আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর-হুমায়ূন আহমেদ

যেন এক মজার খেলাএক সময় লিলিয়ান লক্ষ্য করল সে লােহার পঁাচানাে সিড়িতে দাঁড়িয়েবাইরের অন্ধকার গাঢ় নয়অস্পষ্টভাবে সব কিছুই দেখা যাচ্ছেএখন আর কেউ তার হাত ধরে নেইএতক্ষণ যা ঘটেছিল সবই কল্পনা

আয়নাঘর

মস্তিষ্ক তার নিজস্ব নিয়মে তৈরি করেছে বিভ্রম, এবং তাকে নিয়ে এসেছে ঘরের বাইরেঅশরীরি বলে কিছু নেই, কিছু থাকতে পারে নালিলিয়ান খুব সাবধানে লােহার সিঁড়ি দিয়ে নামছে এতটুকু শব্দও যেন না হয়তাকে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে হবেঅনেক দূর যেতে হবে, যেন কেউ তার নাগাল না পায়সিড়ি এত দুলছে কেন? মনে হচ্ছে ভেঙে পড়ে যাবেখুব হাওয়াউড়িয়ে নিয়ে যাবার মত হাওয়াএই ব্যাপারগুলি তাে স্বপ্নে ঘটেছিলএখনো কি সে স্বপ্ন দেখছে? পুরােটাই কি স্বপ্ন ? লিলিয়ানের শরীর অবসন্ন, অসম্ভব ক্লান্তঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছেইচ্ছা করছে সিড়ির রেলিং জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েমনে হচ্ছে সে জেগে আছে হাজার বছর ধরে। 

সে একতলায় নেমে এসেছেতার সামনেই বাড়ির ভাঙা প্রাচীরফিসফিস কথা শােনা যাচ্ছেনিচেও কি কেউ অপেক্ষা করছে তার জন্যে? নাকি ওরাই নেমে এসেছে নিচে? দোতলা থেকে টর্চের আলাে ফেলল সিড়িতেআলাে এদিকওদিক যাচ্ছেখুঁজে বেড়াচ্ছে লিলিয়ানকেআর একটু হলেই সে আলাে পড়ত লিলিয়ানের মুখেলিলিয়ান ক্লান্ত গলায় ফিসফিস করে বলল, আমাকে সাহায্য করুনআমাকে সাহায্য করুন, Please help me.

আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

কার কাছে সে সাহায্য চেয়েছে ? উত্তেজিত বিভ্রান্ত মস্তিষ্কের কাছে, নাকি যে অশরীরি নারী তার হাত ধরেছিল তার কাছেলিলিয়ান জানে নাসে জানতেও চায়

প্রয়ােজন হলে সে চোখ বন্ধ করে থাকবেঅশরীরি নারীমূর্তি তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাকলিলিয়ান আবারাে বলল, আপনি কোথায়? আপনি আমাকে সাহায্য করুন। 

আর ঠিক তখন সে নারীমূর্তিকে দেখতে পেলভাঙা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকাণ্ড শিরীষ গাছের আড়ালে সে দাঁড়িয়েসে হাত ইশারায় লিলিয়ানকে ডাকললিলিয়ান মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গেল। 

নারীমূর্তি সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আগে আগে যাচ্ছেপেছনে পেছনে এগুচ্ছে লিলিয়ানপাঁচিলের বাইরে এসেই নারীমূর্তি ছুটতে শুরু করলসে লিলিয়ানকে কিছুই বলেনিতবু লিলিয়ানের মনে হল তাকে যেন এই অশরীরি মূর্তি বলছে – 

ভয় পেও নাতুমি আমার পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাক। 

আমবাগান ছাড়িয়ে, খােলা মাঠ, আবার খানিক ঝোপঝাড়, চষা ক্ষেতনারীমূর্তি দ্রুত ছুটছেএকবারও পেছন ফিরে তাকাচ্ছে নালিলিয়ান কাতর গলায় বলল, পারছি নাআমি পারছি না একটু থামুন, please একটু থামুননারীমূর্তি থামছে নাছুটছে, আরাে দ্রুত ছুটছে

আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

তারা একসময় চলে এল নদীর তীরেআর তখনি মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ স্পষ্ট হলঝলমল করে উঠল নদী নদীর ওপাশের বনভূমিনারীমূর্তি থমকে দাঁড়িয়েছেহাত ইশারায় নদীর তীরে পড়ে থাকা কি একটা যেন দেখাচ্ছেলিলিয়ান সেদিকে তাকাচ্ছে নাসে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে নারীমূর্তির দিকে

কি সুন্দর মায়াময় একটি মুখলম্বা বিনুনী করা চুলশাড়ির আঁচল হাওয়ায় উড়ছেলিলিয়ান বলল, আপনি কে? আপনি কি আমার কল্পনা নাকি সত্যি কিছু

নারীমূর্তি হাসলকি সুন্দর সে হাসিলিলিয়ান হাসির শব্দও শুনলআপনি কি বলবেন না আপনি কে

ছায়ামূর্তি নসূচক মাথা নাড়ল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে ছুটতে শুরু করললিলিয়ান চেঁচিয়ে বলল, আপনি কোথায় যাচ্ছেন

ছায়ামূর্তি ছুটতে ছুটতে কি যেন বলল, বাতাসের শব্দে তা শােনা গেল না। 

লিলিয়ান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেচোখ ফিরিয়ে নিতে পারছে নাচোখ ফিরিয়ে নিয়ে আশেপাশে তাকালেই দেখতে পেত নদীর তীরে চিৎ হয়ে যে মানুষটি শুয়ে আছে সে তাহেরএখনাে তার দেহে প্রাণ আছে, সে বেঁচে যাবে সে নিশ্চয়ই বেঁচে যাবে| জ্যোৎস্না প্লাবিত জলরাশি, তার ধার ঘেঁসে ছুটে যাচ্ছে এক নারীমূর্তিবাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ছেরিণরিণ করে বাজছে হাতের চুড়ি। 

আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

পনের বছর পর লিলিয়ান আবার তাহেরকে নিয়ে ইন্দারঘাটে এসেছেতাদের সঙ্গে দুটি ফুটফুটে মেয়েএগার বছরের সারা, সাত বছরের রিয়াদুজনই হয়েছে মারি মত, শুধু চোখ পেয়েছে বাবারবড় বড় কালাে চোখমানীল চোখ কেউই পায় নিদুজনই খুব হাসিখুশি মেয়ে, কিন্তু এদের চোখের দিকে তাকালে মনে হয় চোখ ভর্তি জলএক্ষুণি বুঝি কাঁদবে

তাদের আসা উপলক্ষে বাড়িঘর ঠিক করা হয়েছেবাড়ির চারপাশের বাগানপরিষ্কার করা হয়েছেমেয়ে দুটি মহানন্দে বাগানে ছােটাছুটি করছেরিয়া ছুটতে গিয়ে উল্টে পড়ে হাঁটুতে ব্যথা পেয়েছেহাঁটুর চামড়া ছিলে গেছেকিন্তু রিয়া হাঁটু চেপে ধরে হাসছেযেন এই বাগানবাড়িতে ব্যথা পাওয়াও এক আনন্দ জনক 

অভিজ্ঞতা। 

তাহের নিজেও বাগানেসে খুব ব্যস্তআমগাছের ডালে দোলনা টানানাের চেষ্টা করছেডাল উঁচুচেয়ারে দাঁড়িয়ে নাগাল পাওয়া যাচ্ছে নাবড় মেয়ে সারা বাবাকে সাহায্য করবার জন্য এগিয়ে এলসে গম্ভীর গলায় বলল, বাবা শােন তুমি যদি দুদিন পর বল, বেড়ান শেষ হয়েছে এখন আমেরিকা ফিরে যাবতাহলে কিন্তু হবে নাআমরা খুব রাগ করব। 

আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

তাহলে আমাকে কি করতে হবে? এখানে থাকতে হবেকতদিন?” For eternity.’ 

তাহের হােহাে শব্দে হাসছেহাসির শব্দে লিলিয়ান এসে দোতলার বারান্দায় দাঁড়ালতাহের উঁচু গলায় বলল, এই যে বিদেশিনী ! দয়া করে মগভর্তি কাপাচিনো কফি বানিয়ে নিচে এসে আমাকে সাহায্য কর। 

এখন কফি বানান যাবে নাসরঞ্জাম নেইকোন অজুহাত শুনতে চাই নাকফি বানাতে হবেছােট মেয়ে রিয়া চেঁচিয়ে বলল, বাবার জন্যে কফি বানাতেই হবেলিলিয়ান রান্নাঘরের দিকে গেল নাসে ঢুকল আয়নাঘরেদরজা বন্ধ করে

দিলঅন্ধকার হয়ে গেল আয়নাঘরসে গলার স্বর নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল, আপনাকে দেখানাের জন্যে আমি আমার বাচ্চা দুটিকে নিয়ে এসেছিআপনি কি দেখেছেন তাদের

কেউ জবাব দিল নালিলিয়ান বলল, আপনি কি তাদের একটু আদর করে দেবো না

নীরবতা ভঙ্গ হল নাআয়নাঘরের স্তব্ধতা ভাঙল নালিলিয়ানের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছেপনের বছর আগে এক ভয়ংকর জটিল সময়ে কেউ একজন তার হাত ধরে বলার চেষ্টা করেছিল কোন ভয় নেইসেই দুঃসময় আজ আর তার নেইজীবন তার মঙ্গলময় বিশাল বাহু মেলে লিলিয়ানকে জড়িয়ে ধরেছেআজ আর আশ্বাসের বাণী শােনার তার প্রয়ােজন নেই লিলিয়ান আবার বারান্দায় এসে দাঁড়ালনিচে খুব মজা হচ্ছেদোলনা তৈরি হয়ে গেছেতাহের দোল খাচ্ছে

আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

মেয়েরা বাবাকে নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, পারছে নালিলিয়ান আপন মনে বলল, আমি কেউ না, অতি তুচ্ছ একজন, তবু ঈশ্বর কেন এত সুখ আমার জন্যে রেখেছেন? খুট করে শব্দ হলআয়নাঘরের দরজা খুলে গেল। লিলিয়ানের মনে হল, নূপুর পায়ে কে যেন আসছে তার দিকেএই তাে লিলিয়ান তার পা ফেলার ছােট ছােট শব্দ শুনতে পাচ্ছেলিলিয়ান বাগানের দিকে ইশারা করে স্পষ্ট স্বরে বলল দেখুন হচ্ছে সারাআমার বড় মেয়েআর নীল জামা পরা মেয়েটা রিয়াদুজনই খুব দুষ্টু। 

আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ

তাহের দোল খাওয়া বন্ধ করে উঁচু গলায় বলল, মেয়েরা! তােমাদের মাকে দেখঅকারণে কাঁদছেব্যাপারটা কি বল তো, এই মহিলার অকারণে কাঁদার রােগ আছেআগেও কয়েকবার লক্ষ্য করেছিরিয়া বড়দের মত গম্ভীর গলায় বলল, আমার মনে হয় মাচোখে কোন প্রবলেম আছে। 

লিলিয়ান খুব কাঁদছেঅসম্ভব সুন্দর এই দিনে কেউ কাঁদে নালিলিয়ান কাঁদছে, কাঁদতে তার বড় ভাল লাগছে

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *