আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর-হুমায়ূন আহমেদ

লিলিয়ানের শােবার ঘর অন্ধকারহারিকেন নিভে যাওয়ার পর সলতা থেকে বিশ্রী ধোয়া আসছেলিলিয়ানের নাক জ্বালা করছেঘরে কি কার্বন মনােক্সাইড তৈরি হয়েছে ? তার কি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত? সিড়ির দরজায় ধাক্কার শব্দ হলভারী গলায় কে বলল দরজা খুলেন। 

আয়নাঘর

লিলিয়ান বলল, কে ? খবর আছেদরজা খুলেন Urgent খবরলিলিয়ান সিড়ির দরজার কাছে চলে এলদরজা খুলল নাতার মন বলছে দরজার আড়ালে অপেক্ষা করছে ভয়ংকর বিপদ। 

খুলেন দরজাখুলেন। 

কে যেন প্রচণ্ড শব্দে ধাক্কা দিচ্ছেলিলিয়ান বলল, Go away

দরজায় হিংস্র পশুর থাবার মত থাবা পড়ছেএকজন না, কয়েকজনলিলিয়ানের মনে হল খুব কম করে হলেও তিনজন আছেলিলিয়ান খিকখিক হাসির শব্দও শুনলতিনজনের কোন একজন আনন্দে হাসছেএই আনন্দের উৎস 

সাদা চামড়া দরজা না খুইল্যা কতক্ষণ থাকবি? আপােসে দরজা খােল। 

লিলিয়ান নড়ল নাপঁাড়িয়ে রইলপ্রাচীন ভারী দরজা চট করে ভাঙবে নাভাঙতে সময় লাগবেকতক্ষণ সময় লিলিয়ান জানে নাতাহের ফিরে আসা পর্যন্তকি দরজা তাকে রক্ষা করবে? কিন্তু তাহের ? কেমন আছে ? তারও কি লিলিয়ানের মতই বিপদ হয় নি ? সে কি ফিরে আসতে পারবে? অনেক দিন পর লিলিয়ান তার মাকে ডাকলফিসফিস করে বলল, মা, আমি খুব বিপদে পড়েছি। 

আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে দরজায়এরা দরজা ভাঙার চেষ্টা করছেলিলিয়ান কাপগলায় বলল, ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করদরজার সামনে খেকে তার সরে যাওয়া উচিতলিলিয়ান সরতে পারছে নাতার পা সিসের মত ভারী হয়ে আছে দরজার বাইরের মানুষগুলি পশুর মত গর্জন করছে। 

ভাঙ দরজাভাইঙা ধর সাদা চামড়ারে। 

দরজা ভেঙে পড়ার কয়েক মিনিট আগে লিলিয়ান সম্বিৎ ফিরে পেলপ্রথম দৌড়ে ঢুকল শােবার ঘরেসেখান থেকে ছুটে গেল অয়নাঘরে। কোথাও লুকিয়ে থাকতে হবেআয়নাঘরে লুকানাের জায়গা কোথায় ? কাবার্ড ! কাবার্ড খুলে ভেতরে বসে থাকবে। 

লিলিয়ান কাবার্ড খুলে ভেতরে ঢুকল, আর তখনি তিনজনের একটা দল দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পড়লএই দলের একজন নিতান্ত চ্যাংড়াতার হাতে পাঁচ ব্যাটারীর একটা টর্চতার বয়স পনেরষেলির বেশি নাসে খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলল মেম মাগী গেছে কই

একজন বলল, পালাইছেহয় খাটের নিচে নয় আলমিরার ভিতরেলিলিয়ান এদের কথা শুনতে পারছে, কিন্তু গ্রাম্য টানা টানা কথার অর্থ ধরতে পারছে না

আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

লিলিয়ানের মনে হচ্ছে কাবার্ডে ঢুকে সে বড় ধরনের বােকামি করেছেএরা 

প্রথমেই কাবার্ডগুলি খুঁজবেএককে করে খুঁজবেতার উচিত কাবার্ড থেকে বের হয়ে আসাখােলামেলা জায়গায় থাকা যাতে দৌড়ে পালানাের চেষ্টা সে করতেপারেকোণঠাসা হয়ে ধরা পড়ার কোন মানে হয় না। 

ওরা হারিকেন জ্বালিয়েছেহারিকেন নিয়ে আয়নাঘরেই বােধহয় আসছেলিলিয়ান কাবার্ড ছেড়ে পালাবার জন্যে কাবার্ডের দরজায় হাত রাখল, আর ঠিক তখন কাবার্ডের ভেতর কি যেন একটা নড়ে উঠলঝুনঝুন শব্দ হলএকজন কেউ কোমল ভঙ্গিতে হাত রাখল তার পিঠেলিলিয়ান ছােট একটা নিঃশ্বাসের শব্দও যেন শুনল। 

কি হচ্ছে লিলিয়ানের? সে কি পাগল হয়ে গেছে? তার কি হেলুসিনেশন হচ্ছে? সে এখন কি করবে? চিৎকার করে উঠবে? তাতে লাভ কি ? পিঠে যে হাত রেখেছেসে হাত সরিয়ে নিচ্ছে নাযেন তাকে বলার চেষ্টা করছে ভয় নেইকোন ভয় নেইআয়নাঘরে তুমি নিশ্চিন্ত মনে অপেক্ষা করএরা তােমাকে কিছুতেই খুঁজে পাবে নালিলিয়ান মনে মনে বলল, আপনি যেই হােন, আমার স্বামীকে রক্ষা করার চেষ্টা করুনবিপদে পড়েছে! ওর বিপদ আমার চেয়েও ভয়ংকর বিপদআমি বুঝতে পারছিআমি খুব পরিষ্কার বুঝতে পারছি

আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

তাহেরের সিগারেট অনেক ছোট হয়ে এসেছেসিগারেটের শেষ অংশ এখনি নদীর জলে ফেলে দিতে হবেএরা সম্ভবত সিগারেট শেষ করার জন্যে অপেক্ষা করছেতাহের বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি চান

বৃদ্ধ খিকখিক করে খানিকক্ষণ হাসলসে একাই হাসছেঅন্য কেউ হাসছেনা! বৃদ্ধ হাসি থামিয়ে বলল, বিলাত দেশটা কেমন এটু কন তাে হুনি। 

বিলেতের খবর আমি জানি নাআমি থাকি আমেরিকায়আমরার কাছে আমবিকবিলাত এক জিনিস। 

বৃদ্ধ চাদরের নিচে হাত ঢুকালোতাহের জ্বলন্ত সিগারেট হাতে লাফিয়ে পড়ল নদীতেপানির টান প্রবলতাহেরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেএরা কি তাহেরকে ছেড়ে দেবে? মনে হয় নানৌকা নিয়ে এরা তাকে খুঁজবেতন্নতন্ন করে খুঁজবেতাহের ভাবার চেষ্টা করছে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কতটুকুখুব বেশি নয়সম্ভাবনা ক্ষীণ, কারণ তাহের সাঁতার জানে না। 

লিলিয়ান আয়নাঘরের কাবার্ডে বসে আছেকি গাঢ় অন্ধকার! এই অন্ধকার মাতৃগর্ভের অন্ধকারকোন মানুষের পক্ষে এই অন্ধকার সহ্য করা সম্ভব না। 

হঠাৎ করে অন্ধকার কমে গেলতিনজনের দলটা আয়নাঘরে ঢুকলকাবার্ডে 

বসে থাকার অর্থ হয় নালিলিয়ান ঠিক করল সে দরজা খুলে বের হবেবলবে, কি চাও তোমরা

লিলিয়ান দরজা খুলতে পারল নাযে লিলিয়ানের পিঠে হাত রেখেছিল সে এবার লিলিয়ানের হাত চেপে ধরলনরম হাতহাত ভর্তি চুড়িরিণরিণ করে চুড়ি বেজে উঠলএসব কি স্বপ্নে ঘটছে? টর্চ হাতের ছেলেটি বলল, কুদুস ভাই আমার মনে হইতেছে মেম সাব এই ঘরেছেন্টেরগন্ধ পাইতেছিমেম সাব শইল্যে ছেন্টদিছেহি হি হি ...। 

আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

লিলিয়ান শক্ত হয়ে আছে। এই বােধহয় কাবার্ডের দরজা খুললনা ঠিক তখন রান্নাঘরে ঝন করে শব্দ হলটিনের একটা কিছু মেঝেতে গড়িয়ে যাচ্ছেদলের তিনজনই ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকেদৌড়ে যাবার জন্যে হারিকেনটা নিভে গেলযে লিলিয়ানের হাত ধরেছে সেই তাকে কাবার্ড থেকে বের করলটেনে নিয়ে যাচ্ছে পাশের ঘরেচারদিকে জমাটবাঁধা অন্ধকারচাঁদের আলাে কোথায় ? আজ কি চাঁদ উঠে নি ? কিছুই দেখা যাচ্ছে নালিলিয়ান অন্ধের মত অনুসরণ করছেতার বােধ লুপ্ত ! সে কি করছে নিজেও জানে নাতারা দুজন এখন দাঁড়িয়ে আছে একটা পর্দার আড়ালেএটা কোন্ ঘর? লিলিয়ানের সব এলােমেলাে হয়ে গেছেযে তার হাত ধরে আছে সে কে? বা আসলেই কি কেউ তার হাত ধরে আছে

তিনজনের দলটি ঘরে এসেছেতারা এখন খানিকটা বিভ্রান্তএকজন বলল, গেল কই? বসির ভাই গেল কই

এই ঘর দেখা হইছে ?” 

একবার দেখলামআবার দেখপর্দা টান দিয়া ফেলা। 

একজন এসে পর্দা ধরল আর তখন শােবার ঘর থেকে খিলখিল হাসির শব্দ শােনা গেলকিশােরীর মিষ্টি রিণরিণে গলাটর্চ হাতের ছেলেটা বলল হাসে কেডা বসির ভাই, হাসে কেডা?  তিনজন এগুচ্ছে শােবার ঘরের দিকেএবার আর আগের মত ছুটে যাচ্ছে না।

আয়নাঘর-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

কিশােরীর হাসির শব্দ আরাে বাড়লতারপর হঠাৎ করে থেমে গেললিলিয়ান মনে মনে বলল, যা ঘটছে সবই আমার কল্পনাআমার উত্তেজিত মস্তিষ্ক আমাকে এসব দেখাচ্ছে, শােনাচ্ছেআসলে কেউ আমার হাত ধরে নেই কেউ আমাকে টেনে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে নাআমি নিজেই জায়গা বদল করছি, এবং কল্পনা করছি প্রচণ্ড ভয়ের কারণে আমার রকম হচ্ছে? ডঃ ভারমান আমাকে তাই বলতেন। 

তারপরেও লিলিয়ান ফিসফিস করে বলল, আপনি কে

ছােট্ট নিঃশ্বাসের শব্দ শােনা গেলকোন জবাব পাওয়া গেল নালিলিয়ান বের হয়ে এল পর্দার আড়াল থেকে নিজের ইচ্ছায় নয়যে তার হাত ধরে ছিল সেই তাকে টেনে বের করলসে চরকির মত ঘুরছে ঘর থেকে ঘরে

 

Read more

আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *