কিছু শৈশব-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

এই বলে রাজকুমারী ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকবেনতখন দস্যুসর্দার ভীম নাগ খােলা তরবারি হাতে প্রবেশ করবেআমার হচ্ছে দস্যু ভীম নাগের পার্ট

কিছু শৈশবআমি রাজকুমারীর কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াবকর্কশ গলায় বলব— ভীম নাগ : কে তুমি কাঁদিছ বসি 

বনপ্রান্তে একা বেশভূষা চমক্কার যাইতেছে দেখাচক্ষে অশ্রু জলকী তার কারণ অতি সত্বর করহ বর্ণন ॥ 

পুরােদমে রিহার্সেল শুরু হয়ে গেলমামার উৎসাহের সীমা নেইসবার অভিনয় দেখিয়ে দিচ্ছেনচড় চাপড়ও মারছেনআমার গলা যথেষ্ট কর্কশ হচ্ছে 

বলে কয়েকটা চড় খেলামএইসব নিয়ে আমরা কখনাে মন খারাপ করি নাকারণ মামা বলেছেন, অভিনয় ছেলেখেলা নয়চড়থাপ্পড়, কিলঘুসি না খেলেঅভিনয় শেখা যায় নাবড়ই কঠিন বিদ্যা। 

এক মাসের মাথায় মামা বনমানুষের মতাে হয়ে গেলেনমাথাভর্তি চুল, মুখভর্তি দাড়িগোঁফ, হাতের নখ বড় বড়গােসল করছেন না বলে সারা শরীরে এক পরত ময়লা। কাছে গেলে বিকট গন্ধ পাওয়া যায়মামা নির্বিকার তিনি বাসায় খাচ্ছেন না

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

হােটেল থেকে খাবার আসছেআমার মা দেশের বাড়িতে চিঠি লিখেছেনআমরা ভয়ে ভয়ে আছিচিঠি পেয়ে নানাজান চলে এলে কী হবে কে জানে! নানাজান মানুষটি ছােটখাটো হলেও ভয়ঙ্কর ধরনেরতার স্বভাবচরিত্র দত্মসর্দার ভীম নাগের চেয়েও খারাপধমক ছাড়া কোনাে কথা বলতে পারেন নাসেই ধমকও ভয়াবহ ধমক। একবার রিকশা ভাড়া নিয়ে গণ্ডগােল হওয়ায় রিকশাওলাকে ধমক দিয়েছিলেনসেই ধমকে রিকশার সামনের চাকার টায়ার বাস্ট হয়ে গিয়েছিল । 

মা চিঠি লিখেছেন ঠিকই, তবে আমরা সবাই জানি নানাজান আসবেন নারেলে চড়তে তার খুব ভয় তার ধারণা রেলগাড়ি বাহন হিসেবে খেলনা ধরনেরএত বড় একটা গাড়ি দুটা সরু লাইনের উপর দাঁড়িয়ে থাকেসামান্য বাতাস লাগলেই গাড়ি যে পড়ে যাবে এটা তাে জানা কথা। 

তিনি যে ময়মনসিংহ থেকে রেলে চড়ে সিলেট আসবেন নাএটা নিশ্চিত ধরে নেয়া যায়এত দূরের পথ হেঁটে আসাও সম্ভব নয়কাজেই আমরা মােটামুটি নিশ্চিন্ত হয়ে রিহার্সেল দিতে লাগলামঅভিনয়ের বেশি দেরি নেইআমি মামার উপদেশ মতাে তেঁতুল এবং দৈ খাচ্ছি, যাতে গলা ভেঙে কর্কশ হয়ে যায়

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

বকুল আপা চুলে তেল দেয়া বন্ধ করেছেন, কারণ চুল আলুথালু থাকতে 

স্টেজ রিহার্সেলের আগের দিন নানাজান এসে উপস্থিত তিনি ট্রেনে আসেন নিসুনামগঞ্জ পর্যন্ত এসেছেন লঞ্চেসেখান থেকে হেঁটে সিলেট শহরে বাসে আসা যায়, তিনি আসেন নিকারণ ট্রেনের মতাে বাসও তার অপছন্দপেট্রলের ধোঁয়া সহ্য হয় না । 

বড়মামা সালাম করবার জন্যে নানাজানের সামনে গেলেনআমরা সবাই ধরে নিয়েছি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধমকটি এখন শুনবতা শুনলাম নানানাজান শান্ত গলায় বললেন, ভালাে আছিস

জি। 

নানাজান তাঁর চামড়ার হ্যান্ডব্যাগ খুলে কাঁচি, ক্ষুর, ব্রাশ এবং সাবান বের করলেনআগের চেয়েও শান্ত গলায় বললেন, কাছে আয়, মাথা কামিয়ে দেইজিনিসপত্র সব সাথে করে এনেছি। 

মামা সুবােধ বালকের মতাে কাছে এগিয়ে গেলেন। 

নানাজান যে নাপিতের কাজে এত দক্ষ আমাদের জানা ছিল নাদশ মিনিটের মাথায় বড় মামার চুলদাড়ি সব উড়ে গেলমামাকে দেখাতে লাগল সন্ন্যাসী উপগুপ্তের মতাে

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

নানাজান নিজের কাজে মুগ্ধ হয়ে বললেন, ভুরু দুটা কামিয়ে ফেলব কিনা ভাবছিগাধাটার শাস্তি হওয়া দরকার। 

মা ক্ষীণ গলায় বললেন, ভুরু কামাবার দরকার নেই বাবানানাজান বিমর্ষ গলায় বললেন, আচ্ছা তাহলে থাকতিনি মামার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই বাঁদর, উঠে দাড়ামামা উঠে দাঁড়ালেননানাজান বললেন, আশেপাশে পুকুর আছে ? মামা বললেন, জি আছে । 

পুকুরে চলে যাগলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকবিঘড়ি দেখে পাক্কা তিন ঘণ্টা থাকবিএই তিন ঘণ্টায় গায়ের ময়লা ভিজে নরম হবেতারপর তােকে গােসল দেবনিজের হাতেই দেবগােসলের সাজসরঞ্জামও সাথে নিয়ে এসেছিনারিকেলের ছােবড়া এনেছিডলে চামড়াসুদ্ধ তুলে ফেলবতারপর সােড়া দিয়ে জ্বাল দিব। 

জি আচ্ছা। 

কাল ভােরে আমার সঙ্গে মৈমনসিং রওনা হবি। আমরা যাব হাঁটাপথেলঞ্চে যাওয়া যাবে না, লঞ্চেও পেট্রলের গন্ধ

বড় মামা মিনমিন করে বললেন, এতটা পথ হেঁটে যাব কীভাবে

নানাজান হুঙ্কার দিয়ে বললেন, মােটেই এতটা পথ নামাত্র ৯৬ মাইলঘণ্টায় তিন মাইল করে গেলে ৩২ ঘণ্টা লাগবেকাল ভাের ছটায় রওনা হলে ইনশাআল্লাহ পরদিন দুপুরের মধ্যে বাড়ি পৌছে যাব

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ

পথে কোথাও থামা যাবে নাএখন সামনে থেকে যা, তাের গা থেকে পাঠার গন্ধ আসছে। 

মামা বিষণমুখে চলে গেলেনমা বললেন, এতদিন পর এসেছেন, দুএকটা দিন থাকবেন না

নানাজান বললেন, না গাে মানানান কাজকর্ম ফেলে এসেছিগাধাটাকে বাড়িতে নিয়ে একটা ব্যবস্থা করতে হবে। 

কী ব্যবস্থা করবেন ? বিয়ে দিয়ে দেবএকটা ভালাে মেয়ে সন্ধানে আছেমা বললেন, রঞ্জুর বিয়ে দেবেন, আমরা কেউ থাকব না

এটা কোনাে সুখের বিয়ে না শাস্তির অংশ হিসেবে বিয়েভাত রান্না হলে আমাকে ভাত দাওখাওয়াদাওয়া করে শাহজালাল সাহেবের মাজার জিয়ারত করতে যাব। 

এতটা পথ হেঁটে এসেছেন, খাওয়াদাওয়ার পর শুয়ে বিশ্রাম করেন। 

নানাজান বললেন, মুখের উপর কথা বলবে নামুখে মুখে কথা বলা আমার পছন্দ নাভাত দিতে বলছি ভাত দাও। 

মা তাড়াতাড়ি ভাত বাড়তে গেলেনআমি গেলাম পুকুরপাড়েএই প্রচণ্ড শীতে বড়মামা গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে পুকুরে বসে আছেনমাথা কামানাের জন্যে তাঁকে অদ্ভুত দেখাচ্ছেপুকুরের চারপাশে প্রচুর লােকজনতারা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করছেকী হইছে ? বিষয় কী ? ভাইজান, আপনের হইছে কী ? মামা এইসব প্রশ্নের কোনাে জবাব দিচ্ছেন না, তবে বড়ই বিরক্ত হচ্ছেন

এক বুড়াে লোেক এর মধ্যে বলল, মনে হয় পাগল। 

অনেকেই তাতে সায় দিলকয়েকটা কুকুরও দেখলাম খুব মজা পাচ্ছেমামার দিকে তাকিয়ে ঘেউঘেউ করছে

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *