গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে সে তখন সঙ্গীতের প্রবল আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে গান ধরে। এই গান সে গায় নিজস্ব ভঙ্গিতে । সবাই অবশ্য বিরক্ত হয়। এটা কোনাে বড় কথা নয় ।
বড় কথা হলাে— গাধার সঙ্গীতপিপাসু মন ।। এখন তােরা বুঝলি তাে ? গাধা বললে রাগ করার কোনাে কারণ নেই, বরং
আনন্দে উল্লসিত হবার কারণ আছে। বুঝলি তাে? আহা, গাধাদের কথা ভাবলেই মনটা উদাস হয়— কী মহৎ প্রাণী।
মামার বক্তৃতা শােনার পর কেউ আমাদের গাধা‘ বলে গাল দিলে বড় ভালাে লাগে। মনে খুব আনন্দ হয়। তবে সে আনন্দ মামাই বেশি পান। ঐ মহৎ প্রাণীটির সাথে সবাই মামাকেই বেশি তুলনা করে।
জগতের সব প্রতিভাবান ব্যক্তির মতাে মামারও পুঁথিগত পড়াশােনার প্রতি খুব অনীহা ছিল। কারণ পুঁথিগত পড়াশােনায় কী হয় ? কিছুই হয় না। আত্মার উন্নতি কি পাঠ্যবই থেকে আসবে ? না আসা উচিত ? কাজেই মামা পরীক্ষার পড়া তেমন গুরুত্বের সাথে পড়েন না এবং যথারীতি ফেল করেন। সেবারও আই. এ. পরীক্ষার ফল বের হলে পত্রিকায় তার রােল নাম্বার খুঁজে পাওয়া গেল না।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
মামা উদাস গলায় বললেন, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না। কোনাে মিসটেক হয়েছে বােধহয়। পরীক্ষা তাে ভালােই দিয়েছিলাম । ছাপাখানা বাই মিসটেক রােল নাম্বার বাদ দিয়ে দিল কি–না কে জানে। এরকম প্রায়ই হয়। গত বছর আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড পরিমলের রােল নাম্বার পত্রিকায় ছাপা হয় নি। পরে দেখা গেল হায়ার সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছে। এই জাতীয় ব্যাপার রেগুলার হচ্ছে।
আমরা ছােটরা খুব নিশ্চিন্ত হলাম, মামা পাস করেছেন শুধু বাই মিসটেক’ তার নাম্বার কাগজে ছাপা হয় নি। বড়রা অবশ্য নিশ্চিন্ত হলেন না। আমার বাবা মহাবিরক্ত হয়ে বললেন, প্রথম শ্রেণীর গাধা। গ আকারে গা, ধ আকারে ধা। পরপর তিনবার কেউ ফেল করে ?
মামা বললেন, দুলাভাই, আমাকে গাধা বলায় আমি মন খারাপ করি নি। কারণ গাধাকে আমি মহৎ প্রাণী বলে মনে করি। তবে দ্বিতীয় বাক্যটিতে আমি আহত হয়েছি। দ্বিতীয় বাক্যে আপনি বলেছেন— গ আকারে গা, ধ আকারে ধা। বানান করে বলেছেন। যেন আমি গাধার বানান জানি না। এটা তাে দুলাভাই অন্যায়।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
তুমি আমার সামনে থেকে যাও। বড়মামা গম্ভীর মুখে নিজের ঘরে চলে এলেন। দরজা বন্ধ করে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে শােনা গেল তিনি কবিতা আবৃত্তি করছেন—
সন্ন্যাসী উপগুপ্ত মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে একদা ছিলেন সুপ্ত।। নগরীর দীপ নিবেছে পবনে, দুয়ার রুদ্ধ পৌর ভবনে; নিশীথের তারা শ্রাবণ গগনে ঘন মেঘে অবলুপ্ত ॥
পরীক্ষায় ফেল করলে মামা রবীন্দ্রনাথের কবিতা খুব বেশি পড়েন। কারণ রবীন্দ্রনাথও নাকি তাঁর মতাে ফেলটুস ছাত্র ছিলেন। মামার ধারণা রবীন্দ্রনাথের সাথে তার অনেক মিল আছে। রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখতেন, তিনিও লেখেন। রবীন্দ্রনাথের মতাে তিনি একটা কাব্যনাটকও লিখেছেন। নাম— রাজকুমারী সুবর্ণরেখা । আমরা ছােটরা সেই নাটকে অভিনয় করব। রােজ মামার ঘরে রিহার্সেল হয়। রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকতেন, মামাও ছবি আঁকেন। বিশেষ করে হাতির ছবি আঁকার ব্যাপারে মামার জুড়ি নেই। আমাদের সবার ধারণা রবীন্দ্রনাথও এত সুন্দর হাতির ছবি আঁকতে পারতেন না। মামার আঁকা হাতিগুলি খুব মায়া মায়া চোখে তাকায়।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
দুপুরবেলা এসে মামার বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিয়ে বললেন, এই গাধা, খেতে আয়। ভাত দিয়েছি।
মামা উদাস গলায় বললেন, খাব না বুবু। আমাকে বিরক্ত না করলে খুশি। হবাে।
পরীক্ষায় ফেল করে মাথা কিনেছিস ? ভাত না খেয়ে ঢং করতে হবে না । তাের ঢং যথেষ্ট সহ্য করেছি।
মামা দরজা খুললেন না। আরাে আবেগের সাথে আবৃত্তি করতে লাগলেন—
অঙ্গে আঁচল সুনীলবরণ রুনু ঝুনু রবে বাজে আভরণ
সন্ন্যাসী গায়ে পড়িতে চরণ থামিল বাসব দত্তা। মা কড়া গলায় বললেন, আর সাধাসাধি করব না। না খেলে না খাবি । পরীক্ষায় ফেল করে ল্যাজ গজিয়ে গেছে। অসহ্য! আমি বাবাকে চিঠি লিখে দিচ্ছি। তিনি এসে যা ব্যবস্থা করার করবেন।
আমরা ছােটরা খুব মুষড়ে পড়লাম। বড়মামা খাওয়া–দাওয়া বন্ধ করে দিলে আমাদের রিহার্সেল হবে কীভাবে? ‘রাজকুমারী সুবর্ণরেখা’ কাব্যনাট্য স্টেজে নামানাে যাবে না। বিকেলে সবাই মন খারাপ করে মামার বন্ধ ঘরের দরজার সামনে ঘুরঘুর করছি। মামা দরজা খুলে বললেন, আয় ভেতরে আয়।
আমরা ভেতরে ঢুকলাম।
মামা গম্ভীর গলায় বললেন, যথানিয়মে রিহার্সেল হবে। কোনাে কিছুই আটকে থাকবে না। শিল্প–সাহিত্যের এই নিয়ম। ঝড় হােক, তুফান হােক, টাইফুন হােক, ভূমিকম্পে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাক— শিল্প–সাহিত্য চলবেই।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ
তুমি তাে না খেয়ে আছ মামা।
তাতে কোনাে ক্ষতি নেই। এ বাড়িতে আমাকে যে অপমান করা হয়েছে তার প্রতিবাদ করার জন্যেই আমি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবে তা নিয়ে চিন্তিত হবার কোনাে কারণ নেই, আমি হােটেলে খাওয়া–দাওয়া করব। শুধু তাই
আমি আগামী একবছর চুল–দাড়ি কাটব না, নখ কাটব না, গােসল করব না, গায়ে তেল দেব না, বিছানায় ঘুমুব না— মেঝেতে ঘুমুব। একবছর পর আবার আই. এ. পরীক্ষা দেব। রেজাল্ট বের হবে । ফাস্ট ডিভিশন। তখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাব ।
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, আবার যদি ফেল করাে ?
মামা এমনভাবে তাকালেন যেন এমন হাস্যকর কথা এই জীবনে শুনেন নি। আমি বড়ই লজ্জা পেলাম। মামা বললেন, রিহার্সেল শুরু করা যাক। কই রাজকুমারী সুবর্ণরেখা কোথায় ?
বকুল আপা এগিয়ে এলেন। তিনি হচ্ছেন রাজকুমারী সুবর্ণরেখা।
এবার ক্লাস সিক্সে উঠেছেন। এমনিতে খুব ভালাে, তবে খুব খামচি দেয়। আমরা তার নাম দিয়েছি খামচি রানী। রাজকুমারী সুবর্ণরেখা’র শুরুটা এরকম— গন্ধর্ব রাজার ছােট মেয়ে রাজকুমারী সুবর্ণরেখা চলে গিয়েছেন মৃগয়ায়। দলবল রেখে আপনমনে হাঁটছেন। একসময় পথ হারিয়ে ফেললেন। কিছুতেই পথ খুঁজে পান না। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। বাঘ–ভালুক ডাকছে। আকাশের অবস্থাও ভালাে না। ঝড় হতে পারে। রাজকন্যা ব্যাকুল হয়ে বললেন— সুবর্ণরেখা ; কে কোথায় আছ— বাঁচাও বাঁচাও।
পথহারা পাখি আমি খুঁজিতেছি নীড়। আতঙ্কে অধীর,
চারপাশে বন্য পশুপাখি করিতেছে ভিড়।
Read more