কিছু শৈশব-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে সে তখন সঙ্গীতের প্রবল আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে গান ধরেএই গান সে গায় নিজস্ব ভঙ্গিতে সবাই অবশ্য বিরক্ত হয়এটা কোনাে বড় কথা নয়

কিছু শৈশববড় কথা হলােগাধার সঙ্গীতপিপাসু মন ।। এখন তােরা বুঝলি তাে ? গাধা বললে রাগ করার কোনাে কারণ নেই, বরং 

আনন্দে উল্লসিত হবার কারণ আছেবুঝলি তাে? আহা, গাধাদের কথা ভাবলেই মনটা উদাস হয়কী মহৎ প্রাণী। 

মামার বক্তৃতা শােনার পর কেউ আমাদের গাধাবলে গাল দিলে বড় ভালাে লাগেমনে খুব আনন্দ হয়তবে সে আনন্দ মামাই বেশি পানমহৎ প্রাণীটির সাথে সবাই মামাকেই বেশি তুলনা করে। 

জগতের সব প্রতিভাবান ব্যক্তির মতাে মামারও পুঁথিগত পড়াশােনার প্রতি খুব অনীহা ছিলকারণ পুঁথিগত পড়াশােনায় কী হয় ? কিছুই হয় নাআত্মার উন্নতি কি পাঠ্যবই থেকে আসবে ? না আসা উচিত ? কাজেই মামা পরীক্ষার পড়া তেমন গুরুত্বের সাথে পড়েন না এবং যথারীতি ফেল করেনসেবারও আই. . পরীক্ষার ফল বের হলে পত্রিকায় তার রােল নাম্বার খুঁজে পাওয়া গেল না

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

মামা উদাস গলায় বললেন, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি নাকোনাে মিসটেক হয়েছে বােধহয়পরীক্ষা তাে ভালােই দিয়েছিলাম ছাপাখানা বাই মিসটেক রােল নাম্বার বাদ দিয়ে দিল কিনা কে জানেএরকম প্রায়ই হয়গত বছর আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড পরিমলের রােল নাম্বার পত্রিকায় ছাপা হয় নিপরে দেখা গেল হায়ার সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছেএই জাতীয় ব্যাপার রেগুলার হচ্ছে। 

আমরা ছােটরা খুব নিশ্চিন্ত হলাম, মামা পাস করেছেন শুধু বাই মিসটেকতার নাম্বার কাগজে ছাপা হয় নিবড়রা অবশ্য নিশ্চিন্ত হলেন নাআমার বাবা মহাবিরক্ত হয়ে বললেন, প্রথম শ্রেণীর গাধাআকারে গা, আকারে ধাপরপর তিনবার কেউ ফেল করে

মামা বললেন, দুলাভাই, আমাকে গাধা বলায় আমি মন খারাপ করি নিকারণ গাধাকে আমি মহৎ প্রাণী বলে মনে করিতবে দ্বিতীয় বাক্যটিতে আমি আহত হয়েছি। দ্বিতীয় বাক্যে আপনি বলেছেনআকারে গা, আকারে ধাবানান করে বলেছেনযেন আমি গাধার বানান জানি নাএটা তাে দুলাভাই অন্যায়

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

তুমি আমার সামনে থেকে যাওবড়মামা গম্ভীর মুখে নিজের ঘরে চলে এলেনদরজা বন্ধ করে দিলেনকিছুক্ষণ পরে শােনা গেল তিনি কবিতা আবৃত্তি করছেন— 

সন্ন্যাসী উপগুপ্ত মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে একদা ছিলেন সুপ্তনগরীর দীপ নিবেছে পবনে, দুয়ার রুদ্ধ পৌর ভবনে; নিশীথের তারা শ্রাবণ গগনে ঘন মেঘে অবলুপ্ত ॥ 

পরীক্ষায় ফেল করলে মামা রবীন্দ্রনাথের কবিতা খুব বেশি পড়েনকারণ রবীন্দ্রনাথও নাকি তাঁর মতাে ফেলটুস ছাত্র ছিলেনমামার ধারণা রবীন্দ্রনাথের সাথে তার অনেক মিল আছেরবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখতেন, তিনিও লেখেনরবীন্দ্রনাথের মতাে তিনি একটা কাব্যনাটকও লিখেছেননামরাজকুমারী সুবর্ণরেখা আমরা ছােটরা সেই নাটকে অভিনয় করবরােজ মামার ঘরে রিহার্সেল হয়রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকতেন, মামাও ছবি আঁকেনবিশেষ করে হাতির ছবি আঁকার ব্যাপারে মামার জুড়ি নেইআমাদের সবার ধারণা রবীন্দ্রনাথও এত সুন্দর হাতির ছবি আঁকতে পারতেন নামামার আঁকা হাতিগুলি খুব মায়া মায়া চোখে তাকায়

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

দুপুরবেলা এসে মামার বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিয়ে বললেন, এই গাধা, খেতে আয়ভাত দিয়েছি। 

মামা উদাস গলায় বললেন, খাব না বুবুআমাকে বিরক্ত না করলে খুশিহবাে। 

পরীক্ষায় ফেল করে মাথা কিনেছিস ? ভাত না খেয়ে ঢং করতে হবে না তাের ঢং যথেষ্ট সহ্য করেছি। 

মামা দরজা খুললেন নাআরাে আবেগের সাথে আবৃত্তি করতে লাগলেন— 

অঙ্গে আঁচল সুনীলবরণ রুনু ঝুনু রবে বাজে আভরণ 

সন্ন্যাসী গায়ে পড়িতে চরণ থামিল বাসব দত্তামা কড়া গলায় বললেন, আর সাধাসাধি করব নানা খেলে না খাবি পরীক্ষায় ফেল করে ল্যাজ গজিয়ে গেছেঅসহ্য! আমি বাবাকে চিঠি লিখে দিচ্ছিতিনি এসে যা ব্যবস্থা করার করবেন। 

আমরা ছােটরা খুব মুষড়ে পড়লামবড়মামা খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিলে আমাদের রিহার্সেল হবে কীভাবে? রাজকুমারী সুবর্ণরেখাকাব্যনাট্য স্টেজে নামানাে যাবে নাবিকেলে সবাই মন খারাপ করে মামার বন্ধ ঘরের দরজার সামনে ঘুরঘুর করছিমামা দরজা খুলে বললেন, আয় ভেতরে আয়। 

আমরা ভেতরে ঢুকলাম। 

মামা গম্ভীর গলায় বললেন, যথানিয়মে রিহার্সেল হবেকোনাে কিছুই আটকে থাকবে নাশিল্পসাহিত্যের এই নিয়মঝড় হােক, তুফান হােক, টাইফুন হােক, ভূমিকম্পে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাকশিল্পসাহিত্য চলবেই

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

 তুমি তাে না খেয়ে আছ মামা। 

তাতে কোনাে ক্ষতি নেইএ বাড়িতে আমাকে যে অপমান করা হয়েছে তার প্রতিবাদ করার জন্যেই আমি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিতবে তা নিয়ে চিন্তিত হবার কোনাে কারণ নেই, আমি হােটেলে খাওয়াদাওয়া করবশুধু তাই 

আমি আগামী একবছর চুলদাড়ি কাটব না, নখ কাটব না, গােসল করব না, গায়ে তেল দেব না, বিছানায় ঘুমুব নামেঝেতে ঘুমুবএকবছর পর আবার আই. . পরীক্ষা দেবরেজাল্ট বের হবে ফাস্ট ডিভিশনতখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাব । 

আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, আবার যদি ফেল করাে

মামা এমনভাবে তাকালেন যেন এমন হাস্যকর কথা এই জীবনে শুনেন নিআমি বড়ই লজ্জা পেলামমামা বললেন, রিহার্সেল শুরু করা যাককই রাজকুমারী সুবর্ণরেখা কোথায়

বকুল আপা এগিয়ে এলেন। তিনি হচ্ছেন রাজকুমারী সুবর্ণরেখা। 

এবার ক্লাস সিক্সে উঠেছেন। এমনিতে খুব ভালাে, তবে খুব খামচি দেয়আমরা তার নাম দিয়েছি খামচি রানীরাজকুমারী সুবর্ণরেখার শুরুটা এরকমগন্ধর্ব রাজার ছােট মেয়ে রাজকুমারী সুবর্ণরেখা চলে গিয়েছেন মৃগয়ায়দলবল রেখে আপনমনে হাঁটছেনএকসময় পথ হারিয়ে ফেললেনকিছুতেই পথ খুঁজে পান নাএদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছেবাঘভালুক ডাকছেআকাশের অবস্থাও ভালাে নাঝড় হতে পারেরাজকন্যা ব্যাকুল হয়ে বললেনসুবর্ণরেখা ; কে কোথায় আছবাঁচাও বাঁচাও। 

পথহারা পাখি আমি খুঁজিতেছি নীড়আতঙ্কে অধীর

চারপাশে বন্য পশুপাখি করিতেছে ভিড়

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *