরজা তাকে রক্ষা করবে? কিন্তু তাহের ? ও কেমন আছে ? তারও কি লিলিয়ানের মতই বিপদ হয় নি ? সে কি ফিরে আসতে পারবে? অনেক দিন পর লিলিয়ান তার মাকে ডাকল। ফিসফিস করে বলল, মা, আমি খুব বিপদে পড়েছি।
আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ
প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে দরজায়। এরা দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। লিলিয়ান কাপ। গলায় বলল, ঈশ্বর আমাকে রক্ষা কর। দরজার সামনে খেকে তার সরে যাওয়া উচিত। লিলিয়ান সরতে পারছে না। তার পা সিসের মত ভারী হয়ে আছে – দরজার বাইরের মানুষগুলি পশুর মত গর্জন করছে।
‘ভাঙ দরজা। ভাইঙা ধর সাদা চামড়ারে।
দরজা ভেঙে পড়ার কয়েক মিনিট আগে লিলিয়ান সম্বিৎ ফিরে পেল। প্রথম দৌড়ে ঢুকল শােবার ঘরে। সেখান থেকে ছুটে গেল অয়নাঘরে। কোথাও লুকিয়ে থাকতে হবে। আয়নাঘরে লুকানাের জায়গা কোথায় ? কাবার্ড ! কাবার্ড খুলে ভেতরে বসে থাকবে।
লিলিয়ান কাবার্ড খুলে ভেতরে ঢুকল, আর তখনি তিনজনের একটা দল দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পড়ল। এই দলের একজন নিতান্ত চ্যাংড়া। তার হাতে পাঁচ ব্যাটারীর একটা টর্চ। তার বয়স পনের–ষেলির বেশি না। সে খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলল – মেম মাগী গেছে কই?
একজন বলল, পালাইছে। হয় খাটের নিচে নয় আলমিরার ভিতরে। লিলিয়ান এদের কথা শুনতে পারছে, কিন্তু গ্রাম্য টানা টানা কথার অর্থ ধরতে পারছে না।
আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলিয়ানের মনে হচ্ছে কাবার্ডে ঢুকে সে বড় ধরনের বােকামি করেছে। এরা
প্রথমেই কাবার্ডগুলি খুঁজবে। এককে করে খুঁজবে। তার উচিত কাবার্ড থেকে বের হয়ে আসা। খােলামেলা জায়গায় থাকা যাতে দৌড়ে পালানাের চেষ্টা সে করতে। পারে। কোণঠাসা হয়ে ধরা পড়ার কোন মানে হয় না।
ওরা হারিকেন জ্বালিয়েছে। হারিকেন নিয়ে আয়নাঘরেই বােধহয় আসছে। লিলিয়ান কাবার্ড ছেড়ে পালাবার জন্যে কাবার্ডের দরজায় হাত রাখল, আর ঠিক তখন কাবার্ডের ভেতর কি যেন একটা নড়ে উঠল। ঝুনঝুন শব্দ হল। একজন কেউ কোমল ভঙ্গিতে হাত রাখল তার পিঠে। লিলিয়ান ছােট একটা নিঃশ্বাসের শব্দও যেন শুনল।
কি হচ্ছে লিলিয়ানের? সে কি পাগল হয়ে গেছে? তার কি হেলুসিনেশন হচ্ছে? সে এখন কি করবে? চিৎকার করে উঠবে? তাতে লাভ কি ? পিঠে যে হাত রেখেছে। সে হাত সরিয়ে নিচ্ছে না। যেন তাকে বলার চেষ্টা করছে – ভয় নেই। কোন ভয় নেই। আয়নাঘরে তুমি নিশ্চিন্ত মনে অপেক্ষা কর। এরা তােমাকে কিছুতেই খুঁজে পাবে না। লিলিয়ান মনে মনে বলল, আপনি যেই হােন, আমার স্বামীকে রক্ষা করার চেষ্টা করুন। ও বিপদে পড়েছে! ওর বিপদ আমার চেয়েও ভয়ংকর বিপদ। আমি বুঝতে পারছি। আমি খুব পরিষ্কার বুঝতে পারছি।
আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ
তাহেরের সিগারেট অনেক ছোট হয়ে এসেছে। সিগারেটের শেষ অংশ এখনি নদীর জলে ফেলে দিতে হবে। এরা সম্ভবত সিগারেট শেষ করার জন্যে অপেক্ষা করছে। তাহের বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি চান ?
বৃদ্ধ খিকখিক করে খানিকক্ষণ হাসল। সে একাই হাসছে। অন্য কেউ হাসছে। না! বৃদ্ধ হাসি থামিয়ে বলল, বিলাত দেশটা কেমন এটু কন তাে হুনি।
বিলেতের খবর আমি জানি না। আমি থাকি আমেরিকায়। আমরার কাছে আমবিক। বিলাত এক জিনিস।
বৃদ্ধ চাদরের নিচে হাত ঢুকালো। তাহের জ্বলন্ত সিগারেট হাতে লাফিয়ে পড়ল নদীতে। পানির টান প্রবল। তাহেরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এরা কি তাহেরকে ছেড়ে দেবে? মনে হয় না। নৌকা নিয়ে এরা তাকে খুঁজবে। তন্নতন্ন করে খুঁজবে। তাহের ভাবার চেষ্টা করছে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কতটুকু। খুব বেশি নয়। সম্ভাবনা ক্ষীণ, কারণ তাহের সাঁতার জানে না।
লিলিয়ান আয়নাঘরের কাবার্ডে বসে আছে। কি গাঢ় অন্ধকার! এই অন্ধকার মাতৃগর্ভের অন্ধকার। কোন মানুষের পক্ষে এই অন্ধকার সহ্য করা সম্ভব না।
হঠাৎ করে অন্ধকার কমে গেল। তিনজনের দলটা আয়নাঘরে ঢুকল। কাবার্ডে
বসে থাকার অর্থ হয় না। লিলিয়ান ঠিক করল সে দরজা খুলে বের হবে। বলবে, কি চাও তোমরা?
লিলিয়ান দরজা খুলতে পারল না। যে লিলিয়ানের পিঠে হাত রেখেছিল সে এবার লিলিয়ানের হাত চেপে ধরল। নরম হাত। হাত ভর্তি চুড়ি। রিণরিণ করে চুড়ি বেজে উঠল। এসব কি স্বপ্নে ঘটছে? টর্চ হাতের ছেলেটি বলল, কুদুস ভাই আমার মনে হইতেছে মেম সাব এই ঘরে। ছেন্টের’ গন্ধ পাইতেছি। মেম সাব শইল্যে ‘ছেন্ট’ দিছে। হি হি হি ...।
আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলিয়ান শক্ত হয়ে আছে। এই বােধহয় কাবার্ডের দরজা খুলল। না ঠিক তখন রান্নাঘরে ‘ঝন করে শব্দ হল। টিনের একটা কিছু মেঝেতে গড়িয়ে যাচ্ছে। দলের তিনজনই ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে। দৌড়ে যাবার জন্যে হারিকেনটা নিভে গেল। যে লিলিয়ানের হাত ধরেছে সেই তাকে কাবার্ড থেকে বের করল। টেনে নিয়ে যাচ্ছে পাশের ঘরে। চারদিকে জমাটবাঁধা অন্ধকার। চাঁদের আলাে কোথায় ? আজ কি চাঁদ উঠে নি ? কিছুই দেখা যাচ্ছে না। লিলিয়ান অন্ধের মত অনুসরণ করছে। তার বােধ লুপ্ত ! সে কি করছে নিজেও জানে না। তারা দুজন এখন দাঁড়িয়ে আছে একটা পর্দার আড়ালে। এটা কোন্ ঘর? লিলিয়ানের সব এলােমেলাে হয়ে গেছে। যে তার হাত ধরে আছে সে কে? বা আসলেই কি কেউ তার হাত ধরে আছে ?
তিনজনের দলটি এ ঘরে এসেছে। তারা এখন খানিকটা বিভ্রান্ত। একজন বলল, গেল কই? বসির ভাই গেল কই?
‘এই ঘর দেখা হইছে ?”
একবার দেখলাম। ‘আবার দেখ। পর্দা টান দিয়া ফেলা।
একজন এসে পর্দা ধরল আর তখন শােবার ঘর থেকে খিলখিল হাসির শব্দ শােনা গেল। কিশােরীর মিষ্টি রিণরিণে গলা। টর্চ হাতের ছেলেটা বলল – হাসে কেডা বসির ভাই, হাসে কেডা? তিনজন এগুচ্ছে শােবার ঘরের দিকে। এবার আর আগের মত ছুটে যাচ্ছে না।
আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ
কিশােরীর হাসির শব্দ আরাে বাড়ল। তারপর হঠাৎ করে থেমে গেল। লিলিয়ান মনে মনে বলল, যা ঘটছে সবই আমার কল্পনা। আমার উত্তেজিত মস্তিষ্ক আমাকে এসব দেখাচ্ছে, শােনাচ্ছে। আসলে কেউ আমার হাত ধরে নেই । কেউ আমাকে টেনে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে না। আমি নিজেই জায়গা বদল করছি, এবং কল্পনা করছি প্রচণ্ড ভয়ের কারণে আমার এ রকম হচ্ছে? ডঃ ভারমান আমাকে তাই বলতেন।
তারপরেও লিলিয়ান ফিসফিস করে বলল, আপনি কে?
ছােট্ট নিঃশ্বাসের শব্দ শােনা গেল। কোন জবাব পাওয়া গেল না। লিলিয়ান বের হয়ে এল পর্দার আড়াল থেকে – নিজের ইচ্ছায় নয়। যে তার হাত ধরে ছিল সেই তাকে টেনে বের করল। সে চরকির মত ঘুরছে – এ–ঘর থেকে ঐ–ঘরে।
Read more
